সবাই জানেন বিলেতের সাহেবসমাজে উৎকেন্দ্রিকতাকে (eccentricity) বেশ একটু সমীহের চোখে দেখা হতো একসময়ে। সম্ভবত এই রেওয়াজ কিছুটা হলেও চালু রয়েছে এখনো। আমাদের দেশে উৎকেন্দ্রিক ব্যক্তি ‘ছিটগ্রস্ত বা ছিটেল’, খ্যাপাটে বা পাগলাটে নামে চিহ্নিত হলেও সাহেবসমাজে জিনিয়াসের রূপান্তর হিসেবে এই খ্যাপাটেদের কলকে পেতে অসুবিধা হয় না। সে আমলের অর্থাৎ ঔপনিবেশিক আমলে বাংলা প্রেসিডেন্সির বিভিন্ন মহকুমা ও জেলায় চাকরি করে গেছেন এ ধরনের বেশ কয়েকজন ছিটেল বা তথাকথিত জিনিয়াস। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিম চন্দ্র, ডিএল রায়, নবীন চন্দ্র সেন প্রমুখ তাদের স্মৃতিচারণ বা আত্মজীবনীতে এদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। ইংরেজ প্রশাসক ছাড়াও, ইংরেজ পাদ্রিদের এ দেশটি সম্বন্ধে নানারকম তাদের সুবিশাল অজ্ঞতা, নানা উৎকেন্দ্রিকতার কাহিনী তাদেরই একদার অধস্তন কর্মকর্তাদের কলমে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে, আর সেসব অদ্ভুতুড়ে, উদ্ভট ঘটনাবলিই আজকের এ লেখার উপজীব্য।
কোম্পানির শাসকরা গোড়ার দিকে অর্থাৎ পালতোলা জাহাজের যুগে এ দেশে অবস্থানরত ছোট-বড় সব ইংরেজ সিভিলিয়ানেরই দেশে বড় বড় চিঠি লেখার অভ্যাস ছিল। তখন বিলাতের ডাক প্রতি সপ্তাহে যেত না— ১৫ দিন পর পর জাহাজে চিঠি যেত বিলাতে। তখন ইলেকট্রিক টেলিগ্রাম চালু হয়নি। কাজেই ডাকের দিনটিতে চিঠি না পাঠাতে পারলে, চিঠিটি পাঠাতে এরপর পুরো ১৫ দিন অপেক্ষা না করে কোনো উপায় ছিল না। ফলে বিদেশে বিভুইয়ে সমাজ, আপনজন ছাড়া থাকা এসব সাহেবরা ডাক ধরার জন্য স্বভাবতই উত্কণ্ঠিত থাকত, এবং সহজেই বোধগম্যও।
ডাকের দিন ছোট-বড় সব সাহেব বিলাতে চিঠি লিখতে ব্যস্ত থাকত। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, সাহেব হাকিমরা কাছারির কাজ ফেলে রেখে কেবল চিঠি লিখছে। ফলে আদালতের কাজ বন্ধ হতো, কাজের গতি শ্লথ হয়ে যেত।
কৃষ্ণনগরের তরুণ সিভিলিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেবকে জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ও কালেক্টর সাহেব বিচারের জন্য ছোট ছোট ফৌজদারি ও খাজনার মোকদ্দমার ভাগ দিতেন। দুজন পৃথক পৃথক আমলা এসব মোকদ্দমার নথি পড়ে শোনাতে ও হুকুম লেখার কাজে নিয়োজিত ছিল— একজন হাজির থাকত ফৌজদারি মোকদ্দমার শুনানির সময় এবং আরেক জন খাজনার মোকদ্দমার সময় সাহেবের কাছে থেকে কাজ করত।
এক ডাকের দিন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেব কাছারিতে এসেই বিলাতের চিঠি লিখতে শুরু করল। পাছে কাছারির কাজে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য অন্য যে আমলা উপস্থিত ছিল, তাকেই চাপরাশির মারফত কাজ শুরু করার হুকুম দিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেব মাথা গুঁজে চিঠি লিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। চাপরাশি মারফত হুকুম পেয়ে খাজনার মোকদ্দমার আমলা এজলাসে এসে হাজির হলো। চিঠি লেখায় ব্যস্ত সাহেব ঘাড় তুলে তার দিকে তাকাল না, এজলাসে কাগজ নাড়ার শব্দে বুঝল যে, আমলা উপস্থিত হয়েছে। চিঠি থেকে মুখ না তুলেই অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেব আমলাকে হুকুম করল ‘পড়ো’। আমলা খাজনার একটি নথি পড়তে শুরু করল। ওদিকে সাহেবের চিঠি লেখাও সমানে চলছে। তার মনপ্রাণ চিঠিতে নিবিষ্ট, আমলা কী ছাইভস্ম পড়ে যাচ্ছে, তা কেবল তার কান ছুঁয়ে যাচ্ছে কিন্তু মনে বিন্দুমাত্র ঢুকছে না। কাছারি ঘরে টুঁ শব্দটি নেই। একদিকে আমলার নথি পড়ার ঘরঘরানি শব্দ, অন্যদিকে সাহেবের কলমের খসখসানি। কিছুক্ষণ পরে আমলার নথি পড়া শেষ হলো কিন্তু সাহেবের চিঠি লেখা তখনও চলছে। আমলার পড়ার শব্দ না পেয়ে সাহেব আবার বলল ‘পড়ো’। আমলা জানাল, নথি পড়া শেষ হয়েছে। সাহেব একইভাবে ঘাড় গুঁজে লিখতে লিখতে বলল, আচ্ছা লেখো হুকুম। তিন মাস ফাটক অউর ১০ রুপিয়া জরিমানা। না দেয় তো আরো ১৫ মাস ফাটক বা জিঞ্জির। আমলা হুকুম শুনে হতবাক, খাজনার মোকদ্দমায় চুরির শাস্তি! হতভম্ব আমলা কী করবে ভেবে পায় না, আবার সাহেবকে বিরক্ত করতেও সাহসে কুলাচ্ছে না! কোনো উপায় না পেয়ে সে এক হাতে নথি আর এক হাতে কলম ধরে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর সাহেব লিখিত রায় দস্তখত করার জন্য এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে নথিটি চাইল। আমলা এবার সুযোগ পেয়ে বলে উঠল, খোদাবন্দ, এটি চুরির মামলা নয়, খাজনার মোকদ্দমার নথি অর্থাৎ এখানে জেল-জরিমানা প্রয়োজন নয়। এই কথা শুনে সাহেবের হুঁশ ফিরল, তিনি চিঠি লেখা ছেড়ে আমলার নথি দেখে বুঝলেন এটা খাজনার মোকদ্দমা— তাই সাহেব রায় দিলেন, আচ্ছা লেখো মামলা ডিসমিস।
দুই
যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন দেশের শাসন, বিচার সব গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্মের ভার সাহেবদের হাতেই ন্যস্ত ছিল। দেশীয় শিক্ষিত মানুষের জন্য উচ্চ রাজপদের দরজা বন্ধ ছিল। দীর্ঘকাল পরে লর্ড বেন্টিংকের আমলে সাহেবরা দেশীয়দের হাতে বিচারকার্যের ভার দিয়েছিল। আগে সাহেবরা দেশের বিচারপতি হলেও প্রকৃতপক্ষে সব বিচারালয়ে বিচার করার কাজ সম্পন্ন হতো আদালতের দেওয়ান ও আমলাদের হাতে দিয়েই। অনেক সাহেবেরই সুবিচার করার ব্যাপারে চেষ্টা ছিল কিন্তু শুধু বিচারকের চেষ্টা ও ইচ্ছা বলেই বিচারকার্যের মতো দুরূহ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হতো না।
কারণ, সাহেবরা একে তো বাংলা ভাষায় অনভিজ্ঞ, তার ওপর অপ্রতুল আইনকানুন ও প্রয়োগের অনিশ্চয়তা— বিশেষ করে কোন ক্ষেত্রে কোন আইন প্রযোজ্য হবে, তা দেখিয়ে দেয়ার মতো শিক্ষিত উকিল সম্প্রদায় ছিল না। সুতরাং বিচার বিভ্রাট এবং বিচার প্রহসন খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না উপনিবেশিক বাংলায়। এ ছাড়া অনেক সময়ই সাহেব হাকিমরা কেবল সাক্ষী গোপালের মতো এজলাসে বসে থাকত। আসল কাজ করে দিত আদালতের দেওয়ান। এরা মোকদ্দমার রায়, ফয়সালা সবই লিখে প্রস্তুত করে সাহেবের হাতে দিত।
সাহেব হাকিম খুব বেশি হলে নিজে কেবল ডিক্রি কি ডিসমিস বাক্য উচ্চারণ করে দায়িত্ব শেষ করত। লর্ড বেন্টিংকের সময় উচ্চশিক্ষিত বাঙালিদের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া শুরু হলে এ বিচার বিভ্রাট ও বিচারিক কার্যের বিশৃঙ্খলা দূর হয়।
হেস্টন ও স্কিনার নামে দুজন ইংরেজ সিভিলিয়ানের উল্লেখ করেছেন হিন্দু কলেজের প্রাক্তন কৃতী ছাত্র গিরীশচন্দ্র বসু তার সেকালের ‘দারোগা কাহিনী’ নামে স্মৃতিকথায়। গিরীশচন্দ্র বসু বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ লিখতেন ছাত্রাবস্থা থেকে। ১৮৫৫ খ্রি. তিনি পুলিশ বিভাগের দারোগার পদ গ্রহণ করেন এবং অল্প দিনের মধ্যে প্রথম শ্রেণীর দারোগা হিসেবে উন্নীত হন। ১৮৬০ খ্রি. তিনি দারোগার পদে ইস্তফা দেন। তার আত্মজীবনী ঢাকা থেকে ১৮৮৮ খ্রি. প্রকাশিত হয়। ১৮৯৮তে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
গিরীশচন্দ্র বসুর সময়ে পুলিশের কাজকর্ম ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে পরিচালিত হতো। ফলে দারোগা হলেও গিরীশ বসুর জেলার উচ্চপদস্থ সিভিলিয়ানদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা তার বইয়ের মূল সম্পদ।
হেস্টন ও স্কিনার চরিত্র আদৌ কাল্পনিক নয়। এই দুই সিভিলিয়ান সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ তীক্ষ ও রসসিক্ত। হেস্টন ও স্কিনারকে লোকে পাগল বলত। হেস্টন সাহেব উচ্চ বংশজাত; তিনি বড় লাট ডালহৌসির জ্ঞাতি বা কুটুম্ব ছিলেন। ফলে সাধারণ বংশজাত সিভিলিয়ানদের তিনি একটু অনুকম্পার চোখে দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন। বাংলার প্রথম ছোট লাট হ্যালিডে সাহেবকে তিনি ‘ফিতা ফেরোস কা লাড়কা’ অর্থাৎ ফিতা বিক্রেতার পুত্র বলে তাচ্ছিল্য করতেন। নিজে বড় ঘরের সন্তান, তাই চাকরি দেয়ার সময় তিনি বাঙালিদের মধ্যে সদ্বংশজাত প্রার্থী খুঁজতেন। বিক্রমপুরের ভদ্র সন্তানদের প্রতি তার মনোভাব খুব অনুকূল ছিল বলে গিরীশ বসু লিখে গেছেন। হেস্টন সাহেবের ধারণা বিক্রমপুরের শিক্ষিত মানুষ লেখাপড়ায় খুব দক্ষ ও পারদর্শী। তারও নানা বাতিক ছিল। কোনো আমলার অসুখ হলে তাকে ‘বেল খাও, বেল খাও’ বলে পরামর্শ দিত। নিজেও প্রতিদিন প্রচুর বেল সাবাড় করত।
এই হেস্টন সাহেব কালেক্টর হয়ে হাজির হলো কৃষ্ণনগরে। গরমের দিনে কাছারির বাইরে গাছতলায় বসে কাছারি বসাত। সবাইকে পাগড়ি, চাপকান ইত্যাদি পোশাক পরে কাছারিতে আসতে তার নিষেধ ছিল। তার যুক্তি, বাঙালি বাড়িতে যে কাপড় পরে, সেই পোশাকে তারা কাজ করতে কম কষ্ট বোধ করবে।
গিরীশচন্দ্র বসুর ধারণা, হেস্টন সাহেব কাছারির আসল কাজ কিছুই জানত না কিংবা করতে পারত না। তার সময় কাটত আজ এক ঘর হতে আরেক ঘরে কেরানিখানা বদল করে। এছাড়া এজলাসের টেবিলটা উত্তর দিক হতে পূর্ব দিকে স্থানান্তর করা তার চোখে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। লর্ড ডালহৌসি এ হেস্টন সাহেবকে এক বিভাগের কমিশনার নিয়োগ করেছিল কিন্তু রেভিনিউ বোর্ড হেস্টনের বিদ্যাবুদ্ধির পরিচয় পেয়ে তার নিয়োগে আপত্তি জানায়। লর্ড ডালহৌসি ভীষণ চটে গিয়ে বোর্ডকে এমন তিরস্কার করেছিলেন যে, কোনো সিভিলিয়ানের প্রতি এর আগে এমন কটুবাক্য কেউ প্রয়োগ করেনি। লর্ড ডালহৌসি বোর্ড সম্পর্কে লিখেছেন, It is an unparalled presumtion on the part of the board অর্থাৎ বোর্ডের পক্ষে এটি এক অনির্বচনীয় গোস্তাকি।
আগেই বলা হয়েছে, গিরীশচন্দ্র বসু আরো এক বিটকেলে স্বভাবের ইংরেজ সিভিলিয়ানের কথা উল্লেখ করে গেছেন, এর নাম স্কিনর। হেস্টনের মতো স্কিনার অতটা খেয়ালি ছিল না কিন্তু তার পেটে ছিল প্রচুর নষ্টামি বুদ্ধি। সে ঢাকায় কর্মরত থাকার সময় একদিন কাছারিতে এসে লাটসাহেব এসেছেন বলে আমলাদের কাছারি বন্ধ করে দিতে আদেশ দিল। আমলারা হতবাক। তারা সবাই জানতে চাইল এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে কোনো আগাম সংবাদ নেই কেন, বিশেষত লাটসাহেবের আগমনে তোপধ্বনি হতে হবে, তারও বন্দোবস্ত নেই, এ কেমন কথা। উত্তরে স্কিনার সাহেব জানালেন যে, ‘তোমলোক পাগল, গভর্নর সাহেব নন, হামরা লাটসাহেব হামরা মেম সাহেবের ভাই।’
স্কিনার সাহেব পরে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন। তখন পুলিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে থাকতে আমলারা ভোরে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কুঠিতে হাজির হয়ে থানা হতে পাঠানো সব রিপোর্ট পড়ে শোনাতেন। স্কিনার সাহেবের কুঠিরের যে কামরায় এই রিপোর্ট পড়া হতো, সেই ঘরে একবার নতুন সাদা চুনকাম করা হয়েছিল। চুন একটু শুকালে পুনরায় সেই কামরায় সাহেবের বৈঠকখানা হলো। সেদিন সাহেব রিপোর্ট শোনার সময় একজন ঘোর কালো চেহারার আমলাকে ডেকে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়াতে আদেশ করলেন। শুধু তাই নয় এরপর তিনি নিজে গিয়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে তুড়ি দিতে দিতে, সেই আমলাকে ‘চলো চলো’ বলে যতক্ষণ না দেয়ালে তার মুখ ঠেকল, ততক্ষণ তিনি তাকে সামনের দিকে ঠেলে নিয়ে গেলেন।
‘দেয়ালের চুন আমলার মুখে লাগিয়া বিকৃত হইল দেখিয়া, স্কিনার সাহেব উচ্চৈঃস্বরে হাসিতে আরম্ভ করিলেন এবং অবশেষে একজন চাপরাশি সঙ্গে দিয়া রাস্তায় বাহির করিয়া দিলেন। কারণ পথের লোকেরাও তাহাকে দেখিয়া হাসিবে’ লিখেছেন গিরিশচন্দ্র বসু। কিছু দিন পর স্কিনার সাহেব কৃষ্ণনগরে জজ হয়ে চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে আমলাদের বিস্তর জ্বালাতন করেছিলেন। কাছারির সামনের গাছের ওপর থেকে কাক বা অন্য কোনো পাখি ডাকলে তার মাথা গরম হয়ে উঠত।
একদিন কয়েকটি কাক সেই গাছের ওপর বসে তারস্বরে কা কা করেছিল বলে তিনি ‘নাজির হামকো খুন কিয়া, নাজির হামকো খুন কিয়া’ বলে চিত্কার করে কাছারি ঘর উত্তপ্ত করে তুলেছিলেন। পরে নাজিরকে পাক্কা ১ ঘণ্টা পর্যন্ত রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে ২৫ টাকা জরিমানা করে সে যাত্রা ছেড়ে দিলেন।
মামলা চলার সময় উকিলদের বক্তৃতা শোনার সময় এই জজসাহেব মুখ বিকৃত করে উকিলদের ভেঙচাতেন।
গিরীশচন্দ্র বসু অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, সব ইংরেজ সিভিলিয়ানই এ রকম খ্যাপাটে ছিলেন না। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন কর্মনিষ্ঠ, সৎ, বিবেচক এবং স্থানীয় ভাষায় দক্ষ। তা না হলে মহারানী ভিক্টোরিয়ার শাসনের ভিত্তি এ দেশে এত দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হতো না।
ইংরেজ সিভিলিয়ানরা সবাই যে উৎকেন্দ্রিক ছিলেন তা নয়, সবাই যে কর্মদক্ষ ছিলেন, তাও বলা যায় না। অনেক সময় বিখ্যাত বংশের বা খ্যাতিমান ইংরেজের সন্তান হওয়ার কারণে তারা চাকরি পেতেন। টাঙ্গাইল জেলার এক অখ্যাত গ্রামের এক অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী সন্তান গিরীশ চন্দ্র নাগ। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে বাংলা প্রেসিডেন্সির অনেক জেলা ও মহকুমায় কাজ করেছিলেন। তার আত্মজীবনী ‘ডেপুটির জীবন’ বইয়ে ইংরেজ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কাজ করার সুবাদে তার দেখা এ রকম সাহেবদের কথা উল্লেখ করে গেছেন; যারা ভদ্র, সৎ এবং মার্জিত রাজপুরুষ। এদের মধ্যে পিকার্ড সাহেবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মি. প্রিফার্ড একজন খাঁটি ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট, দেওঘরের এসডিও। তিনি বিলাতের খ্যাতনামা ব্যারিস্টার প্রিফার্ড সাহেবের ছেলে, লেখাপড়া তেমন শেখেননি, বংশমর্যাদার গুণে সম্ভবত চাকরি পেয়েছেন। গিরীশ চন্দ্র নাগের মূল্যায়নে তিনি বেশ বুদ্ধিমান, সৎ ও ন্যায়বিচারের পক্ষে। সহজে কারো অনিষ্ট করেন না তিনি। কাজকর্মে তেমন পোক্ত ছিলেন না বলে ডেপুটি গিরীশের ওপর সব কাজের ভার দিয়ে তিনি সাবজজের মোকদ্দমা ও দেওয়ানি আপিল শোনা ছাড়া আর কিছুই করতেন না। প্রায়ই মফস্বলে ঘুরে বেড়াতেন আর প্রাণভরে শিকারে মত্ত থাকতেন।
কখনো কখনো তিনি নিজের শিক্ষার অপূর্ণতার কথা গিরিশ নাগকে শুনিয়েছেন এমনি ভাষায়— ‘ছেলেবেলা ও কৈশোরে আমি শুধু শেয়াল আর খরগোশ শিকার করে বেড়িয়েছি। এজন্যই আজ আমি এত ভালো শিকারি হতে পেরেছি।’ আরো একদিন বলেছিলেন, ‘তোমরা তো সারাক্ষণ কলেজের লেখাপড়া আর পরীক্ষা পাস করে ডিগ্রি পাওয়ার কথা বলাবলি করো। আমি কোনো দিন কোনো কলেজে যাইনি। সত্যি কথা বলতে কি কলেজে কী ধরনের পড়াশোনা হয়, তা জানারও সুযোগ কখনো হয়নি আমার।’
সরলমনা প্রিফার্ড সাহেব একদিন কাছারি চলার সময় হঠাৎ ডেপুটি গিরীশ নাগকে নিজের এজলাসে ডেকে পাঠিয়ে ইংরেজি ইনসার্ট শব্দটির বানান জানতে চাইলেন। ‘ইনসার্ট’ বানানের ‘সি’ অথবা ‘এস’ ব্যবহার হবে কিনা, এ ব্যাপারে তার একটু বিভ্রম হচ্ছে। আসল কথা হলো তখন তিনি মোকদ্দমার রায় লিখছিলেন, রায়ে ইনসার্ট শব্দটি লিখতে হয়েছিল, হাতের কাছে অভিধান না থাকায় ডেপুটি গিরীশকে ডাকা।
তিন
দেওঘরে সব ইংরেজ কর্মকর্তা পিকার্ড সাহেবের মতো সরলপ্রাণ ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন না। দেওঘরে এসডিও টমসন সাহেবের চালবাজি ও দোষ ধরার স্বভাবের কথা বলেছেন গিরীশ চন্দ্র নাগ।
ডেপুটি গিরীশ বড় বড় ফৌজদারি মামলার বিচার করতেন, সঙ্গে দেওয়ানি মামলার ভার ছিল তার ওপর। আপিলে তার দেয়া রায়ের বেশির ভাগই বহাল থাকত। এসডিও ডেপুটি গিরীশের কোনো ত্রুটি ধরতে না পেরে বড়ই চটে গেলেন। গিরীশ এসডিওকে বিশেষ খোশামোদ করতেন না, এটাও এসডিওর মনঃকষ্টের একটি বড় কারণ ছিল।
সে বছর ডেপুটি কমিশনার মি. বোমপাস দেওঘরের অফিস পরিদর্শনে এলেন। সম্ভবত এসডিওর চালবাজির কথা তার কানেও পৌঁছেছিল। দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে অধস্তন কর্মকর্তাদের চালবাজি বা ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা তিনি সহজেই ধরে ফেলতেন। বোমপাস সাহেব প্রথমেই এসডিও, পরে সেকেন্ড অফিসার এবং শেষে থার্ড অফিসার— সবারই বিচারবিষয়ক কাজের পরীক্ষা করলেন। প্রত্যেক ম্যাজিস্ট্রেট গত এক বছরে যেসব ফৌজদারি মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করেছিলেন, তার একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করালেন। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা গেল, এসডিও টমসন তার অধস্তন ডেপুটি গিরীশ নাগের চেয়ে প্রায় ২০০ মোকদ্দমা বেশি নিষ্পত্তি করে ফেলেছেন।
কমিশনার সাহেব চমত্কৃত হলেন এই দারুণ কর্মদক্ষ এসডিওর কাজে। কৌতূহলী হয়ে তিনি এই অফিসারের ট্রায়াল রেজিস্টার এবং কিছু কিছু নথিপত্র দেখতে চাইলেন। এবার এসডিওর মোকদ্দমা নিষ্পত্তির নজরকাড়া সংখ্যার রহস্য ফাঁস হয় গেল। এসডিও সব ছোট ছোট মোকদ্দমা যেমন পাঁচ আইনের মোকদ্দমা, সামারিওয়েতে বিচার করে দণ্ড দিতেন। অর্থাৎ পুলিশ রিপোর্ট বা চালানের কাগজের ওপর দুই আনা জরিমানা করা হলো বা চার আনা জরিমানা ইত্যাদি লিখে দিতেন। এতেই মামলা ডিসপোজাল বা নিষ্পত্তির সংখ্যা বেড়ে উঠেছিল।
এসডিও টমসন আরো এক কৌশলে মোকদ্দমার সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে খাতায় দেখিয়েছিলেন। দেওঘর কাছারির কম্পাউন্ডের ভেতর দিয়ে একটি সর্বসাধারণের চলাচলের রাস্তা ছিল। যেসব যাত্রী বা লোক দেওঘর শহর বা বৈদ্যনাথের মন্দিরে দর্শনে যেত, তারা এই পথটি দীর্ঘদিন ধরে বিনা বাধায় ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিল। যোগ বা মেলার সময় হাজার হাজার তীর্থযাত্রী এই পথ দিয়ে মন্দিরে যায়। যাওয়ার পথে তারা ভক্তিভরে ‘বোম বোম হরে হরে’ ধ্বনি দিয়ে সেই পথে চলাচল করে। এসডিও নোটিস জারি করে হুকুম দিলেন। যাত্রীরা ওই পথে যাতায়াত করতে পারবে না। আর যারা বোম বোম প্রভৃতি শব্দ কিংবা কোলাহল করে সে পথে যাতায়াত করবে, তাদের ফৌজদারিতে সোপর্দ করা হবে। বিভিন্ন প্রদেশ ও জেলা থেকে অগণিত তীর্থযাত্রী ট্রেনযোগে বৈদ্যনাথ ভারসেলে নেমে পায়ে হেঁটে শহরে হাজির হতো। এটাই তাদের শর্ট কাট রাস্তা। ফলে প্রতিদিনই মেলার সময়ে বহুযাত্রীর বোম
বোম ধ্বনি কাছারি কম্পাউন্ড কোলাহলে ভরে ফেলে। এসডিও তখন কাছারিতে হাজির থাকলে নাজিরের পিয়ন ওই যাত্রীদের এক এক দলকে সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত করত, এসডিও প্রত্যেককে সামারিওয়েতে এক/দুই আনা জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দিতেন। কিন্তু ট্রায়াল রেজিস্টারে প্রত্যেক যাত্রীকে আলাদা কেস হিসেবে দেখানো হতো। ডেপুটি কমিশনার এসডিওর চালাকি ধরে ফেলে কিঞ্চিৎ অসন্তুষ্ট হলেন।
এই কৃতীমান ইংরেজ এসডিও সামান্য দু-একটি ১১০ ধারার মোকদ্দমা বিচার করতেন, তবে দূরবর্তী স্থানে গিয়ে মোকদ্দমা বিশেষ করে জটিল মোকদ্দমা হলে অধস্তন কর্মকর্তাকে দিয়ে কাজ সারতেন। কমিশনার সব বুঝে পরিদর্শন বইয়ে একটু ব্যঙ্গের সঙ্গে তার মন্তব্য লিপিবদ্ধ করলেন। সেই সঙ্গে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট গিরীশ নাগের ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ও রায়ের মান সম্বন্ধে প্রশংসাসূচক মন্তব্য দিলেন। কিছু দিন পর এসডিও টমসন অন্যত্র বদলি হয়ে বিদায় হন।
চার
প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও কবি নবীন চন্দ্র সেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দীর্ঘ ৩৬ বছর নানা জায়গায় কাজ করেছেন। এই সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বেশ কয়েকজন পাগলাটে ইংরেজ উপরিওয়ালার অধীনে বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন। নবীন চন্দ্রের ডেপুটিগিরির হাতেখড়ি হয় যশোর জেলায়। এখানে তিনি ম্যাজিস্ট্রেট মনরো এবং তার জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও’কিনলি নামে দুই খ্যাপাটে সিভিলিয়ানের দর্শন পান। চট্টগ্রামে যখন তিনি উঁচু ক্লাসের ছাত্র, মনরো সাহেব তখন সেখানকার জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট। কিশোর নবীন চন্দ্র তখনই মনরো সাহেবের প্রতাপের কথা শহরবাসীর কাছ থেকে শুনে আসছেন। মনরো দেখতে সুপুরুষ, তবে এক পা খোঁড়া কিন্তু তাতে কি? তার বিক্রমে চট্টগ্রাম জেলা প্রকম্পিত। নবীন সেনের মনে পড়ল শহরের বাসিন্দারা বলাবলি করত, মনরো সাহেবের হাতে যে পড়েছে, দোষী হোক নির্দোষ হোক, ধনী-দরিদ্র যা-ই হোক, তার আর নিস্তার নেই। একবার সাহেবের মনে ধারণা হলেই হলো যে, এ লোকটি দুষ্ট, তার রেহাই নেই। সাহেবের কোপানলে সে সর্বস্বান্ত হবেই। মনরো সাহেবের দুর্দান্ত স্বভাবের কথা মনে করে নবীন চন্দ্র শঙ্কিত চিত্তে যশোরে এসে মনরো সাহেবের কাছে রিপোর্ট করলেন, মনরোর হাতেই তার ডেপুটি লীলার শুভারম্ভ হয়েছিল।
চট্টগ্রামে মনরো ছিলেন জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট, যশোরে তিনি জেলার শাসনকর্তা— ম্যাজিস্ট্রেট। তার পদোন্নতি হয়েছে, ক্ষমতা বেড়েছে, একই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে খামখেয়ালি। চাকরির প্রথম দিনেই তিনি নবীন ডেপুটিকে আশ্বস্ত করে বললেন যে, তিনি নবীনকে এক পক্ষকালের মধ্যেই একজন পাকা কর্মকর্তা করে তুলবেন। কিছুদিন কাজ করার পর নবীন চন্দ্র সাহেবের আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন। তখন সাহেব তাকে আরো উপদেশ দিলেন যে, তাকে সাহসের সঙ্গে কাজ করে নাম করতে হবে, নতুবা যশোরের বদমাশদের শাসন করা সম্ভব হবে না। মনে হয়, বদমাশ শায়েস্তা করাকে তিনি শাসনের মূলমন্ত্র হিসেবে ধরে নিয়ে ছিলেছেন।
অচিরেই নবনিযুক্ত ডেপুটি নবীনচন্দ্র দুর্দান্ত ম্যাজিস্ট্রেট মনরো আর তার জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও’কিনলির প্রতাপ আর স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠলেন। নবীন চন্দ্র লিখেছেন, যেমন ম্যাজিস্ট্রেট, তেমনি জয়েন্ট— সোনায় সোহাগার যোগ। ‘ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব যাহাকে ধরিতে বলেন, জয়েন্ট তাহাকে খুন করেন। এই যুগল রূপের শাসন ও অত্যাচারে যশোর টলটলায়মান।’
ওকিনিলির খ্যাপাটেপনার শেষ নেই। ছদ্মবেশে যশোর শহরে নৈশ পর্যটনে বের হওয়া তার এক পবিত্র কর্তব্য। পতিতাপল্লী হতে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটদের বাড়ি পর্যন্ত সবার বাসার পেছনে লুকিয়ে থেকে কোথায় কী হচ্ছে, তার খবর নিয়ে আসতেন বলে জনরব যশোরে প্রচলিত ছিল। লোকের ধারণা সকালে ও’কিনলি সাহেবের বাড়ি গেলে রাতে শহরে কোথায় কী হয়েছে, তার পুরো খবর পাওয়া যাবে। নবীন চন্দ্র এমন উত্কট বুদ্ধির ইংরেজ কর্মকর্তার খ্যাপাটে কাজকর্ম ও অবশেষে তার নাকাল হওয়ার কাহিনীর উল্লেখ করেছেন তার রসসিক্ত লেখনীতে।
একবার রাতে ও’কিনলি পতিতাপল্লীতে হানা দিয়ে দেখলেন যে, এক পুলিশ কর্মচারী সেখানকার এক কক্ষে গভীর মনোনিবেশে অনুসন্ধানকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ পুলিশ কর্মচারী দেখলেন ঘরের দরজার পাশ দিয়ে এক কামিজ পরা শ্বেত মূর্তি। শ্বেত মূর্তি বলে উঠল, ‘কি বাবা বড় মজা করলা’। এরপরই মূর্তি অদৃশ্য। এই শ্বেত মূর্তি আর কেউ নন, ও’কিনলি সাহেব। এর কয়েক দিন পরই পুুলিশ কর্মচারীটি চাকরিচ্যুত হলো।
আরেকদিন যশোরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বিদ্যারত্নের বাসায় নৈশভোজের নিমন্ত্রণে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা খুব আমোদ করছেন। হঠাৎ বাড়ির ভৃত্য এসে গৃহকর্তা বিদ্যারত্ন এবং তার অতিথিদের খবর দিল যে, বাসার পেছনে এক সাদা প্রেত ঘোরাফেরা করছে।
গৃহকর্তা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সেকেলে ভাবধারার মানুষ ও তিনি সেকালের পণ্ডিতের মতো এই প্রেত বিতাড়নের সনাতন ব্যবস্থার নির্দেশ দিলেন। তার আদেশমতো ভৃত্য এক হাঁড়ি আগুন গরম ফেন বাড়ির পেছনের সেই সাদা ভূতের গায়ে ঢেলে দিল। উপস্থিত অতিথিরা ‘মহাপলায়ন শব্দ’ শুনতে পেলেন। বাসার কাজের লোকেরা ‘চোর চোর’ বলে তাড়া করল। নবীন চন্দ্র লিখেছেন, ‘শুনিলাম সেই অবধি শ্বেত প্রেতের উপদ্রব অনেক হ্রাস পাইয়াছিল। এই ও’কিনলি সাহেব নবীন সেনের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের সময় তার আইরিশ উচ্চারণে এই অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে এমন ভাষায় উদ্ভট এক দীক্ষা দিয়েছিলেন, যা নবীনচন্ত্র সারা জীবন মনে রেখেছিলেন। ‘তুমি বালক! আমি তোমাকে একটি উপদেশ দিব। যে পর্যন্ত বিপরীত প্রমাণ না পাইবে, সেই পর্যন্ত প্রত্যেক লোককে ষোলআনা বদমায়েশ বলিয়া ধরিয়া লইবে।’
এই ছিল সাহেবের শাসন ও ধর্মনীতির মূলমন্ত্র। তিনি একবার যাকে ইধফ গধহ অর্থাৎ মন্দ লোক বলে সন্দেহ করতেন, শতগুণ থাকলেও তার কপালে দুঃখের শেষ হতো না। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে তাদের উৎকেন্দ্রিকতার যুক্তিবিহীন দাম্ভিকতা সত্ত্বেও তাদের দুর্নীতিপরায়ণ হিসেবে তেমন অপবাদ ছিল না। এই ধরনের প্রকট উৎকেন্দ্রিক স্বভাবের ইংরেজ সিভিলিয়ানদের সংখ্যাও খুব অসহনীয় পর্যায়ে কখনো পৌঁছেনি।
নবীন সেন আরো জানিয়েছেন সম্ভবত স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার উইলিয়াম গ্রে ম্যাজিস্ট্রেট মনরোকে রেভিনিউ বোর্ডের সেক্রেটারি পদে নিয়োগ দিয়ে যশোর থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। যাওয়ার সময় মনরো নিজে নবীন সেনকে স্নেহভরে বললেন, ‘তুমি ভয় পাইও না, বদমাশদের শাসন করে যাও।’
ম্যাজিস্ট্রেট মনরোর বিদায়ের সময় কাছারি ভেঙে আমলারা সাহেবের পিছু পিছু হেঁটে গিয়েছিলেন। ‘তিনি জনসাধারণের অপ্রিয় হলেও আপন অধীনস্থদের কাছে অপ্রিয় ছিলেন না। সবাই জানত যে, তিনি অধীনস্থদের আশ্রয়দাতা ছিলেন’— লিখেছেন তার ডেপুটি নবীন চন্ত্র সেন। তবে তার জয়েন্ট ও’কিনলিকে সাধারণ মানুষ অপছন্দ করত। তিনিও অল্প কিছুদিন পর যশোর থেকে বদলি হয়ে গেলে যশোরবাসীর হাড় জুড়াল।
পাঁচ
বাংলাদেশের প্রথম গ্র্যাজুয়েট বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৫৮ থেকে ১৮৯১— প্রায় ৩৩ বৎসর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি করেছিলেন। এই দীর্ঘ চাকরিজীবনে বহু ছোট-বড় ইংরেজ সিভিলিয়ানকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য তার হয়েছিল। এদের পর্বতপ্রমাণ অজ্ঞতা ও সাদা চামড়ার অহংকার এবং নিজের অপদার্থতাসহ নানা হাস্যকর প্রয়াস তিনি দেখেছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। এই অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন হয়েছে তার বিভিন্ন লেখায়— মুচিরাম গড়ের জীবনচরিত, লোকরহস্য ইত্যাদিতে। নামগুলো কাল্পনিক হলেও এসব সাহেব তখন ম্যাজিস্ট্রেট কালেক্টর, জেলাধিপতি হিসেবে আপন আপন বুদ্ধিমত্তায় মহারানী ভিক্টোরিয়ার শাসনযন্ত্রকে চালু রাখতে নিযুক্ত ছিলেন। বঙ্কিম দেখেছেন যে, অনেক গড়গড়তা মাপের মানুষ রাজসম্মানে ভূষিত হয়েছেন। দেখেছেন এই শ্বেত চর্মধারীদের খোশামোদে ভেজানো ছাড়া পাতে দেয়া অসম্ভব।
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে উপলব্ধি করেছিলেন, ভারতীয় ভাষা, ভারতীয় স্বভাব, ভারতীয় ঐতিহ্য সম্বন্ধে উদাসীন সাহেবরা ভারতজ্ঞ হওয়ার জন্য দাবিদার। তিল তিল করে জমতে থাকা এই অভিজ্ঞতা মুচিরাম গড়ের জীবনচরিতে ব্যঙ্গমূর্তি ধারণ করেছিল। মুচিরাম ব্রিটিশ ব্যুরোক্রেসির এক অপূর্ব সৃষ্টি। মহারানীর রাজত্ব রাখতে গেলে ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের মুচিরামকে সৃষ্টি করা ছাড়া পথ ছিল না। ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের বড় আপদ ইংরেজি শিক্ষিত মেধাবী বাঙালি যুবক যে সে নামসর্বস্ব, চাটুকার নয়। অধিকন্তু এই বাঙালি সঠিক ইংরেজি লিখতে জানে। আর এসব সাহেবের দরকার মুচিরামের মতো আভূমিপ্রণত কর্মচারী— অশিক্ষিত, জো হুকুম মুচিরামদের যারা প্রতিষ্ঠা করবে না। আর যেসব সাহেব এদের তৈরি করেছিলেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও তাদের গুণের ফিরিস্তি দিয়ে গেছেন বঙ্কিম চন্দ্র। এসব সাহেবের মধ্যে একজন হলেন Gronerham সাহেব, যাকে বঙ্কিম নাম দিয়েছিলেন ‘গঙ্গারাম’। এই সাহেবের কর্মদক্ষতা বলতে তিনি কেবলই মামলা ডিসমিস করেন। যত দিন সাহেব জেলায় ছিলেন, একদিনের জন্য একখানি চিঠি স্বহস্তে মুসাবিদা করেননি। এই সাহেব মুহুরি মুচিরামকে সর্বাপেক্ষা কর্মক্ষম বিবেচনা করে তাকে মীরমুন্সী পদে অভিষিক্ত করেন। কালেক্টর হোম সাহেব চাটুবাক্যপ্রিয়। নীল রক্তের অহংকারে আত্মহারা। তিনি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ। শেক্সপিয়ার, মিল্টন বেকন প্রমুখের ভাবধারায় উজ্জীবিত বাঙালি শিক্ষিত মিডল ক্লাসকে (মধ্যবিত্ত) তিনি সন্দেহের চোখে দেখেন। চাকরি দেয়ার সময় এদের প্রথমেই বাতিল করে দেন।
রিড সাহেব— হেলিবেরি কলেজের সিভিলিয়ান তিনি। ন্যায়বান এই সাহেব সেকালের ইংরেজদের মতো বাঙালিদের পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। তিনি জানতেন ঘুষ আমলারা নেবেই— ডেপুটি পদে প্রমোশন পেলে না নিতেও পারে। ‘ডেপুটিগিরি আমলাদের বৈধব্য বিধবা হইলে আর মাছ খাইতে নাই।’ তিনি ভালো করেই জানতেন, ডেপুটিগিরিতে খুব বিদ্যাবুদ্ধির প্রয়োজন দেখা যায় না। সুতরাং বহুলোকের প্রভূততম উপকারের জন্য রিড সাহেব মুচিরামকে ডেপুটি পদে প্রমোশন দিলেন। বঙ্কিমের ধারণা, এ দেশে ডেপুটিগুলো কুষ্মাণ্ডসদৃশ। মাচায় চড়িয়ে না দিলে তারা উচ্চে আরোহণ করতে পারেন না।
ছয়
সে আমলের ইংরেজ সিভিলিয়ানদের দেশীয় ভাষা শেখা ছিল বাধ্যতামূলক। জেলা শহরে আদালতে বিচারকাজের সুবিধার জন্য, দেশীয় সাক্ষীর বক্তব্য দোভাষীর সাহায্য ছাড়াই যাতে ইংরেজ জজ ও ম্যাজিস্ট্রেটরা স্বাধীন এবং নিরপেক্ষভাবে সাক্ষীর বক্তব্য বুঝতে পারেন, সেজন্য দেশীয় ভাষা শেখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। সে যুগের সিভিলিয়ানদের কষ্ট করে পরীক্ষায় পাস করা বাংলা ভাষা ছিল এক বিষয়বস্তু। পাস করলে চাকরিতে মিলত অতিরিক্ত মোটা ভাতা। এত সব প্রণোদনা থাকলেও অধিকাংশ সাহেব আমলার বাংলা জ্ঞান ছিল জোড়াতালি দেয়া।
সাহেবরা ইংরেজি থেকে বাংলায় আক্ষরিক অনুবাদ করলে কেমন অদ্ভুত ও অর্থহীন শোনায়, তার নিদর্শন পাওয়া যায় দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পন’ নাটকের এই বাক্যটিতে— যেখানে সাহেব বলছেন, ‘আমি বুঝিলাম আমাকে প্লানটার লইয়াছে’ (ইংরেজি বাক্য দে টুক মি ফর ইন্ডিগো প্লানটার-এর আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ)। অর্থাৎ চাষীরা সাহেবকে ভুল করে নীলকর ভেবেছিল। বাংলা ভাষা জানা বেশির ভাগ সাহেব যে চলতি বাংলা ব্যবহার করেন, তা আরো ভয়াবহ। সে ভাষা একেবারেই খোঁড়া বাংলা। বাজার হিন্দি বা উর্দুর কাঁধে ভর না দিয়ে সেই বাংলা হাঁটতেই পারে না।
পরিশ্রম করে বাংলা ভাষা শেখা সাহেবদের বাংলা উচ্চারণে কোনো শৃঙ্খলা নেই। তাদের বাংলা উচ্চারণ, শব্দ চয়ন, সাধারণ মানুষের জন্য তো দূরের কথা, শিক্ষিত জনেরও বোধগম্য হতে সময় লাগত। বক্তা ও শ্রোতা উভয়ের জন্য প্রায়ই তা হতো বিভ্রান্তিকর। বঙ্কিম চন্দ্রের লেখা থেকে বাংলা ভাষায় দক্ষ প্রজাহিতৈষী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিনওয়েলের দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। সাহেবের জেলায় দুর্ভিক্ষ দেখা গেছে। তিনি সরেজমিন দুর্ভিক্ষের অবস্থা দেখতে ঘোড়ায় চড়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। পথে এক কৃষকের সঙ্গে দেখা। সাহেব বাংলা পরীক্ষা পাস দিয়ে পুরস্কার পেয়েছেন, সুতরাং তিনি সেই কৃষকের সঙ্গে বাংলা ভাষাতেই কথাবার্তা চালাতে মনস্থির করলেন। সাহেবের প্রশ্ন, ‘টোমাদিগের গুড়ামে ডুরবেক্কা কেমন আছে?’ (তোমাদের গ্রামে দুর্ভিক্ষ কেমন?) সাহেব যদি দুর্ভিক্ষের চলতি শব্দ ‘আকাল’ কথাটি ব্যবহার করতেন, তবে সব গোল মিটে যেত, চাষীও সদুত্তর দিতে পারত। বঙ্কিমের এ কাহিনী সবাই জানেন বলে এর পরে কী হয়েছিল তা বলে পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি করতে চাই না। বঙ্কিম নিজে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ফলে সাহেবদের সঙ্গে গাঁগঞ্জে সারা জীবন কাজ করেছেন। দুর্ভিক্ষকে ডুরবেক্কা বলা ম্যাজিস্ট্রেট তার দেখা ছিল বলেই মিনওয়েল সাহেবের দৃষ্টান্ত দিতে পেরেছেন। এবার কবি নবীনচন্দ্র সেনের দেয়া যশোরের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলা জ্ঞানের পারদর্শিতা সম্পর্কে দৃষ্টিপাত করা যাক।
একটি ৪ পয়সা উৎকোচ গ্রহণের মামলায় নবীন চন্দ্র যশোরের নতুন জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট কুইন সাহেবের এজলাসে জবানবন্দি দিতে হয়েছিল। কুইন সাহেব সাক্ষ্য বাংলায় দিতে বললেন। কারণ তিনি বাংলা বেশ ভালো বোঝেন। ইংরেজি সাক্ষ্য দিলে আসামির মোক্তাররা আপত্তি জানাতে পারে।
নবীন চন্দ্র বাংলাতে জবানবন্দি দিতে লাগলেন। নবীনের চোস্ত বাংলা শুনে সাহেব ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। নবীন লিখেছেন, কোনো বিষয়ে অজ্ঞতার পরিচয় দেয়া শ্বেত চর্মের পক্ষে মৃত্যুর অধিক। সাহেবের যেখানে বুঝতে অসুবিধা হয়েছে, তা জিজ্ঞাসা করে পরিষ্কার অর্থ বুঝে নিলে হবে— তা না করে তিনি একটু থেমে থেমে লিখে যেতে লাগলেন। জবানবন্দি শেষ হলো। পড়ে শোনাবেন কিনা, নবীন চন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করলেন। নবীন পড়ে শোনাতে অনুরোধ করলেন। কখনো কোথায় যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, তবে তা শোধরানো যাবে।
সাহেবের পড়া শুনে নবীন যেন হতবাক। তিনি অধিকাংশ স্থানেই নবীনের বাংলার অদ্ভুত ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। ডেপুটি নবীন সেন লাইনে লাইনে আপত্তি করতে লাগলেন এবং বাংলায় কী বলেছেন, তার ইংরেজি অনুবাদ করতে লাগলেন আর জয়েন্ট সাহেব নিজের অনুবাদ কাটতে শুরু করলেন। পরে নিতান্ত লজ্জিত হয়ে নবীন সেনকে বিদায় দিলেন। এর কয়েক দিন পর কলকাতার ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকায় সিভিলিয়ানকৃত একখানি জবানবন্দির কাল্পনিক নমুনা বের হয়েছিল। প্রথম বাদীর জবানবন্দি, পরে জবানবন্দির বিচিত্র ইংরেজি অনুবাদ।
নবীন চন্দ্র ব্যাপারটির একটি মোটামুটি বর্ণনা তার বইয়ে দিয়েছিলেন, যেটি নিম্নরূপ:
১। বাদীর জবানবন্দি:
আমি মধু ধরের হাটে কারবার করি। আমি আমার ঘরের পোতায় বসিয়াছিলাম। উঠিয়া প্রস্রাব করিতে গেলাম। আসামি আমাকে আসিয়া ধরিল এবং ঘুষা মারিতে লাগিল। আমি চিত্কার করিতে লাগিলাম।
২। ইংরেজি অনুবাদ:
I manage my affairs through Madhu Dhar. I was sitting with may grandchild. I went out to make a proposal. Accused Caught hold of me, laid me flat on my back, and offered me bribes.
৩। সাহেব বাংলা অনুবাদ করিয়া সাক্ষীকে পড়িয়া শুনাইতেছেন— সাহেব।
টুমি করে কারবার মধু ধরের হাটে? (সাহেবদের ‘ত’ উচ্চারণ হয় না। তাঁহার বলিবার ইচ্ছা ছিল ‘হাতে’।)
বাদী। হাঁ হুজুর।
সা। টুমি বসিয়াছিলে টোমার পোটার কাছে?
বা। হাঁ হুজুর।
সা। টুমি করিটে গেলে প্রস্টা-ব।?
বা। হাঁ হজুর।
সা। সে টোমাকে ধরিল, করিল চিট, কবুল করিল ঘুষ।
বা। হাঁ হজুর।
সাহেব লিখিলেন, ‘‘Read over to the witness and admitted correct.’’
নবীনচন্দ্র এ প্রসঙ্গে আরো জানাচ্ছেন—
‘যদিও পত্রিকাতে সাহেবের নাম ছিল না, সকলে বুঝিল— জইণ্ট সাহেব এবং উহা আমার জবানবন্দির শ্লেষ। যশোহরময় কি বাঙ্গালী, কি ইংরাজ মহলে একটা হাসির ধুম পড়িয়া গেল। জইণ্ট বড়ই অপ্রস্তুত হইলেন।’ এর দু-এক দিন পরে তার সঙ্গে দেখা করিতে গেলেন নবীন সেন। সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি সে দিন যে জবানবন্দি দিয়াছিলেন, উহা কি ভাষায়?’
উ। বাংলা ভাষায়।
সাহেব। কই, এরূপ বাংলা ভাষা তো অন্য সাক্ষীরা বলে না?
উ। সাক্ষীরা প্রায় ইতর লোক। ভদ্র ও ইতরের ভাষা, শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের ভাষা তো এক হতে পারে না। আপনার ভাষা ও আপনার দেশের ইতর লোকের ভাষা কি এক?
কেবল সাহেব সিভিলিয়ানরা নন, সাহেব পাদ্রিরাও বাংলা ভাষা শিখে দেশীয়দের ধর্মান্তরিত করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল প্রবল উৎসাহে। তাদের বেশির ভাগই এক অদ্ভুত উচ্চারণে সাধু বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে আত্মপ্রসাদে তৃপ্তি পেতেন। বাংলা জানেন বলে বেশ একটু গোমর ছিল তাদের। কেরি সাহেবের জাত ভাই হলেও বাংলা ভাষায় ন্যূনতম দক্ষতা ছিল না তাদের।
১৮৬০-এর শেষ দিকে এমনি এক বাংলা ভাষা জানা সাহেব পাদ্রির কথা বর্ণনা করেছেন প্রমথ চৌধুরীর ভগ্নী প্রসন্নময়ী দেবী তার ‘পূর্বকথা’ গ্রন্থে। তিনি তখন কৃষ্ণনগরে ছিলেন। এক ফিরিঙ্গি মেম তাদের ইংরেজি পড়াতেন। এই শিক্ষিকার উত্তেজনায় তিনি একদিন সঙ্গিনীসহ ওই শহরের ক্যাথলিক চার্চে যান। তাদের সম্মানার্থে সেদিন চার্চে বাংলায় বক্তৃতা হলো, পাদ্রি মহাশয় ভাবভঙ্গি সহকারে বলতে লাগলেন, ‘দ্যাক জানানা গন, সয়টান ডারের (দ্বারের) নিকটে, প্রভুর প্রেরণ। টাহার ধর্ম তোমরা লইবে কিনা বোলো? ঘুঁট (গোবরের ঘুঁটে) যেমন আগুনে গলে যায় টেমনি টোমরা নরকে গলে যাবে। সয়টান চুলে ঢরিয়া বেঢর্মিকে লয়ে যাবে। গায়ে লোহা ডিবে।’ তিনি আরো লিখেছেন, এ রকম প্রচারকার্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের পত্মীরা অর্থাৎ মেম সাহেবরা পরোক্ষভাবে সহায়তা করতেন।
সাহেবদের মধ্যে দেশীয় ভাষায় দক্ষ ও পণ্ডিত ব্যক্তি কম ছিলেন না। জন বিমসের কথা কে না জানেন। বাংলা তথা ভারতের সব ইংরেজ সিভিলিয়ানই যে উৎকেন্দ্রিক এবং স্বেচ্ছাচারী ছিলেন, এমন একপেশে ধারণা তৈরি করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। ন্যায়নিষ্ঠ, কর্তব্যপরায়ণ এবং সুবিচারপ্রবণ মার্জিত রুচির সিভিলিয়ানের সুখ্যাতির অভাব ছিল না। হেয়ার সাহেব, পাদ্রি কেরি এবং বিচারক জোন্স তো আজ ও তাদের সদাশয়োক্তি ও মহানুভবতার জন্য স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। নারীশিক্ষর প্রসারে বেথুন সাহেব ড্রিংক ওয়াটার বিটন আজো বাঙালির স্মৃতিতে উজ্জ্বল। নীলকরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বহু ইংরেজ সিভিলিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন। সিটনকার সাহেব নীলচাষীদের প্রতি সহানুভূতির জন্য তার উপরিয়ালাদের বিরাগভাজন হতেও দ্বিধা করেননি। এদের সবার সমবেত চেষ্টার ফলেই সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ইংরেজ শাসনকর্তারা ঔপনিবেশিক বাংলায় নানা সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলনে সক্রিয় সহযোগিতা দিতে পেয়েছিলেন।





