মুক্তি পেতে না পেতেই শোরগোল তুলেছিল কন্নড় সিনেমা কানতারা। মাত্র ১৬ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটি ঘরে তুলেছে ২০০ কোটি রুপির বেশি। দক্ষিণ ভারতের সিনেমার সুবর্ণ সময়ে কানতারার এ আয় সিনেমার ব্যবসাসংক্রান্ত ধারণাই বদলে দিচ্ছে। সেখান থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে যে, স্বল্প বাজেটের সিনেমাটি কী এমন বিশেষ উপহার নিয়ে হাজির হলো দর্শকদের জন্য? প্রথমেই একটি জানা উত্তর আসে-গল্প। কিন্তু এর বাইরেও কোনো না কোনো অনুষঙ্গ থাকে, যা সিনেমাটিকে বিশেষ করে তোলে বা দর্শকের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে। এ সিনেমা কেবল দর্শকই নয়, সমালোচকদেরও সন্তুষ্ট করেছে। আইএমডিবিতে এর রেটিং ৯ দশমিক ১।

সিনেমাটিতে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যোগসূত্রের কথা বলা হয়েছে। এর গল্প দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগের প্লট ২০০ বছর আগের। ১৮৪৭ সালে একজন রাজা তার মানসিক শান্তির খোঁজে বের হন এবং শেষ পর্যন্ত একটি বনে গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে পানজুরলির সঙ্গে তার দেখা হয়। এ পৌরাণিক সত্তাটি বন, বনে বসবাসকারী মানুষ ও অন্য প্রাণীদের সুরক্ষা দেয়। রাজা এ পানজুরলিকে নিয়ে আসতে চান নিজের সঙ্গে। বদলে বনের অধিবাসীদের ওই বনের অধিকার প্রদান করেন। এর পরের গল্পটি ১৯৯০ সালে চলে আসে। ফরেস্ট অফিসাররা এ সময় বনটিকে রিজার্ভ ফরেস্ট করার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় ওই রাজার উত্তরপুরুষ বনের অধিকার লাভ করে। সিনেমায় ঋষভ শেঠি ওই বনাঞ্চলের অধিবাসীদের নেতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

সিনেমাটিতে এর প্লটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভূত কলা নামের একটি আচারের প্রসঙ্গ এসেছে। এ আচারে সাধারণত স্থানীয় কিছু স্পিরিটকে পূজা করা হয়। মানুষের বিশ্বাস হলো যিনি এ আচার পালন করেন, তিনি খোদ ঈশ্বরে পরিণত হন। বিষয়টি অনেকটা যজ্ঞের মতো করা হয়। ফলে এ আচার পালনকারীকে একদিকে জনতা ভয় করে এবং সে ভয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় সম্মান। মানুষ বিশ্বাস করে ওই ব্যক্তি তার আশপাশের মানুষের সব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। বাস্তবেই এ ধরনের আচার প্রচলিত আছে। টুলুভাষীদের মধ্যে দক্ষিণ কন্নড়, উত্তর কন্নড় ও উদুপী জেলার অধিবাসীরা এ রকম কয়েক ভূতের উপাসনা করে। সেসব অঞ্চলে ভূত কলা নামক আচার পালন করা হয়।

সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন কন্নড় অভিনেতা ঋষভ শেঠি। পরিচালনার পাশাপাশি তিনিই লেখক ও অভিনেতা। বলা যায় সিনেমাটি অনেকটাই ওয়ান ম্যান শো। ঋষভের অভিনয়, সিনেমার গল্প তৈরি সব মিলিয়েই কানতারা ভালো করেছে। তবে ভালো করার পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। শুরু থেকেই সিনেমাটির গতি ভালো ছিল। এছাড়া এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখানো হয়। এক জায়গা থেকে ক্ষমতা আরেক জায়গায় কীভাবে যায়, তা দেখানো হয়েছে। এর সঙ্গে ছিল স্থানীয় সংস্কৃতির যোগসূত্র। এ কারণে সিনেমাটি দর্শকরা আরো পছন্দ করেছেন। দক্ষিণ ভারতের এ ধরনের সিনেমা সবসময়ই অ্যাকশন ঘরানার। কানতারায়ও অ্যাকশনের কমতি ছিল না। সে কারণেই একটা বড়সংখ্যক দর্শককে খুব সহজেই ধরতে পেরেছে সিনেমাটি।

কানতারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দর্শককে খুব বেশি যুক্ত করতে পেরেছে। বিশেষত সংলাপ, চরিত্রগুলোর আঞ্চলিকতা, সেট, গল্প ইত্যাদি। অর্থাৎ দর্শক বুঝতে পেরেছে এর গল্পটি তাদেরই গল্প। অন্যদিকে সিনেমার অভিনয়, গল্পের গতি ও প্রাসঙ্গিকতা পছন্দ করেছেন সমালোচকরা। ফলে উভয় দিকেই সিনেমাটি ভালো নম্বর পেয়ে উতরে গিয়েছে। কেবল উতরেই যায়নি, সিনেমাটি দেখার জন্য লোকে লাইন দিয়েছে। এ ধরনের ছবি তখনই ভালো ব্যবসা করে, যখন দর্শক ফিরে ফিরে আসে। কানতারায় ঠিক তেমনটিই হয়েছে। এর একটি ইতিবাচক দিক হলো সিনেমাগুলো স্থানীয় দর্শকদের খুব আকর্ষণ করে। তারা নিজের গল্পটি দেখতে চান। অন্যদিকে ওই অঞ্চলের বাইরের দর্শকরাও অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতি জানতে চলচ্চিত্রগুলো দেখার চিন্তা করেন।

এর আগে সুঝল: দ্য ভরটেক্স সিরিজেও এমন আঞ্চলিক সংস্কৃতি দেখানো হয়েছিল। এ ধরনের সিনেমার প্রতি মানুষের আগ্রহের কথা এখন সবাই জানে। কানতারা দর্শকের ঠিক সেই চাহিদাটি পূরণ করেছে। এর বাইরে অভিনয়, গল্প আর দর্শককে যুক্ত করার ক্ষমতাও দেখিয়েছেন ঋষভ শেঠি। ভূত কলার বিস্তারিত ও সঠিক চিত্রায়ণ দর্শক ও সমালোচকদের সন্তুষ্ট করেছে। এর বাইরে ঋষভ একটি কমপ্লিট এন্টারটেইনার উপহার দিয়েছেন দর্শকদের। ফরেস্ট অফিসারের সঙ্গে শিবার সংঘাতের মধ্য দিয়ে অ্যাকশন ড্রামার সৃষ্টি করা হয়েছে। সেখানে দুর্নীতি ও অন্যান্য বিষয়ও এসেছে। ফলে দর্শকদের পছন্দসই হয়েছে সিনেমাটি। যদিও ভূত কলা নিয়ে ঋষভের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন কেউ কেউ, তাতে সিনেমাটিকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কানতারা হয়ে উঠেছে দর্শকের সিনেমা।