প্রদর্শনীর নাম হিসেবে কেন ‘মিথস্ক্রিয়া’ শব্দটি বেছে নিলেন? এর পেছনে কী ভাবনা কাজ করেছে? এ নামের সঙ্গে আপনার সম্পূর্ণ শিল্পচর্চার কী মিল বা অমিল রয়েছে?
আমি বিশ্বাস করি শিল্প নিজেই একটি মিথস্ক্রিয়া, কারণ আমার শিল্প আমাকে করেছে পরিপূর্ণ। মিথ শব্দটির অর্থ ‘রেসিপ্রোকাল বা পারস্পরিক’ এবং ক্রিয়া মানে ‘অ্যাকশন’ বা ‘উদ্যোগ’; আমার সঙ্গে আমার শিল্পের যে মিথস্ক্রিয়া তা আমাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে—বোধে, চৈতন্যে, মননে ও সৃজনে। আমাদের পারস্পরিক যে ভালোবাসার, প্যাশনের বন্ধন তা কখনই কোনো নির্দিষ্ট পরিধি বা বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আর এ মিথস্ক্রিয়াই সৃষ্টি করেছে বৈচিত্র্যময় ‘আমি’-কে। সেই আমি’র প্রতিফলন ঘটেছে আমার সহজাত সাম্প্রতিককালের ‘ইন্টারপ্লে’ শীর্ষক এ প্রদর্শনীতে। এটি একটি পরীক্ষা-নিরীক্ষাধর্মী প্রদর্শনী, এর বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতার কারণে।
এবারের কাজগুলোর সঙ্গে আপনার বিগত কাজের থিম বা বার্তার কী মিল-অমিল ছিল?
আমার জীবন ও শিল্প একে অন্যের পরিপূরক, অভিন্ন। বরাবরের মতোই আমাকে অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টা এতে প্রাধান্য পেয়েছে। তেলরঙ, মিশ্র মাধ্যম, অ্যাক্রেলিক, জলরঙ—বিবিধ মাধ্যমে করা সাম্প্রতিক এবং কিছু আগের কাজও উপস্থাপিত হয়েছে খুব সচেতনভাবেই। এতে আমার কাজের একটা ধারা এবং এর বিবর্তন ঠাহর করা সহজ হবে। আমার চেষ্টা আমার কাজের মাত্রা ও আঙ্গিকের মাধ্যমে তাকেই সহজ করে প্রকাশ করা। আমার সাতাশ বছরের সৃজনশীল যে প্রণালি তাতে মিল-অমিল থাকাই স্বাভাবিক। কারণ প্রবণতাই আমার কাজকে ত্বরান্বিত করে চলেছে—আর এ প্রবণতা চলমান, ধাবমান।
ছবিগুলোয় স্ট্রোকের ব্যবহার নিয়ে জানতে চাই।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আমার শিল্পচর্চা। অন্য যেসব এভিনিউ কিংবা অঙ্গনে আমি বিচরণ করেছি তার প্রভাব আমার শিল্পে প্রকাশিত। আমার সততাই আমার শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। ভান আমার আসে না এবং আমার সময়কালের যে অবয়ব তা অগ্রাহ্য করে রোমান্টিক সৃষ্টিতে আমি বিশ্বাস করি না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক বৈরিতা নানাভাবে আমার শিল্পে প্রতীয়মান। কখনো প্রতীকী, কখনো রূপক, কখনো-বা একেবারেই বিমূর্ত। শিল্প যেমন কনসেপ্টও নয়; তা ডিজাইনও নয়। শিল্প নির্ভেজাল আমার অভিজ্ঞতা, যাপিত জীবন, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, নারীর প্রতি সহিংসতা, মানবতার অবক্ষয়—আমি তার ধারা-পর্যবেক্ষক।
যেমন কনসেপ্ট অব মডার্ন রাধা চিত্রে উন্মুক্ত নারীর যে টরসো, যা বিবিধ অলংকারে সুসজ্জিত, তা বাংলার চিরায়ত নারীরই কৃষ্ণরূপ। যার ভেতরে আছে আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, আর্তনাদ; আবার সমকামীর প্রতিরূপ। সমসাময়িক কালের সে সমকামীর প্রতিরূপ, রাধার মধ্যে কৃষ্ণ আর কৃষ্ণের বাহ্যিক অঙ্গের আড়ালে রাধার কামুক নারীত্ব।


কসমোপলিটান ওমেন, ২০১৯
প্রদর্শনীর ছবিগুলোতে আপনি কোন কোন মাধ্যম ব্যবহার করেছেন? শৈল্পিক আবেগ বা বার্তা প্রকাশে সেগুলোর বিশেষত্ব কী?
যদিও আমি বহুমুখী, বহুগামী। তথাপি মিথস্ক্রিয়ায় আমার উপস্থাপিত মাধ্যমে কাজ আমি আগেই করেছি। আমার ব্যবহৃত মাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃৎকলার মাত্রায় শরীর যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রাসঙ্গিক কারণেই জলরঙে সৃষ্ট শিল্প তার আবেদনকে মেটানোর অভিপ্রায়ে তৈরি। এটাই মিথস্ক্রিয়া। মাধ্যম, কনটেক্সট, কনসেপ্ট, সময়—সব একে অন্যের কাঙ্ক্ষিত এবং তার ফলস্বরূপ এ বিবিধ আঁচড়। প্রতিটি তুলির আঁচড় একেকটি চলমান কালের গল্প। শিল্পীর আখ্যান—তাকে আরো আবিষ্কার করার, আবিষ্কৃত হওয়ার অভিপ্রায়ে।
আপনি নির্দিষ্ট কিছু রঙের ব্যবহার বেশি করে থাকেন? রঙগুলো কী কী? কেন করেন?
রঙের সঙ্গে আলোর যোগাযোগ সাংঘাতিক। ঠিক তেমনি আমার নিজস্ব কিছু রঙের ব্যবহার আমার ছবি তৈরির উপজীব্য। কখনো কখনো রঙ নিজেই উপপাদ্য। যেমন একসময় আমার কাজে ব্যাপক কালো রঙের ব্যবহার লক্ষ করা যেত। ২০০৯ থেকে ২০১৬-১৭ অবধি আমার ‘স্টেয়ারিং উইমেন’ সিরিজকে কেন্দ্র করে এ কালোর আবির্ভাব। পরবর্তী সময়ে এই কালোর আবার সমতা প্রদানের লক্ষ্যে লাল রঙের আগমন।

দ্য স্টেয়ার কনটিনিউজ
আমি যত গোপন, আমার রঙ তত আবৃত। আমি যত মূর্ত, আমার রঙ তত বৈচিত্র্যে উন্মুক্ত। আমি আগে, আমিই আমার শিল্প। ‘আই এমবডিড মাই আর্ট’—আমি আমার শিল্পকে শরীরে ধারণ করেছি, আমি আমার শিল্পকে নিজের মধ্যে রূপ দিয়েছি। ফলে আর্টের সর্ব আঙ্গিকে আমি উপবিষ্ট, এবং রঙ তার অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি এলিমেন্ট। এবারো ইন্টারপ্লে এক্সিবিশনের ড্যান্সিং স্প্রিং, সানরাইজ, সোল অ্যান্ড সয়েল, ড্যান্সিং বডিসহ সব ছবিতেই বিবিধ চড়া রঙের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার করেছি। ইউরোপীয় ঘরানার একাডেমিক শিক্ষাকে ছাড়িয়ে বাংলার যে মৌলিক রঙ তাকেই ফিউশনের মাধ্যমে তুলে ধরা আমার রঙ ব্যবহারের তাৎপর্য।
আপনার ছবিতে কোন উপাদান বা কনটেক্সটের ব্যবহার বেশি করেন? কেন?
আমার শৈল্পিক অভিব্যক্তিতে আমার ব্যক্তিগত ন্যারেটিভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার নারীসত্তা, সমাজে আমার প্রতিবাদী ও প্ররোচক বক্তব্য, আমার শিল্প-উপাদান হিসেবে ঘুরেফিরে আসে। বাংলাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ‘নারী রোল-মডেল’ হিসেবে আমি গভীরভাবে ডিজাইন করেছি আমাকে। আমি আমার চিত্রকল্পের প্রধান উপাদান; যা কখনো বিমূর্ত কখনো মূর্ত, কখনো-বা স্বীয় জীবন আখ্যান। বাস্তব ও পরাবাস্তব উভয়েই রঙ, রেখা, আলো, ছায়ার সমন্বয়ে সৃষ্ট একেকটি আখ্যান। যার ভেতরে বিরাজমান প্রতিটি নারীর মানুষ হয়ে ওঠার স্বপ্ন। আমার স্বনির্ভর-আত্মনির্ভর-স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প ব্যবচ্ছেদে আমিই এর উপাদান।
এ প্রদর্শনীর ছবিগুলো কি কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত?
সব ছবির গল্পই আমার অভিজ্ঞতা—কিছু সত্য, কিছু কাল্পনিক। আমার শিল্প আমারই মতো কিছু একটা হয়ে উঠতে চায়। অদর্শনী দর্শনকে ধারণ করে যে সব প্রতিদিনকার চিহ্ন, তা আমার বিচিত্র রেখার সমন্বয়। এটি কাল্পনিক হলেও তা সূক্ষ্ম জীবনবোধে তাড়িত—নারীত্ব, একাকিত্ব, ভারসাম্য, যৌনতা, স্বাধীনতা, আত্মা—সব যেখানে রূপ-রঙ-রেখা দিয়ে প্রকাশিত। আমি বাঙালি, যা আমার স্বকীয়তা। আমার প্রচেষ্টা থাকে প্রতিটি শিল্পকর্ম যেন আমার স্বতন্ত্র এ আদর্শকে প্রকাশিত করে। কারণ আমার আর্ট কোনো ধার করা সমসাময়িক শিল্প নয়। এই আমি, যা ক্যানভাসে তৈরি করে শিল্প ও জীবনের সম্মিলিত শক্তির উপস্থিতি বা ‘সিনারজি’।
প্রদর্শনীতে কোন ছবিটি দর্শকদের কাছে বেশি আলোচিত হয়েছে?
খুব অল্প সময়ে এ প্রদর্শনীর পরিকল্পনা করা হয় বিধায় মানুষের সমাগম কিছুটা কম ছিল। আর যেহেতু এটি আমার "‘আর্ট ফর কজ’ বা নন-প্রফিট ইনিশিয়েটিভের প্রথম উপস্থাপনা, তাই একে কনসেনট্রেটেড রাখাও ছিল একটা উদ্দেশ্য। এ কাজটা করে আমি টের পেলাম যে বাংলাদেশের মানুষ একে অন্যের পাশে দাঁড়ায় যদি সে প্রকৃত কারণ খুঁজে পায়। এছাড়া আমি সবসময় বিশ্বাস করি, আর্ট কোনো গ্যালারি বা ইনস্টিটিউশন দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। একে আমাদের মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা প্রয়োজন। এর শৈল্পিক, গুণগত মান ছাড়াও এর দেয়ার যে ক্ষমতা তা আমাদের পরীক্ষা এবং প্রমাণ করা অনেক বাকি। আমার আর্ট সমাজ, মানুষ ও পৃথিবীর নবজাগরণের কাজ করছে সন্তর্পণে। এ আলো ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
বারিধারার ডিপ্লোম্যাটিক জোনে প্রদর্শনী করার বিশেষ কোনো কারণ ছিল কী?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য এটি ঢাকাকেন্দ্রিক। প্রতিটি জোন এক একটি বিচ্ছিন্ন গণ্ডি"বা ‘সাইলো’। এ সাইলোর মধ্যে ঢোকে না শিল্প, সম্পর্ক, বোধ বা সান্নিধ্য। ডিপ্লোম্যাটিক জোন একটি অভিজাত সাইলো। এ এলাকায় কোনো শিল্পের বহিঃপ্রকাশ ঘটে না। আমি বহুবার অনেক মিশনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। এদের উঁচু প্রাচীর টপকে বাংলাদেশ ঢোকানো এক বিরল ঘটনা। আমার ইচ্ছে ছিল একটি ডাবল সিলিং হাইটের নির্দিষ্ট জায়গায় আমার দুই ডাইমেনশনাল পেইন্টিংগুলোকে কিউরেট করা। এ সংরক্ষিত অভিজাত এলাকায় সাধারণ একটি প্রদর্শনী করা।

পারসোনা, ২০১৬

যে স্পেসটি আমি পছন্দ করেছি তা একটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। যার কমিউনিটি হলকে ট্রান্সফর্ম করে এতে আমার ছোট-বড় ৫০টির অধিক পেইন্টিং ও ড্রইং ডিসপ্লে করা হয়। যেহেতু এটি প্রচলিত গ্যালারি স্পেস নয়, তাই এখানে চ্যালেঞ্জও অনেক বেশি এবং এটাই ছিল আমার স্পেস সৃষ্টির মূল লক্ষ্য। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত দলের যারা সহযোগিতায় ছিল তারাও শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। এ কারণে এ প্রদর্শনী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমার সবসময় লক্ষ্য থাকে, ‘ট্রান্সফর্মিং স্পেস, ট্রান্সফর্মিং পিপল’। কেননা সাধারণ মানুষকে শিল্পের কাছাকাছি আনা খুবই প্রয়োজন। বিশেষ করে এ সময়ে, যখন চারদিকে অপসংস্কৃতির ছড়াছড়ি।
শিল্পী হিসেবে আপনি কি দর্শকদের প্রতিক্রিয়াকে আপনার ভবিষ্যৎ কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? বা অনুপ্রেরণা হিসেবে নেন কিনা?
আমি কেবল আমার জন্য শিল্প সৃষ্টি করি না, আমি নিজের কাছে একধরনের রিফ্লেকটিভ বা আত্মমুখী প্রতিক্রিয়া তৈরি করি। যেখানে আমার দর্শক তার নিজেকে খোঁজার বা আবিষ্কার করার কৌশল বা রসদ পেতে পারে। আর্ট হৃদয় আর মগজের খেলা। এর মধ্যে এক জাদুকরী রহস্যময়তা অবগাহন করে সবসময়। কারণ এর প্রকাশভঙ্গি বা ভাষা একটি সৃজনশীল ঘটনা। যার লক্ষ্য পরিপূর্ণতায় হয় পৌঁছবে বা না-হয় পৌঁছবে না। এটি অনেকটা দুর্বোধ্য, তাই এর প্রতি দর্শকের আকাঙ্ক্ষাও বেশি।
৭ আগস্ট অফিশিয়াল উদ্বোধনের পর আমার একটা পারফরম্যান্স ছিল। যার শিরোনাম ছিল ‘স্রোত’। যেহেতু বাংলাদেশে অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যার কবলে যারা সর্বস্ব হারিয়েছে, তাদের সাহায্য করতেই এ প্রদর্শনী; তাই পানির স্রোত এবং তার সঙ্গে মানবের জীবনের যে মিথস্ক্রিয়া তারই বহিঃপ্রকাশে ১৫ মিনিটের একটি কৃৎকলা ছিল, যা দর্শকদের উৎসাহের কেন্দ্রবিন্দু। তাই আমি বিশ্বাস করি আমার কাজের দর্শক আমার একান্ত ক্রিটিক, আলোচক এবং অনুপ্রেরণার উৎসও বটে। এও এক মিথস্ক্রিয়া।









