কাতারের দোহায় গত মাসে উদ্বোধন হয়েছে ‘দ্য লাওহ ওয়া কালাম: এমএফ হুসেন মিউজিয়াম’। এটি ভারতের বিখ্যাত আধুনিক চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের (এমএফ হুসেন) নামে প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর। এখানে ফিদা হুসেনের জীবনের বিভিন্ন সময়ের ১৫০টিরও বেশি চিত্রকর্ম এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। মিউজিয়ামের প্রদর্শনী ঘরগুলোয় দেখা যায় কীভাবে হুসেন ভারতীয় সংস্কৃতি ও লোককথাকে আধুনিক শিল্পের সঙ্গে মিলিয়েছেন, যা অনেক সময় বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। বিংশ শতাব্দীর আধুনিকতায় স্বতন্ত্র কিউবিস্ট শৈলী গড়ে তুলেছেন ফিদা হুসেন। এর মধ্যে আটটি চিত্রকর্ম বিশেষভাবে নজর কাড়ে।

পুতুলের বিয়ে, ১৯৫০

এমএফ হুসেনের প্রথম দিকের কাজের একটি। ভারত উপমহাদেশে শিশুদের মধ্যে পুতুলের বিয়ে সাজিয়ে খেলার একটি প্রথা রয়েছে। সেই প্রথা থেকেই হুসেন চিত্রকর্মটি আঁকার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। যদিও চিত্রকর্মটির কোনো আনুষ্ঠানিক নাম নেই, তবে বিষয়বস্তুর জন্য এটি ‘পুতুলের বিয়ে’ নামে পরিচিত।

তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তৈরি হয়েছে চিত্রকর্মটি। হুসেন তখন স্বাধীন ভারতের প্রগতিশীল শিল্পীগোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিলেন। গোষ্ঠীটি পশ্চিমা ও ভারতীয় শিল্পের শৈলী মিশিয়ে এক ধরনের আলাদা ও নিজস্ব আধুনিক শিল্প তৈরি করতে চেয়েছিল।

হুসেন তার জীবনের প্রথম দিকে শিশুদের খেলনার ডিজাইন করে অর্থ উপার্জন করতেন এবং সেই কাজ তার শিল্পের ধরন ও শৈলীতে বড় প্রভাব রেখেছে।

কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট (১৯৮৫)

হুসেনের কাজগুলো ১৯৮০-এর দশকের দিকে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হতে শুরু করে। সে সময়ে হুসেনের ছবি আঁকার ধরনে ফুটে উঠেছিল তীক্ষ্ণ রেখা, সমতল আকার ও সরল আধুনিক শৈলী।

কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট চিত্রকর্মটি ১৯৪২ সালের ভারত ছাড় আন্দোলনের ওপর কেন্দ্রীভূত। ছবির ওপরে তারিখটি বড় করে দেখানো হয়েছে আর নিচে দণ্ডায়মান মুখবিহীন ঔপনিবেশিক সৈন্যদের চিত্র অঙ্কিত। তাদের নিচে এক সংযত সন্ন্যাসী হাত তুলে প্রতিরোধের সংকেত দেখাচ্ছেন। সংকীর্ণ বিন্যাস ও সীমিত রঙের ব্যবহার ছবিতে তৎপরতার অনুভূতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আশির দশক হুসেনের শিল্পের জন্য একটি মোড়ঘেরা সময় ছিল। তিনি তখন অতীত ও শৈশবের স্মৃতি ছেড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাগুলোকে চিত্রায়ণ করতে শুরু করেছিলেন।

এলিফ্যান্ট (১৯৯২)

১৯৯০-এর দশকে এমএফ হুসেন নতুন করে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সমালোচনার মুখে পড়েন। হুসেন এ সময়ে প্রায়ই কাট-আউট ও দ্বিমাত্রিক চিত্রশৈলী ব্যবহার করতেন, যা ভাস্কর্য ও অঙ্কনের মধ্যবর্তী একটি ধারা হিসেবে দেখা হয়। কম পরিচিত হলেও এসব কাজ তার ভারতী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি অবিচল আগ্রহ প্রদর্শন করে।

23

‘এলিফ্যান্ট’ শিল্পকর্মটিতে হিন্দু ঐতিহ্যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দীর্ঘদিনের শ্রদ্ধার নিদর্শন হাতিকে মূল বিষয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ চিত্রকর্মে হুসেন একটি অনন্য ভারতীয় শিল্পভাষা তৈরির চেষ্টা করছেন।

মাদার তেরেসা (১৯৯৮)

মাদার তেরেসা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ও ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ভারতরত্ন অর্জন করেন ১৯৭৯ সালে। এর পরের বছরই হুসেন প্রথম মাদার তেরেসার ছবি আঁকেন। পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি মাদার তেরেসাকে মাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে চিত্রায়ণ করতে থাকেন। হুসেনের কাছে তার মায়ের কোনো ছবি বা স্মৃতি না থাকায় তিনি মা চরিত্রগুলো সবসময় মুখবিহীন অবয়বে আঁকেন।

22

মাদার তেরেসা ট্রিপটিক (তিনটি আলাদা ক্যানভাস নিয়ে তৈরি) চিত্রকর্মটি মিউজিয়ামের সবুজ দেয়ালে প্রদর্শিত। ক্যানভাস তিনটি একে অপরের কাছে খুব কাছাকাছি রাখা হয়েছে। এখানে মাদার তেরেসার পাশাপাশি একটি ক্ষীণ মানব ও তিনজন শাড়ি পরা নারীকে দেখানো হয়েছে। ছবিতে তেরেসাকে শোকগ্রস্ত ও ভেঙে পড়া অবস্থায় দেখানো হয়েছে। ছবিতে তেরেসার লম্বা দেহটি ভারী পোশাকে ঢাকা, আর রঙে গুরুত্ব পেয়েছে গাঢ় লাল ও কালো। এখানে তার পরিচয়ের থেকে আকার ও ভঙ্গিমার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া দিয়েছেন হুসেন।

হিউম্যানিজম (২০০৩)

২০০০-এর দশকে হুসেনের মুসলিম পরিচয় তার কাজের প্রতি রাজনৈতিক দৃষ্টি বা সমালোচনাকে বাড়িয়ে দেয়। এ সময় হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তার প্রদর্শনীতে বাধা দেয়া ও মামলা করার মতো অভিযোগ ওঠে। এমনকি হুসেনের বাড়ি ও চিত্রকর্মেও হামলা চালানো হয়। এর পরপর তার শিল্পের ধরন পরিবর্তন হয়। হুসেন তখন তার ছবিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা ফুটিয়ে তুলতে শুরু করেন। হিউম্যানিজম হলো হুসেনের ১০ খণ্ডের থিওরামা সিরিজের একটি কাজ। সিরিজটি ১০টি ধর্ম ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। হিউম্যানিজম চিত্রকর্মটিতে একটি শুয়ে থাকা চরিত্র ক্যানভাসজুড়ে দেখা যায়। এর চারপাশে আছে লিপি, প্রতীক ও হাতের তৈরি কাগজের টুকরো।

ইয়েমেন (২০০৮)

হুসেনের স্বেচ্ছা নির্বাসনের দুই বছর পর তৈরি আরব সভ্যতা সিরিজের অংশ এ ‘ইয়েমেন’। এ সময় তার শিল্পচর্চায় ভারতের বিষয়বস্তু থেকে মুসলিম বিশ্বের দিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মেলে। ইয়েমেন চিত্রকর্মে মিনার, উটের কাফেলা, সেতু, মোটরসাইকেল, বাজার, ছাদ, উড়ন্ত উড়োজাহাজ এবং একটি সাদা কবুতর একসঙ্গে দেখা যায়।

আরব জ্যোতির্বিজ্ঞান (২০০৮)

হুসেনের জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক জগৎ মিলিত হয়েছে আরব জ্যোতির্বিজ্ঞান চিত্রে। এক ভারত, যেখানে তিনি শিল্পশৈলী গড়ে তুলেছেন, আর দুই আরব বিশ্ব, যেখানে তিনি শেষ বছরগুলো কাটিয়েছেন। এ চিত্রকর্মে হুসেন নবম শতাব্দীর পারস্য এ সময় হুসেন ভারতীয় ও ইসলামিক প্রভাবগুলো আলাদা না করে একত্র করেছেন তার চিত্র। ছবিতে সাদা কাপড় পরিহিত এক মানবপাহাড় নক্ষত্রের এক ক্ষেত্রজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে ছবিতে উজ্জ্বল নীল, লাল ও হলুদ রঙ ব্যবহার হয়েছে। পাশাপাশি আকাশের প্রতীকগুলো মধ্যযুগীয় ইসলামিক বিশ্বের ইঙ্গিত দেয়।

সিরু ফি আল আর্দ (২০১৯)

এমএফ হুসেনের শেষ কাজ সিরু ফি আল আর্দ ছিল একটি কাইনেটিক বা গতিশীল ইনস্টলেশন। শিল্পকর্মটি আলো, শব্দ ও যন্ত্রাংশের মাধ্যমে নড়াচড়া করে, যা একটি বড় স্থানজুড়ে স্থাপন করতে হয়। শিল্পী হুসেন কাতারি নাগরিকত্ব গ্রহণের সময় এটি তৈরির কাজ শুরু করেন। তবে মৃত্যুর আগে কাজটি শেষ করতে পারেননি তিনি। তার অঙ্কন ও নকশার অনুসরণ করে পরবর্তী পর্যায়ে চিত্রকর্মটি সম্পন্ন হয়।

সূত্র: আর্টসি