গাছের কাণ্ডের রেখা, শিকড়ের বিস্তার, নদীর স্রোত কিংবা পাহাড়ের ক্ষতচিহ্ন—এসবের ভেতর দিয়ে প্রকৃতি হয়তো তার নিজস্ব গল্পই বলে যায়। কিন্তু প্রকৃতির এসব উপকরণ যখন শিল্প ও শিল্পীর সান্নিধ্যে আসে, তখন তার নীরব শরীরে যুক্ত হয় আরেকটি ভাষা—শিল্পীর ভাষা। শিল্পীর হাত, ভাবনা ও অনুভব প্রকৃতির শরীরে প্রতিফলিত হয়ে তাকে নতুন অর্থ দেয়।
প্রকৃতির সেই নীরব ভাষা আর শিল্পীর নিজস্ব ভাষার এমনই এক মেলবন্ধন দেখা গেছে ঢাকার লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে চলমান ভাস্কর সুমন বর্মণের ‘অন্তঃস্রোত’ প্রদর্শনীতে। কাঠকে কেন্দ্র করে নির্মিত এ প্রদর্শনীতে প্রকৃতির একটি চেনা উপাদানই শিল্পীর ভাবনার মধ্য দিয়ে পেয়েছে নতুন রূপ ও ভাষা। কাঠের রেখা, গঠন, বাঁক ও নিজস্ব প্রবাহকে ধারণ করেই সুমন বর্মণ এগিয়েছেন বিমূর্ততার দিকে, যা প্রকৃতি ও শিল্পীর ভাবনার মধ্যকার এক নীরব সংলাপ তুলে ধরছে।
প্রদর্শনীর শিরোনাম সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্পী জানান, প্রদর্শনীর নামটি শিল্পীর নিজের দেয়া নয়; কিউরেটরই এর নামকরণ করেছেন। শিল্পীর ভাষ্যে, এ নামের মধ্য দিয়ে মূলত কিউরেটর শিল্পীর কাজের ভাবনাকে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছেন।
প্রদর্শনীতে মোট সাতটি কম্পোজিশন তৈরি করা হয়েছে, যার বিন্যাসেও ‘অন্তঃস্রোত’-এর ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কাজগুলোর মূল ফর্মে রয়েছে ঢেউ খেলানো গতি। শিল্পী জানান, তার কাজে ফুটে ওঠা এ ঢেউ তার পরিবারের প্রতীক। তার পরিবার একসময় জেলে পরিবার ছিল। বর্তমানে সেই পেশায় আর কেউ না থাকলেও শিল্পী সুমন তার পারিবারিক উত্তরাধিকারকে বয়ে চলছেন নতুন একটি রূপে।
তার প্রতিটি কাজে ফিগারের আকার ও বিন্যাসে রয়েছে ভিন্নতা। ফলে একই ধরনের প্রবাহের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আলাদা দৃশ্যমানতা। কোনোটি অপেক্ষাকৃত সরু ও দীর্ঘ, কোনোটি আবার মোটা ও ভারী। কোথাও কাঠের বুকের অংশ প্রশস্ত হয়ে উঠেছে, কোথাও আবার শরীরের গঠন সংকুচিত। এ পার্থক্যগুলোকে শুধু কারিগরি বৈচিত্র্য হিসেবেও দেখা যায়, আবার এগুলোকে দেখা যায় একেকটি আলাদা শারীরিক অভিব্যক্তি হিসেবে।
দুটি ভাস্কর্য পাশাপাশি দাঁড় করালে দর্শকের মনে হতে পারে একটি পুরুষ ও একটি নারীর অবয়ব; কিন্তু পরক্ষণেই সেই ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়ে—সত্যিই কি একটি পুরুষ আর অন্যটি নারী? নাকি দর্শকের নিজের দৃষ্টিই তাদের এমন পরিচয় দিচ্ছে? শিল্পীর কাজের আকর্ষণ ঠিক এখানেই। তিনি কোনো নির্দিষ্ট উত্তর চাপিয়ে দিচ্ছেন না; বরং দর্শকের মনে প্রশ্ন ও সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করছেন।
এ অনিশ্চয়তাই ভাস্কর্যগুলোকে আরো জীবন্ত করে তোলে। একটি কাঠের শরীরকে দেখে দর্শক যেমন মানুষের শরীরের কথা ভাবতে পারেন, তেমনি পরক্ষণেই সেটিকে সম্পূর্ণ বিমূর্ত একটি ফর্ম হিসেবেও দেখতে পারেন। পরিচিত ও অপরিচিতের এ সীমারেখায় দাঁড়িয়েই কাজগুলো নিজের ভাষা তৈরি করেছে।
শিল্পীর কাছে এ কাজগুলো নিছক কাঠের ভাস্কর্য নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ের তার চিন্তার দৃশ্যমান ফলাফল। তিনি বলেন, ‘আমার ফিলোসফির ফল হচ্ছে এই কাজ।’ তার ভাষ্যে, কাজ করার সময় যে চিন্তা তার মধ্যে থাকে, সেটিই কোনো না কোনোভাবে কাজে ফুটে ওঠে। আবার কাজ শেষ হয়ে গেলে সেই সময়ের চিন্তাটিও যেন সেখানেই সমাহিত হয়ে যায়। ফলে প্রতিটি কাজ একই সঙ্গে একটি সময়ের সাক্ষ্য এবং সেই সময়ের সমাপ্তি।
প্রদর্শনীর কিউরেটর ওয়াকিলুর রহমান জানান, শিল্পীর এবারের কাজগুলো অনেক বেশি সুচিন্তিত। একজন শিল্পীর পরিণত হওয়ার যে প্রক্রিয়া, সেটি শুধু কাজের আকারে নয়, বরং তার চিন্তার মধ্যেও ধরা পড়ে। কাঠের মূল ফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্পী আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ব হয়েছেন। আগের কাজগুলোর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অবয়ব বা পরিচিত রূপ সহজেই চোখে ধরা পড়ত। দর্শক হয়তো দেখেই বুঝতে পারতেন, কাজটি কোন আকৃতি বা কোন ধারণাকে কেন্দ্র করে তৈরি। কিন্তু এবারের কাজগুলো সেই সরল পরিচয়ের জায়গা থেকে সরে এসেছে। সেখানে রয়েছে নানা ধরনের মুভমেন্ট—কখনো শরীরের ভঙ্গিতে, কখনো কাঠের উল্লম্ব ব্যবহারে, কখনো আবার পৃষ্ঠের নকশায়। ফলে তার কাজের মধ্যে এসেছে শক্তিশালী অ্যাবস্ট্রাকশন বা বিমূর্ততা। তাই ভাস্কর্যগুলোকে শুধু ‘কী দেখাচ্ছে’ দিয়ে বোঝার সুযোগ নেই; বরং ‘কী ভাবাচ্ছে’ সেটিই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ।
ভাস্কর্যগুলোকে প্রদর্শন করার জন্য আলোর ব্যবহার এমনভাবে করা হয়েছে, যার ফলে থ্রি-ডাইমেনশনাল একটি পার্সপেক্টিভ তৈরি হয়েছে। কোনো অংশে আলো পড়ে সেটিকে সামনে নিয়ে আসে, অন্য অংশ ছায়ায় ঢেকে গিয়ে তৈরি করে গভীরতা। ফলে ভাস্কর্যের দাঁড়ানোর ভঙ্গি, তার গঠন এবং চারপাশের আলোর পরিবর্তন—সবকিছু মিলে তৈরি হয় নতুন এক অভিব্যক্তি।
শিল্পী কাঠকেই কেন বেছে নিয়েছেন—এ প্রশ্নের উত্তরে জানা যায়, তার অভিব্যক্তির যে ভঙ্গি, তা একমাত্র কাঠের মধ্যেই সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে ওঠে বলে মনে করেন তিনি। অন্য কোনো মাধ্যমে, যেমন সিমেন্টে, একই প্রকাশ সম্ভব নয় বলেই তার বিশ্বাস। কাঠের সঙ্গে কাজ করার আরেকটি সুবিধা হলো—এতে অতিরিক্ত কাস্ট বা বর্জ্য তৈরি হয় না, কাজের জায়গাও তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন থাকে।
শিল্পীর কাজের প্রক্রিয়াতেও রয়েছে নিজস্বতা। তিনি কোনো প্রকার পাওয়ার টুলস ব্যবহার করেন না। যতটুকু কাজ প্রয়োজন, নিজের হাতেই তা করতে পারেন বলে মনে করেন। কাঠ সংগ্রহ করেন পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের কাঠের বাজার থেকে। সেই অতিসাধারণ কাঠই তার হাতে এসে ধীরে ধীরে অনন্য এক শিল্পরূপ পায়।
কাঠের গায়ে একের পর এক চলমান ঢেউ খোদাই করে শিল্পী যেন জীবনের নিরন্তর প্রবাহকেই দৃশ্যমান করে তুলেছেন। স্থিরতার ভেতরেও যে জীবন প্রতিনিয়ত বয়ে চলে, ‘অন্তঃস্রোত’ সেই কথাটিই যেন বলে যায়।









