প্রতিকূল আবহাওয়া, পরিবহন সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ববাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে খাদ্যপণ্যের দাম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের গড় মূল্যসূচক বেড়ে প্রায় চার বছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। খবর রয়টার্স ও হেলেনিক শিপিং নিউজ।
এফএওর তথ্যানুযায়ী, গত মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের গড় মূল্যসূচক ছিল ১৩৬ পয়েন্ট। এটি গত আগস্টের তুলনায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ দাম বাড়ার হার প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দামে এটিই সর্বোচ্চ রেকর্ড।
বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনে নানামুখী সংকট ও ভৌগোলিক সংঘাতের প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্যের বাজারে। কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পরিবহন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সময়ে বিভিন্ন দেশে চরম আবহাওয়ায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি, পরিবহন ও গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ের বাজারেও পড়বে। বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি চাপে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে চিনি ও দানাদার খাদ্যশস্যের। সেপ্টেম্বরে এফএওর চিনির মূল্যসূচক আগের মাসের চেয়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এটি টানা তৃতীয় মাসিক প্রবৃদ্ধি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কায় টানা তিন মাস ধরে চিনির দাম বাড়ছে। থাইল্যান্ডে উৎপাদন হ্রাস, ভারতে এল নিনোর প্রভাবে কম বৃষ্টিপাত, ব্রাজিলে অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চাষের জমি কমে যাওয়ায় চিনির বাজারে এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
দানাদার খাদ্যের ক্ষেত্রে এফএওর শস্য মূল্যসূচক আগের মাসের চেয়ে ৫ দশমিক ১ এবং গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ১৭ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে বন্দর ও নৌপথ জটিলতায় বিশ্ববাজারে গমের দাম ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ইউরোপের খরা পরিস্থিতি এবং পরিবহন ব্যবস্থার কারণে ভুট্টা এবং অন্যান্য খাদ্যশস্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চালের বাজারজাতেও প্রভাব ফেলেছে বৈরী আবহাওয়া। ফলে চালের মূল্যসূচক ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। আবহাওয়াজনিত উদ্বেগ ও মৌসুমি সরবরাহ কমে যাওয়ায় এশিয়ার বাজারে চালের দামে চাপ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ভোজ্যতেলের দামও সেপ্টেম্বরে বেড়েছে, তবে বৃদ্ধির হার ছিল তুলনামূলক কম। এফএওর ভেজিটেবল অয়েল মূল্যসূচক আগস্টের তুলনায় দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। মূলত শক্তিশালী বৈশ্বিক চাহিদা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শুষ্ক আবহাওয়ায় পাম অয়েলের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ এ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের দামে কিছুটা পতন দেখা গেছে। মাংসের মূল্যসূচক কমেছে ১ দশমিক ১ ও দুগ্ধজাত পণ্যের দর কমেছে দশমিক ১ শতাংশ।
পৃথক এক পূর্বাভাসে এফএও জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বে দানাদার খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ২ দশমিক ১ শতাংশ কমে ২৯৭ কোটি ৯০ লাখ টনে নামতে পারে। তা সত্ত্বেও এটি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড গড়তে পারে। তবে অস্ট্রেলিয়ায় আবহাওয়া ভালো থাকায় গম উৎপাদন বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রে দাবদাহের কারণে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমতে পারে। সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে শস্য রফতানি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ার দেশগুলোয় চাল ও কৃষিপণ্যের উৎপাদনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।









