স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম জি ফাইভে তাজের দুটো সিজন স্ট্রিম হয়েছে এ পর্যন্ত। গল্পটা বাদশাহ আকবরের সময়ের। প্রথম সিজনে সেলিম-আনারকলির গল্প দিয়ে এর শুরু। সিরিজে আকবরের চরিত্রে নাসিরউদ্দিন শাহ, আনারকলি চরিত্রে অদিতি রাও হায়দারী, শেখ সেলিম চিশতীর চরিত্রে ধর্মেন্দ্র অভিনয় করেছেন। এর বাইরে পরিচিত মুখ খুব বেশি নেই। সিরিজের প্রথম সিজন এসেছিল এ বছরের মার্চে। দ্বিতীয় সিজন জুনে। দুই সিজনে এপিসোড মোট ১৮টি। আর দুই সিজনজুড়েই দেখানো হয়েছে সিংহাসন ও মুকুট দখলের লড়াই।
মূলত পৃথিবীর ইতিহাসের অনেক ইতিহাসই সিংহাসন দখলের ইতিহাস। ভ্রাতৃযুদ্ধ থেকে শুরু করে পরিবারের মধ্যে তৈরি হয় নানা সংকট। ফিকশনে এসবই থাকে লেখক ও নির্মাতাদের মূল আকর্ষণ। তাজের ক্ষেত্রেও সে রকমই হয়েছে। এখানে বাদশাহ্ আকবরের সময়কালে তার তিন সন্তানের মধ্যে ঘটা উত্তরাধিকারের লড়াই ও একটি প্রেমকাহিনী প্রধান হয়ে ওঠে। একদিকে ছিল তিন ভাইয়ের উত্তরাধিকারের লড়াই এবং অন্যদিকে ছিল সেলিম ও আনারকলির প্রেমকাহিনী। দুই সিজন এক এক করে এসব নিয়েই চলে।
প্রথমে ইতিহাস বাদ দিয়ে সিরিজ হিসেবে দেখা যাক তাজকে। নাসিরউদ্দিন শাহর মতো একজন অভিনেতাকে নেয়া হয়েছে আকবরের চরিত্রে কিন্তু তিনি আকবর হতে পারেননি। সে চেষ্টা নির্মাতারা করেছেন বলেও মনে হয় না। বিশেষত আকবরের শারীরিক গড়ন সম্পর্কে ইতিহাস যা বলে, তার সঙ্গে নাসিরউদ্দিন শাহর মিল নেই। যে সময় থেকে গল্প শুরু হয় সে সময় আকবরের বয়স ৪০ বছর পার হয়নি, কিন্তু সিরিজের আকবর অশক্ত। পাশাপাশি অন্যান্য চরিত্রের অভিনেতাদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার।
সেট ডিজাইনের ক্ষেত্রে এ সিরিজ ভালো কাজ করেছে। মোগল মহল, বাদশাহী হারেম, তখতসহ অন্যান্য বিষয় বেশ সুন্দর উপস্থাপন করেছে। পোশাকের নকশা প্রায় নিখুঁত, তবে সেখানেও কিছুটা ‘গেম অব থ্রোনস’ হওয়ার ইচ্ছা দেখা গেছে। বিশেষত সেলিমের উপস্থাপনায় তা স্পষ্ট। অন্যদিকে এ সিরিজ যুদ্ধের তেমন কোনো দৃশ্য দেখায় না। আকবরের চিতোর জয়ে যুদ্ধের বিস্তারিত দৃশ্যায়ন নেই। বাজেট বাঁচানোর চেষ্টা স্পষ্ট। প্রথম সিজনে পুরো মনোযোগ ছিল সেলিম-আনারকলি-আকবরের গল্পে। এ গল্পে সেলিমকে মজনুর মতো প্রেমিক দেখানো হয়েছে এবং আকবর একজন ‘ইনসিকিউরড প্রেমিক’। ইতিহাস এ ঘটনাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করেছে। তাজ একটি নতুন ধরন আনতেই পারে, কিন্তু সিরিজে যে সময়কাল, ঘটনার ধারাবাহিকতা ও পার্শ্বচরিত্রদের ভূমিকা দেখানো হয়েছে তা ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ বয়নের সঙ্গে মেলে না।
তাজের সিনেমাটোগ্রাফি ভালো হলেও চিত্রনাট্য ও স্টোরিটেলিং ততটা ভালো হয়নি। সিরিজ দেখলে মনে হবে ইউরোপীয়দের চোখে মোগল ইতিহাস দেখছি। সেটা হওয়ার বহু কারণও আছে। অভিমন্যু সিংয়ের প্রযোজনায় এ সিরিজ পরিচালনা করেছেন রন স্ক্যালপেলো (১০ এপিসোড) ও বিভু পুরী (৮ এপিসোড)। গল্প লিখেছেন অভিমন্যু সিং, অজয় সিং, উইলিয়াম বোর্থউইক, সিমন ফ্যান্টুজো ও আনন্দ নীলকণ্ঠন। তারা সবাই দূর থেকে দেখেই অভ্যস্ত। আনন্দ নীলকণ্ঠন ভালো লেখক, তবে তিনি এক্ষেত্রে চিত্রনাট্যকার হিসেবে দর্শক টানার দিকেই মন দিয়েছেন বলে সিরিজ দেখার পর মনে হবে।
মোগলদের সবসময়ই নারীলোভী ও বিলাসী হিসেবে উপস্থাপন করার উদাহরণ ফিকশনে আগেও দেখা গেছে। তাজ সেখানে আরেকটি সংযোজন। সিরিজে একের পর এক ষড়যন্ত্র দেখানো হয়েছে। বাদশাহী হারেম দেখিয়ে বোঝানো হয়েছে সেখানে দিন-রাত চলত নানা রাজনীতি। তা চলত সত্য, কিন্তু বাদায়ূনী, বীরবল ও আবুল ফজলকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা পুরোপুরি ভুল। বীরবলকে এখানে দেখানো হয়েছে একজন আদর্শবাদী হিসেবে। আবুল ফজল দুমুখো সাপ এবং বাদায়ূনী একজন অযোগ্য ক্ষমতালোভী। বাস্তবে পঙ্কজ সারস্বতের আবুল ফজল ইতিহাসের আবুল ফজলের সঙ্গে মেলেন না। সিরিজে দেখানো হয় বীরবল অভিমান করে আকবরের দরবার ত্যাগ করেন, কিন্তু বাস্তবে বীরবল মারা গিয়েছিলেন সোয়াতে যুদ্ধ করতে গিয়ে। বাস্তবে মান সিংহ খুসরোর সঙ্গে জোট করে তাকে সিংহাসনে বসানোর চেষ্টা করলেও সিরিজে তিনি একজন সৎ, আত্মাভিমানী রাজপুত।
আকবরের দরবারে পাদ্রিরা এসেছিলেন এবং এ সিরিজ অনুসারে পাদ্রি মনসারেটকে হত্যা করে মুরাদ। অথচ বাস্তবে তিনি সসম্মানে আকবরের দরবার থেকে বিদায় নেন। সিরিজে মুরাদকে হত্যা করে আবুল ফজল, কিন্তু বাস্তবে মুরাদ মারা যান অসুস্থতায়। তাজ মূলত আকবর ও জাহাঙ্গীরের সময়কার প্রতিটি চরিত্রকে অসৎ, ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। দ্বিতীয় সিজনের একটি সিকোয়েন্সে দেখানো হয়েছে, কাবুলের দরবারে আবুল ফজলকে কেটে টুকরো করা হয়। বাস্তবে সেলিমের কথাতেই আবুল ফজলের গুপ্তহত্যা হয়েছিল, কিন্তু সিরিজ লেখকদের জানা উচিত কোনো রাজদরবারেই এভাবে কেটে টুকরো করার রীতি নেই।
জাহাঙ্গীরের সিংহাসনে আরোহণকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে এ সিরিজ। মূলত তৈমুরি উত্তরাধিকার ও মোগল আমল সম্পর্কে মাঝারি মানের জ্ঞান থাকলেও এর চেয়ে ভালো সিরিজ লেখা সম্ভব। তাজের নির্মাতারা সেদিকে একদমই মনোযোগ দেননি। তারা সিংহাসন সম্পর্কিত লড়াইয়ে মন দিতে নিজেদের মতো গল্প তৈরি করেছেন। কিন্তু সে বলাটাও ভালো হয়নি। গল্প বলার যাচ্ছেতাই দশার বিপরীতে মীর্জা হাকিম চরিত্রে রাহুল বোস, বখত-উন-নিসা চরিত্রে শিবানী তানাকসলের অভিনয় ও সেলিম চিশতীর চরিত্রে ধর্মেন্দ্রর চোখ ছাড়া তেমন কিছুই মনে রাখার মতো নয়।









