মূল: জ্যাক জাইপস   

ভাষান্তর: শানজিদ অর্ণব

গ্রীম ভাইদের রূপকথা আমরা অনেকেই পড়েছি। আগেও পড়া হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের, নানা ভাষার শিশু-কিশোররা এ দুই ভাইয়ের সংগ্রহ করা রূপকথা পড়ে বড় হয়েছে। দুই খণ্ডে এ দুই ভাইয়ের রূপকথা প্রকাশিত হয়েছিল ১৮১২ ও ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে। দুই ভাইয়ের কীর্তি প্রকাশের দুই শতক পার হয়েছে কয়েক বছর আগে। কিন্তু বই সবাই পড়লেও দুই ভাই সম্পর্কে জানাশোনা মানুষের সংখ্যা বেশ কম।

বইয়ের প্রথম সংস্করণটি ও ১৮৫৭ সালের সংস্করণটির মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। ১৮১২ থেকে ১৮৫৭ সালের মধ্যে গ্রীম ভাইদ্বয় বইটির সাতটি ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। প্রথম সংস্করণের পর তারা সূচি ও আঙ্গিকে প্রচুর পরিবর্তন আনেন। লোকগাথা ও রূপকথা নিয়ে তাদের ধারণায়ও পরিবর্তন আসে। জ্যাক জাইপস মনে করেন, জার্মান সাহিত্যের তথাকথিত পণ্ডিত ও গ্রীম ভাইদের রূপকথা বিশেষজ্ঞরাও প্রথম সংস্করণটি নিয়ে ভালো জানেন না। সাধারণ পাঠক ও বিশেষজ্ঞ সবারই ‘অজ্ঞতা’ এক্ষেত্রে প্রকট। তাই এ সংস্করণটিকে অনুসন্ধান করাটা নিঃসন্দেহে উত্তেজনাকর।

প্রথম সংস্করণটিকে মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এটা শুধু জার্মান লোককথাই নয়, বরং পুরো ইউরোপের জন্য একটি অনন্য অবদান। এ সংস্করণটিই ইউরোপ ও গ্রেট ব্রিটেনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মৌখিক লোকগল্পগুলোকে লিখিত রূপ দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তাকে মূর্ত করে এবং একই সঙ্গে পথও দেখায়। ফোকলোর বিশেষজ্ঞরাও গ্রীম ভাইদের উদ্যোগে পথের দিশা খুঁজে পান।

সে সময়ের সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিলে গ্রীম ভাইদের কীর্তির গুরুত্ব একটু ভালোভাবে অনুভব করা যাবে। তাদের সেই প্রথম সংস্করণটি এক কথায় সাহিত্যের দুনিয়াকে আলোকিত করেছিল। তাই এর পেছনের ইতিহাসটা একটু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুরুতেই আমাদের মাথায় রাখতে হবে, লোককথা সংগ্রহ কেবল দুই ভাইয়ের কাজের একেবারে সামান্য একটি অংশ। বেঁচে থাকলে অবাক হতেন এই দেখে যে, শব্দতত্ত্ব নিয়ে তাদের অসাধারণ ও বিপুল কাজ থাকলেও তারা বিখ্যাত হয়ে আছেন কেবল লোককথার সংগ্রহ নিয়ে। দুই ভাই ইয়াকব (১৭৮৫) ও ভিলহেম (১৭৮৬) যখন উনিশ শতকের শুরুর দিকে বিভিন্ন লোককথা ও সংগীত সংগ্রহ করতে শুরু করেন, তখন তারা ইউনিভার্সিটি অব মারবার্গের তরুণ, দারুণ উদ্যমী দুই ছাত্র। ১৮০৫ সালে তাদের পুরো পরিবার হানাউ গ্রাম থেকে কাছের বিভাগীয় শহর কাসেলে চলে আসে। অর্থ সংকটে দুই ভাইকে পারিবারিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। কয়েক বছর আগে তাদের বাবা মারা গিয়েছিলেন এবং মায়েরও তখন যায় যায় অবস্থা। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলো নেপোলিয়নের যুদ্ধের কারণে। ইয়াকব পড়াশোনায় বিরতি দিয়ে কিছুদিন ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে হেসিয়ান ওয়ার কমিশনে কাজ করেন। এর মধ্যে ভিলহেম আইন পরীক্ষায় পাস করেন। তিনি সামান্য বেতনে রাজকীয় গ্রন্থাগারে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৮০৭ সালে ফরাসিরা কাসেল দখল করার পর ইয়াকব ওয়ার কমিশনে তার চাকরি হারান। অবশ্য তখন তিনি নেপোলিয়নের ভাই নতুন রাজা জেরোমের গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ পেয়ে যান। জেরোম তখন ওয়েস্টফালিয়ার শাসক। এতসব উত্থান-পতনের মধ্যে ১৮০৮ সালে তার মা মারা যান। ইয়াকব ও ভিলহেমের কাঁধে তখন তাদের ছোট তিন ভাই ও বোনের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে। মায়ের মৃত্যু, প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবন কাটালেও ১৮০৫ থেকে ১৮১২ সময়ে দুই ভাই মধ্যযুগের সাহিত্যের ওপর প্রবন্ধ ও বই প্রকাশ করে জার্মান ফাইয়োলজির ক্ষেত্রে একজন মেধাবী পণ্ডিত হিসেবে আবির্ভূত হন। সেই ২০ বছর বয়সের কোটাতেই তারা দুই ভাই লোককথার যে সংগ্রহ প্রকাশ করেন, তা ২০ শতকে জার্মানি ও ইউরোপে জনপ্রিয়তার নিরিখে বাইবেলের পরই স্থান পায়।

পুরনো জার্মান সাহিত্য নিয়ে গ্রীম ভাইদের আগ্রহ ও বিস্ময়ের মূলে ছিল তাদের একটি বিশ্বাস— সংস্কৃতির সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রকৃত রূপ, যা কোনো সমাজকে সংযুক্ত রাখে তা হলো ভাষাবিদ্যাগত ও প্রাচীন সময়ে লুক্কায়িত। তারা আরো মনে করতেন যে, আধুনিক সাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ হওয়ার পরও সেগুলো কৃত্রিম এবং তা কোনো জাতির মৌলিক আবেগকে ধারণ করতে পারে না। এ আবেগ মানুষের সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয় এবং মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে। তাই দুই ভাই প্রাচীন গল্পের সন্ধানে দিন-রাত এক করে ফেলেন। তাদের বন্ধু রোমান্টিক কবি ক্লেমেন্স ব্রেন্টানো ১৮০৮ সালে দুই ভাইকে লোকগাথা সংগ্রহ করতে উৎসাহ দেন এবং সেগুলোকে রূপকথার একটি বইয়ের সংকলনে প্রকাশ করার ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান। ১৮১০ সালে দুই ভাই ক্লেমেন্সকে ৫৪টি গল্প সংগ্রহ করে পাঠান। কিন্তু ক্লেমেন্স ওলেনবুর্গ মনেস্ট্রিতে পাণ্ডুলিপিটি হারিয়ে ফেলেন এবং সেগুলোকে আর কোথাও প্রকাশ করেননি। সৌভাগ্যবশত গ্রীম ভাইয়েরা ক্লেমেন্সকে পাঠানো গল্পগুলো নিজেদের কাছে কপি করে রেখেছিলেন। এর মধ্যে গ্রীম ভাইয়েরা বন্ধু, পরিচিতদের কাছ থেকে গল্প সংগ্রহ করতে থাকেন। একটা সময় তারা বুঝতে পারেন, ক্লেমেন্স তাদের গল্পগুলো নিয়ে বই প্রকাশ করবে না। তারা দুই ভাই আরেকজন রোমান্টিক লেখক আখেম ফন আখেমকে দিয়ে তাদের বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। গল্পের সংখ্যা এবার দাঁড়ায় ৮৬। বইটি প্রকাশ হয় ১৮১২ সালে এবং আরো ৭০টি প্রকাশ হয় ১৮১৫ সালে। দুটো সংগ্রহ নিয়ে তৈরি হয় বইয়ের প্রথম সংস্করণ। গল্পগুলোয় তারা টীকা যোগ করেন এবং জ্ঞানগর্ভ ভূমিকা যুক্ত করেন।

প্রথম সংস্করণ প্রকাশের সময় দুই তরুণ গ্রীম ভাইয়ের লোককথা-বিষয়ক ধারণা পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছিল তেমনটা নয়। এমনকি দুই ভাইয়ের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে মতপার্থক্যও ছিল। গ্রীম ভ্রাতৃদ্বয় সব ধরনের প্রাচীন স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে চাইছিলেন, এসবই যেন তাদের কাছে পবিত্র ও মহামূল্য কোনো রত্ন। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন— তাদের সংগ্রহের তালিকায় কিন্তু শুধু রূপকথা ছিল না, বরং তারা গল্প, পুরাণ, গান, উপকথা, কিংবদন্তি, মহাকাব্য, দলিলও সংগ্রহ করেছেন সমান উৎসাহে। তারা সংস্কৃতির বিবর্তনের মূল সূত্রটি চিহ্নিত ও আলোচনা করতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে তারা দেখাতে চেয়েছেন, কীভাবে ভাষা সাধারণ মানুষের প্রয়োজন, প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠানের ওপর ভিত্তি করে বিকশিত হয় এবং সমাজের মধ্যে বন্ধন তৈরি করে ও সভ্যতা নির্মাণে সহায়তা করে। তারা রূপকথার সংগ্রহকে একটি শিক্ষাবিষয়ক নির্দেশনা বলে অভিহিত করেছিলেন। কারণ তারা মনে করতেন, রূপকথা জার্মান জনগণ ও ইউরোপের অন্যান্য জাতির মৌলিক মূল্যবোধকে তুলে ধরে। রূপকথাগুলো মানুষকে গল্পের মাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতা বিষয়ে আলোকিত করে। মজার বিষয় হচ্ছে, সেই তরুণ বয়সে গ্রীম ভাইয়েরা বুঝতে পারেননি যে, তাদের সংগ্রহ করা রূপকথা শুধু জার্মান বা শুধু ইউরোপের মানুষই নয়, বরং পুরো দুনিয়ার মানুষের কাছেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। দুনিয়ার প্রতি না হলেও অন্তত পশ্চিমা সভ্যতার জন্য গ্রীম ভাইদের সংগ্রহ কী ধরনের ভূমিকা রেখেছিল, সেটা বুঝতে তাদের লেখা ভূমিকায় একটু চোখ বোলাতে হবে:

‘সম্ভবত এ রূপকথাগুলো সংগ্রহের এটাই উপযুক্ত সময়। কারণ যারা এগুলো সংরক্ষণের জন্য চেষ্টা করেছেন, তাদের খুঁজে পাওয়াটা দিনে দিনে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে এটা নিশ্চিত, যারা জানেন তারা অনেক কিছু জানেন। কারণ মানুষ মারা গেলেও গল্পগুলো বেঁচে থাকে।... যেখানে গল্পগুলো এখনো টিকে আছে, সেখানে কেউ এসব নিয়ে চিন্তিত নয় যে, গল্পগুলো ভালো না মন্দ, কাব্যিক না অশ্লীল। আমরা এসব গল্প জানি এবং ভালোবাসি। কারণ এগুলো আমরা এক বিশেষ পদ্ধতিতে শুনেছি। কারণ ছাড়াই আমরা এদের ভালোবাসি। এসব গল্প বলা একটি বিশেষ প্রথা।’

গ্রীম ভাইয়েরা মানুষের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার ও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির জন্য গল্প বলার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে কথা বলেন। তারা বিশ্বাস করতেন, রূপকথা ও তার সব বিভাগ স্বতন্ত্র এবং এরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জীবিত রাখে। তারা বৈচিত্র্য ও পার্থক্যকে সম্মান করতেন। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, ‘আমাদের সংগ্রহের উদ্দেশ্য কেবল কাব্যের ইতিহাস সংরক্ষণ নয়। আমাদের উদ্দেশ্য এ কাব্য মানুষের মনে আনন্দ বয়ে আনুক এবং এ কারণে এটা একটা শিক্ষাবিষয়ক নির্দেশনাও হয়ে উঠুক।’

জার্মান লোককথা ও রূপকথার আরো অনেক সংগ্রহ আছে। কিন্তু আর কোনো সংগ্রহই গ্রীম ভাইদের সংগ্রহের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়। দুই ভাই জার্মানভাষী সব অঞ্চল থেকেই গল্প সংগ্রহ করেছিলেন। ১৮১১ সালে ইয়াকব তার বন্ধু ও পণ্ডিতদের কাছে পাঠানোর জন্য একটি আবেদন লিখেছিলেন ‘জার্মান কবিতা ও ইতিহাসের বন্ধুদের প্রতি আবেদন’ শিরোনামে। এটি কারুর কাছে আর পাঠানো হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে আরো উন্নত মানের একটি আবেদনের ভিত ছিল এই প্রথম খসড়াটি। ১৮১৫ সালে ইয়াকব নতুন আবেদনটি প্রিন্ট করে অনেকের কাছে পাঠান। এ আবেদনের কিছুটা অংশ পড়লেই গ্রীম ভাইদের কাজের উদ্দেশ্য ও মূলনীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

সম্মানিত মহোদয়!

একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা সমগ্র জার্মানিজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে চায়। এ সংঘের উদ্দেশ্য অস্তিত্বমান জার্মান পদ্য ও গদ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা। আমাদের পিতৃভূমি এখনো এসব সম্পদে পূর্ণ। আমাদের সৎ পূর্বপুরুষরা এসব গল্প আমাদের জন্য রেখে গেছেন। উপহাস সহ্য করে এগুলো এখনো টিকে আছে। গবেষণা ব্যতীত আমাদের সাহিত্য, ইতিহাস ও ভাষাকে সেই পুরনো চেহারায় চেনা যাবে না। তাই আমরা চাই নিচের বিষয়গুলো সংগ্রহ করতে এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে সেগুলোকে লিখিত রূপ দিতে।

১. লোকগান ও ছড়া

২. কাব্যের ভাষায় রূপকথা। শিশুদের যেসব জাদু, দৈত্য, বামন, দানোদের সম্পর্কে শোনানো হয়।

৩. কৌতুকের মাধ্যমে শিক্ষণীয় বিভিন্ন আচরণ, কৌশল।

৪. লোক উৎসব, প্রথা, খেলাধুলা

৫. কুসংস্কার

৬. বাগ্ধারা, অদ্ভুত আঞ্চলিক ভাষা, নীতিকাহিনী ও শব্দের খেলা।

এসব উপাদান বিশ্বস্ততার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কিছু কাটাছেঁড়া করা যাবে না। সম্ভব হলে বক্তার মুখের কথা অনুসারেই হুবহু লিখতে হবে। স্থানীয় ভাষায় সংগ্রহ করতে পারলে সেটা হবে দ্বিগুণ মূল্যবান। অন্যদিকে পুরোটা না পেলেও সেই উপাদানকে ফেলে দেয়া যাবে না। আবার একই গল্পের বিভিন্ন ধরনও স্বতন্ত্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ।... আমাদের পরামর্শ থাকবে এগুলো সংগ্রহ আগেই হয়েছে এমন কোনো মত দিয়ে ধোঁকা না খাওয়ার। এ রকম কথা শুনে কোনো গল্পকে বাদ দেয়া যাবে না।

ওপরের চিঠিসহ গ্রীম ভাইদের সংগ্রহের প্রথম সংস্করণটি জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও সুইস লোকগবেষকদের বিপুলভাবে উৎসাহিত করে এবং ইউরোপজুড়ে লোকগবেষকরা লোককথা সংগ্রহ শুরু করেন। প্রথম সংস্করণটিতে গ্রীম ভাইদের উদ্দেশ্য সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এ সংস্করণেই গল্প বলিয়েদের স্বরটা শোনা গিয়েছিল স্পষ্টভাবে, কিছু গল্প ছিল একেবারে স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায়। পরবর্তী সংস্করণগুলোয় সম্পাদনার ফলে এ আমেজটি নষ্ট হতে থাকে। পাঠকদের রুচি আর তাদের সন্তুষ্ট করতে গিয়েই দুই ভাইকে এসব পরিবর্তন করতে হয়।

প্রথম সংস্করণের অনেক গল্প গ্রীম ভাইয়েরা পরবর্তী সংস্করণে বাদ দেন। কারণ ছিল তারা এ গল্পগুলোর জার্মান উৎস নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। তাদের মনে হচ্ছিল, অনেক ফরাসি কাহিনীও সেখানে ঢুকে পড়েছে। পরবর্তীতে তারা বুঝেছিলেন যে, এ পদ্ধতি ভুল। কারণ এসব রূপকথার উৎস নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

প্রথম সংস্করণের গল্পগুলো ছিল ছোট আকারের, কিন্তু একেবারে লক্ষ্যভেদী। এগুলো ছিল একেবারে কাঁচা জিনিস। পরবর্তীতে সেগুলোকে ঘষামাজা করে ভদ্রস্থ চেহারা দেয়া হয়। পাঠকরা আরো খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, প্রথম সংস্করণের গল্পগুলোয় বিবরণ কম, গল্পের দ্বন্দ্ব ও কর্মের ওপরই জোর বেশি ছিল। কারণ গল্প বলিয়েরা জাদু, কুসংস্কার, অলৌকিক ঘটনা দিয়ে সত্য তুলে ধরতে চাইতেন। তাই বিবরণ কম কাজ বেশি।

গ্রীম ভাইয়েরা প্রথম সংস্করণের গল্পগুলো সংগ্রহ করেছিলেন মূলত শিক্ষিত ও তাদের পরিচিত মানুষের কাছ থেকে। এছাড়া বই ও বিভিন্নজনের চিঠির মাধ্যমে পাঠানো গল্পও তারা সংগ্রহ করেছিলেন। সমালোচকরা গ্রীম ভাইদের সমালোচনা করেন প্রথম থেকে সপ্তম সংস্করণ পর্যন্ত গল্পগুলোকে সম্পাদনা করার জন্য। অর্থাৎ তারা যা শুনেছিলেন, শেষ পর্যন্ত গল্পগুলো আর সে রকম থাকেনি। অনেকে বলেন, গ্রীমদের রূপকথা প্রকৃত গল্পগুলো নয়। তবে এ দাবি অনেকটাই অসার। কারণ কারো পক্ষেই কোনো গল্পের মৌলিকতা চিরদিন অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব নয়। এটা অসম্ভব। বরং লোককথা ও গল্পের সংগ্রাহক, সম্পাদক, অনুবাদক, প্রকাশক হিসেবে গ্রীম ভাইদের প্রতি সবার কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। তারা এক অসাধ্যকে সাধন করেছিলেন। অসংখ্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে তারা তাদের উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। তাদের সংগ্রহের সেই প্রথম সংস্করণটি হারানো অনেক স্বরের কথা আজীবন স্মরণ করিয়ে দেবে।