৫৬ বছর আগে ২০ অক্টোবর ১৯৬১-তে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘সপ্তপদী’র ‘আইকনিক’ প্রেমের দৃশ্য কোনটি? স্মৃতির সড়ক ধরে অতীতে গিয়ে যে দৃশ্যটি আপনাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করবে তা হচ্ছে— স্কুটার বাইকে উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেন। উত্তমের কণ্ঠে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান— ‘এই পথ যদি না শেষ হয়/ তবে কেমন হতো তুমি বলো তো/ যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়/ তবে কেমন হতো তুমি বলো তো।’
সুচিত্রার কণ্ঠে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও যোগ দেন— ‘না না তুমি বলো।’
কৃষ্ণেন্দু মেধাবী মেডিকেল ছাত্র, জাত ব্রাহ্মণ আর রীনা ব্রাউন্ড অ্যাংলো ইন্ডিয়ান তরুণী, মেধায় কৃষ্ণেন্দুর চেয়ে কম কিছু নন। দুজনই কলকাতা মেডিকেল কলেজে। কৃষ্ণেন্দুর গোড়া বাবা ছবি বিশ্বাস একটি খ্রিস্টান মেয়েকে পুত্রবধূ করতে রাজি নন। সুতরাং ভাঙনই অনিবার্য হয়ে ওঠে। কাহিনীর মাঝখানে ওথেলোর মঞ্চায়ন— সেখানে জেনিফার কাপুর ডেসডিমোনা আর উত্পল দত্ত ওথেলোর ভূমিকায়। উত্তম কুমার হচ্ছেন কৃষ্ণেন্দু আর সুচিত্রা সেন সেই রীনা ব্রাউন।
সিনেমার গল্পটি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের। রোমান্টিক কাহিনী সপ্তপদীর বাইকটিও স্মরণীয় হয়ে আছে। কিন্তু কেউ স্মৃতিস্মারক হিসেবে এটি রক্ষা করেনি, যেমন রক্ষা করেছে ‘রোমান হলিডে’ চলচ্চিত্রের ভেসপাটি। রোমান হলিডে আরো আট বছর আগের। ২৭ আগস্ট ১৯৫৩ সালে মুক্তি পেল উইলিয়াম ওয়াইলার পরিচালিত ও প্রযোজিত স্মরণকালে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক ড্রামা— রোমান হলিডে। গ্রেগরি পেক— সিনেমার জো ব্র্যাডলি একজন অনুসন্ধিত্সু সাংবাদিক, অদ্রে হেপবার্ন একটি দেশের ক্রাউন প্রিন্সেস অ্যান এবং একটি ভেসপা ১২৫, এ দেশেরও বহু সিনেমা দর্শককে স্মৃতিকাতর করে রেখেছে। সপ্তপদীর স্কুটার চালিয়েছেন কেবল উত্তম কুমার, রোমান হলিডের ভেসপার চালক ছিলেন দুজনই— গ্রেগরি পেক ও অদ্রে হেপবার্ন।
রাজকুমারী ইউরোপীয় বিভিন্ন রাজধানী সফরে বেরিয়েছেন। রোমে এসে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের বেড়াজালে এবং কর্মসূচির বাড়াবাড়িতে রাজকুমারী বিগড়ে যান, হতাশ হয়ে পড়েন, অর্থহীন মনে হয় এ জীবন। ডাক্তার পরিস্থিতি সামলাতে তাকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখেন।
কিন্তু মুক্তিপ্রত্যাশী রাজকুমারী ঘুম ভাঙার পর সঙ্গোপনে নিজ দেশের দূতাবাস থেকে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু তখনো ওষুধের প্রতিক্রিয়া শেষ হয়নি। তিনি একটি বেঞ্চের ওপর আবার ঘুমিয়ে পড়েন। আমেরিকার একটি বার্তা সংস্থার রিপোর্টার জো ব্র্যাডলি তাকে পেয়ে যান, কিন্তু চিনতে পারেনি। ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি তাকে টাকা সাধেন, কিন্তু তার দিক থেকে কোনো সাড়া পান না। আবার এমন সুন্দরী একটি তরুণীর নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে একলা রেখে যেতেও তার মন চায় না। শেষ পর্যন্ত জো তাকে নিয়ে যান নিজের অ্যাপার্টমেন্টে। মেয়েটির রাজকীয় আচরণ তাকে দ্বিধায় ফেলে দেয়।
মেয়েটিকে ঘুমন্ত রেখেই জো চলে আসেন তার পূর্বনির্ধারিত কাজে; সেই দূতাবাসে রাজকুমারীর সংবাদ সম্মেলনে। এখানে এসে শোনেন রাজকুমারী আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, সংবাদ সম্মেলন বাতিল। রাজকুমারীর ছবি দেখার পর ব্র্যাডলির বোধ হয়, তার অ্যাপার্টমেন্টে কৌচের ওপর ঘুমিয়ে থাকা তরুণী আসলে কে। জো তার এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে রাজকুমারীর একটি একান্ত সাক্ষাত্কারের জন্য ৫০০ ডলার দাবি করে। এজেন্সি রাজি হয়। একই সঙ্গে ৫০০ ডলার বাজিও ধরে যে, জো এ সাক্ষাত্কার নিতে পারবে না।
জো অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসে, নিজের সাংবাদিক পরিচয় লুকিয়ে রেখে তাকে রোম ঘুরিয়ে দেখানোর প্রস্তাব দেয়। জো তাদের ছবি তুলতে ফটোগ্রাফার আরভিং র্যাডোভিচকেও ডেকে নেয়।
কিন্তু খেয়ালি রাজকুমারী একসময় কেটে পড়ে, সেলুনে ঢুকে চুলও কাটিয়ে নেয়। বহু খোঁজাখুঁজি করে জো তার সন্ধান পায় এবং সেই ভেসপাতে তাকে নিয়ে রোমের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায়।
রাজকুমারীর ভূমিকায় অভিনয় করে অদ্রে হেপবার্ন সেবারের শ্রেষ্ঠ নায়িকা হিসেবে অস্কার পেলেন। ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বাজেটের সিনেমা রোমান হলিডে বক্স অফিস হিট করে উপার্জন করে ১২ মিলিয়ন ডলার।
অদ্রে হেপবার্ন ও গ্রেগরি পেকের ভেসপা ভ্রমণ এতটাই রোমান্টিক ছিল যে, ভেসপা কেনার হিড়িক পড়ে গেল। কেবল এ জুটির কারণেই তখন ১ লাখ বাড়তি ভেসপা বিক্রি হয়েছে বলে বাজার বিশেষজ্ঞদের ধারণা। রোমে বেশ ঘটা করে প্রদর্শিত হলো অদ্রে হেপবার্ন ও গ্রেগরি পেকের সেই ভেসপাটি। ২০১৬-তে ভেসপার ৭০ বছর পূর্তির উত্সবে সেই ভেসপার ছবি, সেই সুন্দরী ও সেই পুরুষ আবার ফিরে আসে সেন্টার স্টেজে।
একটি পাদটীকা: পরিচালক ও প্রযোজক জন ওয়াইলার জো ব্র্যাডলি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ক্যারি গ্র্যান্টকে পছন্দ করেছিলেন। ক্যারি প্রত্যাখ্যান করলেন, কারণ তার মনে হয়েছে অদ্রে হেপবার্নের তুলনায় তাকে একটু বেশি বুড়ো মনে হবে। অন্য একটি সূত্র মনে করে, সিনেমার দর্শকদের আগ্রহ নিবদ্ধ থাকবে রাজকুমারীর ওপর, নায়ক হিসেবে তিনি উপেক্ষিত হবেন বলে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি। তার পরই গ্রেগরি পেককে পছন্দ করা হয়।
রাজকুমারীর চরিত্রে প্রথমে এলিজাবেথ টেইলর কিংবা জিন সিমনকে পছন্দ করা হয়, কিন্তু তাদের শিডিউল পাওয়া যায়নি। তারপর অদ্রে হেপবার্ন। কিন্তু স্ত্রিন টেস্টে তাকে নিয়ে সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত জন ওয়াইলার চরিত্রটির জন্য তাকে চূড়ান্ত করেননি।
সিনেমাটি রঙিন করার পরিকল্পনা থাকলেও রোমে শুটিংয়ের খরচ এত বেশি যে, শেষ পর্যন্ত ব্যয়সংকোচন করতে পরিচালক-প্রযোজক সাদা-কালোতে ফিরে এলেন।
১৯৫৫ সালে আলফ্রেড হিচককের চলচ্চিত্র ‘টু ক্যাচ অ্যা থিফ’-এ ক্যারি গ্রান্ট কুখ্যাত চোর জন রোবির ভূমিকায় ভেসপায় ঘুরে বেড়াতেন।
ভেসপা প্রস্তুতকারী কোম্পানি পিয়াজ্জিও ভেসপা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে। রোমে অবস্থিত জাদুঘরটির নাম পিয়াজ্জিও মিউজিয়াম। এখানে ‘দ্য ভেসপা অ্যান্ড দ্য মুভিস’ নামে বিশেষ প্রদর্শনীও হয়েছে।
অদ্রে হেপবার্ন ও গ্রেগরি পেক ছাড়াও যেসব নায়ক-নায়িকা অভিনয়ের কোনো না কোনো অংশে ভেসপা চালিয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন— চার্লটন হেস্টন, রক হাডসন, মার্চেলো মাস্ত্রিয়ানো, জন ওয়েইন, হেনরি ফন্ডা, রেকুয়েল ওয়েলচ, উরসুলা অ্যানড্রেস, জেরাল্ডিন চ্যাপলিন, জোয়ান কলিন্স, জেইন ম্যানসফিল্ড, ভার্না লিসি, মিল্লা জভোভিচ, গ্যারি কুপার, অ্যান্থনি পার্কিনস, জ্য পল বেলামদো, নান্নি মোরেত্তি, আন্তোনিও বান্দারেস, ম্যাট ড্যামন, জুড ল, এডি মার্ফি, ওয়েন উইলস, নিকোল কিডম্যান এবং আরো অনেকেই।





