১৫০৩ সালে ভ্যাটিকানে নতুন পোপ হয়ে আসেন দ্বিতীয় জুলিয়াস। সে সময় তার প্রধান স্থপতি ছিলেন দোনাতো ব্রামান্তে। পোপ যেন ঘোড়ায় চড়েও সহজে চলাচল করতে পারেন, সেজন্য তিনি একটি সিঁড়ির নকশা করেন যা ব্রামান্তে সিঁড়ি নামে পরিচিত। সিসটিন চ্যাপেল দেখা শেষে আমাদের দলের সবাই গেল ওই ব্রামান্তের সিড়ির খোঁজে। ১৫০৫ সালে নির্মিত সর্পিল সিঁড়িটি বেলভেদেরে প্রাসাদকে ভ্যাটিকানের বাকি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য নির্মাণ করা হয়। সিঁড়িটি স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। একটু বলে রাখি, ভ্যাটিকান মিউজিয়ামে মূল ব্রামান্তে সিঁড়িটি সাধারণ দর্শকের জন্য সাধারণত খোলা থাকে না। তবে ১৯৩২ সালে জিউসেপ্পে মোমো নকশা করেন ব্রামান্তে সিঁড়ির একটি আধুনিক সংস্করণ যা সবার জন্য উন্মুক্ত।

আমি দলছুট হয়ে গেলাম। কেননা আমি খুঁজছি ভ্যান গঘের ‘পিয়েতা’কে। যখন জেনেছিলাম যে এ দফায় মাইকেলেঞ্জেলোর পাথুরে পিয়েতাকে দেখা হবে না, তখন এটা ভেবে শান্তি পেয়েছিলাম যে এখানেই আছে ভ্যান গঘের রঙ-তুলির পিয়েতা। কিন্তু এত বড় ভ্যাটিকানে কোথায় খুঁজব? আমি শুধু জানি আমাকে যেতে হবে আধুনিক ও সমসাময়িক সংগ্রহশালার দিকে।

18

ভ্যাটিকান মিউজিয়ামের ৪০টি বিভিন্ন বিভাগে কাজ করে প্রায় হাজারখানেক কর্মী। বিভিন্ন কক্ষ ও গ্যালারিতে কমপক্ষে একজন করে নিরাপত্তাকর্মী তো আছেনই। তেমন একজনের কাছে মডার্ন আর্ট কোনদিকে জানতে চাইলে বলল, ‘তুমি তো খুব কাছেই আছো। সোজা এই করিডোর দিয়ে হেঁটে যাও।’ কী মনে আবার বলল, ‘আচ্ছা, চলো তোমাকে একটু এগিয়ে দিই। ভ্যাটিকান সিটি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট রাষ্ট্র হতে পারে, তবে এটি চমৎকার একটি শিল্প সংগ্রহশালা যা বিশ্বব্যাপী ঈর্ষণীয়—বুঝলে!’

‘বিভিন্ন সময়ে পোপেরা বিশাল পরিমাণ অর্থ খরচ করে চিত্রকলা, ফ্রেসকো, স্থাপত্য আর ভাস্কর্য সংগ্রহ করেছেন যা কেবল চার্চের ক্ষমতাকেই প্রতিফলিত করে না, তারা তাদের নিজেদের নামকেও ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে লিখে রেখেছেন। তাই তো এখানের মিউজিয়ামগুলোয় সিসটিন চ্যাপেল, পোপের ব্যক্তিগত বাসস্থান, প্রাচীন ভাস্কর্য থেকে শুরু করে রেনেসাঁসহ আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্পের অসংখ্য সংগ্রহের দেখা মেলে। ৭০ হাজার সংগ্রহের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিল্পকর্ম ১ হাজার ৪০০টিরও বেশি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়। ফলে তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ঠিক কী কী একদিনে দেখে শেষ করবে। আর শোনো, ভ্যাটিকানের সব সংগ্রহ একজনের মানুষের দেখে শেষ করতে চার বছর লাগবে।’ আমি অবাক হয়ে লোকটির দিকে তাকাই। গর্বের হাসি মুখে রেখেই বলতে থাকে, ‘হ্যাঁ, মানে তুমি যদি মাত্র এক মিনিট করে প্রতিটা ছবি ও কাজের সামনে দাঁড়াও, তাহলে চার বছর লাগবে। কিন্তু যদি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখো আর এই যেমন আমার কথা টুকে নিচ্ছো এমন করে নোট নাও—তাহলে একটু বেশি সময় লাগবে আর কি।’

রোসির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আধুনিক এবং সমসাময়িক শিল্প সংগ্রহের গ্যালারিতে (কালেকশন অব মডার্ন অ্যান্ড কনটেমপোরারি আর্ট) ঢুকলাম। পোপ ষষ্ঠ পলের ইচ্ছায় চার্চ ও সমসাময়িক সংস্কৃতির মধ্যে সংলাপ পুনরায় চালুর লক্ষ্যে এ সংগ্রহটি গড়ে তোলা হয়। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের প্রথম দিকের বিভিন্ন শিল্পীদের কাজ রয়েছে এখানে। ১৯৭৩ সালের ২৩ জুন পোপ মন্টিনির উপস্থিতিতে এ সংগ্রহশালাটির উদ্বোধন করা হয়। পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি রয়েছে ভাস্কর্য এবং গ্রাফিক শিল্প।

এর আগে পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে পোপ দ্বাদশ পিয়াসের আদেশে উনিশ শতকের অল্প কিছু কাজ এখানে রাখা হয়। এরপর ১৯৬৪ সালের মে মাসে পোপ ষষ্ঠ পল তার এক ভাষণে চার্চ ও সমসাময়িক শিল্পের মধ্যের ব্যবধানের কথা তুলে ধরেন। অতীতে যেখানে ভ্যাটিকানের সঙ্গে শিল্পী ও শিল্পের ঘনিষ্ঠ এবং ফলপ্রসূ সম্পর্ক ছিল। এই ব্যবধান দূর করার আশায় তিনি শিল্পীদের ভ্যাটিকানের কাছাকাছি আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। এর ফলস্বরূপ সমসাময়িক ধর্মীয় শিল্প সংগ্রহ করা শুরু হয়। পোপ পল ষষ্ঠের ব্যক্তিগত সচিব পাসকোয়াল মাচ্চি প্রায় ১০ বছর ধরে এ নিয়ে কাজ করেন। সংগ্রহের তালিকাকে আরো সমৃদ্ধ করেন। বর্তমানে এই সংগ্রহশালায় রয়েছে প্রায় আট হাজার শিল্পকর্ম। এখানে ডাচ শিল্পী ভ্যান গঘ, ব্রিটিশ শিল্পী ফ্রান্সিস বেকন, রাশিয়ান-ফরাসি শিল্পী মার্কি শেগাল, ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী কার্লো কার্রা, ফরাসি শিল্পী হেনরি মাতিস থেকে শুরু করে স্প্যানিশ শিল্পী সালভাদর দালির কাজ রয়েছে। ১৯৮০ সালে মাতিসের ছেলে পিয়েরে মাতিস তার সংগ্রহের একটা বড় অংশ ভ্যাটিকানকে দিয়ে দেয়। ২০১১ সালে মাতিসকে উৎসর্গ করে একটি সম্পূর্ণ কক্ষ উদ্বোধন করা হয়। মডার্ন অ্যান্ড কনটেমপোরারি আর্টের ১৩ নম্বর কক্ষে রয়েছে মাতিসের কাজগুলো। আর দালির কাজ ২৫ নম্বর কক্ষে।

আমি প্রথমেই গেলাম ২ নং কক্ষে। নির্দেশনা অনুসারে এখানেই রয়েছে ভ্যান গঘের পিয়েতা। সেই মোটা তুলির টান। ধূসর-নীল আর হলুদের প্রাধান্য। ভিনসেন্ট ছোট ক্যানভাসের এই পিয়েতাকে এঁকেছিলেন তার মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে, জুলাই ১৮৯০ সালে। যদিও তার অধিকাংশ কাজ প্রকৃতি, মানুষ আর জীবনের গ্লানি-বেদনা নিয়ে। সরাসরি ধর্মীয় চিত্র আঁকতেন না বা ধর্মকে শিল্পের মূল বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতেন না, তবে তার কাজগুলোয় মাঝে মাঝে তার বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়, যেমন পিয়েতার কাজে—এমনটিই লেখা আছে ভ্যাটিকানের তথ্যে।

চিত্রকর্মটির ডান কোণের স্বাক্ষর থেকে জানা যায়, তিনি ইউজিন দেলাক্রোয়ার “পিয়েতার একটি লিথোগ্রাফ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এই কারণে ভ্যান গঘের এ কাজটি মূল শিল্পীর কাজের সঙ্গে পুরোটাই মিলে যায়। বোন উইলেমিয়েনের জন্য এ ছবিটি আঁকেন তিনি। বোনকে এ ছবির বিষয়বস্তু মাতের দোলোরোসা” (দুঃখিনী মা) সম্পর্কে লিখেছিলেন, তিনি সাধারণ নারীর প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন, যার ভাগ্য কষ্টের এবং সমাজ যাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিছু পর্যবেক্ষক ছবিটিকে গঘের আত্মপ্রতিকৃতি হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর আগে তিনি একই বিষয়ে আরো বড় এবং উজ্জ্বল রঙের একটি সংস্করণ তৈরি করেছিলেন ভাই থিওর জন্য, যা বর্তমানে আমস্টারডামের ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে রয়েছে।

২৫ নম্বর কক্ষে প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে তিনটি সালভাদর দালির। যেগুলো ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে আঁকা। এ কাজগুলো শিল্পীর ক্রমাগত পরিবর্তনের প্রমাণ যা তাকে নানা ধরনের থিম, এমনকি ধর্মীয় বিষয় নিয়েও কাজে উৎসাহিত করেছে। তিনটি ছবির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ক্রোসিফিসো বা ক্রুশবিদ্ধ যিশু। দালি এ ছবিটি আঁকেন ১৯৫৪ সালের। যেখানে যিশু খ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে ‘করপাস হাইপারকিউবিকাস’ ছবিটি আঁকার সময় খসড়া হিসেবে তিনি এ কাজটি করেন। অন্য দুটি ছবির একটি “ল’আনুনসিও” বা ‘ঘোষণা’। ১৯৬০ সালে আঁকা। বলা হয় এ কাজটিও ‘দি ইকিউমেনিক্যাল কাউন্সিল’ নামের চিত্রকর্মের প্রস্তুতিপর্বের অংশ। এছাড়া শিরোনামহীন অন্য ছবিটি দালির সুররিয়েল কাজেরই প্রতিনিধিত্ব করে।

ভ্যাটিকানের আরো যে কয়েকটি গ্যালারি ও কাজের কথা উল্লেখ না করলে নয়, যেমন গ্রেগরিয়ান ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম। মিউজিয়ামটি ১৮৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রাচীন মিসর থেকে সংগৃহীত শিল্পকর্ম এবং প্রত্নবস্তুর বিশাল সংগ্রহ দিয়ে সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভাস্কর্য, মূর্তি, মাটির তৈরি ছোট ছোট পুতুল এবং ব্রোঞ্জের তৈরি বিভিন্ন জিনিস।

এছাড়া রয়েছে পাপেল থ্রোন নামে পোপদের বিভিন্ন প্রতিকৃতির সংগ্রহশালা। প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। এটি ষোড়শ শতক থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত পোপদের প্রতিকৃতির একটি বিশাল সংগ্রহ। বিশেষভাবে বলতে হয় রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট অগাস্টাস সিজারের বিখ্যাত ভাস্কর্যটির কথা। অগাস্টাস তার সৈন্যদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিচ্ছেন—এমন একটি ভঙ্গিকে ধারণ করে প্রাচীন একদল শিল্পী মিলে মূর্তিটি গড়েছেন। এবার বের হওয়ার পালা। ব্রামান্তে সিঁড়ির আদলে তৈরি জিউসেপ্পের সর্পিল সিঁড়িটি দিয়ে নামছি। যদিও ভ্যাটিকান মিউজিয়াম ভ্রমণের সময় বেশির ভাগ পর্যটকই প্রায়ই একে মূল ব্রামান্তে সিঁড়ি বলে ভুল করেন।