পোলিও রোগের নাম শোনেনি, বাংলাদেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। সরকারের তরফ থেকে কিছুদিন পরপর শিশুদের পোলিওর প্রতিষেধক টিকা খাওয়ানোর আহ্বান থেকে বোঝা যায়, পোলিও একটি মারাত্মক রোগ। সাধারণ ধারণা হচ্ছে, পোলিও হলে হাত-পা শুকিয়ে বিকৃৎ হয়ে যায়, ব্যাপারটি কেবল এটুকু নয়। পোলিও বা পোলিওমাইলিটিস হচ্ছে ভাইরাসজনিত সংক্রামক ব্যাধি, যা স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে মানুষকে স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলতে পারে। পোলিও শ্বাসতন্ত্রের মাংসপেশিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করলে মানুষের মৃত্যুও ঘটে। ১৯৫৫ সালে পোলিওর প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কারের আগে পোলিওর আক্রমণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। পোলিও ভাইরাসজনিত রোগ বলে সংক্রমিত হয়ে গেলে এর নিরাময়ের উপায় নেই, প্রতিষেধক টিকার মাধ্যমে পোলিওর আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা আর পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করে এর সংক্রমণ থেকে বাঁচা একমাত্র অবলম্বন। পোলিও নির্মূলে বিশ্বব্যাপী চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে বুনো পোলিওর রিপোর্টেড কেসের সংখ্যা ৯৪, যা ২০১৮ সালে ছিল ৩৩। পোলিও মূলত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের হলেও প্রতিষেধক টিকা দেয়া না থাকলে যেকোনো বয়সে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। আক্রান্ত মানুষের মল থেকে পানির মাধ্যমে বা স্পর্শ থেকে খাদ্যের মাধ্যমে পোলিও ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির নিবিড় সংস্পর্শে লালার মাধ্যমেও পোলিও ছড়াতে পারে।

১৮৪০ সালে জার্মান চিকিৎসক জ্যাকব হেইন সর্বপ্রথম রোগটিকে পোলিও হিসেবে শনাক্ত করেন। ১৯০৯ সালে আরেক জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার পোলিওর ভাইরাস শনাক্ত করতে সক্ষম হন। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে বিশ্বে পোলিও আক্রান্তদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। প্রতি গ্রীষ্মে বিশেষত শহরাঞ্চলের হাজার হাজার শিশু-কিশোর পোলিও মহামারীতে আক্রান্ত হতে থাকে। ১৯৫৫ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী জোনাস এডোয়ার্ড সল্কের আবিষ্কৃত প্রতিষেধক ব্যাপক হারে ব্যবহারের ফলে গত ৬৫ বছরে পোলিওকে প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

১৯১৪ সালে জন্ম নেয়া জোনাস সল্কের অধ্যয়নের আগ্রহ ছিল মানবিক কিছুর প্রতি। এ আগ্রহ তাকে নিউইয়র্ক সিটি কলেজে পড়ার সময় প্রি-মেডিকেলে পড়তে উৎসাহিত করে। বেলেভ্যু হসপিটাল মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় প্রাণরসায়নের অধ্যাপক তার মধ্যে সম্ভাবনার বিচ্ছুরণ দেখতে পেয়ে তাকে গবেষণা বৃত্তি জোগাড় করে দেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি কালচার ব্রথ থেকে ব্যাকটেরিয়াকে আলাদা করতে পারার উন্নততর পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষণাপত্র প্রকাশে সমর্থ হন। তার গবেষণার সুপারভাইজার তাকে এমডি ডিগ্রি নেয়ার বদলে পিএইচডি করার পরামর্শ দিলেও দৃষ্টি গবেষণার মানবিক দিক থেকে রাসায়নিক চমত্কারিত্বের দিকে সরে যেতে পারে আশঙ্কায় তিনি এমডি ডিগ্রি নেয়াকে বেছে নেন।

১৯২১ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কোমর থেকে শরীরের নিচের অংশ স্থায়ীভাবে পক্ষ্মাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সে সময় ডাক্তাররা এটিকে পোলিও বলে চিহ্নিত করলেও এখন এটিকে গিলেনবার সিনড্রোম বলে মনে করা হয়। রুজভেল্ট ১৯৩৩-৪৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ধনকুবের আইনজীবী বাসিল ও’কনরও পোলিও আক্রান্ত ছিলেন। ১৯৩৮ সালে তারা ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইনফ্যান্টাল প্যারালাইসিস (এনএফআইপি) গড়ে তোলেন, যা পরবর্তী সময়ে ‘মার্চ ফর ডাইম’ নামের তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করে। এ কার্যক্রম পোলিও গবেষণার জন্য তহবিল জোগাড় করে। প্রথম বছরে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ছিল ২ মিলিয়ন ডলার, যা ১৯৫৪ সালের মধ্যে ৬৭ মিলিয়নে দাঁড়ায়। ১৯৪৮ সালে এনএফআইপির পরিচালক হ্যারি ওয়েভারের অনুরোধক্রমে জোনাস সল্ক পোলিও গবেষণায় যুক্ত হন।

১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পোলিওর মহামারী শুরু হয়। প্রায় ৫৮ হাজার ব্যক্তি আক্রান্ত হয়, আর তিন হাজারের অধিক মানুষ মারা যায়। যারা বেঁচে যায়, তাদের একটা বড় অংশ স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। ফলে পোলিওর প্রতিষেধক বের করার জন্য বিজ্ঞানী মহলে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। জোনাস এডোয়ার্ড সল্ক ছাড়া অ্যালবার্ট সাবিন, হিলারি কোপরোওস্কি ও হেরাল্ড কক্সপোলিও নিরাময়ের ওপর গবেষণা চালাচ্ছিলেন। তখন পর্যন্ত ধারণা ছিল, কোনো ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা জন্মাতে ওই ভাইরাসেরই দুর্বল অথবা মৃদু সংক্রমণ হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু পোলিও ভাইরাসের মৃদু সংক্রমণ করানো ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। জোনাস সল্ক দেখলেন, ফরমালিন দিয়ে নিষ্ক্রিয় করা পোলিও ভাইরাসকে মানুষের দেহে ঢুকিয়ে দিলে দেহে পোলিও প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। এ টিকা তৈরিতে প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ পোলিও ভাইরাস পাওয়া সহজ ছিল না। দেখা গেল, এক প্রজাতির বানরের কিডনির এপিথেলিয়াল কোষে পোলিও ভাইরাসকে রাখলে তা বানরটির ক্ষতি না করেই সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে। সল্ক নিজে, তার স্ত্রী ডোনা লিন্ডসে আর সন্তানদের শরীরে পোলিওর প্রতিষেধক আর জীবাণু নিয়ে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখেন।

সল্কের আবিষ্কৃত প্রতিষেধককে বলা হয় Inactivated Poliovirus Vaccineev আইপিভি। এটি টাইপ ওয়ান পোলিওভাইরাস, টাইপ টু পোলিও ভাইরাস ও টাইপ থ্রি পোলিওভাইরাস নিয়ে গঠিত। এ প্রতিষেধক টিকা সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করালে প্রতিষেধক রক্তে ইমিউনোগ্লোবিউলিন জি-ঘটিত প্রতিরক্ষা অর্জন করতে দেয়, যা পোলিও সংক্রমণজনিত ভাইরেমিয়া হতে বাধা দেয়। ফলে রক্তে পোলিওভাইরাস প্রবেশ করতে পারে না। এছাড়া এটি মোটর স্নায়ু রক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কের মেডুলা অবলংগাটা অঞ্চলের স্নায়ু ধ্বংসকারী বাল্বার পোলিও থেকে এবং পোলিও-পরবর্তী সিনড্রোম থেকে রক্ষা করে। ১৯৫২ সালে এর প্রথম পরীক্ষা চালানো হলেও ১৯৫৫ সালের ১২ এপ্রিল ডা. টমাস ফ্রান্সিস জুনিয়র সাধারণ্যে পোলিওর টিকার ঘোষণা দেন। সল্কের টিকা পোলিওর অধিকাংশ সমস্যার প্রতিরোধ তৈরি করতে সমর্থ হলেও প্রাথমিক আন্ত্রিক সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর ছিল না। সমসাময়িক কালে পোলিশ-আমেরিকান বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট সাবিন নিষ্ক্রিয় পোলিওভাইরাসের বদলে দুর্বল পোলিওভাইরাসের জীবাণু ব্যবহার করে মুখে খাওয়ার টিকা (Oral Polio Vaccine বা ওপিভি) আবিষ্কার করেন, যা প্রাথমিক আন্ত্রিক সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর এবং এর কার্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ী। ১৯৫৭ সালে সাবিনের আবিষ্কৃত এ টিকা দেয়া শুরু হয় এবং ১৯৬২ সালে এর লাইসেন্স করা হয়।

সল্ক তার আবিষ্কৃত পোলিও টিকা থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা নেননি। এমনকি তিনি নিজ নামে এটির পেটেন্ট করেননি। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘সূর্যের কি কখনো পেটেন্ট হয়?’ অথচ তিনি যদি পোলিও টিকার পেটেন্ট করাতেন, তাহলে আজও তিনি বা তার উত্তরাধিকাররা রয়্যালটি হিসেবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পেতেন। আর্থিক সুবিধা বাদ দিলেও আরো একটি বেদনাদায়ক ব্যাপার হচ্ছে, সল্ক এ মহান আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পাননি।

সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজির অধ্যাপক সভেন গার্ড ১৯৫৪ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের জন্য জন এন্ডার্স, থমাস ওয়েলার ও ফ্রেডেরিক রবিন্সের নাম সুপারিশ করেন। ওই বছর এ তিনজন বিভিন্ন প্রকার টিস্যুতে পোলিও জীবাণুর বংশ বৃদ্ধিতে সাফল্যের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এ আবিষ্কারকে ভাইরোলজির ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এর মাধ্যমে কেবল মৃদু বা নিষ্ক্রিয় পোলিওভাইরাস প্রতিষেধকই নয়, আরো বহু ভাইরাসের কৃত্রিম বংশ বৃদ্ধি সম্ভব হয়। পরের দুই বছর পুরস্কারের জন্য জোনাস সল্ক মনোনয়ন পান বটে, কিন্তু ১৯৫৫ সালে সল্কের পরীক্ষণের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল আসা বাকি থাকায় পুরস্কার পাননি। ১৯৫৬ সালে সল্কের মনোনয়নের ব্যাপারে অধ্যাপক গার্ড মতামত দেন, সল্ক নতুন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করেননি। তিনি কেবল অন্যদের গবেষণার ফলাফলকে সফলভাবে ব্যবহার করেছেন। সুতরাং পোলিও প্রতিষেধক আবিষ্কারের ব্যাপারে সল্কের কর্ম পুরস্কার পাওয়ার উপযুক্ত নন। ষাটের দশকে একবার পোলিও প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য সল্ক, সাবিন, কোপরোওস্কি আর গার্ডের নাম সম্মিলিতভাবে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পায়। কিন্তু গার্ড জানান, তার কর্ম মৌলিক নয়, বরং এ ব্যাপারে যারা আগেই নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তাদের অর্জনের ওপর নির্ভরশীল। খোদ মনোনয়নপ্রাপ্তদের একজন এমন মতামত ব্যক্ত করায় এ চারজন আর সেবার নোবেল পুরস্কার পাননি। এরপর পোলিও প্রতিষেধক আবিষ্কারকদের আর কখনই নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হয়নি।

যেহেতু পোলিওভাইরাস রোগীর দেহে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে পারে না, প্রকৃতিতে খুব লম্বা সময়ের জন্য বাঁচতে পারে না এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী ছাড়া অন্য কোনো পোলিও বাহক নেই, তাই এ দুই প্রকার টিকা পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ থেকে পোলিওকে বিলুপ্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ২০০৮ সালের পর কেবল নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে পোলিও মহামারী দেখা গেছে। পোলিওর টিকায় ইসলামে নিষিদ্ধ এমন বস্তু আছে এবং এটি পুরুষ শিশুদের মধ্যে পুরুষত্বহীনতা ও বন্ধ্যত্ব তৈরি করে এমন ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অনেক জায়গায় পোলিওর টিকা প্রদানে বাধা দেয়া হয়। ফলে এ অঞ্চল থেকে পোলিও যেমন নির্মূল করা যাচ্ছে নাম তেমনি এখান থেকে বাহকের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যত্রও পোলিও ছড়িয়ে পোলিও নির্মূলের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্বের অধিকাংশ স্থানে পোলিওভাইরাস ছড়ানো প্রতিরোধ করা গেলেও বুনো পোলিওভাইরাস এখনো ছড়াচ্ছে। আগের পোলিওমুক্ত এলাকাগুলোতেও বুনো পোলিওভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেসব এলাকায় টিকা কম দেয়া হয়েছে, যেসব এলাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা খারাপ, সেসব স্থানে পোলিও মহামারীর আশঙ্কা আছে। শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে পোলিও টিকার আওতায় আনা সম্ভব হলে, পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন নিশ্চিত করা গেলে বুনো পোলিও থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে এবং গুটি বসন্তের মতো পৃথিবী পোলিওমুক্তও হবে। জোনাস সল্কের ভাষায় বলা যায়—

আমরা স্বপ্ন দেখি, দুঃস্বপ্নও। কিন্তু আমি স্বপ্ন দিয়ে দুঃস্বপ্নকে কাটিয়ে উঠি। যারা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সাহস রাখে, তাদের স্বপ্ন, কল্পনা আর সাহসের মধ্যে আশা বেঁচে থাকে।

 

জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ: লেখক, প্রকৌশলী