টিক টিক করে ঘড়িতে ঠিক রাত ১২টা। উত্তেজনায় ছেয়ে যায় চারদিক। বহু প্রতীক্ষিত নতুন বছরের ঘণ্টা বাজে৷ মুঠোফোনে একের পর এক ভেসে ওঠে শুভেচ্ছা বার্তা—হ্যাপি নিউ ইয়ার! নতুন বছরের শুভেচ্ছা প্রকাশ যেন এই তিন শব্দে বন্দি। কেমন জানি পানসে, একটুও স্বাদ নেই; ভিন্নতা নেই। আচ্ছা, কেউ যদি মনের রঙিন কালিতে লিখে পাঠাত নববর্ষের রঙিন চিঠি! নতুন সকালে কোনো অচেনা পোস্টম্যান তা পৌঁছে দিত দরজায়। ভাঁজ খুলেই পড়া যেত প্রিয়জনের আদুরে হাতে লেখা—তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে।/ এসো গন্ধে বরনে, এসো গানে। এমন বার্তা হয়তো রাঙিয়ে দিত পুরো দিনটা। শূন্যতার এবেলায় দাঁড়িয়ে এমন ভাবনা হয়তো কেবলই অলীক। হেমন্তের অরণ্য থেকে পোস্টম্যানরা তো কবেই পালিয়ে গেছে। অতীত হাতড়ে কিছুটা আত্মতুষ্টি লাভ করা যাক তবে।

গ্রিটিংকার্ড বা শুভেচ্ছাপত্রের প্রচলন শুরু হয়েছে বহু আগেই। একসময় এই কার্ডের কদর ছিল। এর শিল্পমূল্যও ছিল অনেক। হাতে প্রস্তুত কার্ডে চিত্রশিল্পীদের মুন্সিয়ানা প্রকাশ পেত। বাহারি নকশাযুক্ত কার্ডের একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতা ছিল সমাজে। এসবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বিচিত্র কিছু পেশা ও পেশাজীবী। শুভেচ্ছাকার্ড মূলত একটি সচিত্র বার্তা যা কোনো শুভ ইচ্ছা, কৃতজ্ঞতা, অভিনন্দন, সহানুভূতি বা অন্যান্য অনুভূতি প্রকাশ করে। নববর্ষ, বড়দিন, জন্মদিন, হ্যালোইন অথবা অন্যান্য দিবস উপলক্ষে পাঠানো হয়। আধুনিক কার্ডগুলো সাধারণত শক্ত কাগজ বা কার্ডবোর্ডে হয়। তবে কাপড়, চামড়া, ধাতু, কাঠ, মাটি ও অন্যান্য উপাদানে তৈরির রীতি ছিল একসময়। শুভেচ্ছাপত্র দেয়ার এ রীতি সর্বপ্রথম শুরু হয় চীন ও মিসরীয়দের হাত ধরে। প্রাচীন মিসরে শুভেচ্ছা জানানোর প্রচলন ছিল, বার্তা লেখা হতো প্যাপিরাসে। পরবর্তী চৌদ্দ শতক নাগাদ কাঠের ব্লকে কালির ছাপ দিয়ে কাগজে লেখা শুভেচ্ছা জানানোর ইতিহাস জার্মানদের মধ্যে পাওয়া যায়। আধুনিক গ্রিটিংকার্ডের মাধ্যমে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর রীতি ইউরোপে সমৃদ্ধি লাভ করে। তখন ক্রিসমাসের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানো হতো। কোনো কোনো সূত্রমতে, এ গ্রিটিংকার্ডের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর রীতি প্রথম শুরু হয় স্কটল্যান্ডের টমাস শরকের (Thomas Shorrock) হাত ধরে। যিনি ১৮৪০ সালে প্রথম হাসিমাখা মুখের ছবিসহ একটি কার্ড ছাপেন, যাতে লেখা ছিল A Gude Year to ye. তবে আধুনিক শুভেচ্ছাপত্রের প্রচলনে স্যার হেনরি কোলের অবদান সর্বাধিক বলে মনে করা হয়। ১৮৪৩ সালে তিনি জন ক্যালকট হর্সলেকে দায়িত্ব দেন এক হাজার পিস খোদাই করা কার্ড বানাতে। বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত গ্রিটিংকার্ড ছিল সেটিই। এটি শক্ত কার্ডবোর্ডে লিথোগ্রাফি দ্বারা মুদ্রিত ছিল। নকশায় অঙ্কিত ছিল একটি পারিবারিক পার্টির দৃশ্য। যাতে লেখা ছিল A merry Chiristmas and a Happy New Year to you. উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গ্রিটিংকার্ড ব্যক্তিগত যোগাযোগের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে রূপ নেয়। তখন Marcus World and co, Charles Bennett-এর মতো কোম্পানিগুলো গ্রিটিংকার্ডের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করে। তারা কেট গ্রিনওয়ে এবং ওয়াল্টার ক্রেনের মতো সুপরিচিত শিল্পীকে চিত্রকর এবং কার্ড ডিজাইনার হিসেবে নিয়োগ করে। পোস্টকার্ডের মাধ্যমেও শুভেচ্ছা বিনিময় জনপ্রিয় হতে থাকে। ধীরে ধীরে হস্তনির্মিত কার্ডের পরিবর্তে প্রিন্টিং কার্ডের প্রচলন হতে থাকে। বিশ শতকের শুরুতে রঙিন লিথোগ্রাফির মতো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন গ্রিটিংকার্ড শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ধীরে ধীরে তা এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে এসব কার্ডের জন্য পুরস্কারের প্রচলন করা হয়। ১৯৮৮ সালে গ্রিটিংকার্ড শিল্পের বাণিজ্য সংস্থা ‘গ্রিটিং কার্ড অ্যাসোসিয়েশন’ সেরা শুভেচ্ছা কার্ডগুলোর জন্য একটি বার্ষিক পুরস্কারের আয়োজন করে। আমেরিকান ক্রিসমাস কার্ডের জনক লুই প্রাংয়ের নামানুসারে এ পুরস্কারকে লুই বলা হয়।

তবে কেবল ইউরোপ-আমেরিকা নয়, সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এসব শুভেচ্ছাপত্র ভারতবর্ষেও হাজির হয়েছিল। ১৮৬০-এর দশক থেকে ভারতে প্রবাসী ইংরেজদের মধ্যে সীমিত আকারে এর চর্চা দেখা যায়। ধীরে ধীরে তা নেটিজেনদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে।
কার্ডের চিত্রকর্মে ইউরোপীয় ছাপ পরিবর্তনে যারা সচেষ্ট হন তাদের মধ্যে জর্জ ডার্বি অন্যতম। স্বদেশী যুগে তিনি কলকাতায় ছাপা বেশকিছু কার্ড আঁকেন। কার্ডগুলো প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতার সে যুগের বিখ্যাত প্রকাশক ‘থ্যাকার স্পিঙ্ক অ্যান্ড কোম্পানি’ থেকে। সেসব কার্ডের চিত্রে ডার্বি তুলে ধরেছেন সাধারণ মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র বাঙালির আনন্দ-উল্লাস।

একটি কার্ডে দৃশ্যমান হয়েছে এক ব্যান্ড কোম্পানির কিছু বাজনদারকে। তারা নিজেদের মতো বাজাচ্ছেন। তাদের শ্রোতাও সমগোত্রীয় কিছু গরিব মানুষ ও একটি কালো রঙের দেশী কুকুর। আরো দুটি কার্ডে চিত্রিত হয়েছে বড়দিনের জন্য নানা মালপত্র আনা-নেয়ার দৃশ্য। একটি ছবিতে একটি গরুর গাড়িতে করে মালপত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর অন্যটিতে একটি ছেকরা গাড়ি করে। জর্জ ডার্বির প্রতিটি ছবিতেই রয়েছে দেশীয় ছাপ। ঔপনিবেশিক আমলের দৈন্য-দারিদ্র্যের মধ্যেই তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন বাঙালির আনন্দ।
শুভেচ্ছাপত্র নিয়ে চমকপ্রদ ঘটনাও বিশ্বে কম নয়। ব্রিটিশ নাগরিক ক্রেগ শেরগোল্ড আনুমানিক ৩৫০ মিলিয়ন শুভেচ্ছা কার্ড পেয়েছিলেন, যা তাকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান দিয়েছে। ১৯২৯ সালে ওয়েলসের রাজপুত্রকে একটি খোদাই করা চালের দানায় শুভেচ্ছা উপস্থাপন করা হয়।
প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষে তা এখন কেবল অতীত। যেখানে আঙুলের আলতো চাপেই সেকেন্ডে পৌঁছে যাচ্ছে শুভেচ্ছাবার্তা, সেখানে এসবের প্রয়োজনীয়তা কী? এমন প্রশ্ন তোলাই যায়; কিন্তু অগ্রাহ্য করা যায় না এর সঙ্গে জড়িত আবেগ, অনুভূতি, সামাজিক বন্ধন। বাতিল করা যায় না এর শিল্প ও সাহিত্যমূল্য কোনোটাই।









