সুপারহিরোদের দুনিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ সম্ভবত উইথ গ্রেট পাওয়ার, কামস গ্রেট রেস্পন্সিবিলিটি। অর্থাৎ ক্ষমতা যত বড়, দায়িত্বও তত বড়। সব সুপারহিরোই কমবেশি দায়িত্বশীল। বিষয়টিই তাদের ‘সুপারহিরো’ করে তোলে। কখনো তারা হয়তো দায়িত্ব বুঝতে পারেন না, কখনো বুঝলেও তা কাজে প্রমাণ করতে পারেন না বা দেরি হয়ে যায়। তবে মানুষের প্রতি সুপারহিরোদের নিবেদন, দায়িত্ব ও মমত্ববোধই তাদের সুপারহিরোর আসনে বসায়। কমিকস বা সিনেমায় কখনো তাদের ব্যক্তিগত মিশন আর কখনো সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রধান হয়ে ওঠে। সিনেমার ক্ষেত্রে নির্মাতারা নানা সময় নিরীক্ষা করেন। সে নিরীক্ষা থেকেই জেমস গান এবার হাজির হলেন সুপারম্যানের এক নতুন ন্যারেটিভ নিয়ে, যেখানে এ সুপারম্যান আরো বেশি মানবিক।
সিনেমা শুরু হয় সুপারম্যানের পতন থেকে। পতনটা কেমন? না, তিনি অতিপ্রাকৃত কোনো একটি প্রাণীর সঙ্গে লড়াই করতে করতে আহত হন। চলে যান নিজের ডেরার কাছে। সেখানে সুপারম্যানের রোবটদের হাতে শুশ্রূষা নিয়ে তিনি ফেরেন সে অতিমানবিক শত্রুটির সঙ্গে লড়াইয়ে। কেননা লড়াইটি তিনি আধাআধি রেখে যান না।
অবশ্য এ সময়ের মধ্যে সুপারম্যানের শত্রু লেক্স লুথর তার সহযোগী মেটাহিউম্যান পাঠিয়ে সুপারম্যানের ডেরার খবর জেনে ফেলেন এবং আমরা দেখি অল্প সময়ের মধ্যেই সুপারম্যানের ডেরায় ঢুকে তা ধ্বংস করার পাশাপাশি সুপারম্যানের জন্ম ও অন্যান্য রহস্য সে জেনে নেয়। ক্যাল এলের সে রহস্য হাতিয়ে লেক্স লুথর নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে। মানুষের মধ্যে সুপারম্যানের প্রতি যে দরদ ছিল তা কমিয়ে ফেলে মিডিয়াকে ব্যবহার করে। কিন্তু সুপারম্যান তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়। প্রয়োজনে সে আত্মসমর্পণও করে সিস্টেমের কাছে। এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে লুথরের বিরুদ্ধে আবারো যুদ্ধ করে। এক্ষেত্রে তার সহযোগী হন প্রেমিকা লুইস লেন ও জাস্টিস গ্যাং। সঙ্গে ছিল সুপারডগ ক্রিপ্টো।
গল্পের এ সংক্ষিপ্ত বিবরণ শুনে মনে হতে পারে সুপারম্যানের নিয়মিত গল্পটাই তো এখানে আছে, যা কমবেশি সবার জানা। কিন্তু এ সাধারণ গল্পের মধ্যেই জেমস গান নিয়ে এসেছেন আরো কিছু বিষয়। তার সুপারম্যানকে আসলে দেখতে হবে নতুন দৃষ্টিতে—রাজনীতি, সমাজ ও আধুনিক ব্যবসায়িক মনোভাবের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে।
এ সিনেমায়ও সুপারম্যান কাজ করে পত্রিকায়। ডেইলি প্ল্যানেটের আরেক সাংবাদিক লুইস লেনের সঙ্গে প্রেমও আছে তার। লুইস জানেন ক্লার্ক কেন্টই সুপারম্যান এবং একটা সময় সুপারম্যান হিসেবেই সে লুইসকে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়। কেন্টের অ্যাপার্টমেন্টে লুইস ও সুপারম্যানের কথোপকথনটি আলাদাভাবে লক্ষ করার মতো। দীর্ঘ এ কথোপকথনের মধ্যে আছে রাজনীতি, ব্যবসা ও সমাজ বাস্তবতা। লুইস নানাভাবে সুপারম্যানকে জেরা করে তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও চলমান সমাজের নানা বিষয় নিয়ে। সুপারম্যান তার যথাসাধ্য উত্তর দেন ও নিজের যুক্তি তুলে ধরতে থাকেন।
সিনেমা ও কমিকের অন্যতম চরিত্র লেক্স লুথর। সে সুপারম্যানকে নিজের শত্রু মনে করে। গানের সিনেমায় আমরা দেখি লেক্স তার হেডকোয়ার্টার থেকে তার মেটাহিউম্যানদের চালিত করে। বড় একটি টিম নিয়ে মেটাহিউম্যানদের অপারেট করে ও সে হেডকোয়ার্টার থেকে সুপারম্যানের মুভ বলে দেয় এবং সে অনুসারে মেটাহিউম্যানরা সুপারম্যানকে আক্রমণ করে। লেক্সের টিমের একজনের প্রশ্নের উত্তরেই আমরা জানতে পারি দীর্ঘ সময় সুপারম্যানকে স্টাডি করে লেক্স তার মুভমেন্ট, আক্রমণের ধরন, প্রতিরক্ষা সবই জানেন। এ লেক্স লুথর একজন ব্যবসায়ী এবং সুপারম্যানকে সে নানাভাবে হেয় ও খলচরিত্র প্রমাণ করে বিভিন্ন দেশের কাছে নিজেকে তুলে ধরতে চায়। প্রমাণ করতে চায় মানবজাতির জন্য সুপারম্যান ক্ষতিকর এবং সুপারম্যানের হাত থেকে বাঁচার জন্য লেক্সের সহায়তা নিতে হবে। তিনি চাইলে অস্ত্র ও মেটাহিউম্যান দিয়ে সুপারম্যানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করবেন।
সত্যি বলতে এখন সবার জানা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দেশের ব্যবসায়ীরা নানাভাবে অপরাধী তৈরি করে এবং সেসব অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নিজের দেশ ও প্রতিষ্ঠান থেকে অস্ত্র এবং লোকবল সরবরাহ করে। এটাই তাদের ব্যবসা। এক লেক্সের মধ্য দিয়ে সে বিষয়টিই বুঝিয়ে দিলেন জেমস গান। পাশাপাশি সিনেমায় সায়েন্স ফিকশনেরও স্পর্শ আছে। যেমন লেক্স একটি পকেট ইউনিভার্স তৈরি করেছেন। সেখানে যেন আরেকটি রাজ্য। লেক্স যাদের নিজের জন্য হুমকি মনে করেন বা যাদের দিয়ে তার কোনো কাজ উদ্ধার করাতে হবে তাদের আটক করে রাখেন এ পকেট ইউনিভার্সে এক একটা কুঠুরিতে। এমন বন্দিশালার কথা তো আমরা হরহামেশাই দেখি খবরে।
এ সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করেন সুপারম্যান। তার সাহায্যে থাকে জাস্টিস গ্যাং—গ্রিন ল্যান্টার্ন, মিন্টার টেরিফিক ও হকগার্ল। তবে সুপারম্যানের বাবা-মায়ের বার্তাকে ভুলভাবে জনতার সামনে উপস্থাপনের পর তারা সুপারম্যানকে সাহায্য করতে নারাজ হলেও পরে লুইস মিস্টার টেরিফিককে রাজি করান সুপারম্যানকে উদ্ধারের জন্য। পকেট ইউনিভার্স থেকে তিনিই উদ্ধার করেন সুপারম্যানকে। পাশাপাশি ছিল ক্রিপ্টোও।
সিনেমায় সুপারম্যান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডেভিড কোরেন্সওয়েট। হেনরি ক্যাভিলের পর অন্য কাউকে সুপারম্যান হিসেবে মানতে পারছিলেন না অনেক দর্শক। সত্যি বলতে সুপারম্যানের যে লৌহকঠিন ইমেজ দর্শক ও ভক্তরা দেখে এসেছেন ডেভিড তেমনটা নন। আর গান তার সুপারম্যানকে সেভাবে উপস্থাপন করতে চাননি। তিনি যে সুপারম্যানকে দেখাতে চেয়েছেন—কিছুটা আবেগী, চিন্তাশীল, শক্তিশালী কিন্তু নরম—ডেভিড তেমনই ছিলেন। কিন্তু ডেভিড ও র্যাচেলের রসায়নটা তেমন জমে ওঠেনি। এমনকি র্যাচেল ভালো অভিনয় করেও অনেকটা বলিউডের নায়কপ্রধান সিনেমার নায়িকার মতোই নিষ্প্রভ ছিলেন। লেক্স লুথর চরিত্রে নিকোলাস হল্ট ভালো, তবে জেসি আইসেনবার্গকে অনেকেই মিস করবেন।
জেমস গান অনেকগুলো বিষয় এ সুপারম্যানে চিহ্নিত করা বা সেসবের প্রতি আঙুল তোলার চেষ্টা করেছেন। যারা সুপারম্যানের গল্পের বাইরে রাজনীতি, সমাজ ও ব্যবসা নিয়ে কিছু দেখতে চান সুপারহিরো সিনেমায়, তাদের ভালো লাগবে জেমস গানের সুপারম্যান। অনেক বিষয় আনার কারণে সব সিঙ্ক্রোনাইজ করেনি এ কথা সত্যি, তবে এ সুপারম্যানের কাছে মেটাহিউম্যানকে পরাজিত করার পাশাপাশি বাচ্চা মেয়টাকে বাঁচানো জরুরি। তিনি একটা কাঠবিড়ালিকেও বাঁচান আর ছোট মেয়েটাকে বাঁচানোর পর সময় নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আর উই ওকে?’ আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা কাছের মানুষকেও এ প্রশ্ন করতে ভুলে যাই। গান হয়তো সেটাও স্মরণ করতে চাইলেন।









