প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চ প্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
দ্বিতীয় অধ্যায়

অনুবাদকরা এবং জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ

(তৃতীয়াংশ)

রাজা আলফ্রেডের (মৃত্যুর) পরও অনুবাদ বিকশিত হতে থাকল, বিশেষ করে মঠ ও অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বেনেডিক্টীয় সন্ন্যাসী অ্যালফ্রিক (৯৫৫-১০২০ খৃ.) সন্তদের জীবন এবং হোমিলিয (ধর্মকথা) প্রাচীন ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। সঙ্গে ভূমিকাও জুড়ে দেন, যেখানে তিনি খুবই সামান্য লেখাপড়া জানা সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর ভাষা সহজ ও সরল করার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছেন। ‘ব্যাকরণবেত্তা’ নামে সমধিক পরিচিত অ্যালফ্রিক একটি লাতিন ব্যাকরণ এবং প্রথম লাতিন-ইংরেজি অভিধানেরও রচয়িতা।

জিওফ্রে চসার (আনুমানিক ১৩৪০-১৪০০ খৃ.) ইংরেজি ভাষার মহত্তম কবিদের অন্যতম। তিনি একজন অনুবাদকও ছিলেন। তিনি বোয়েথিয়াসের Consolation of Philosophy  অনুবাদ করেছিলেন এবং ক্যাক্সটন সেই অনুবাদটি ১৪৭৮ খ্রিস্টাব্দে ছেপেছিলেন। বোয়েথিয়াসের অনুবাদের পূর্বকথায় ক্যাক্সটন চসারের গুণকীর্তন করেছেন এবং সে সময়ের অন্য লেখকদের শংসা বচনের প্রতিধ্বনি করে তাঁকে ইংরেজি ভাষার জনক হিসেবে অভিহিত করেছেন: ‘the worshipful fader & first foundeur & enblissher of ornate eloquence in our englissh.’

যে ঘটনাটি আরেকটি ‘বড় ভাষাতাত্ত্বিক সংঘর্ষ’-এর সূত্রপাত করেছিল, সেই নরমান বিজয়ের (১০৬৬ খৃ.) পর দাপ্তরিক মহলে ফরাসি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়েছিল, আর লাতিন রয়ে গিয়েছিল বিদ্যাবত্তা ও জ্ঞানচর্চার প্রধান ভাষা হিসেবে। অবশ্য চতুর্থ শতকের মধ্যে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ব্যবহার হতে শুরু করে। বিদ্যালয়গুলোয় ভাষাটি প্রবর্তিত হয় ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে, আদালতে ১৩৬২-তে এবং পার্লামেন্টে ১৩৯৯-এ। ইংরেজিতেই লেখার সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে দিয়ে চসার জাতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজির পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে মূর্ত করে তুলেছিলেন।

একটি অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণকারী চসারকে একজন স্কোয়্যার হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষাদান করা হয় এবং তিনি রাজদরবারের কাজে একজন সফল পেশাজীবী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। একজন রাজপুরুষ বা রাজসভাষদ হিসেবে তিনি বিভিন্ন পদে কাজ করেন, যার মধ্যে কূটনৈতিক মিশনে ফ্রান্স ও ইতালি গমনও রয়েছে। লাতিন, ফরাসি ও ইতালীয়— এই অন্তত তিনটি ভাষায় লিখিত ধ্রুপদী ও স্বদেশী সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ছিল চসারের। ফরাসি ভাষায় রচিত অনেক সাহিত্যকর্ম তিনি নিজের মতো করে ইংরেজিতে রচনা করেছেন, যাঁর মধ্যে Romaunt of the Rose উল্লেখযোগ্য, যা গীয়ম দে লরিস (Guillaume de Lorris) এবং জাঁ ডি মং (Jean de Meung)-এর Le Roman de la Rose অবলম্বনে রচিত; Romaunt of the Rose-এর একটি পর্ব চসার অনুবাদ করেন এবং বাকি দুটো পর্ব তাঁর নিজের রচনা বলে কথিত)। যদিও আংশিক অনুবাদ, তার পরও কাজটি চসারের ‘প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যক প্রচেষ্টা’র প্রতিনিধিত্ব করে।

১০৬৬ খ্রিস্টাব্দের নরমান বিজয়ের পর থেকে ইংরেজ-ফরাসি যোগাযোগের ফলটি মূলত একপক্ষীয় হয়ে দাঁড়ায়, আর সেটা এই অর্থে যে, ইংরেজ লেখকরা ফরাসি ও ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের অন্য লেখকদের লেখার বিষয় ও আঙ্গিক অনুকরণ করতে থাকেন। কাজেই চসার নিজেকে এক ‘মাঝারি মানের সাহিত্যিক প্রথায় এমন এক ভাষার মধ্যে আবিষ্কার করেন, যার ফরাসি ও লাতিনের সমান মর্যাদা নেই।’ এটি খানিকটা হলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যে Romaunt যাঁরা পাঠ করবেন বলে ভাবা হয়েছিল— ফরাসি ভাষার সঙ্গে পরিচিত রাজদরবারের সেই সদস্যরা— তাদের কিন্তু এ অনুবাদটি দরকার ছিল না। চসার তাঁর নিজ ভাষার সম্ভাবনা ও সংস্থানের পরিধি বাড়ানোর একটা কসরত বা প্রচেষ্টা হিসেবেই আসলে কাজটি করেছিলেন এবং তৃতীয় অধ্যায়ে স্বদেশী ভাষায় অনূদিত সাহিত্যের অন্যান্য যেসব উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, এটিও সে রকম একটি ব্যাপারই ছিল। কাজেই Romaunt-এর মাধ্যমে চসার এবং ইংরেজি ভাষা দুই পক্ষই সম্মানিত হলো, আর ভাষাটিও অনুশীলনের মতো একটা কিছু লাভ করল। চসার লাতিন থেকে ওভিদ ও ভার্জিল এবং ইতালীয় থেকে বোক্কাচিওর রচনা অনুবাদ করেছিলেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীনভাবেই অনুবাদ করেছেন এবং যেখানে প্রয়োজন মনে করেছেন, সেখানে নানা কিছু যোগ করেছেন। চসার লিরিককে প্রভাবিত করেছেন, আখ্যানমূলক কাব্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন এবং ইংল্যান্ডে বেশকিছু সাহিত্যিক বিভাগ বা শাখা— এই যেমন ব্যালাড (ballade), রোমান্স (romance) আর ফ্যাবলিউ (fabliau)— আমদানি করেছেন।

এমনকি Treatise on the Astrolabe শিরোনামের এক বৈজ্ঞানিক রচনার ক্ষেত্রেও চসার ইচ্ছাকৃতভাবেই লাতিনের বদলে ইংরেজিকে বেছে নেন। ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ইংরেজি তাকে ‘nahwt only as trewe but as many and as subtil conclusions’ টানতে দিয়েছে ‘as ben shewd in Latyn’. তিনি আরো বলছেন, ‘God save the King, that is lord of this Language.’ সম্ভবত এটাই “King’s Englis” বলে যে কথাটা প্রচলিত আছে (যা দিয়ে শুদ্ধ ইংরেজি বা শিক্ষিত জনের ইংরেজি বোঝানো হয়— অবশ্য একই অর্থে “Queen’s English” কথাটাও ব্যবহূত হয় অনুবাদক), সেটার আদিমতম উল্লেখ, যা লিখিত ইংরেজির দাপ্তরিক বা আনুষ্ঠানিক রূপ প্রতিষ্ঠায় রাজ নথিপত্রের দপ্তর বা ‘রয়্যাল চ্যান্সেরি’র প্রভাবের ব্যাপারে চসারের সচেতনতার একটি নিদর্শন।  

চসারের শৈলী ‘খ্রিস্ট ধর্ম এবং নরমান বিজয়ের মাধ্যমে, যথাক্রমে— লাতিনশোভিত ও ফরাসি-প্রভাবিত মধ্যযুগীয় ইংরেজির সমৃদ্ধির’ মূর্ত রূপ। তবে রাজদরবারের একজন কবি হিসেবে, সর্বোপরি তাঁর ভাষা প্রয়োগ দরবারের ভাষা বা বাচন এবং ফরাসি-প্রভাবিত সাহিত্যিক প্রথারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। সেকালের প্রশাসনিক নথিপত্রে ব্যবহূত ইংরেজি সেটা নয়, এমনকি সেটা লন্ডনের স্বাভাবিক ভাষাও নয়। পরবর্তী শতকে প্রমিত বা মান ইংরেজি যে রূপ নেবে, চসার সেটা নির্দিষ্ট করেননি।

ইংরেজি ব্যাপকভাবে কথিত হলেও চতুর্দশ শতকের দাপ্তরিক নথি বা কাগজপত্র ফরাসি বা লাতিনেই লিখিত হতো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৩৬২ খ্রিস্টাব্দে রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড যখন পার্লামেন্টে প্রথম ইংরেজিতে ভাষণ দেন, তখন সেই সভার নথিপত্র ফরাসিতেই লিখিত হয়েছিল। তবে ল্যাংকাস্টারীয় রাজতন্ত্রের প্রভাবে ইংরেজি ধীরে ধীরে দাপ্তরিক প্রশাসন ও পার্লামেন্টের লিখিত ভাষায় পরিণত হয়। পঞ্চম হেনরিই ছিলেন নরম্যান বিজয়ের পর থেকে প্রথম রাজা (রাজত্বকাল ১৪১৩ থেকে ১৪২২ খ্রিস্টাব্দ), যিনি নিজের দাপ্তরিক নথিপত্রে ইংরেজি ব্যবহার করেন। ফ্রান্সের সঙ্গে তিনি যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, সেটা ইংরেজ জাতীয়তাবাদ এবং ইংরেজি ভাষার বিকাশে বিশেষ অবদান রেখেছিল। রাজা হেনরি, তাঁর আগে রাজা অ্যালফ্রেডের মতো, নিজের কর্তৃত্বের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষার কিছুটা হলেও প্রমিত মান প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিলেন। রাজার কাজে উত্সাহিত হয়ে লন্ডনের মদ্য প্রস্তুতকারীদের মতো একটি প্রভাবশালী সংঘ ১৪২২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজিতে তাদের কাগজপত্র লিখতে শুরু করে, যদিও ইংরেজিতে লেখার সেই সিদ্ধান্তটি লাতিনেই লেখা হয়েছিল।

এ সিদ্ধান্তটিই ইংরেজির ওপর লাতিন ও ফরাসির আধিপত্যের পরিসমাপ্তির সূচনা করে। ইংল্যান্ডে মুদ্রণ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা ছিল আরেকটি যুগান্তকারী বিষয় এবং ইংল্যান্ডের প্রথম মুদ্রক উইলিয়াম ক্যাক্সটন ‘তাঁর নিজের মতো করে ভাষাটির জন্য ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন যতটা ছিলেন জিওফ্রে চসার, যাঁর রচনা ক্যাক্সটন ছেপেছিলেন।’

উইলিয়াম ক্যাক্সটন (আনুমানিক ১৪২২-৯১ খ্রিস্টাব্দ) একজন বণিক ভাগ্যান্বেষী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। ইংল্যান্ড আর নিম্নাঞ্চলীয় দেশগুলোর মধ্যে লোভনীয় ও বিকাশমান বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। সে সময়ে পশুর লোমই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য কিন্তু ক্যাক্সটন ফরাসিতে লিখিত এবং ইংল্যান্ডের দরবারি মহলে আদৃত হওয়ার জন্য পূর্বনির্ধারিত অলঙ্কৃত পাণ্ডুলিপিরও ব্যবসা করতেন। কালক্রমে ক্যাক্সটন ব্রাগসের ‘গভর্নর অব দ্য ইংলিশ নেশন অব মার্চেন্ট অ্যাডভেঞ্চারার্স’ পদে উন্নীত হন এবং সে হিসেবে তাঁকে ইংল্যান্ড আর তখন নিম্নাঞ্চলীয় অঞ্চলগুলো যাদের অধীনে ছিল, সেই  বার্গান্ডির ডিউকদের মধ্যে দরকষাকষির কাজ করতে হতো। তিনি ১৪৬২ থেকে ১৪৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ পদে কর্মরত ছিলেন।

তুলনামূলকভাবে জীবনের শেষ দিকেই ক্যাক্সটন অনুবাদক ও মুদ্রক হিসেবে তাঁর পেশা শুরু করেন। ফরাসি টেকস্ট ইংরেজিতে অনুবাদ শুরু করেন তিনি ১৪৬৯ সালের দিকে; ১৪৭১ সালে তিনি রাউল লেফেভর (Raoul Lefevre) ট্রয়ের ইতিহাস অনুবাদের কাজ শুরু করেন এবং মুদ্রণ শিল্প সম্পর্কে শিক্ষালাভের জন্য কোলোন যান। তাঁর অনুবাদ The Recuyell of the Historyes of Troye প্রকাশ করেন তিনি ১৪৭৩-৭৪ সালে। ইংরেজিতে মুদ্রিত এটাই প্রথম বই। বণিক ও কূটনীতিক হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত ক্যাক্সটন ১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং ব্রিটিশ রাজদরবারের জন্য সুবিধেজনক ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের চৌহদ্দির ভেতরে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই রাজদরবারের সদস্যরাই ছিলেন তাঁর সবচেয়ে ভালো খদ্দের। সেখানে তিনি সর্বপ্রথম যে বইটি ছাপেন, সেটা হচ্ছে অ্যান্থনি উডভিলকৃত একটি অনুবাদ: Dictes and Sayenges of the Phylosophers

(ক্রমশ)