তিন বছর হলো পাঠানের কোনো খোঁজ নেই- এভাবেই শুরু হয়েছিল সিনেমাটির টিজার। পাঠান তিন বছর ধরে নিখোঁজ, তবে শাহরুখকে থিয়েটারে পাওয়া যাচ্ছিল না প্রায় পাঁচ বছর। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া জিরোর পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আসে পাঠান। মাঝে দীর্ঘ বিরতি, তারপরই ধামাকা। পাঠানের পর একই বছর আসে জওয়ান ও ডাঙ্কি। তিন সিনেমাই হিট। এরপর শাহরুখের সিনেমা আসেনি এখন অবধি। কিন্তু তাকে নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। ৬০তম জন্মদিনে প্রকাশ করলেন নতুন সিনেমা কিংয়ের টাইটেল।

আবারো অ্যাকশন অবতারে কিং খান। মারপিট করছেন, সোয়্যাগ দেখাচ্ছেন। রোমান্টিক অবতার থেকে একেবারেই চলে গেছেন অ্যাকশনে। তবে তাকে সেখানেই যেন পছন্দ করছেন দর্শক। অ্যাকশনধর্মী পাঠান ও জওয়ানের পর ডাঙ্কিতে ইমোশনাল গল্প দিয়েছিলেন শাহরুখ। এরপর দুই বছরের বিরতি। এবার ফিরছেন অ্যাকশন নিয়ে। শাহরুখ যেন যাই করেন বা যাই করবেন তা-ই ট্রেন্ডি। মেট গালায় তার স্টাইলও ছিল টক অব দ্য মিডিয়া।

২০১০ থেকে ২০১৮ সাল অবধি নানা ধরনের সিনেমা দিয়েছেন শাহরুখ। কিন্তু সেভাবে সাফল্যের দেখা পাননি। জিরোর পর বিরতি নিয়েছিলেন পাঁচ বছর। এর মধ্যে একাধিক সিনেমায় ক্যামিও করেছেন, হয়েছেন প্রশংসিতও। কিন্তু সেই পুরনো শাহরুখ যেন সেখানে নেই। লাভার বয় কিংবা ডন— বলিউডে পাওয়া যাচ্ছিল না শাহরুখকে। তবে শাহরুখ তো শাহরুখই, রীতিমতো একটা ব্র্যান্ড। তাই জওয়ান বা পাঠানের পোস্টার, টিজার এমনকি লুক আসতে না আসতে শুরু হয়েছিল তোলপাড়।

‘শাহরুখের ক্যারিয়ার শেষ’—জিরোর মুক্তির পর এমন আলোচনায় সয়লাব হয়েছিল ভারতীয় মিডিয়া। কেননা শাহরুখের ক্যালিবার বিবেচনায় গত এক যুগে তার অভিনীত সিনেমাগুলো না হয়েছে ‘ভালো’, না ছিল ‘ব্যবসাসফল’। পুরো ভারত যখন দক্ষিণী সিনেমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, রীতিমতো বলিউডের সৎকার করে ফেলছে, সে সময় শাহরুখ ফিরেছিলেন অ্যাকশন সিনেমা নিয়ে। তবে কোনো রিমেক না, বরং মৌলিক সিনেমা। একটা যশরাজের সঙ্গে, একটা অ্যাটলির সঙ্গে, আরেকটা করলেন রাজকুমার হিরানীর সঙ্গে।

153089086

‘কিং’য়ে শাহরুখের লুক। ছবি: জুম টিভি

শাহরুখ শুরু করেছিলেন শূণ্য থেকে। হয়ে উঠলেন সেরার সেরা। তারপর পতন, আবার ফিনিক্সের মতো জেগে ওঠা। এটা শাহরুখের স্টারডম নয়, তার প্রতি দর্শকের আশাবাদ। কেননা তিন দশকের ক্যারিয়ারে শাহরুখ খান বলিউড ও ভারতীয় সিনেমাকে যা দিয়েছেন, এমনকি বহির্বিশ্বে ভারতীয় সিনেমাকে যেভাবে প্রমোট করেছেন, তা বলিউড বা ভারতের অন্য কোনো সিনেমা তারকার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ভক্তদের কাছে তার আবেদন তো অন্য মাত্রার।

বলিউডে ২০০৭ অবধি ছিল কমেডির যুগ। এরপর আসে রিমেক যুগ। কিন্তু শাহরুখ খান সে পথে হাঁটেননি। করেছেন নতুন নতুন নিরীক্ষা। রা. ওয়ানের মতো সুপারহিরো সিনেমা এনেছেন। ডন-টু সে হিসেবে খারাপ সিনেমা না। ব্যবসাও তুলনামূলক কম করেনি। রইসের প্রতি দর্শকদের এক ধরনের আগ্রহ ছিল। সিনেমা হিসেবে ডিয়ার জিন্দেগী সময়োপযোগী। এর মধ্যেই শাহরুখ করেছিলেন ফ্যানের মতো নীরিক্ষাধর্মী সিনেমা, যা ওটিটি-যুগের আগে এবং ওটিটি-যুগেও পড়তি ক্যারিয়ার বাদে কোনো স্টার ধরার সাহস করতেন না। প্রশংসা পেলেও অবশ্য বক্স অফিসে সিনেমাটি খুব ভালো করেনি। বাকি থাকে হ্যরি মেট সেজাল বা দিলওয়ালের মতো সিনেমা। এগুলো শাহরুখ কেন করলেন তা অবশ্য অনেকেরই প্রশ্ন। বিগত দিনগুলোয় তার স্ক্রিপ্ট বাছাই ভুল ছিল বলে এক বাক্যে মন্তব্য করে থাকেন সবাই। কিন্তু শাহরুখ নতুন কী করবেন?

unnamed

রা. ওয়ানে ‘জি ওয়ান’ চরিত্রে শাহরুখ খান

করার মতো হয়ত অনেক কিছিুই ছিল। কিন্তু শাহরুখ খান মূলত সময় থেকে এগিয়ে। অনেক কিছু তিনি অনেক আগেই করে ফেলেছেন। ২০১১ সালে তার করা রা. ওয়ান বক্স অফিস বা দর্শকের কাছে পাত্তা পায়নি। ২০২২ সালে এসে বিগ বাজেট সিনেমা আদিপুরুষের ভিএফএক্স দেখে দর্শকরা বলছেন রা. ওয়ান থেকে তাদের শেখা উচিত ছিল। বলিউডে যখন দক্ষিণী সিনেমার রিমেক চলছে, শাহরুখ তখন দক্ষিণ ভারতের যুক্ত গল্পে নির্মিত চেন্নাই এক্সপ্রেসে অভিনয় করেছিলেন। ফ্যানের মতো সিনেমা করেছেন তিনি। একজন সুপারস্টারের জন্য এরকম 'আউট অব দ্য বক্স' সিনেমায় (ফ্যানডম নিয়ে নির্মিত) অভিনয় করাতে 'রিস্ক' থাকে। কিন্তু রিস্ক কবে নেননি শাহরুখ? নব্বইয়ের দশকে তিনি যখন লাভার বয় হিসেবে স্বীকৃত, সে সময় তিনি ডর কিংবা আনজামের মতো সিনেমায় খল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সুপারস্টার হয়েছেন বহু আগে, তারপরও ক্যামিওতে তাকে দেখা গেছে বারবার।

সিনেমাকে বর্তমানে ব্যবসার মানদণ্ডে মাপা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গল্প বা স্ক্রিপ্টের আলোচনা আনেন অনেকে। কিন্তু আদতে হলিউড বা বলিউডে আয়টাই মূল। সেদিক থেকে হিসাব করলে বহু ব্যবসাসফল সিনেমা আছে শাহরুখের। আর পাঠান থেকে সেই ধারায় নতুন করে হাঁটলেন তিনি। স্পাই ইউনিভার্সকে এগিয়ে নিলেন। জওয়ান সিনেমা দিয়ে দেখালেন একাই একটা ইন্ডাস্ট্রির মোড় ঘোরানো যায়। নব্বইয়ের পর আবারো বাদশাহর মতো করেই ফিরলেন তিনি। এ সবকিছুর সঙ্গে আছে তার অভিনয়গুণ। আর এর স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর ভারত সরকার তাকে দিল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

Shah_Rukh_Khan_Best_Actor_for_Jawan

ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার গ্রহণ করছেন শাহরুখ। ছবি: দি ইকোনমিক টাইমস

অবশ্য বলিউডে নিজের শতভাগ গুণ তিনি দেখাতে পেরেছেন এমন নয়, কিন্তু যা দিয়েছেন তাও কম নয়। বেশ কয়েকটা প্রজন্মকে রোমান্স শিখিয়েছেন, অ্যাকশনেও কম যাননি। ভেবেছেন ভিন্ন ধারায়। এমনকি তৈরি করেছেন অভিনেতা, পরিচালক। মন্দিরা বেদী থেকে দীপিকা পাড়ুকোন, আনুশকা শর্মা; আজকের জিশান আউয়ুব, জয়দীপ আহেলওয়াতরা শাহরুখের প্রশংসা করেন এবং তারাই বলেন, আরো বহুদিন শাহরুখ খান বাদশার মতোই রাজত্ব করবেন।

এ কারণেই দুই বছর সিনেমা মুক্তি না পেলেও শাহরুখ থাকেন আলোচনায়। অ্যাওয়ার্ড শো হোস্ট করেন। মেট গালায় গিয়ে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ছেলেকে নিয়ে আসেন পরিচালনায়।

বিশ্বের অন্যতম ধনী অভিনেতা তিনি। সিনেমার পাশাপাশি প্রযোজনা আর অন্য ব্যবসায়ও শাহরুখ খানই বাদশাহ। এক সময় সিনিয়ন অভিনেতাদের সঙ্গে তার তুলনা হয়েছে। তাদের মধ্যে জ্বলজ্বল করেছেন, সম্মানও করেছেন তাদের। সে কারণেই এখন তরুণদের মধ্যেও তার চর্চা চলে। তাদের কাছ থেকেও সম্মান পান বলিউডের কিং।