গত শতকের পঞ্চাশের দশক। ভারতের স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিধি কমে গেছে। সেই সঙ্গে বদলাতে শুরু করেছে তাদের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র। এ সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দুই শিল্পী গিয়েছিলেন লন্ডনে। সেখানে তাদের চিত্রকর্ম প্রদর্শনের পাশাপাশি তারা সেখান থেকে শিখেছিলেন। কিছুটা শিখেছিলেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। আর লন্ডনের আবহাওয়া ও সংস্কৃতি থেকে শিখেছিলেন বাকিটা। তাদের যাত্রার মধ্য দিয়ে মডার্নিজমের সঙ্গে সদ্য স্বাধীন একটি অঞ্চলের মানসিকতার পরিচয় হয়েছিল বলা যায়। যুদ্ধ ও ঔপনিবেশিক শাসন-পরবর্তী সময়ে নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে এগোচ্ছিলেন সবাই। জয়নুল আবেদিন ও সুলতানের ভ্রমণের (দুজনের ভ্রমণ ভিন্ন ছিল) মধ্য দিয়ে তারাও নতুন আইডিয়া ও শিল্পবোধ গ্রহণ করেছিলেন।
জয়নুল আবেদিন ততদিনে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ও ঢাকার ফাইন আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা। জয়নুল আবেদিন কমনওয়েলথ ফেলোশিপ (১৯৫১-৫২) নিয়ে লন্ডনের স্লেড স্কুল অব ফাইন আর্টসে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে ১৯৫২ সালে সুলতান লন্ডনে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে। তিনি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের স্পন্সরশিপে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। ফলে দুজনের ভ্রমণ ছিল বেশ দীর্ঘ এবং তারা গভীরভাবে দেখেছিলেন চারপাশ। দুজনের কারোরই সেখানে থাকার ইচ্ছা ছিল না। তবে এ অল্প সময়ের মধ্যে দুই শিল্পী দেখেছিলেন বিশ্বের একটি আধুনিক জনপদ। ফলে তারা বুঝতে পেরেছিলেন তথাকথিত আধুনিক বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বকে কোন দৃষ্টিতে দেখে। তারা লন্ডনে বসে পোস্ট-কলোনিয়াল ন্যারেটিভকে স্পষ্ট করে পড়তে পেরেছিলেন যা তাদের পরবর্তী শিল্পীজীবনে কাজে লেগেছিল।

জয়নুল আবেদিন ও এসএম সুলতানের এ ভ্রমণকে লন্ডন ও মডার্নিজমের ভ্রমণ বলা যায়। এটি তাদের শিল্পচর্চার অংশ হয়ে উঠেছিল। যেকোনো শিল্পীই তার কাজের ক্ষেত্রে নিজ অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে কাজ করেন। কিন্তু ভ্রমণ তাকে নতুন করে চিন্তা করার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করে। দুই শিল্পীর ভ্রমণও তাদের মেট্রোপলিটনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। তাদের ভ্রমণ একদিকে যেমন ছিল ভৌগোলিক, তেমনি ছিল শৈল্পিক। তারা যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদ-পরবর্তী মেট্রোপলিটনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে ছিল যা পরবর্তী সময়ে চিত্রকর্মে প্রভাব রেখেছিল। যদিও তাদের দুজনেরই কাজ ছিল স্বকীয়; স্বাতন্ত্র্যের মধ্যেও নতুন করে দেখা বিশ্ব মনোভাব তারা মাথায় রেখেছিলেন।
শিল্পীদ্বয়ের ভ্রমণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তারা যুদ্ধ-পরবর্তী সময় দেখেছিলেন। যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাদের কাছে দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে তুলনা এসে পড়েছিল। ওই সময়টা শিল্পীদের মধ্যে একটা আদান-প্রদানের রীতি চলছিল। কথা চলছিল শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে। ইউনেস্কোর বৈরুত (১৯৪৮), ফ্লোরেন্স (১৯৫০) ও প্যারিস (১৯৫১) কনফারেন্স আন্তর্জাতিক ভ্রমণের গুরুত্ব তুলে ধরেছিল। ১৯৫২ সালে ভেনিস বিয়েনালে ২০০ অতিথির মধ্যে ১৫০ জন ছিলেন শিল্পী। এর মধ্যে জয়নুল আবেদিন প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন পাকিস্তানের।
পঞ্চাশের দশক আসলে জয়নুল আবেদিনের ভ্রমণের দশক ছিল। তিনি কমনওয়েলথের সহযোগিতা পাওয়ার পাশাপাশি রকফেলার গ্র্যান্ট নিয়ে ঘুরেছিলেন উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও জাপান। এর পরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পেয়েছিলেন স্বর্ণপদক। ষাটের দশকে তাকে আরব লিগ থেকে আহ্বান করা হয় ফিলিস্তিনের গেরিলাদের স্কেচ করার জন্য। লন্ডন ছিল এসব ভ্রমণের প্রথম পদক্ষেপ। ভেনিসের আয়োজনে যাওয়ার আগে তিনি ব্রাসেলস, প্যারিস, আঙ্কারা ও ইস্তানবুল ভ্রমণ করেন।

সে সময় এসএম সুলতানের বয়স খুবই কম। তবে তিনি ফোর্ড অ্যান্ড রকফেলার ফাউন্ডেশনের একটি গ্র্যান্টে ভর করে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া যুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ শৃঙ্খলায় ছিল না। তবে শিল্পীদের এ ধরনের ভ্রমণে আগ্রহী করার মাধ্যমে বিষয়গুলো শৃঙ্খলায় ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। জয়নুল ও এসএম সুলতান তার অংশ হয়েছিলেন। লন্ডনে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে জয়নুল ও সুলতান নতুন করে ঢাকা, করাচি, লাহোর, ভেনিস, শিকাগো, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও নড়াইলকে চিনিয়েছিলেন।
জয়নুল আবেদিনের ভ্রমণ শুরু হয়েছিল চল্লিশের দশকে। পুরো সময়টা মূলত ঔপনিবেশিকতা ভাঙার কাল। পরের দশকে তিনি যান লন্ডনে। স্লেড স্কুল অব আর্টে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানকার আর্ট ক্রিটিক এরিক নিউটন ‘স্টুডিও’ নামে একটি ম্যাগাজিনে তাকে ‘লন্ডনে পড়তে আসা পাকিস্তানি শিল্পী’ বলে উল্লেখ করেছেন। মূলত স্লেডে জয়নুল আবেদিনের প্রশিক্ষণ নেয়ার কথা নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত চিত্রকর জন বাকল্যান্ড-রাইটের অধীনে। এছাড়া মৃৎশিল্প ও বস্ত্র নকশা নিয়েও পড়ার কথা ছিল। স্টুডিওতে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায় জন বাকল্যান্ড-রাইট যখন তার এক ছাত্রকে পড়াচ্ছেন তা দেখছেন জয়নুল আবেদিন। এ ম্যাগাজিন থেকেই জানা যায় জনের কাছে বহু ব্রিটিশ শিল্পীই প্রশিক্ষণ নিতে আসতেন। জয়নুল এ সময় সেখানেই থাকতেন এবং শিক্ষা গ্রহণ করতেন।
জয়নুল আবেদিন লন্ডনে থাকাকালীন দুটি প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়। প্রথমটি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল ইনস্টিটিউটে। রয়্যাল ইন্ডিয়া পাকিস্তান ও সিলন সোসাইটির তত্ত্বাবধানে আয়োজিত হয় ১৯৫১ সালের ৩-৮ ডিসেম্বর। দ্বিতীয়টি পাকিস্তান হাইকমিশনের সহায়তায় লন্ডনের বার্কলে গ্যালারিতে ১৪-১৬ জানুয়ারি চলেছিল। এ প্রদর্শনীর সাইট দুটো গুরুত্বপূর্ণ। ইম্পেরিয়াল ইনস্টিটিউটে আগে থেকেই ভূতপূর্ব সাম্রাজ্যের শিল্পীদের চিত্রকর্ম ছিল। এ প্রদর্শনীর ক্যাটালগে জয়নুল আবেদিনের পরিচয় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এভাবে—‘পাকিস্তান সরকার প্রেরিত শিল্পী। তিনি লন্ডনে করা নিজের কাজ নিয়ে একটি প্রদর্শনী করবেন এবং ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের আর্ট গ্যালারি প্রদর্শন করবেন।’ সে তুলনায় ১৯৪১ সালে চালু হওয়া বার্কলে গ্যালারিতে যুক্তরাজ্যের লোকশিল্প ও অন্যান্য শিল্পকর্ম স্থান পেত।
লন্ডনে জয়নুল আবেদিনের প্রদর্শনীর কেন্দ্রে ছিল ১৯৪৩ সালের বাংলার মন্বন্তর নিয়ে অঙ্কিত চিত্রকর্মগুলো। সে সময় জয়নুল আবেদিন কলকাতা আর্ট কলেজের একজন তরুণ শিক্ষক ছিলেন। এ ছবিগুলোর মধ্য দিয়ে সে সময়ের ঔপনিবেশিক শাসকদের অতিমুনাফা করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দুরবস্থা ফুটে উঠেছিল। ছবিগুলো ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিচ্ছবি আর তা তুলে ধরেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনে থাকা এক শিল্পী। তিনি কালি ও কলম দিয়ে এ ছবিগুলো তৈরি করেছিলেন। দুর্ভিক্ষের ছবি ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের দৈনন্দিন জীবন ও মানুষকে নিয়ে আঁকা তার ছবিও এসেছিল এ প্রদর্শনীতে। এর মধ্যে ছিল হোমওয়ার্ড বাউন্ড, দ্য ফ্লোটিং মার্কেট, বোটরেস, আফটার ফিশিং শিরোনামের ছবিগুলো।
এরিক নিউটনের লেখায় জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্ম সম্পর্কে বলা হয়, ‘মিস্টার আবেদিন জলরঙে বিশেষজ্ঞ। তিনি খুব দ্রুত ছবি আঁকতে পারেন। একটি ২০ বাই ২৪ ইঞ্চি ছবি আঁকতে তিনি মাত্র ১৫ মিনিট সময় নেন। এছাড়া ড্রাই ব্রাশ স্ট্রোকে একই মাপের একটি ছবি আঁকতে একই সময় নিয়েছেন।’ সেই ছবি দুটোর বাইরেও মূলত দুর্ভিক্ষের ছবিটিই জয়নুল আবেদিনের সব ছবির মধ্যে লন্ডনের প্রদর্শনীতে দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্ম নিয়ে জন বাকল্যান্ড-রাইট বলেন, ‘শুধু বিমূর্ত গ্রাফিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে শ্রেষ্ঠ অঙ্কনগুলোর একটি নিজস্ব প্রাণ থাকে। সেগুলো এমন এক নকশা, যা শিল্পীর সংবেদনশীলতা দ্বারা পরিপূর্ণ। যদি একই সঙ্গে সেগুলো আমাদের অনুপ্রাণিত করা বস্তুকে পুনঃসৃজন করে এবং গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়, তবে সেগুলোর কেবল একটি নান্দনিক মূল্যই থাকে না, বরং তীব্র আবেগপ্রবণ শক্তিও থাকে।
[...] মি. আবেদিনের ভারতীয় দুর্ভিক্ষের দৃশ্যগুলোর তুলির অঙ্কন দেখে এ দুটি গুণই আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ক্ষুধার্ত মানুষের চিত্রগুলোর আবেগজড়িত প্রভাব অপরিসীম, তবু এ আবেগগত বৈশিষ্ট্যের বাইরেও যে জিনিসটি রয়ে যায়, তা হলো এক উচ্চমানের বিমূর্ত নান্দনিক রচনাবিন্যাস।’
জয়নুল আবেদিনের এ চিত্রকর্মগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু লন্ডনে তার এ প্রদর্শনী দুটি ছিল বিশ্বপরিমণ্ডলে দক্ষিণ এশীয় পরিবেশ, প্রতিবেশ ও মনোভাব প্রকাশের মাধ্যম।
একই রকম যাত্রা ছিল এসএম সুলতানেরও। দীর্ঘ যাত্রার মধ্য দিয়ে তিনি পরিচিত হন নতুন ন্যারেটিভের সঙ্গে এবং বাংলাকে তিনি তুলে ধরেছিলেন চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে।
[লোটে হোয়েক ও সংযুক্তা সুন্দরেসনের গবেষণাপত্র Journeying through Modernism: Travels and Transits of East Pakistani Artists in Post-Imperial London অবলম্বনে রচিত]
(পরবর্তী পর্বে সমাপ্য)









