শিল্পকলায় লেবাননের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস। দেশটিতে বর্তমানে মোট ৯২টি আর্ট গ্যালারি, ১০৩টি মিউজিয়াম ও ১০২টি সংস্কৃতি কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের লেবাননে হামলার মধ্য দিয়ে সৃষ্ট সংঘাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে দেশটির শিল্পকলায়। আতঙ্কে প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটা অংশই বন্ধ। কতেকটা নামমাত্র খোলা থাকলেও কমিয়ে আনা হয়েছে সময়। কর্মীদের জন্যও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। এদিকে গ্যালারি ও মিউজিয়ামে দর্শকের আনাগোনাও কমেছে ব্যাপকভাবে।
বৈরুতের সালেহ বারাকাত গ্যালারি সিদ্ধান্ত নিয়েছে খোলা রাখার। অবশ্য কমিয়ে আনা হয়েছে সময়। চলমান যুদ্ধের মধ্যে তারা নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়কেই প্রাধান্য দিচ্ছে বলে জানিয়েছে। মানুষ এমন পরিস্থিতিতে দূরের সফরে যেতে চাচ্ছে না এ সময়ে। গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা সালেহ বরকত দাবি করেছেন, ‘সাংস্কৃতিক পরিসরকে যেন জীবিত রাখা যায়, তার জন্য আমরা প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
বারাকাত গ্যালারিতে এর মধ্যে কিছু প্রদর্শনী বাতিল হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরাকি চিত্রশিল্পী দিয়া আজাভির সৃষ্টিকর্ম প্রদর্শনী। তাকে প্রায়ই আধুনিক আরব চিত্রকলার পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অবশ্য তার পরও বারাকাত থেমে নেই। তিনি নতুন শোয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে সময় ব্যয় করছেন। কাজ করে যাচ্ছেন শিল্পকলা নিয়ে। সন্তানদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কর্মীদের একটা অংশকে সরিয়ে নিয়েছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। চেষ্টা করছেন আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে গ্রাহক আকর্ষণ করতে।
লেবাননের আরেক বিখ্যাত শিল্প কেন্দ্র হলে, গ্যালারি তানিত; প্রতিষ্ঠাতা নাইলা কেট্টানেহ কুনিক। যুদ্ধের জন্য তাকে একটা প্রদর্শনীর সময় কমিয়ে আনতে হয়েছে। প্রদর্শনীটি ছিল বেত্তিনা খুরি বদরের। নাইলা প্যারিস ও আবুধাবির শিল্প প্রদর্শনীতে যোগ দেয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। যেহেতু বৈরুতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের ফ্লাইট সংখ্যা কমে গেছে; ফলে বেড়ে গেছে ভাড়া। বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তার মতো অনেক শিল্পী।
লেবাননের অনেক শিল্প কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। তাদের একটা জুমানা অ্যাসিলির প্রতিষ্ঠিত মারফা গ্যালারি। এদিকে সংঘাতের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ বন্ধ হয়ে গেছে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত (এইউবি) রাজধানীতে অন্তত দুটি গ্যালারির তত্ত্বাবধান করে। দুটি গ্যালারিই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে প্রদর্শনী। কোর্সগুলোর পাঠদান কর্মসূচিকে নেয়া হয়েছে অনলাইনে। এক সময় যে চত্বর প্রাণবন্ত ছিল, এখন যেন সেখানে ভূতের বসবাস।
কোনো কোনো শিল্পী এককভাবেই নানা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলেন। সে কাজে ব্যাঘাত ঘটেছে বড় ধরনের। তার পরও এগিয়ে চলেছেন তারা। চিত্রশিল্পী কাদিরি দক্ষিণ লেবননে বসবাস করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনা প্রভাবিত করেছে তার শিল্পকর্মকে। বর্তমান অবস্থা তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এদিকে লেবাননের শীর্ষ ভাস্কর আনসার বাসবুসের মতো অনেকেই হারিয়ে ফেলেছেন সৃষ্টির সুযোগ। তাদের মতো অনেকেই কাজ করার জন্য সুযোগ পাচ্ছেন না। কেবল বেঁচে থাকার জন্য ছুটছেন। কেউ হয়েছেন বাস্তুহারা। এর আগে ফিলিস্তিনি বহু চিত্রশিল্পীর বাস্তুহারা হওয়ার গল্প শুনেছে দুনিয়া, এখন তা লেবাননে বিস্তৃত হচ্ছে কিনা সেটাই প্রধান প্রশ্ন।









