ফিওদর দস্তয়েভস্কির শেষ সময়টা ছিল যন্ত্রণার ও আবেগের।

তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছ? তিনি জিজ্ঞেস করবেন।

তবুও নীরবতা।

ফিওদর বললেন, আমি আজ মারা যাচ্ছি।

আনা গ্রিগোরিয়েভনা দস্তয়েভ্স্কা সেই সময়টার কথা মনে করলেন। বললেন, তারপর আমি আর কান্না ধরে রাখতে পারলাম না।

২৬ জানুয়ারি ১৮৮১ গলা দিয়ে বেশ কয়েকবার রক্তক্ষরণের পর তিনি অজ্ঞানও হয়ে গিয়েছিলেন। জ্ঞান ফেরার পর আনাকে বললেন যেন ধর্মযাজককে ডেকে আনেন। সেদিন তার মৃত্যু হয়নি। ৯ ফেব্রুয়ারি ১৮৮১ যখন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিকপাল ফিওদর দস্তয়েভস্কি মারা গেলেন, তার বয়স ৬০ বছর আর আনার ৩৪।

শোকের তোড় যখন কমে আসে এই যুবতী স্ত্রীকে বলা হলো, মানুষটার জন্য তো জীবন দিয়ে দিলে, আর কত। এবার দেখেশুনে একটা বিয়ে করে নাও। আনা বললেন, একটু ঠাট্টা করেই, দস্তয়েভস্কির পর বিয়ে করার মতো পাত্র আর কে আছেন? সম্ভবত একমাত্র তলস্তয়।

আনা আর বিয়ে করেননি। দস্তয়েভস্কির মৃত্যুর পর আরো ৩৭ বছর তিনি প্রয়াত মানুষটির স্মৃতি নিয়েই বেঁচে ছিলেন।

লেখাটি ভ্যালেরিয়া মিখাইলোভার ‘টু বি দ্য ওয়াইফ অব দস্তয়েভস্কি’ (টমাস হারমান অনূদিত) অনুসরণে লিখিত। কিছু তথ্য অন্য সূত্র থেকেও নেয়া হয়েছে।

ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভস্কির জীবন হাজার দুর্যোগের মধ্য দিয়ে কাটলেও খ্যাতি তাকে ছেড়ে যায়নি। বয়স তখন ৪৪ বছর এবং তিনি অন্য লেখকদের চেয়ে বেশিই খ্যাতিমান। আনা স্নিতকিনা কেবল স্টেনোগ্রাফির কোর্সটি শেষ করেছেন। বাস্তব কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। কোর্সের পরিচালক পাভেল গুলখিন তাকে ফিওদর দস্তয়েভস্কির কাছে পাঠালেন, তিনি জানেন, তার কাজে সাহায্য করতে পারেন এমন একজন কাউকে ফিওদর খুঁজছেন। আর টিকে থাকতে হলে আনারও কাজ দরকার।

আনা যখন এই বিখ্যাত মানুষটির দরজায় টোকা দিলেন, তিনি বাস্তবিকই বোকাসোকা ধরনের সাধারণ নারী। ফিওদর তাকে দিয়ে কাজের একটি ছোট্ট ট্রায়ালও দিলেন এবং প্রথম সংক্ষিপ্ত বৈঠকের পর বললেন, ভালোই হলো যে তুমি পুরুষ নও।

কেন? প্রশ্নটি জিজ্ঞেস না করে পারলেন না আনা।

কারণ পুরুষ হলে তো অবশ্যই মদটদ খেতো। তুমি সম্ভবত মদ খাওয়া শুরু করোনি।

প্রথম দেখাটা দুজনের কারো জন্যই খুব আনন্দদায়ক কিছু নয়। তবে আনার ভালো লাগতেই হবে, তার চাকরি দরকার। ভালো দিক হচ্ছে, প্রফেসর গুলখিন তাকে যার কাছে পাঠিয়েছেন তিনি বিখ্যাত মানুষ, আনাদের বাড়িতেও লেখক হিসেবে তার কদর আছে। তার জন্য আরো ভালো দিকটি হচ্ছে যে ফিওদর মিখাইলোভিচ প্রথম দিনই তাকে প্রত্যাখ্যান করেননি। তার ভয় ছিল যদি তিনি তাকে তার উপন্যাসের নায়কদের নামধাম জিজ্ঞেস করেন হয়তো ভয়েই বলতে পারবেন না।

রাতে ভালো ঘুম হয়নি। পৌঁছতে এক মিনিটও যাতে বিলম্ব না হয়, এদিকে তিনি সতর্ক। যে মানুষটির সঙ্গে তার দেখা হচ্ছে এমন কোনো সুদর্শন বীরপুরুষ নন, তার ওপর অসুস্থ, বিষণ্ন অনেকটা পরিত্যক্ত মানুষ—এমনকি তিনি তার নামও মনে রাখতে পারেননি। তার ওপর দিয়ে বহু ঝড়ঝাপটা গেছে। জেল খেটেছেন, শ্রমশিবিরে দাসত্ব করেছেন, নির্বাসিত ছিলেন, বিয়ে করেছিলেন, বিয়েটা সুখের হয়নি, স্ত্রী মারা গেছেন। তার আগের স্বামীর ঔরসে জন্ম নেয়া একটা ছেলে বোঝার মতো পড়ে আছে, ক’দিন আগে তিনি প্রিয় ভাইটিকে হারিয়েছেন, ভীষণ ঋণগ্রস্ত, ভাইবোনদের অনেককেই টাকাপয়সা দিয়ে চালাতে হয়, তার ওপর শরীরে যন্ত্রণা, ফিটের ব্যামো-মৃগীরোগগ্রস্ত। খারাপের তালিকা শেষ হয়নি, জীবনের যা কিছু মন্দ সব তার বেলায় ঘটে, ভালো কিছুর দেখা পান না। এত কিছুর পর আরো খারাপ হচ্ছে তার জুয়ার দুর্নিবার নেশা—এখান থেকে তাকে টেনে তোলার উপায় কারো জানা নেই।

তিনি আনাকে ডিকটেশন দিচ্ছেন, কিন্তু তা এত দ্রুত যে অনেক কিছুই বাদ পড়ে যাচ্ছে! কিন্তু ফিওদর তাতে যে ক্ষুণ্ন হচ্ছেন এমন নয়। বরং কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজের জীবনের কিছু কাহিনী তাকে শোনাচ্ছেন, যা পরে ‘ইডিয়ট’ নামের উপন্যাসে উঠে এসেছে। বললেন, তার বয়স যখন ২৮ বছর, মিখাইল বুতাশেভিচ পেত্রাসভস্কির রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রাখার অপরাধে তাকে গুলি করে হত্যা করার হুকুম দেয়া হয় এবং এমনকি সেন্ট পিটার্সবার্গে সেমিউনভস্কি প্যারেড গ্রাউন্ড হত্যাযঞ্চে তাকে আনাও হয়।

ফিওদর তাকে বললেন, আমার মনে আছে কেমন করে আমার সহ-অপরাধী সঙ্গীদের সঙ্গে সেমিউনভস্কি প্যারেড গ্রাউন্ডের সেই বিশেষ জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে তাদের প্রস্তুতি লক্ষ করছিলাম। আমি জেনে গেছি আর মাত্র ৫ মিনিট। সেই প্রতিটি মিনিট বছর কিংবা দশকের মতো দীর্ঘ। কিন্তু আমি তখন বুঝতে পারছি, আমার বেঁচে থাকার বাসনা জেগে উঠেছে। ততক্ষণে আমাদের মৃত্যু পোশাক—ডেথ শার্টস হস্তান্তর করা হয়ে গেছে। আমাদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছে। গুলিতে নিহত হওয়ার কাজে আমি তিন নম্বর দলের ১৮তম ব্যক্তি। প্রথম তিনজনকে ‘এক্সিকিউশন পিলার’-এর সঙ্গে বাঁধা হলো। পরবর্তী ২-৩ মিনিটের মধ্যেই প্রথম দুই দলের সবার মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যাবে। তারপর আমাদের পালা! কিন্তু আমি বুঝতে পারি—আমি তীব্রভাবে বাঁচতে চাই। ওহ্ গড! জীবন কত মূল্যবান—বেঁচে থাকলে আমি কত ভালো কিছু করতে পারব। আমার পেছনের পুরো জীবনটার কথা মনে হলো—আমি কতভাবে এর অপচয় করেছি—অথচ আমি এখন জানি, আমি আরো অনেকদিন বেঁচে থাকতে চাই, আরো ভালো কিছু করতে চাই। হঠাৎ এক সিগন্যাল শুনে আমি প্রাণ ফিরে পেলাম। সেই পিলার থেকে আমার কমরেডদের বাঁধন খুলে দেয়া হলো। তারপর আমাদের সবার জন্য নতুন একটি দণ্ড ঘোষণা করা হলো—চার বছরের জন্য শ্রমশিবির।

‘এর চেয়ে বড় আনন্দের মুহূর্তের কথা আমি স্মরণ করতে পারছি না। পিটার পল দুর্গে আলেভক্সি ক্রিসেন্ট কারাগারের প্রিজন সেলে আমি কেবল ঘুরপাক খেয়েছি, আনন্দে গান গেয়ে উঠেছি, সজোর চিত্কারে সুর ধরেছি—আমাকে জীবন ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে—আমি দারুণ খুশি।’

***

আনা স্নিতকিনা ডিকটেশন নিতে শুরু করলেন, দ্রুত সব কাজ শেষ করতে হবে, হাতে সময় মাত্র ২৬ দিন। প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করে জমা দিতে হবে, নতুবা টাকা তো পাবেনই না, চুক্তি ভঙ্গের জরিমানাও দিতে হবে। আনা জানেন ফিওদরের সঙ্গে প্রকাশকের চুক্তির শর্ত। প্রথমে ফিওদর নিজেও ধরে নিয়েছিলেন এটা অবিশ্বাস্য কাজ, হবে না। কিন্তু দুজনই দিন-রাত কাজ করার পর ২৬ দিনের মধ্যেই ১৮৬৬ সালে ৩০ অক্টোবর যে পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত হলো তার নাম ‘গ্যাম্বলার’—ফিওদরের জীবনের আরেকটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। উপন্যাসে অনেকটাই তার নিজের কাহিনী। খুব বড় একটা পাথর নেমে যাওয়ার পর ঠিক করলেন ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ আবার শুরু করবেন। আনা গ্রিগোরিয়েভনা হঠাৎ আবিষ্কার করলেন তার এতদিনের লালিত কল্পলোক থেকে সবকিছু অপসৃত হয়েছে। যা কিছু অবশিষ্ট আছে তার সবটাই ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভস্কি। কিন্তু কেমন করে ব্যাপারটা ঘটল?

নিজের স্মৃতিকথায় কাহিনীটি আনা লিখে রেখে গেছেন। ফিওদর একটি নতুন উপন্যাসে হাত দিতে চাচ্ছেন। সেজন্য তিনি নারী মনস্তত্ত্ব কিছুটা বুঝতে চান। এর জন্য বড় ধরনের কোনো পড়াশোনার দরকার নেই। আমাকে জিজ্ঞেস করলেই তো সহজ উত্তর পাওয়া যাবে। তার সম্ভাব্য উপন্যাসের নায়ক একজন বৃদ্ধ চিত্রশিল্পী। তিনি কম বয়সী একটি মেয়েকে প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন মেয়েটি তা কেমনভাবে গ্রহণ করেবে? আনা বললেন, এটা সম্ভব মেয়েটি রাজি হয়ে যাবে। ফিওদর বললেন, তোমাকে চরিত্রটির জায়গায় স্থাপন করো আর আমাকে বৃদ্ধ চিত্রশিল্পীর জায়গায়। আর মনে করো আমি তোমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিচ্ছি। এখন তোমার জবাব কী হবে? আনা শুনলেন এবং বললেন, তখন আমি বলতাম আমি আপনাকে ভালোবাসি এবং চিরদিন আমি আপনাকে ভারোবেসে যাব।

১৮৬৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ফিওদর মিখাইলোভিচ ও আনা স্নিতকিনার বিয়ে হলো। আনার বয়স ২০, ফিওদরের ২৫; ২৫ বছরের ব্যবধান। তারপর বহুবার ফিওদর বলেছেন, ঈশ্বর আমাকে একটি উপহার দিয়েছেন—তার নাম আনা।

আনা এবার স্ত্রী হিসেবে ফিওদরের বাড়িতে ঢুকলেন। ফিওদর বড় মাপের লেখক, ফিওদর তার জীবনের স্বপ্নের নায়ক। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে দুস্তর ফারাক—স্বর্গ থেকে জঞ্জালে ভরা মাটির বৃথিবীতে টেনে এনেছে।

শুরুতে বিয়েটা ফিওদরের জন্য অপরিসীম সুখের একটা ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। এমন সুখ তিনি আগে কখনো পাননি। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি শুধু বলেননি, লিখেছনেও তুমিই একমাত্র নারী যে আমাকে বুঝেছে। দুজনের বয়সের সিকি শতাব্দীর ব্যবধান তিনি মনে রেখেই বলেছেন তাদের সম্পর্কটি অনেক বেশি আত্মিক।

আনা তার স্মৃতিকথায় লিখলেন, জীবনে এই প্রথম আমি একজন বুদ্ধিমান ও ভালো মানুষকে দেখলাম, কিন্তু তিনি অসুখী এবং সবার কাছে পরিত্যক্ত। এ চ্যালেঞ্জটিই আনা নিয়েছেন। এমন একটা মানুষকে অসুখী ও পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকতে দেয়া যায় না।

প্রথম কন্যাসন্তান সোনিয়ার জন্ম হলো। কিন্তু মাত্র তিন মাস পর সাধারণ ঠাণ্ডায় মেয়েটির মৃত্যু হলে ফিওদর ভেঙে পড়লেন। এমন একটি কষ্টকর ঘটনার পরও আনা নিজের যন্ত্রণার কথা ভাবলেন না; তিনি ভাবলেন ফিওদরের যাতনার কথা। তিনি তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন: আমার বোবা স্বামীর জন্য আমি অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। ছোট্ট শিশুটির শীতল মরদেহ সামনে নিয়ে ফিওদর মেয়ে মানুষের মতো কাঁদতে শুরু করেছেন। তার কোমল হাতে একবার শিশুটির পাণ্ডুর মুখমণ্ডল ঢাকছেন আাার ছোট্ট হাত তুলে নিয়ে উষ্ণ চুম্বন দিচ্ছেন। এমন ভয়ংকর হতাশার ছবি জীবনে আর কোনোদিন দেখিনি।

এক বছর পর দ্বিতীয় কন্যা সুবভের জন্ম হলো। আনা ভেবেছিলেন সোনিয়াকে হারানোর এত বড় যন্ত্রণার পর ফিওদরের পক্ষে আর কোনো শিশুকে মেনে নেয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু দেখা গেল পিতৃত্বের অদম্য শক্তি তাকে আবার জাগিয়ে তুলেছে। তিনি নতুন শিশুটিকে একইভাবে ভালোবাসতে শুরু করলেন। একবার এক সমালোচককে ফিওদর চিঠি লিখে জানিয়েছেন, সন্তানের জন্ম মানুষকে পৃথিবীতে তাবৎ সুখের তিন-চুতার্থংশই দিয়ে দিতে পারে।

আনা জানিয়েছেন, সন্তানের সঙ্গে ফিওদরের সম্পর্ক অনবদ্য। তিনি তখন শিশুদের জগতে ঢুকে পড়তেন। তাদের বুঝতেন, কথা বলে তাদের মোহিত করে রাখতেন—আর সেসব মুহূর্তে তিনি নিজের বয়স ভুলে শিশু হয়ে যেতনে।

সোনিয়ার জন্ম রাশিয়ায়ই, কিন্তু লুবভের জার্মানির ড্রেসডেনে। আনা যে সুখ ও সান্নিধ্যের প্রত্যাশায় সিকি শতাব্দীর বেশি বয়সী ফিওদরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন (তার মতো একজন বিষাদগ্রস্ত একদা বিবাহিত বয়স্ক পুরুষকে বিয়ে করার জন্য ফিওদর আনাকে এতটুকুও চাপ দেননি)। কিন্তু সংসারে দুজনের নিবিড় সান্নিধ্য লাভের কোনো সুযোগ নেই। ফিওদরের প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আসা পুত্র পাভেল কোনোভাবেই আনাকে মেনে নিতে পারেনি। তাকে দেখলেই চিত্কার-চেঁচামেচি করতে শুরু করে এবং এমনকি শারীরিক আক্রমণও বাদ রাখেনি। এদিকে অভাবগ্রস্ত ভাইবোনেরা টাকার জন্য খাবলে ধরে। একসময় আনার মনে হয়েছে, নিজ থেকে সেধে কেন এই বয়স্ক বেছে নিয়েছেন। এমনকি তালাকের চিন্তাও মাথায় এসেছে। তারপর একদিন ফিওদর বললেন, চলো। আনার কাজ মান্য করা। তারা চলে এলেন জার্মানিতে। আনার মনে হলো নরক থেকে মুক্তি। এখানে টানা চারটি বছর পার করে তবে রাশিয়ায় ফিরলেন। লুবভের জন্ম জার্মানিতেই।

দস্তয়েভস্কি তার মধ্যে কী পেয়েছিলেন, আনা আন্তরিকভাবেই লিখেছেন যে একজীবন তার সঙ্গে সংসার করেও বুঝে উঠতে পারেননি, ‘বাস্তব সত্য হচ্ছে, আমি এমন কোনো সুন্দরী নই যে আমাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যাবে। আমার তেমন কোনো মেধা ছিল না। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। পড়াশোনা, জিমনেশিয়াম স্কুল পর্যায়ের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এতসব সীমাবদ্ধতার পরও ফিওদর কেন আমাকে নিয়ে এত মুগ্ধ ছিলেন আমার জানা নেই—তার মতো জ্ঞানী ও মেধাবী মানুষ কেন আমাকে পছন্দ করতেন।’

আনা একজন সাধারণ নারী নন, একজন বিশেষ কোনো ব্যক্তিত্ব—ঠিক এভাবেই রহস্যাবৃত কোনো কারণে ফিওদর দস্তয়েভস্কি এসে তার সামনে নিজেকে সমর্পণ করতেন। তাদের আরো দুটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। তিন বছরের মাথায় ধরা পড়ল আলিওশা বাবার মতো মৃগীরোগগ্রস্ত। ভীষণ ব্যস্ততায় কেটেছে তার সময়, শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলো টাইপ করা থেকে শুরু করে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা সবই তাকে করতে হয়েছে। মৃত্যুর আগের বছর ১৮৮০ সালে যখন ব্রাদার্স কারমাজভ প্রকাশিত হলো, ফিওদরের দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যে সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দের মুহূর্তে।

আনার বয়স তখন ৭০ পেরিয়ে গেছে। দস্তয়েভস্কির সঙ্গে সংসার মাত্র ১৪ বছরের। আনা লিখেছেন, ২০ বছর বয়সে আমি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ফিওদরের কাছে বিলিয়ে দিই। এখন আমি ৭০ ছাড়িয়ে এসেছি। এখনো চিন্তায় ও কাজে আমি সম্পূর্ণভাবে তারই।

দস্তয়েভস্কির মৃত্যুশয্যায় শিয়রের কাছে আনা যখন কাঁদছিলেন, তিনিই তাকে শান্ত করেছেন। দস্তয়েভস্কি বললেন, আমি তোমাকে আমার সমস্ত আবেগ দিয়ে ভালোবেসেছি। আমি কখনো তোমার প্রতি অবিশ্বস্ত হইনি—এমনকি কল্পনায়ও নয়। এমন কথার পর কি আর অশ্রু ধরে রাখা যায়?

দস্তয়েভস্কির যা কিছু ছিল সব নিয়ে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই লেখকের নামে গড়ে ওঠা জাদুঘরটির সৃষ্টি তারই হাতে। বড় লেখকের সঙ্গে শান্তিতে থাকার উপায় কী? সে রেসিপি আমাকে বলতে হয়েছে: অশান্তির কারণটা নিজের মধ্য খুঁজে বের করা, ক্ষমা করা আর নিজের অমসৃণ অংশগুলোকে ঘষেমেজে সমান করা।

দস্তয়েভস্কির মৃত্যুর পর সত্যিই তার তলস্তয়ের সঙ্গে দেখা হয। দাম্পত্য যাতনা তখন তলস্তয়েরও অসহনীয় হয়ে উঠছে। তিনি আনার উপস্থিতিতে বলেছেন: যদি তাদের দস্তয়েভস্কির স্ত্রীর মতো একজন করে স্ত্রী থাকত, রুশ লেখকদের অনেকেই ভালো থাকতেন।

আনা দস্তয়েভস্কির স্ত্রী হিসেবে নিজের ওজনটা পুরোপুরি পরিমাপ করতে পেরেছিলেন বলেই ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলেন, দস্তয়েভস্কির পর বিয়ে করার মতো একমাত্র তলস্তয়ই আছেন।

২২ জুন ১৯১৮ আনা দস্তয়েভস্কার মৃত্যু হলো।

 

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক