তিনি ছিলেন কারি শেফদের রাজা, একই সঙ্গে বহু ভোজনরসিকের হূদয় ভঙ্গকারীও বটে। অভিবাসন কেলেঙ্কারির ফলে তার রন্ধন শিল্পে ধস নামার আগ পর্যন্ত আমেরিকায় ভারতীয় রন্ধনশৈলীতে রঞ্জী স্মাইল ছিল অনবদ্য এক নাম।

১৮৯৯ সালে আমেরিকান রন্ধন শিল্পে তার অভ্যাগমনকে স্বাগত জানানো হয়েছিল নিউইয়র্ক লেটারের নজরকাড়া এক শিরোনামের মধ্য দিয়ে। চমত্কার সে শিরোনামটুকুর ভাষ্য ছিল অনেকটা এ রকম— ‘আমেরিকায় ভারতীয় কারির রাজা: রসনাবিলাসী নারীদের উপচে পড়া ভিড়’। কথাগুলো কিন্তু একটুও বাড়িয়ে বলা নয়, বরং ঠিক এ রকমভাবেই আমেরিকায় রন্ধন শিল্পে আগমন ঘটেছিল রঞ্জী স্মাইলের। আজ থেকে এক শতক আগে যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার গণমাধ্যমকে এতটা দখল করে নেয় নি, সেই সময়েও নিউইয়র্ক থেকে শুরু করে সাউথ ডাকোটা পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের সংবাদ পত্রিকা আর সামাজিক মাধ্যমগুলোয় তার সুস্বাদু, মুখরোচক রান্না নিয়ে বিশাল সাড়া পড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে নারীদের কাছে তার রান্না খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। স্মাইলও ব্যাপারটিকে ইতিবাচকভাবেই নিয়েছিলেন এবং সুযোগটি বেশ কায়দা করেই কাজে লাগিয়েছিলন। তিনিও ছোটখাটো একটা ঘোষণা দিয়ে বসলেন, ‘আমেরিকান নারীরা তাদের কল্পনাতীত সৌন্দযের্র অধিকারী হয়ে  উঠবেন, তারা যদি শুধু আমার রান্না করা খাবার খান। তারা হয়ে উঠবেন আরো সুন্দর, কমনীয় চোখের অধিকারিণী, তাদের দেহের গড়নও হবে আমাদের ভারতীয় রূপসী নারীদের মতোই।’

বেশক’টি প্রকাশনায় স্মাইলকে একাধিকবার ‘আমেরিকার প্রথম ভারতীয় শেফ’ বা ‘কারি শেফদের রাজা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রান্নার জাদুতে তিনি মন কেড়ে নিয়েছিলেন সব রসনাবিলাসীর। ভারতীয় স্বাদের ভুবনে স্মাইলের ব্যাতক্রমী কীর্তি সারা দুনিয়ায় সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়ে আছে।

পশ্চিমে ‘কারি’র আস্বাদন

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী সামাজিক প্রেক্ষাপটে ও দেশীয় সংস্কৃতিতে ইঙ্গ-ভারতীয় রন্ধনশৈলী নিয়ে বহুল আলোচনা ও প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। সাধারণ কারি থেকে শুরু করে প্রচুর পরিমাণ ঝাল ও মসলাসহ রান্না করা ঝোল বা কারিও বর্ণনাও এসব লেখায় স্থান পেয়েছিল। এ জন্য সকল তারিফ পাওয়ার দাবিদার শেখ দ্বীন মাহমেত, তিনিই প্রথম হিন্দুস্তানি কফি হাউজের মাধ্যমে বৃটেনে কারির যাত্রা শুরু করেছিলেন। হিন্দুস্থানী এ কফি হাউজই ছিল লন্ডনের প্রথম কোনো ভারতীয় মালিকানাধীন কারি হাউজ। ১৮১১ সালের দিকে ব্রিটিশ রাজমহলের খাদ্যতালিকায় ফিশ অ্যান্ড চিপসের পাশাপাশি মিশ্র ভারতীয় কারির চাহিদা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

প্রায় ওই একই সময়ে ভারতীয় কারির রেসিপিগুলো আমেরিকান রান্না শেখার বইগুলোতেও স্থান পেতে শুরু করল। এর মধ্যে সর্বাধিক বিক্রীত দুটি বই হলো এলিজা লেসলাইয়ের ডিরেকশন ফর কুকারি ইন ইটস ভ্যারিয়াস ব্রাঞ্চেস (১৮৪০) ও নিউ কুকারি বুক (১৮৫৭)। উল্লেখযোগ্য এমন আরো কয়েকটি বইয়ের মধ্যে রয়েছে অ্যান এলানের দ্য হাউজকিপার’স অ্যাসিস্ট্যান্স (১৮৪৫) ও ক্যাথরিন বিচারের ডোমেস্টিক রেসিপি বুক (১৮৪৬)। ১৮৮৭ সালের নভেম্বরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকাটি তার পাঠকদের জন্য থ্যাংকস গিভিং ডিনার শেষে রয়ে যাওয়া বাকি অংশটুকু দিয়ে টার্কি কারি প্রস্তুত করতে কারির রেসিপি প্রকাশ করে।

আমেরিকান বিপ্লবের আগে সেখানকার নব্য ঔপনিবেশিকরা ব্রিটেনের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে ভারতের দেশীয় পণ্য ও মসলা ক্রয় করত। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চা, এলাচ, দারচিনি, গোলমরিচ, হলুদ, জাফরান, রসুন, আদা প্রভৃতি। ১৮০৯ সালে বোস্টন ইন্ডিয়া জাহাজঘাটায় চীন ও ভারত থেকে পণ্য ক্রয় করতে প্রথম আমেরিকান জাহাজ ভিড়েছিল। ১৮১৩ সালের চার্টার আইনের ফলে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় পণ্যের ওপর তাদের একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার হারিয়ে ফেলে, তখন ভারত থেক সরাসরি পণ্য সংগ্রহের দ্বার আমেরিকার জন্য সহজেই উন্মুক্ত হয়ে ওঠে। কলিন টেইলর সেন তার ‘কারি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘১৮২০ থেকে ১৮৩০ সালের দিককার সময়ে বোস্টনের সরাইখানা আর খাবারের দোকানগুলোয় মুরগির মাংসের কারি, কচি গরুর মাংসের কারি আর গলদা চিংড়ির কারি— প্রভৃতিই ছিল খাদ্যতালিকায় সেখানকার লোকজনের প্রথম পছন্দ।’

ভারতীয় রন্ধন শিল্পের সব উপকরণের এত সহজলভ্যতা সত্ত্বেও রান্না পদ্ধতিতে খানিক পরিমার্জিত করে কারির স্বাদকে আরো মুখরোচক করে তোলার মতো বুদ্ধি বা বিচক্ষণতা ভিক্টোরিয়ান আমেরিকানদের নিজেদের মধ্যে ছিল না। ‘এইট ফ্লেভারস: দি আনটোল্ড স্টোরি অব আমেরিকান কুইজিন’ বইয়ের লেখক সারাহ লহম্যানের মতে, ১৮৮০ সালের আগ পর্যন্ত খোদ আমেরিকায় রন্ধন শিল্পে কারির ধারণা খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। মূলত সেখানকার ব্রিটিশ অভিবাসী অথবা ভারতে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসা আমেরিকান নাবিকদের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে আমেরিকাবাসীর কাছে কারি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরই ফলে কারির মূল উপাদেয় উপকরণগুলো দু-দুবার রান্না পদ্ধতি থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল। উনিশ শতকের শেষ দিকে নিউ জার্সি বা আটলান্টিক সিটিতে হাতের কাজ করা নকশি সিল্কের ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাঙালি অভিবাসীদের আগমন ঘটলেও সেখানকার আমেরিকান-ভারতীয় রান্না পদ্ধতিতে পরিমার্জিত নতুনত্ব আনার বিষয়টি সবার অগোচরেই রয়ে গিয়েছে।

আমেরিকার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গতানুগতিক খাবারের এ ধারায় যিনি প্রথম স্বাদের ভিন্নতা বা বিচিত্রতা নিয়ে এসেছিলেন, তিনি হলেন রঞ্জী স্মাইল। লন্ডনের সেভয় হোটেলে প্রথমেই তিনি খাদ্য সমালোচক নাথানিয়েল নিউম্যান ডেভিসের নজরে আসেন। ১৮৯৬ সালে স্মাইল সেখান থেকে ইউরোপের বৃহত্তম হোটেল সিসিলে চলে যান। এখান থেকেই ১৮৯৯ সালে রিচার্ড শেরি নামে একজন আমেরিকান রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী তাকে ও তার ইংরেজ স্ত্রীকে নিউইয়র্কে নিয়ে আসেন। এখানে নিউইয়র্কের ৪৪ নং স্ট্রিট, ৫ নং এভিনিউয়ে শহরের একটি বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় স্মাইলকে তিনি রান্নার দায়িত্ব দেন। শেরি মাত্র এক বছর আগে রেস্তোরাঁটি খুলেছিলেন। সিসিলে স্মাইলের রান্না করা সুস্বাদু কারি একবার চেখে দেখার পরই তিনি নিউইয়র্কের ভোজনরসিকদের ভিন্নমাত্রার বিদেশী নতুন স্বাদ উপহার দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত এ কারণেই শেরি স্মাইলকে তার স্ত্রীসমেত বগলদাবা করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিলেন।

এশিয়ার স্বাদ

চমত্কার শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখাবয়ব, নিখুঁত পরিপাটি বেশভূষা আর মাধুর্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর— এসব মিলিয়ে স্মাইল খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা অর্জন করে নেন। রান্নাঘরে আর রান্নায় তার কর্তৃত্ব ও কৃতিত্ব দুটোই ছিল সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য। এমনকি অন্যান্য শেফকে তার ভারতীয় রান্নার কাছে ঘেঁষতে দেয়া হতো না। সচরাচর তার খাদ্যতালিকায় থাকত কারি অব চিকেন মাদ্রাজ, মুস্কি সিন্ধ, মুরঘি রাইন, কালুহ শেরি, ইন্ডিয়ান ভাগি তপুর, বোম্বে হাঁস প্রভৃতি। আর এ ধরনের খাবারের মধ্য দিয়ে তিনি আমেরিকার ভোজনরসিকদের কাছে সমগ্র ভারতের আঞ্চলিক বা এক ধরনের উপমহাদেশীয় আমেজ নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। যদিও অবশ্য ফরাসি কিংবা আমেরিকান রন্ধনশৈলী থেকেই এগুলোর উত্পত্তি হয়েছে। খাবারে মূল আমেরিকান স্বাদ বজায় রাখা আর ঝোলের সংমিশ্রণে রান্নাকে পরিমার্জিত করে নতুনত্ব আনা— এ দুইয়ের মধ্যে তিনি সুন্দর সামঞ্জস্য তৈরি করেছিলেন। এমনকি আমেরিকানদের জাউ ভাত (মাড়সহ আঠালো সাদা ভাত) রান্নার পদ্ধতিতেও তিনি নতুনত্ব এনেছিলেন।

আমেরিকানদের এশীয় স্বাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে তিনি এশীয় অভিবাসীদেরও আমেরিকার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করেছিলেন। এক রকম মিশ্র অভিব্যক্তির ওপর ভিত্তি করে লহম্যান খুব সযত্নেই স্মাইলের পরবর্তী গল্পটুকু লিখেছেন।

১৯০১ সালে স্মাইল যখন লন্ডনে পদার্পণ করলেন, সংবাদ মাধ্যমগুলো তখন দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল যে, তিনি কি সেখানে শেরির জন্য ভারতীয় শেফ নিযুক্ত করতে এসেছেন, নাকি তার বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পৈতৃক সম্পত্তির জন্য তিনি সেখান থেকে ভারতমুখী হচ্ছেন। স্মাইল মূলত করাচি থেকে এসেছিলেন। কাজ করেছেন বোম্বে আর কলকাতার হোটেলগুলোতেও, কিন্তু তখনো পর্যন্ত তার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মজীবন ছিল না। কেবল একজন জনপ্রিয় শেফ হিসেবেই তিনি সুপরিচিত ছিলেন। কিন্তু লন্ডনে এসে যখন তিনি হোটেলে উঠলেন, তার নামের অদ্যংশে তিনি ‘রাজপুত্র’ (প্রিন্স) লিখেছিলেন। সেখানে হোটেলে তার জন্য ২৬ জন পরিচারক তখন অপেক্ষমাণ ছিল।

স্মাইলের এমন ধাঁধার বহর শুধু এখানেই শেষ নয়। তিনি নিজেকে বেলুচিস্তানের আমিরপুত্র বলে দাবি করতে লাগলেন। এছাড়া তিনি নিজেকে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের বন্ধুবর ও একজন ক্যামব্রিজ স্নাতক হিসেবে দাবি করেন। এর পরবর্তী বছরে যখন স্মাইল তার পরিচারকদের সঙ্গে নিয়ে আমেরিকায় ফিরে এলেন, তখন একদিকে সংবাদ মাধ্যম আর অন্যদিকে আইনি জটিলতা— তিনি এ দুয়ের মাঝে পড়ে গেলেন। ১৮৮৫ সালের শ্রম চুক্তি আইন অনুসারে কাউকে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিবাসনের প্রস্তাব দেয়াকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। স্মাইল তার ২৬ জন পরিচারিকের কাছে এ রকম প্রতিশ্রুতি করেছিলেন। সংবাদ মাধ্যমের কাছে তিনি অবশ্য এ কথা বলেছিলেন যে, তিনি নিজেকে কখনই রাজপুত্র বা প্রিন্স বলে দাবি করেননি এবং তার সঙ্গে সফররত ভারতীয় নাগরিকরা শুধু ভ্রমণের উদ্দেশ্যেই এসেছিলেন। আদালতের কাছে আত্মপক্ষ সমর্থনেও তিনি এ কথা বলেছিলেন যে, তার সঙ্গে আসা ভ্রমণকারীদের কাউকে তিনি এ ধরনের কোনো প্রস্তাব দেননি। তবে তাদের মধ্যে স্মাইলের কিছু বন্ধু ছিল, পরবর্তীতে যাদের কোনো রেস্তোরাঁয় নিয়োজিত করার পরিকল্পনা অবশ্য তার ছিল।

শেরির তারকা খ্যাতিতে তখন রীতিমতো ধস নেমে আসে এবং ২৬ হাজার ডলার  ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে তিনি নিজেকে স্মাইলের কাছ থেকে সরিয়ে নেন। সেনের মতে, স্মাইল আমেরিকার একজন ধনী নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং এর পরবর্তী সময়ে রেস্তোরাঁগুলোয় রন্ধনশৈলী প্রদর্শনের মাঝেই নিজের পরিসরকে সীমিত রাখেন। ১৯১৩ থেকে ১৯২০-এর মাঝামাঝি একসময়ে স্মাইল ভারতে তার নতুন রেস্তোরাঁ খোলার প্রতিশ্রুতিতে সদ্য বিবাহিত আমেরিকান পত্নীকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের উদ্দেশে প্রস্থান করেন। পরবর্তীতে তার সম্পর্কে আর তেমন কিছু জানা যায়নি। আমেরিকার রন্ধন শিল্পে ঝোল বা ‘কারি’র এ ধারা নিউইয়র্ক সিটি থেকে শুরু করে লস অ্যাঞ্জেলেসসহ আরো অসংখ্য শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এ ইতিহাসের অংশ হিসেবে সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি বইয়ে খামখেয়ালিপূর্ণ এ স্মাইল চরিত্রটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।