মালয়ালম চলচ্চিত্রে বহু কিংবদন্তি নির্মাতা এসেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে বিশেষ হয়ে আছেন ফাজিল। তিনি ছিলেন দূরদর্শী চলচ্চিত্রকার। তার প্রথম সিনেমা মঞ্জিল বিরিঞ্জা পুক্কল শুধু ইন্ডাস্ট্রিকে নতুন দিশা দেয়নি, ভারতীয় সিনেমাকে উপহার দিয়েছিল এক যুগান্তকারী অভিনেতা মোহনলালকে।
আলাপ্পুয়ায় জন্ম নেয়া ফাজিলের বাবা চেয়েছিলেন তিনি যেন ডাক্তার হন। কিন্তু ফাজিল গল্প বলতে পছন্দ করতেন। স্কুল-কলেজে নাটক লেখা ও অভিনয়, আর কেরালার প্রথম মিমিক্রি দলে কাজ করেছেন। এভাবেই মালয়ালম ইন্ডাস্ট্রির নজরে আসেন। তার প্রথম সুযোগ আসে নবদয়া স্টুডিওতে। প্রণয় নাজির ও মধু অভিনীত থীক্কাদাল সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন তিনি। আপ্পাচান পরিচালিত সিনেমাটি সফল হলে ফাজিল পরিচালনায় আসারও সুযোগ পান।
১৯৮০ সালে ফাজিল পরিচালনা করেন মঞ্জিল বিরিঞ্জা পুক্কল। স্বল্প বাজেটের এ রোমান্টিক সিনেমায় নতুন মুখদের আনা হয়েছিল। অডিশনে চারজন বিচারক ছিলেন। একজন তরুণকে এ চারজনের দুজন ৫ ও ৭ নম্বর দেন। ফাজিল দিয়েছিলেন ৯০ এবং শেষ পর্যন্ত তাকেই খলনায়ক হিসেবে বেছে নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মালয়ালম সিনেমার ইতিহাস বদলে দেয়া এ তরুণ ছিলেন মোহনলাল।
৭ লাখ রুপিতে নির্মিত সিনেমাটি বক্স অফিসে আয় করেছিল ১ কোটি রুপিরও বেশি। শঙ্কর ও পূর্ণিমা জয়রাম অভিনীত সিনেমাটি কেরালা স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডে একাধিক বিভাগে পুরস্কার জেতে এবং ফাজিল রাতারাতি তারকা নির্মাতা হয়ে ওঠেন। একই সঙ্গে মোহনলালের অভিনয়জীবনেরও সূচনা হয় এ সিনেমার মাধ্যমে।
এরপর ধন্যা ও মারাক্কিলোরিক্কালুম দর্শক টানতে পারেনি। তবে ১৯৮৩ সালে এন্তে মাম্মাটিক্কুট্টিয়াম্মাক্কুর মাধ্যমে বড়সড় প্রত্যাবর্তন করেন ফাজিল। পরের বছর নোকেৎথাদুরথু কন্নুম নাত্তু দিয়ে তিনি আরেকটি সফল অধ্যায় লেখেন। এরপর এন্নেন্নুম কান্নেট্টান্তে ব্যর্থ হলেও তিনি পুনরায় সাফল্য পান মাম্মুত্তি অভিনীত পুভিনু পুত্যা পুন্থেন্নাল দিয়ে। সিনেমাটি পরে ছয়টি ভাষায় রিমেক হয়। এরপর মানিভাথুরিলে আয়িরাম শিবরাত্রিকাল, এন্তে সূর্যপুত্রিক্কু, পাপ্পায়ুদে স্বন্থম আপ্পুস এবং কিলিপেচ্চু কেত্কাভা—প্রতিটি সিনেমা তাকে গল্পকার হিসেবে অনন্য মর্যাদা দেয়।
তবে ফাজিলের সর্বোচ্চ সাফল্য আসে ১৯৯৩ সালে মানিচিত্রথাঝু দিয়ে। এ সাইকোলজিক্যাল হরর সিনেমায় আবারো অভিনয় করেন মোহনলাল। সঙ্গে ছিলেন শোভনা ও সুরেশ গোপী। লোককথা, মনোবিজ্ঞান ও রহস্যের দুর্দান্ত মিশ্রণে নির্মিত সিনেমাটি ভারতীয় সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এটি দুটি জাতীয় পুরস্কার জেতে এবং ৩০০ দিনেরও বেশি সময় প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল। সিনেমাটির নাম কঠিন মনে হলেও এর তামিল ও হিন্দি সংস্করণের নাম বললে পাঠক সহজেই চিনতে পারবেন। তামিল সিনেমাটির নাম চন্দ্রমুখী ও হিন্দি সিনেমাটির নাম ভুল ভুলাইয়া।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে আবারো ফাজিল রোমান্টিক ঘরানায় ফেরেন। এরপর তিনি মোহনলাল ও মাম্মুট্টিকে পর্দায় আনেন হারিকৃষ্ণনস সিনেমায়। এ সিনেমা দিয়ে জুহি চাওলার অভিষেক হয় মালয়ালমে। ফাজিল তার পুত্র ফাহাদ ফাসিলকে কায়্যেত্থুম দূরথ (২০০২) সিনেমার মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়ে আসেন। কিন্তু এটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয় এবং ফাহাদের অভিনয় ব্যাপক সমালোচিত হয়। ফলে ফাহাদ কিছু বছর চলচ্চিত্র থেকে দূরে থাকেন, পরে নিজেকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে। কিন্তু এ ব্যর্থতাই ফাজিলের পতনের সূচনা ঘটায়। তার পরবর্তী সিনেমা বিস্ময়াথুম্বাথু, ওরু নাল ওরু কানাভু, মজ অ্যান্ড ক্যাট ও লিভিং টুগেদার তেমন সাফল্য পায়নি।
২০১১ সালের পর ফাজিল আর কোনো সিনেমা পরিচালনা করেননি। তবু তিনি আজও মালয়ালম সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাতা হিসেবে সম্মানিত। তার চলচ্চিত্র প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে। তৈরি করেছে সুপারস্টার। আর মঞ্জিল বিরিঞ্জা পুক্কল থেকে মানিচিত্রথাঝু পর্যন্ত উপহার দিয়েছেন ভারতীয় সিনেমার কিছু অমর সৃষ্টি।









