১৮৫৪ সালে লন্ডনের ব্রড স্ট্রিটে যখন কলেরা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ল, তখন ইংরেজ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী জন স্নো (১৮১৩-৫৮) ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন কলেরা ঠিক কীভাবে ছড়াল, তা নিয়ে অনুসন্ধান করতে। ব্রড স্ট্রিটে সরেজমিন অনুসন্ধান করে তিনি দেখলেন, ব্রড স্ট্রিটে পানীয় জলের উৎস মাত্র দুটি কল। যেসব ব্যক্তি এরই মধ্যে কলেরা আক্রান্ত হয়েছে বা কলেরায় ভুগে মারা গেছে, তারা সবাই একটি নির্দিষ্ট কলের জল পান করেছিল বলে তথ্য মিলল। অতএব ডা. স্নোর তল্লাশি ঘুরতে থাকল ওই দাগাপ্রাপ্ত কলটিকে ঘিরে। পরে খুঁজে পেতে দেখা গেল, ওই কলের পাইপ ভূগর্ভস্থ সুয়ারেজ লাইনের সঙ্গে কেমন করে যেন সংযুক্ত হয়ে যাওয়াতেই মূল বিপত্তি। কলের জল চূড়ান্তভাবে দূষিত হয়ে পড়েছিল। পরে কলটি বন্ধ করে দিলে ব্রড স্ট্রিটে কলেরার মহামারী কিছুটা হলেও থেমে যায়। ডা. স্নো ওই হিসেবে কলেরার বীজাণু আবিষ্কারে কোনো পেশাদার অণুজীববিজ্ঞানীর মতো ভূমিকা রাখেননি। কিন্তু কলেরা যে দূষিত পানির মারফত ভয়ানকভাবে, সে বিষয়টি তিনি নিজের কাণ্ডজ্ঞান দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনিই প্রথম উন্মোচন করেন।
এরপর কলেরার বীজাণুকে চিহ্নিত করার মূল উদ্যোগটি নেন জন স্নোর এক বছর আগে জন্ম নেয়া ইতালীয় বিজ্ঞানী ফিলিপ্পো পাসিনি (১৮১২-১৮৮৩)। ব্রড স্ট্রিটে যখন কলেরার উৎসমুখ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন স্নো, তখন ইতালির ফ্লোরেন্স শহরেও ছড়িয়ে পড়ছে কলেরা। পাসিনিও তাই আগ্রহী হয়ে উঠলেন রোগটি নিয়ে। পাসিনি একাধিক কলেরায় মৃত রোগীর ময়নাতদন্ত করে তাদের অন্ত্রের শ্লেষ্মা খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন। অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে শ্লেষ্মা পরীক্ষা করার সময় তিনি একটি নলাকার জীবাণু বা ব্যাসিলাসের দেখা পান। তবে অন্য ব্যাসিলাসের মতো এটি পুরোপুরি লম্বাকার ছিল না। মাথাটা খানিক বাঁকা ছিল। কমা আকৃতির যেন বা। পাসিনি জীবাণুটির নাম দেন Vibrio। নিজের আবিষ্কৃত এ জীবাণু ও কলেরার সঙ্গে এর সংযোগ নিয়ে ১৮৫৪ সালেই তিনি একটি গবেষণাপত্র রচনা করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘Microscopical observations and
pathological deductions on cholera’।
পাসিনির প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিজ্ঞানের ইতিহাসে জার্মান চিকিৎসক ও অণুজীববিজ্ঞানী রবার্ট কখকে (১৮৪৩-১৯১০) কলেরার জন্য দায়ী মূল ‘আসামি’ যে কীটাণু, তাকে প্রথমবারের নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার কৃতিত্ব দেয়া হয়। ১৮৮৩ সালে কখ মিসরে কলেরা ছড়িয়ে পড়ায় তার কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে সেখানকার আলেকজান্দ্রিয়া শহরে গবেষণার উদ্দেশ্যে গমন করেন। ওই বছরের শেষে কখের দল কলকাতায়ও গবেষণা চালান। পরে ১৮৮৪-এর ৭ জানুয়ারি কখ একটি বিবৃতিতে জানান, তিনি কলেরার জন্য দায়ী ব্যাসিলাসটিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এর এক মাস পর কখ ডায়ারিয়ার জীবাণুর সঙ্গে কলেরার কী তফাত তা আলাদা করে জানান। ওই সময় তিনি আরো বলেন, ভেজা ভূমি ও সিক্ত আবহাওয়ায় কলেরার বীজের সর্বাধিক বাড়বাড়ন্ত হয়।
রাজনৈতিক চাপান উতোরে ধামাচাপা জাওমি ফেরানের অভিনব আবিষ্কার
বহুবিধ সাফল্য সত্ত্বেও রবার্ট কখের ব্যর্থতা ঠিক এখানেই যে তিনি কলেরার প্রকৃত প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেননি। প্রায় ওই সময়েই স্প্যানিশ বিজ্ঞানী জাওমি ফেরান ক্লুয়া (১৮৫১-১৯২৯) কলেরা ও এর প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেন। বিজ্ঞান গবেষণার জগতে রবার্ট কখের প্রতিপক্ষ ছিলেন ফেরানের গুরু লুই পাস্তুর। কখের গবেষণার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে কলেরার প্রতিষেধক তৈরিতে ফেরান তাই বেছে নিলেন গুরুর পদ্ধতিকেই। ‘ফাউল কলেরা’ নামে পরিচিত মুরগির এক ধরনের রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে পাস্তুর আক্রান্ত প্রাণীর রক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কীটাণু ও তা বৃদ্ধির দায়ী যে এনজাইম, তাকে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফেরানের ধারণা হলো, রক্তে কলেরার বীজ থেকে এ এনজাইমকে আলাদা করতে পারলে দেহে ঢুকে পড়া জীবাণুকে দুর্বল করে ফেলা যাবে। কলেরার জীবাণুকে বেয়াড়া ও ভয়ংকর দশা থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য অবস্থায় আনার এটা একটা ভালো উপায় হতে পারে বৈকি। ফেরান তার এ সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে তুলে ধরে একটি গবেষণাপত্র লিখলেন ‘Memory on
bacterial parasitism’ শিরোনামের ওই অভিনব গবেষণাপত্রটি ১৮৮৪ সালেই মাদ্রিদের রয়েল মেডিকেল একাডেমির পক্ষ থেকে পুরস্কৃত হয়। আবার ওই একই বছর কলেরা ফ্রান্সে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৮৪-এর আগস্টে বার্সেলোনার সিটি কাউন্সিল ফেরানকে কলেরাসংক্রান্ত একটি কমিশনের অণুজীববিজ্ঞানী পদে নিয়োজিত করে। কলেরা বিষয়ে বিস্তৃত গবেষণা করতে পারবেন, এমনটা ভেবে তাকে পাঠানো হয় ফ্রান্সের বন্দরনগরী মার্সেলিসে। কারণ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও বন্দর থাকায় মার্সেলিসে কলেরা রোগীর সংখ্যার বাড়বাড়ন্ত হচ্ছিল তখন। মার্সেলিসের হাসপাতালগুলোয় কলেরা রোগীদের পর্যবেক্ষণ করার পর ফেরান ফ্রান্সের আরেক বন্দরনগরী তুলুজেও যান। কেননা ওইখানেই কলেরার কীটাণু আবিষ্কার করেছিলেন রবার্ট কখ। ফ্রান্সে বসেই ফেরান ওই বিশেষ কীটাণুটিকে চিহ্নিত ও আলাদা করতে সক্ষম হন। কিন্তু ওই জীবাণু নিয়ে বার্সেলেনায় ফেরাটা কঠিন ছিল ফেরানের জন্য। ফ্রান্স কর্তৃপক্ষ এ জীবন্ত কীটাণু নিয়ে ফেরতে দেবে কিনা, এমন শঙ্কায় শেষমেশ ফেরান কলেরার কীটাণু একটি দেয়াশলাই বাক্সে লুকিয়ে নিয়ে বার্সেলোনায় ফেরেন। ফরাসি কাস্টমসকে তিনি শেষমেশ ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। অতঃপর জীবন্ত কীটাণুর সাহায্যে ফেরানের কলেরাবিরোধী গবেষণা নতুন মাত্রায় শুরু হলো। ফেরান দেখলেন, রক্তের মধ্যে থাকা কলেরার মারণ জীবাণু দুর্বল হয়ে পড়ে শরীরে জীবন্ত জীবাণুকে ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় প্রবেশ করালে। জীবন্ত কীটাণু দিয়ে তৈরি করা কলেরার প্রতিষেধক পরে নিজের শরীরে ও আরো কয়েকজন বন্ধু-পরিচিতজনের ওপর তিনি প্রয়োগ করেছিলেন। তাতেও সাফল্য এল। চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাই ফেরান নিজের আবিষ্কার বার্সেলোনার সিটি কাউন্সিল ও প্যারিসের একাডেমি অব সায়েন্সে উপস্থাপন করলেন। ১৮৮৪ সালেই স্পেনেও কলেরা দেখা দিয়েছিল। তবে তখনো ততটা মহামারীরূপে ছড়ায়নি। পরের বছর মার্চের মাঝামাঝি স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশের রাজধানী জাতিভা শহরে একজন রেলওয়ে কর্মী কলেরা আক্রান্ত হওয়ার পর সেখানে প্রাদেশিক গর্ভনরের ডাকে ফেরানকে যেতে হয়। কিন্তু জাতিভা শহরের মেয়রের অসহযোগিতার কারণে (মেয়র সাহেব মানতেই চাইছিলেন না যে শহরে কলেরা মহামারীরূপে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এখনকার কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে তার আচরণের মিল আছে বটে) ফেরানকে পরে ফিরে যেতে হয়েছিল। বিধি বাম, পরে শহরে কলেরা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ায় আবার ফেরানের ডাক পড়ে। তখন এপ্রিল মাস। কলেরার প্রতিষেধক গণহারে প্রদানের ব্যবস্থা তিনি করেন নিজের সহযোগীদের সহায়তায়। এর মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েও ফেরান থামেননি। টিকা প্রদান তিনি চালিয়ে যান। কিন্তু কলেরা রোগী আক্রান্তের সংখ্যা কমছিল না। ফেরানকে তখন এক অপপ্রচারের মুখে পড়তে হয়। তার বিরুদ্ধে থাকা বিজ্ঞানীরা বলতে থাকেন, ফেরানের প্রতিষেধক বুমেরাং হয়েছে এবং তা উল্টো কলেরার শক্তি বাড়িয়েছে। অবশ্য ফেরান মনে করতেন, ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশের দুর্বল স্যানিটেশন ও পানীয় জলের সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে সেখানে কলেরা বেশি ছড়িয়েছিল। বিশুদ্ধ পানি পানে বাধ্য করা ও কলেরা রোগীদের বিচ্ছিন্ন আকারে রাখার ব্যবস্থা করার পর রোগীর সংখ্যা কমেছিল। কিন্তু এটুকুর ব্যবস্থা করাও সম্ভব ছিল না অনেক ক্ষেত্রেই। তার জন্য আর ফেরান দায়ী নন, দায়ী স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনীতিবিদেরা। যদিও ফেরানের আবিষ্কৃত প্রতিষেধক গ্রহণ করা জাতিভা শহরের ৫০০-এরও বেশি মানুষের মধ্যে মারা গিয়েছিল মাত্র ৫৪ জন। ফেরানকে নিয়ে পরে রাজনৈতিক তর্কাতর্কি শুরু হয়। ফলে পরে ফেরান আর কলেরা রোগের প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা সেভাবে করেননি। একদিক থেকে বলতে গেলে তার ব্যক্তিগত উদ্যোগটি যেন রাজনীতির প্যাঁচে আটকে ধামাচাপাই পড়ে গিয়েছিল।
গেমেলিয়াইয়ের পথ ধরে হাফকিনের নতুন উদ্ভাবন
ফেরানের প্রায় সমসাময়িক রুশ চিকিত্সা বিজ্ঞানী নিকোলাই গেমেলিয়াইও (১৮৫৯-১৯৪৯) পেয়েছিলেন লুই পাস্তুরের সান্নিধ্য। তিনিও কলেরার প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। সেন্ট পিটার্সবার্গের মিলিটারি মেডিকেল একাডেমিতে পড়াশোনা করে পরে চিকিৎসক হিসেবে বেশ খ্যাতি পাওয়া গেমেলিয়াই ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সে লুই পাস্তুরের ল্যাবেরটরিতে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। ফেরানের গবেষণার দুর্বলতা ছিল যে তিনি মানুষের দেহে থাকা কলেরার বীজাণুকে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলেন। এতে সর্বদা এক রকম শক্তিসম্পন্ন প্রতিষেধক তৈরি হতো না। ফলে প্রতিষেধকের ক্ষমতা ওঠানামা করত। গেমেলিয়াই প্রতিষেধকের ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে স্থির রাখার লক্ষ্যে গিনিপিগের পাকস্থলীতে কলেরার জীবাণু ঢুকিয়ে দিকে প্রথমে তাকে আক্রান্ত করে পরে গিনিপিগের শরীর থেকে জীবাণু নিয়ে প্রতিষেধক তৈরি করেন। কিন্তু ফেরানের পদ্ধতির ত্রুটি এখানেও দেখা দেয়। প্রতিষেধকের শক্তি একটি নির্দিষ্ট এককে আনতে পারেননি গেমেলিয়াই। মূলত ফেরানের উদ্ভাবিত পদ্ধতিকে মাথায় রেখে পাশাপাশি গেমেলিয়াইয়ের ‘গিনিপিগ ফর্মুলা’-কেও আমলে নিয়ে কলেরার প্রতিষেধক আবিষ্কারকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেন ইউক্রেনে জন্ম নেয়া ওয়াইল্ডমার হাফকিন (১৮৬০-১৯৩০)। হাফকিনের কলেরা নিরাময় প্রচেষ্টার গল্পটা বলার আগে নিকোলাই গেমেলিয়াইয়ের কথা অবশ্য এড়িয়েই যাওয়া হয়। কাকতালীয়ভাবে তিনি ফেরান-গিমেলিয়াইয়ের সমসাময়িক এবং আরো কাকতালীয় ব্যাপার এই, হাফকিনও ছিলেন লুই পাস্তুরের প্রতিষ্ঠিত গবেষণা
n এরপর পৃষ্ঠা ৭
প্রতিষ্ঠানের কর্মী। হাফকিন আবিষ্কার করেছিলেন, গিনিপিগের দেহ থেকে আরো উন্নত মানের প্রতিষেধক পাওয়া সম্ভব, এটা গিমেলিয়াই ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি, কারণ তীরটা তিনি ছুড়েছিলেন ভুল জায়গায়। হাফকিন দেখালেন, গিনিপিগের পাকস্থলীতে নয়, পেরিটিনেয়াল ক্যাভিটি বা উদরের আবরক ঝিল্লিতে বীজাণু ইনজেক্ট করতে পারলে অধিকতর বিশুদ্ধ কলেরার বীজাণু পাওয়া সম্ভব। হাফকিন তার কলেরাসংক্রান্ত গবেষণায় এ রোগের জীবাণুর বৈশিষ্ট্য বিষয়ে আরো কিছু নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত জানান। সেগুলো নিম্নরূপ: ১. কলেরার জীবাণু রোগীর রক্তে উত্পন্ন হয় না, খাওয়ার পানি বা অন্য মাধ্যমে তা দেহে প্রবেশ করার পর তার টক্সিন রক্তে ঢুকে পড়তে থাকে। শরীরে টক্সিন ধ্বংস করার শক্তি থাকা তাই জরুরি। ২. মানুষের দেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় কলেরা প্রতিরোধী শক্তি দেখা যায়। তা অবশ্য সামান্য পরিমাণে। কলেরার বীজাণু থেকে তৈরি প্রতিষেধক ‘বিষে বিষক্ষয়’ প্রক্রিয়ায় এ প্রতিরোধশক্তিকে আরো বাড়াতে সাহায্য করে। ৩. ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের অধিক তাপমাত্রায় কলেরার জীবাণুর শক্তি কমতে থাকে। সুতরাং পানি ফুটিয়ে পান করলে জল মারফত কলেরা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
হাফকিন আরো দেখেছিলেন, একটি গিনিপিগকে অল্প মাত্রার বীজাণু থেকে তৈরি করা ভ্যাকসিন নিয়মিত ইনজেক্ট করলে পরে শক্তিশালী বীজাণু দ্বারাও তারা মারা যায় না। একটি গিনিপিগকে তিনদিনের ব্যবধান রেখে তিন দফায় তিনি ভ্যাকসিন ইনজেক্ট করলেন। পরে চরম শক্তিশালী বীজাণুর ডোজ ইনজেক্ট করা হয়। গিনিপিগটি মারা যায়নি, বহাল তবিয়তেই বেঁচে ছিল। অন্যদিকে আরেকটি গিনিপিগকে প্রথমেই চূড়ান্ত শক্তিশালী বীজাণুর ডোজ ইনজেক্ট করার সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। ওয়াইল্ডমার সিদ্ধান্ত নিলেন, মানবদেহেও এ ভ্যাকসিন কাজ করে কিনা তা জানার জন্য তিনি নিজেকেই এবার পরীক্ষার সামগ্রী হিসেবে বেছে নেবেন। নিজের দেহে পরপর তিনবার তিন ডোজে ভ্যাকসিন নেয়ার পর চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য নিজের শরীরে হাফকিন ঢুকিয়ে দিলেন কলেরার মারণ বীজ। এমন ভয়ানক ঝুঁকি নিয়েছিলেন যে তাতে তার মৃত্যুও হতে পারত। কিন্তু না, হাফকিন বেঁচে গিয়েছিলেন। নিজের উদ্ভাবনের ব্যাপারে আরো নিঃসংশয় হতে তিনি পরে আরো ৬০ ব্যক্তির দেহে ভ্যাকসিনের একই রকম পরীক্ষা চালিয়ে সফলতা অর্জন করেন। হাফকিন পরে কলেরার মহামারী বিশ্বের প্রথম যে এলাকায় দেখা দেয়, সেই ভারতবর্ষে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য, কলেরা প্রতিষেধক নিয়ে ব্যাপক হারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। ওই সময় ভারতের একটি জেলের ৩৯৩ জন বন্দির মধ্যে ২০১ জনকে হাফকিন উদ্ভাবিত কলেরা প্রতিরোধী টিকা দেয়া হয়। পরে কলেরার প্রকোপ দেখা দিলে টিকা না নেয়া বাকি ১৯২ জনের মধ্যে তিনজন আক্রান্ত হয়। একজন মারা যায়। টিকা গ্রহণকারীরা কেউ আক্রান্ত হয়নি। কলকাতায় পরপর দুই দফা দুই ডোজে টিকা নেয়া ১৩৪ জনের মধ্যে মাত্র একজন কলেরায় ভুগে মারা গিয়েছিল। ভারতের অনেক চা বাগানেও হাফকিনের কলেরা টিকা কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়।
হালনাগাদ কলেরা টিকার কথা
বিশ শতকের গোড়ায় জার্মান অণুজীব বিজ্ঞানী উইলিয়াম কোল হাফকিনের ফর্মুলা অনুসরণ করে তুলনামূলকভাবে সহজে উত্পাদনযোগ্য কলেরার টিকা তৈরি করেন। জাপানে বড় আকারে রোগীদের ওপর টিকাটি পরীক্ষা করে সাফল্যও মেলে। সেবনযোগ্য কলেরার টিকা বাজারে আসে ১৯৯০-এর দশকে। ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন সংস্থা এফডিএ Vaxchora নামের কলেরা প্রতিরোধী সেবনযোগ্য টিকার অনুমোদন দেয়। তবে টিকাটি অত্যন্ত উচ্চমূল্যের, পাক্কা ২৫০ ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের আইসিডিডিআর,বি Shanchol নামে পূর্বপরিচিত একটি সেবনযোগ্য ও কম দামি কলেরার টিকা (টিকাটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারাও অনুমোদিত) গণহারে প্রয়োগের পর সম্প্রতি সাফল্য পেয়েছে। ৩ ডলার ৭০ সেন্ট মূল্যের ওই টিকা প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার কলেরা রোগীর ওপর প্রয়োগ করার পর তাদের ৩৭ শতাংশই পূর্ণরূপে সেরে উঠেছেন, যাদের মধ্যে অর্ধেকের অবস্থা মরণাপন্ন ছিল। এটি ছাড়া Dukoral ও Euvichol নামের দুটি কলেরা টিকাও বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনপ্রাপ্ত।





