টিকা আবিষ্কারের আগে মানুষের জীবন ছিল অসহায় ও সংক্ষিপ্ত। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বেশির ভাগ সময়েই মানুষকে কাটাতে হয়েছে প্রতিষেধকহীন অবস্থায়, আর তখন মরণঘাতী ছোঁয়াচে রোগের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক মহামারীতে তারা ছিল বড্ড অসহায়, বিশেষ করে আগে কখনো দেখা যায়নি তেমন কোনো রোগের প্রাদুর্ভাবে। মানুষের এ অসহায়ত্ব সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠেছিল আধুনিক যুগের গোড়ার দিকে আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোয়, যখন গুটিবসন্ত মহামারী ডেকে এনেছিল। স্ক্যানিশ হানাদাররা গুটিবসন্ত থেকে নিরাপদ থাকার কৌশল আয়ত্ত করলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাঝে এ মারণ ব্যাধি ছড়িয়ে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। ১৫৬৮ সাল নাগাদ এ রোগের কারণে অঞ্চলটিতে কমে গিয়েছিল ৩০ লাখ মানুষ, যা ছিল এ গোটা মহাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-দশমাংশ। উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত মহামারী সৃষ্টিকারী রোগগুলো মোকাবেলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় ছিল কোয়ারেন্টিন। সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্তদের সমাজের অন্যদের থেকে পৃথক করে রাখার জন্য গোটা ইউরোপীয় ভূখণ্ডে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল অসংখ্য বিচ্ছিন্নালয়। সংগত কারণেই জীবনের প্রত্যাশিত আয়ু ছিল কম। ১৮ শতক নাগাদ প্রত্যাশিত বৈশ্বিক গড় আয়ু ছিল ২৫-৩০ বছরের মধ্যে, আর বেশির ভাগ জনগোষ্ঠীতেই ৬৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকা মানুষের হার ছিল ৫ শতাংশেরও কম। বুড়ো হওয়া পর্যন্ত মানুষ বেঁচে থাকত খুবই কম।
বিশ্ব গুটিবসন্তের অভিশাপমুক্ত হয় ১৯৮০ সালে। ১৯৭৭ সাল নাগাদ এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কমতে কমতে একজনে এসে ঠেকেছিল। আর গুটিবসন্তে আক্রান্ত এ সর্বশেষ মানুষ ছিল সোমালিয়ার মিরকায় একটি হাসপাতালের বাবুর্চি, স্বাস্থ্যকর্মী আলি মায়াউ মালিন নামের এক যুবক। আলির আগে তিন হাজার বছর ধরে গুটিবসন্ত মানবসমাজকে চরম ভোগান্তিতে নাকানিচুবানি খাইয়েছে, আক্রান্ত করেছে গোটা বিশ্বের যুবক-বৃদ্ধ-ধনী-দরিদ্র-দুর্বল ও প্রাণবন্তদের। কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে ছড়ানো গুটিবসন্ত হলে সারা শরীরে মারাত্মক লাল লাল ফুসকুড়ি ও ক্ষত হতো, শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যেত এবং প্রচণ্ড মাথাব্যথা হতো। এ রোগে আক্রান্ত ৩০ শতাংশ মানুষই মারা যেত এবং বেঁচে যাওয়াদের অনেকেই অন্ধ হয়ে যেত বা তাদের চেহারা বিকৃৎ হয়ে যেত। শুধু বিশ শতকেই এ রোগে মারা গেছে ৩০ কোটি মানুষ এবং সারা বিশ্বে এ রোগ নির্মূল অভিযান শুরু হওয়ার আগে প্রতি বছর পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যেত।
প্রতি এক লাখ মানুষের ভেতর ৩৩ জনই সত্যিকারের হামে ভুগে মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে বা তাদের স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার এটি বাড়তি হিসাব। কেবল ২০১২ সালেই সারা বিশ্বে ভাইরাসজনিত হামে মারা যায় ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ। ১৯৬০-এর দশকে রুবেলার প্রাদুর্ভাবে ২০ হাজার শিশু জন্ম নেয় ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্ক নিয়ে, যার ভেতরে ছিল অটিজম ও অন্যান্য জন্মগত অস্বাভাবিকতা। টিকা প্রয়োগ করে গুটিবসন্ত নির্মূলের আগ পর্যন্ত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে যারা বেঁচে ছিল, তারা অন্ধত্ব, বিকলাঙ্গ বা মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ততার শিকার হয়েছিল। টিকা আবিষ্কারের আগে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টঙ্কার ও হুপিং কফ বা ঘুংড়ি কাশি।
টিকা আবিষ্কারের আগে এসব রোগ ভয়ংকর হুমকি হয়ে উঠেছিল মানবসভ্যতার জন্য। টিকার মাধ্যমেই এসব রোগ নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। এখন এমনকি একজন ডাক্তারকেও এসব রোগ সম্কর্কে জানতে হয় পাঠ্যবই পড়ে। ১৯৪০-এর দশকে কার্যকর টিকা আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত বিশ্বে হাজার হাজর শিশু ডিপথেরিয়ায় ভুগে মারা গেছে। আমেরিকার ইতিহাসে ১৭৩০ ও ১৭৪০-এর দশকে ভয়ানক মহামারী হয়ে দেখা দিয়েছিল রোগটি। ডিপথেরিয়া ভীষণ ভয়ংকর রোগ ছিল শুধু এ কারণেই নয় যে এ রোগ হলে শিশুরা আঁতকে ওঠার মতোই দ্রুত মারা যেত এ কারণেও যে হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে খুবই দ্রুত এটি ছড়িয়ে পড়ত।
১৯৬৭-৮০ সাল পর্যন্ত গুটিবসন্তের অভিশাপ থেকে বিশ্বকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে জোরালো করা হয় টিকাদান কর্মসূচি। ১৯৭৭ সালে এ রোগে আক্রান্ত সর্বশেষ রোগী আলিকে এবং তার সংস্কর্শে আসা সবাইকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দুই বছর ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে বৈশ্বিক টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যায়, যাতে আর কেউই এ রোগে আক্রান্ত না হয়। এর তিন বছর পর, অর্থাৎ ১৯৮০ সালে বিশ্বকে গুটিবসন্ত থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়। মানুষের ইতিহাসে টিকা প্রয়োগ করে কোনো রোগ নির্মূলের ঘটনা এটাই প্রথম।
কেবল গুটিবসন্তই নয়, ভাইরাসজনিত আরো অনেক রোগই মানবসভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল। যতদূর জানা যায়, মানুষের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মহামারী সৃষ্টিকারী রোগটি ছিল প্লেগ, এটি এথেন্সের প্লেগ নামে পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ সালে এথেন্সে এ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। এ সময় স্কার্টানদের সঙ্গে যুদ্ধ করছিল গ্রিকরা। তখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছিল প্লেগ। মাত্র কয়েক দিনেই হাজার হাজার গ্রিক সৈন্য মারা গিয়েছিল এ রোগে। এ সময় শুধু এথেন্সেই ৩০ হাজার মানুষ প্লেগে মারা যায়, যা ছিল ওই নগরীর মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। ৫৪০-৫৪১ সালে মিসরে এক ভয়ানক প্লেগের উত্পত্তি ঘটেছিল। ১৩৩৪ সালে দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন গোটা ইউরোপকে কাঁপিয়ে দেয়। তখন এ মহাদেশে এ রোগে মারা গিয়েছিল আড়াই কোটি মানুষ, যার ৯০ হাজারই ছিল ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের। তবে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত মহামারী ‘দ্য ব্ল্যাক ডেথ’-এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল ১৩৪৬ সালে। কৃষ্ণ সাগরের (ব্ল্যাক সি) উপকূল থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে এটি ব্ল্যাক ডেথ নামে পরিচিত। রোগটি সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল ১৩৪৭-৫১ সাল পর্যন্ত সময়ে। এ সময়ে ইউরোপের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এ রোগে মারা গিয়েছিল। এ মহামারীর প্রকোপ টিকে ছিল অন্তত ২০০ বছর। প্রায় দুই কোটি মানুষ তাতে প্রাণ হারিয়েছিল। প্লেগের তৃতীয় মহামারীটি দেখা দেয় ১৮৬০ সালে, যার উত্পত্তি হয়েছিল চীনে এবং তা ভারত, আফ্রিকা, একুয়েডর, এমনকি আমেরিকায়ও ছড়িয়ে পড়েছিল, যাতে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৮৯০ সালে প্লেগের টিকা আবিষ্কার হয়। তার পরও প্লেগের চতুর্থ মহামারী দেখা দিয়েছিল ১৯১০ সালে, চীনের মাঞ্চুরিয়ায়, যাতে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল।
মহামারী সৃষ্টিকারী আরেকটি রোগ পোলিও। ১৯১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নয় হাজার মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয়েছিল, যাদের ছয় হাজার মারা গিয়েছিল। এ রোগ নির্মূলে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা নিরলস চেষ্টা চালাতে থাকেন। অবশেষে ১৯৫৩ সালের ২৬ মার্চ ড. জোনাস সাল্ক পোলিও রোধে কার্যকর টিকা আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। বিশ্ববাসী আশার আলো দেখতে থাকে এ রোগ নির্মূলের। গুটিবসন্তের মতোই সারা বিশ্বে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল এ রোগ। পোলিওভাইরাস মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে এবং নানা মাত্রার পক্ষাঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং অনেক সময় এতে আক্রান্ত রোগী মারাও যায়। তখন এর চিকিৎসা সীমাবদ্ধ ছিল ফিজিওথেরাপি বা ‘আয়রন-লাঙ’ নামের অদ্ভুতদর্শন এক ধরনের যন্ত্রের মধ্যে, যা পোলিও রোগীদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সাহায্য করত। গবেষকদের অসংখ্য ধন্যবাদ যে তারা নিরাপদ ও কার্যকর টিকা আবিষ্কার করতে পেরেছেন, যার কারণে শিশুরা শেষমেশ এ রোগের সংক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারছে। ১৯৬১ সালে আলবার্ট স্যাবিন পোলিও প্রতিরোধে মুখে খাওয়ানোর প্রথম টিকা আবিষ্কার করে পথ দেখান। খুব সহজেই এটি শিশুদের ওপর প্রয়োগ করা যেত। ১৯৮৮ সালে বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূল অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের প্রত্যেক শিশুকে পোলিও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা। এখন যে ১ কোটি ৭০ লাখ পোলিও আক্রান্ত মানুষ দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে, পোলিওর টিকা আবষ্কার না হলে তারা হয়তো পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকত। এখন মাত্র তিনটি দেশের শিশুরা পোলিওজনিত পক্ষাঘাতের কবলে পড়ছে—আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়া। বিশ্ব আজ পুরোপুরি পোলিওভাইরাস নির্মূলের দোরগোড়ায়—২০১৭ সালে পাকিস্তানে পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে আটজনে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। টিকাদানের মাধ্যমেই কেবল পোলিও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মানুষের কল্যাণযাত্রায় অভূতপূর্ব অবদান রেখে চলেছে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের টিকা। এখন প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ২৫ লাখ শিশুর জীবন রক্ষা সম্ভব হচ্ছে ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টঙ্কার, হুপিং কাশি ও হামের টিকা প্রয়োগ করে। ফলে ১৯৯০ সালের পর থেকে শিশুমৃত্যুর হার অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে আরো অবদান রেখেছে পোলিও নির্মূল কর্মসূচি চলাকালে শিশুদের বাধ্যতামূলক ভিটামিন ‘এ’ প্রয়োগের উদ্যোগ। এতে শিশুদের আরো অনেক রোগের কবল থেকে মুক্ত রাখা গেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব বেশ উৎসাহজাগানিয়া। টিকা প্রয়োগের ফলে আরো বেশিসংখ্যক শিশু উৎপাদনশীল সক্ষম নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, টিকাদান কর্মসূচিতে প্রতি মার্কিন ডলার খরচ ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে যোগ করে আরো ৪৪ মার্কিন ডলার।
গুটিবসন্তে আক্রান্ত সর্বশেষ ব্যক্তি আলি মায়াউ মালিন পুরোপুরি সেরে উঠেছিলেন এবং তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন পোলিও টিকাদান কর্মসূচিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে এক বিরাট অনুপ্রেরণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
মরণঘাতী রোগগুলোর টিকা আবিষ্কার করতে না পারলে আমাদের এ পৃথিবী হয়ে উঠত আরো দুর্বিষহ। আশা করি চলমান মহামারী সৃষ্টিকারী ত্রাস নভেল করোনাভাইরাসের টিকাও আমাদের বিজ্ঞানীরা অচিরেই আবিষ্কার করবেন এবং এ ভীষণ ঘাতক রোগটিকে আমরা রুখে দিতে সক্ষম হব।
মনজুর শামস: লেখক ও অনুবাদক





