মেউয়া জুড়ানো। কৃষিভিত্তিক পালা-পার্বণের এক অমোঘ আয়োজন। এটি মূলত লৌকিক আচার। ফসল তোলাকেন্দ্রিক এ আচার সিলেট অঞ্চলে ‘মেউয়া জুড়ানো’ নামে পরিচিত। আর একে ঘিরে চালের গুঁড়ি দিয়ে তোলা লোকচিত্রকে বলা হয় ‘মেউয়া তোলা’। অগ্রহায়ণের ধান ঘরে তোলার পর সনাতন ধর্মাবলম্বী কৃষক পরিবার এই আচার পালন করেন। হেমন্তে আমন ধান ওঠে ঘরে ঘরে। মাসব্যাপী চলে ধান কাটা, ঝাড়াই-মাড়াই। ধান মাড়াইয়ে গৃহপোষ্য গরুই ভরসা। যদিও এখন যান্ত্রিক প্রভাবে এমন সংস্কৃতির স্রোতে ভাটা ধরেছে অনেকটাই; তবে রীতি জিইয়ে রয়েছে বাঙালি মননে। ধান মাড়াই করার সময় একটি গরুকে কেন্দ্র করে অন্য গরুগুলো চক্রাকারে ঘুরে৷ গরুর পায়ের চাপে গাছ থেকে ঝরে পড়ে ধান। কেন্দ্রে যে গরুটা থাকে তারই আঞ্চলিক নাম মেউয়া। শেষ মাড়াইয়ের পর শুভদিন দেখে উঠানে আলপনা অর্থাৎ মেউয়া তোলার মাধ্যমে পালিত হয় লোকাচার। ফসল তোলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। যে মেউয়া গরুটি এতদিন মাড়াইয়ে ঘুরল, তার মাথা শীতল করতেই এই মেউয়া জুড়ানো রীতি।

এ নিয়ে কল্পনা রানী নাথের কাছ থেকে জানা গেল সবিস্তারে। শেষ মাড়াই থেকে একগুচ্ছ খড় এবং ধান তুলে আলাদা করে রাখা হয়। কেউ কেউ মেউয়া গরুর পায়ের বেরাইল (পায়ে প্যাঁচানো খড়) রেখে দেন। তারপর কোনো এক রবি অথবা বৃহস্পতিবারে আরম্ভ করা হয় মেউয়া জুড়ানোর পর্ব। গোবর-জলে লেপে উঠান প্রস্তুত করে রাখেন গৃহবধূ। প্রস্তুত করা হয় শেষ মাড়াই থেকে তুলে রাখা ধান থেকে চালের গুঁড়ি। সেই চালের গুঁড়ি দিয়ে উঠানে তোলা হয় বৃত্তাকার আলপনা। এক টুকরো সাদা সুতি কাপড়কে গুঁড়ির মিশ্রণে ভিজিয়ে অনামিকা অথবা মধ্যমা আঙুলের সাহায্যে তোলা হয় সুনিপুণ নকশা। শুরুতে একটি ফুল এঁকে, এটাকে কেন্দ্র ধরে একের পর এক আঁকা হয় বৃত্তাকার কুণ্ডলী। সাধারণ প্রথম বৃত্তে আঁকা হয় গরুর পায়ের ছাপ ও দেবী লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। তারপর বিভিন্ন রকম নান্দনিক নকশায় বাকি বৃত্তগুলো আঁকা হয়। কোনোটাতে কাঞ্চিকাটা, কোনোটাতে শঙ্খমুরন, কোনোটাতে আবার পদ্মপাতা অথবা পানপাতা। এছাড়া বাঁধাকপি, কলা, চালতাফুল, মন্দির, কাঁকই, কলসসহ বিভিন্ন আকৃতির নকশার কাজ করা হয়। পুরো আলপনাটি আঁকা হয় পাঁচ, সাত অথবা নয়টি চক্র নিয়ে। বৃত্তাকার আলপনার বাইরে জুড়ে দেয়া হয় ফলন্ত গাছ, কৃষক, হালের গরু, লাঙল, জোয়াল, মইসহ নানা কৃষি সরঞ্জাম। আঁকা হয় চাঁদ-সূর্যও। কৃষিজীবনে চন্দ্র-সূর্যের প্রভাবের মান্যতাই এখানে প্রতিভাত। লোকমানসের এমন পরিচয় পাওয়া যায় মৈমনসিংহ গীতিকার কাজলরেখার আলপনায়ও।
সমুদ্র সাগর আঁকে চান্দ আর সুরুযে/ভাঙ্গা মন্দির আঁকে কন্যা জঙ্গলার মাঝে আলপনা আঁকা সম্পন্ন হলে এর মধ্যভাগে রাখা হয় তুলে রাখা সেই খড় আর ধান, সাথে ফুল-দূর্বা। হাজির করা হয় সকল কৃষি উপকরণ। ঢালা হয় সাত নাল বা সাত ধারা পানি। তারপর মেউয়া গরুটির মাথায়ও ঢালা হয় সাত ধারা পানি। লোকবিশ্বাস, এতে গরুর মাথা জুড়াবে অর্থাৎ শীতল হবে। তারপর অল্প মাটিসহ সেই ফুল-দূর্বা ও ধান ফেলা হয় ধান রক্ষিত উগার বা ভাঁড়ারে। সেখানেই তো দেবী লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান। আগামী বছরও যাতে ফসলে ভাঁড়ার পূর্ণ হয়, মনে মনে সেই বাসনাটুকু ব্যক্ত করেন কৃষাণী।
পৌষের এ আনন্দ-উঠান আমন্ত্রণ জানায় পাড়া-প্রতিবেশীকেও। হাতে হাত মিলিয়ে শুরু হয় রেখা টানাটানি। গল্প, হাসি, তামাশায় মুখর হয়ে ওঠে গৃহস্থবাড়ি। গৃহকর্ত্রী নয়া চালের চিতই পিঠা তৈরি করে খাওয়ান আঁকিয়েদের। কার হাতের কাজ কেমন হচ্ছে, তা অদূরে বসে পরখ করেন বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ গৃহিণী। কখনো নিজেও হাত লাগান। বড়দের দেখাদেখি বাড়ির ছোটরাও আঁকার বাহানা ধরে। সায় না দিয়ে উপায় কী? উঠানের এককোণে চলে আনাড়ি হাতের আঁকিবুঁকি। সব মিলিয়ে কৃষকের সাদামাটা উঠান হয়ে ওঠে দুধসাদা ক্যানভাস। হরিদ্রাভ আঙিনায় তা যেন শুভ্রতার এক পরম মায়া।
এ চিত্ররীতি সুরমাপাড়ের উঠানগুলোয় কত আগে হাজির হয়েছে তা বলা মুশকিল। সত্তরোর্ধ্ব সরস্বতী বালা দেবী বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থাকি দেখিয়া আইরাম। আমরার পূর্বপুরুষরাও ইতা নিয়মনীতি মানিয়া আইছন।’ সরস্বতী দেবীর কথার সূত্র ধরেই বলা যায়, এটা নিজগৃহে বংশানুক্রমে শেখা শিল্পকর্ম। গ্রামীণ লোকসমাজ এ নান্দনিক প্রকাশের মধ্য দিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজেকে ব্যক্ত করে আসছে। গুহাচিত্রসহ বিভিন্ন খননে পাওয়া প্রাচীন মৃৎপাত্রের অঙ্কনরীতিতে তারই ছাপ পাওয়া যায়। হাঁড়িকুঁড়ির সেই শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে এসব রেখাচিত্র আজও গ্রামীণ ললনার হাতেই লালিত। নারীর মনোভূমিতে তা যেন নিষ্কলুষ চাষের শুচিশুভ্র ফসল। এ কামনারেখায় এসে মেলে কাজলরেখা থেকে অধুনাতন কুলবালা।
লেখক: ঐতিহ্য সংগ্রাহক









