ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তার আঁকা ‘সানফ্লাওয়ার’ বা সূর্যমুখী ফুল সিরিজটিকে নিজের সবচেয়ে সফল ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে গণ্য করতেন। সূর্যমুখী ফুলকে তিনি নিজেরই প্রতীক ভাবতেন। একটি মাত্র রঙ—হলুদের বিভিন্ন শেড ও টেক্সচার ব্যবহারে তিনি উচ্ছ্বাস আর আবেগের এক অনন্য প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাই তো এখনো সূর্যমুখী ফুলের এ ছবিগুলোর সরলতা জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে।

১৮৮৮-৮৯ সালের মধ্যে ভ্যান গঘ সানফ্লাওয়ার সিরিজের যে তিনটি সংস্করণ এঁকেছেন, সেগুলো এ সিরিজের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হিসেবে বিবেচিত, যার একটি সংরক্ষিত আছে জাপানের টোকিও শহরের সোমপো মিউজিয়াম অব আর্টে। অন্য দুটি রয়েছে লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারি ও আমস্টারডামের ভ্যান গঘ জাদুঘরে।

দীর্ঘদিন ধরেই টোকিওর সোমপো শিল্প জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকা চিত্রকর্মটি নিয়ে চলছে আইনি লড়াই। ১৯৮৭ সালে জাপানি কোম্পানি সোমপো হোল্ডিংস (তৎকালীন ইয়াসুদা বীমা কোম্পানি) ছবিটি লন্ডনে অবস্থিত ক্রিস্টি’জ নিলামঘর থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলারের রেকর্ড মূল্যে কিনে নেয়।

24

এরপর ২০২২ সালে জার্মান-ইহুদি ব্যাংকার ও শিল্প সংগ্রাহক ‘পল ফন মেনডেলসন-বারথোল্ডি’র উত্তরাধিকারীরা সোমপো হোল্ডিংসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করেন। তাদের দাবি, ১৯৩৪ সালে নাৎসি চাপের মুখে তাদের পূর্বপুরুষ চিত্রকর্মটি বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে এটি ‘নাৎসি দখলকৃত’ শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। এছাড়া চিত্রকর্মটির আগের মালিক হিসেবে মালিকানা ইতিহাসে তার উল্লেখ থাকলেও ইয়াসুদা কোম্পানি তা স্বীকার করেনি। একই সঙ্গে উত্তরাধিকারীরা ২০০১-০২ সালে শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত ‘ভ্যান গঘ ও গগাঁ’র প্রদর্শনীর আর্থিক লাভও দাবি করছে। বারথোল্ডির ৩০ জনেরও বেশি উত্তরাধিকারীর পক্ষে মামলাটি করেন জুলিয়াস এইচ শোপস, ব্রিট-মারি এনহোয়েরনিং ও ফ্লোরেন্স ফন কেসেলস্ট্যাট।

এটি হলোকাস্টে দখলকৃত শিল্প পুনরুদ্ধার আইন, ২০১৬-এর আওতায় করা হয়। এ আইন অনুযায়ী নাৎসি যুগে জোরপূর্বক বিক্রি হওয়া শিল্পকর্মের মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে ‘ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে মামলার যথেষ্ট সংযোগ নেই’ যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন আদালতে মামলাটি খারিজ হলে উত্তরাধিকারীরা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম আপিল আদালতে মামলাটি পুনরায় উপস্থাপন করা হয় এবং ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের তিন বিচারকের প্যানেলের সামনে তারা তাদের যুক্তি তুলে ধরেন।

অন্যদিকে সোমপো হোল্ডিংসের যুক্তি, চিত্রকর্মটি নিলামে বিক্রি হওয়ার ফলে আর ‘নাৎসি দখলকৃত’ শিল্পকর্মের সংজ্ঞায় পড়ে না। তারা আরো বলছেন, পুনরুদ্ধার আইন শুধু মামলা দায়েরের সময়সীমা তুলে দিয়েছে, কিন্তু নতুন কোনো আইনি দাবি তৈরির সুযোগ দেয় না।

উত্তরাধিকারীদের দাবি অনুযায়ী ‘তেরেজিন ঘোষণাপত্র, ২০০৯’ একটি নির্বাহী চুক্তি, যা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিশ্রুতি বহন করে; যে ঘোষণাপত্রে বিভিন্ন দেশ সম্মত হয়েছিল নাৎসি দখলকৃত শিল্পকর্ম দ্রুত ফেরত দেয়ার বিষয়ে। তবে নাৎসি যুগের অন্ধকার অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত এ মামলার রায় এখনো ঘোষণা হয়নি। বিচারকরা এখনো রায়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেননি। তবে চিত্রকর্মের মালিকানা নিয়ে চলমান মামলাটি শিল্পজগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে হলোকাস্ট-পরবর্তী শিল্পকর্ম পুনরুদ্ধারসংক্রান্ত নীতিমালার আলোকে।

সূত্র: দি আর্ট নিউজপেপার