জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আপনার কোম্পানির লোগোতে খাস বাঙালি ‘ডালঘুটুনি’ ব্যবহার করা হয়েছে কেন?

তিনি ডান দিকের দেয়াল জোড়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। সন্ধ্যা নামছে। সেপ্টেম্বরের শীতে প্যারিসের রাস্তাগুলো ম্রিয়মাণ, গ্রীষ্মের তারুণ্য ঝকমক হানি লোকাস্ট গাছগুলোকে বুড়োটে মনে হচ্ছে, এর মধ্যে ঝলমল করছে আইফেল টাওয়ারের সন্ধ্যাবাতি।

তিনি কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে দেখলেন, তারপর ফিরে তাকালেন। আমার হালকা ভ্রুর নিচে কেমন যেন ভাব খেলে যায়, কপালের দুই পাশের রগ তিরতির কেঁপে ওঠে।

তিনি ফিসফিস করে ডেকে ওঠেন, ‘বাবা...’
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। এ কিংবদন্তি কাকে ডাকছেন, বাবাকে?????
তার কথা আমি বছরখানেক আগেও জানতাম না। বাংলাদেশে খুব কম মানুষই তার কথা জানে। আমি জেনেছিলাম রোমে।
সেখানকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় লুইস স্কুল অব গভর্নমেন্টে গিয়েছিলাম বিশ্ব খাদ্য সংস্থার একটি সেমিনারে। ইউরোপের এসব প্রোগ্রামের বিশেষত্ব হলো, বিশাল লাঞ্চ ব্রেক। প্রায় ২ ঘণ্টা। এরা মোটামুটি রিলিজিয়াসলি দুপুরে বিশ্রাম নেয়, ঘুমায়ও। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট দ্য গল নাকি দুপুরের ঘুমের জন্য এলিসি প্রাসাদও ছাড়তে রাজি ছিলেন। কারণ প্রেসিডেন্সির কাজের চাপে তার এ আরামের ব্যাঘাত হচ্ছিল। যথারীতি নিয়ম মেনে ২ ঘণ্টার লাঞ্চ ব্রেক দেয়া হলো। আমি ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে গিয়ে বসলাম। পাশের টেবিলে এক বয়স্ক ভদ্রলোক খাচ্ছেন। বেশ বয়স্ক, আশি-টাশি হবে। দেখে তেমন বোঝার উপায় নেই। টান টান শরীর, সাদা চুলে ব্যাক ব্রাশ, হালকা বাদামি রঙের সুটের সঙ্গে অফ হোয়াইট শার্ট, টাইয়ের বদলে পড়েছেন ‘গারাভানির’ স্কার্ফ। চোখাচোখি হতেই তিনি হাসলেন, ভদ্রতার হাসি। আমিও। মনে হলো, ভদ্রলোক বেশ জনপ্রিয়। যারাই খেতে আসছেন, তার টেবিলে গিয়ে নড করছেন। আমারও তাকে খুব পরিচিত মনে হয় কিন্তু ধরতে পারি না কোথায় দেখেছি। বিদ্যুত্ চমকের মতো মগজে ধাক্কা মারল চেয়ারের পাশে রাখা তার ব্যাগ দেখে। সেখানে ছোট্ট একটি ইনিশিয়াল কিন্তু খুব বিখ্যাত। জি এ। পুরো অর্থ করলে দাঁড়ায়—  জর্জিও আরমানি।

‘বিস্ময়’ আমার মাথায় লাফ দিতে থাকে। বিশ্ব ফ্যাশনের প্রবাদপুরুষ এখানে, আমার সামনে কী করছেন? শুধু প্রবাদ পুরুষই নয়, তার কোম্পানি জর্জিও আরমানি সারা দুনিয়ার ফ্যাশনে যে বিপ্লব এনেছে, তাকে সভ্যতার বিবর্তনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাছাড়া প্লেবয়ও বটে। সোফিয়া লরেনের সঙ্গে তার গোল গলা টি-শার্ট পরা ছবি একসময় তাবত্ দুনিয়ার যুবকদের বুকে হিংসার আগুন জ্বালিয়েছিল।

এ লোক আমার সামনে বসে খাবার খাচ্ছে!!!!! নিজেকে সামলাতে পারি না, উঠে গিয়ে বললাম, আমি কি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি? তিনি পাস্তার প্লেটে কাঁটা চামচ আর ছুরি আড়াআড়ি রেখে বললেন, ‘বলো।’

আমি সৈয়দ। বাংলাদেশ।

তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘বাংলাদেশ! চমত্কার।’

‘চমত্কার’ শব্দটিতে জোর দেয়া দেখে অবাক হলাম। মনে হলো, এ শব্দটি তিনি এমনি এমনি উচ্চারণ করেননি। এটি মিনও করছেন।

জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেন?

তিনি হাসলেন, খেয়াল করলাম, এ হাসি দিয়ে সোফিয়া লরেন না, তাবত্ রমণীকুলকে বশ করা যায়।

‘হা, জানি, আমার কোম্পানির মার্কেটিং যে এজেন্সির দায়িত্বে, তার মালিক বাংলাদেশী। তাকে বলা হয় ডায়মন্ড মার্কেটিয়ার। জুরাসিক পার্কসহ অনেক হলিউড মুভিরও তিনি মার্কেটিং এজেন্ট ছিলেন। এই যে ইউরোপে ফুটবল নিয়ে এত ক্রেজ দেখছ, তার পেছনেও তার বিপণন জাদুর ভূমিকা আছে। তিনি এখানকার প্রায় সব লিগেরও মার্কেটিং এজেন্ট। সবার বিশ্বাস, এমনকি অ্যান্টার্কটিকার বরফ বিক্রি করার দায়িত্ব দিলে তিনি তাও হীরার দামে বাজারে বিকোতে পারবেন।

আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে আসে। বলে কী!!!!!! সারা দুনিয়ার বাজার বাণিজ্যের রাজা একজন বাংলাদেশী, আর আমরা তার নামও জানি না!!!!!

তারপর খুঁজতে খুঁজতে সামনে জানালার পাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোকের কাছে আসা। ব্যাপারটা এত সহজে হয়নি। এক বছর আগে, তাকে মেইল দিয়েছিলাম সাক্ষাত্ চেয়ে। তার সেক্রেটারি উত্তর দিয়েছিল, আগামী এক বছর তার প্রতিটি মুহূর্ত এরই মধ্যে বুকড হয়ে গেছে। দেখা করতে হলে অপেক্ষা করতে হবে।

আমি লেগে রইলাম। অদম্য আগ্রহের কারণে। মনে হতে লাগল, এ ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা না করলেই নয়। মোটামুটি ফ্যাশন, হলিউড আর ইউরোপের ফুটবলের বাজার, যার হাতে পিংপং বলের মতো লাফায়, আমরা তার সম্পর্কে কিছুই জানি না!!!! অথচ আমরা একই দেশের! এটা হয় না। কিন্তু আমার আগ্রহ থাকলেও তার আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না, তার সেক্রেটারি বারবার একই কথা বলে মেইলের উত্তর দেয়, সময় নেই, সময় নেই, ইচ অক হিজ মোমেন্টস ইজ আন্ডার কমিটমেন্ট।

&dquote;&dquote;মোটামুটি আশা ছেড়ে দিয়েছি, এমন সময় তার অফিস থেকে মেইল আসে।

তিনি ওদিন প্যারিসে তার অফিসে সন্ধ্যা ৭টায় সময় দেবেন। গুনে গুনে ১০ মিনিট। একা যেতে হবে, মোবাইল বা কোনো গ্যাজেট নেয়া যাবে না, সিকিউরিটি ডিটেইলের জন্য ১ ঘণ্টা আগে পৌঁছতে হবে।

এক বছরের শ্রম আর দেখা করার বিশাল ফরমালিটি দেখে মনে হয়েছিল, তিনি খুব ধোপদুরস্ত, রাশভারী হবেন, আদতে দেখা গেল খুব সাধারণ একজন মানুষ, ছোটখাটো গড়ন, শ্যামলা বর্ণ, দীর্ঘদিন ইউরোপে থাকার কারণে লালচে দিকে বাঁক নিয়েছে, পাতলা চুলগুলো ছড়িয়ে আছে পুরো মাথায়। পড়েছেন কালো প্যান্টের সঙ্গে লিনেনের সাদা শার্ট, তার ওপর মেরুন ব্লেজার। তবে থমকে দেয়ার মতো হচ্ছে, পুরু চশমার ওপারের চোখগুলো। সেখানে হাজার ভোল্টের আলো।

আমার সময় ১০ মিনিট, প্রথম থেকেই বারবার বলা হয়েছে, তাই ঠিক করে এসেছি প্রথম প্রশ্নই করব, তার কোম্পানির লোগোতে আমাদের ডালঘুটুনি ব্যবহার করা হয়েছে কেন?

তিনি আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে পাশের চামড়ার আরাম চেয়ারে বসলেন, তারপর ধীরে-সুস্থে কেটলি থেকে সুগন্ধি ঢালতে লাগলেন। আমি অস্থির হয়ে উঠি, আমার সময় মাত্র ১০ মিনিট, দ্রুত শেষ হয়ে আসছে অথচ...

দয়া করে বলবেন, আপনার কোম্পানির লোগোতে কেন ডালঘুটুনি ব্যবহার করা হয়েছে?
তিনি আমার দিকে তাকালেন। তারপর আবার ডাকলেন, ‘বাবা।’
গভীর মমতা নিয়ে সে ডাক সারা রুমে যেন ছড়িয়ে পড়ল।
আমি বললাম, ‘একটু ক্লিয়ার করবেন?’
তার ঘোরলাগা চোখগুলো কেমন যেন শূন্য মনে হয়, সেগুলোয় লেপ্টে থাকে উপচে পড়া আকুতি। তিনি কোন সুদূরে তাকিয়ে থাকেন।

‘কিশোরবেলা থেকেই আমি ছিলাম বখাটে। ইন রিয়েল সেন্স। যত ধরনের নষ্টামি সব স্কুলেই শিখে ফেলি, সিগারেট, গাঁজা, মেয়েদের বিরক্ত করা। মাস্তানির পাটও শেষ। পকেটে থাকত ছুরি। নানচাকু। ভাড়ায় মারামারি করতে যেতাম। মোটামুটি কয়েকবার ফেলটেল করে পাকা বয়সে ক্লাস টেনে ওঠার আগেই আমি পাড়ার আতঙ্কে পরিণত হলাম। পড়াটা ছেড়েই দিতাম, বাবার জন্য পারিনি। অসম্ভব একজন ভালো মানুষ। ছোটখাটো সরকারি চাকরি আর বিকালে হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করে কোনোভাবে সংসার চালাতেন। কিন্তু সে তীব্র দারিদ্র্যের মাঝেও আমাদের পড়ালেখা করানোর জন্য ছিল তার প্রাণান্ত চেষ্টা। যত কষ্টই হোক, তিনি আমাদের পড়াশোনা স্বচ্ছন্দ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। আমাদের মগজ খোলার জন্য সাধ্যমতো ভালো খাবার কিনতেন কিন্তু তিনি এবং মা কখনই সেগুলো খেতেন না। শুধু আমরা পাঁচ ভাইবোনকে দিতেন। তারা কোনোমতে খেয়ে উঠতেন। দূর-দূরান্তের কেউ ভালো রেজাল্ট করেছে শুনলেই বাবা ছোটে যেতেন যদি বুঝিয়ে শুনিয়ে আমাদের জন্য সেই ভালো ছাত্রের নোটগুলো আনা যায়!!!!

আমার অসাধারণ বাবা তার চোখের সামনে একমাত্র ছেলেকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। অসহায় কষ্টের কাছে কী করুণ ছিল তার আত্মসমর্পণ, তা না দেখলে বোঝা যাবে না। সব চেষ্টা বিফলে যাওয়ার পর তিনি যেটা করতে লাগলেন তা হলো, আক্ষরিক অর্থে করুণা ভিক্ষা। আমার কাছে। যেন আমি পড়ার টেবিলে ফিরে যাই।

কখনো মাথায় হাত বুলান, কখনো ফুঁপিয়ে কাঁদেন।

আমার কিন্তু মন গলে না। আমি ঘোরের মধ্যে আছি। ছুরির বদলে পকেটে জায়গা করে নিয়েছে রিভলভার, একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কমিটিতে পদ দেয়া হয়েছে। হাত বাড়ালেই চাঁদার টাকা আসছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে বিভিন্ন নেশা। আমার বয়েই গেছে পড়তে। কিন্তু বাবা হাল ছাড়েন না। তিনি তার নষ্ট ছেলের হাত-পা ধরে তাকে অন্তত এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার আকুতি জানান। আমি পাত্তাই দিই না। বরং মনে মনে বলি, বুড়ো হামবাগ, পড়ালেখা করে ঘণ্টা হবে...। সিদ্ধান্ত নিলাম এসএসসি পরীক্ষাই দেব না। শুনে বাবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সমস্যা হলো, তিনি রাগ করতে জানতেন না, তাই এ অবস্থায় অন্য বাবারা যা করতেন, তিনি সে রাগী প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলেন না। তিনি যা করলেন তা হলো, তীব্র ভালোবাসা দিয়ে আমাকে ঠিক করার চেষ্টা। কিন্তু আমার তখন তো বিগড়ানো মগজ, ভালো কথা কানে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমি তার কথা শুনলাম না, উল্টো তাকে পেটালাম।’

আমি আঁতকে উঠি,‘ পেটালেন! বাবাকে...।’

তীব্র বেদনায় তার চেহারা আরো লাল হয়ে ওঠে, টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলোয় সেখানে কী যেন চকচক করে। ঘাম না অশ্রু ঠিক বুঝতে পারি না। তিনি হাঁপাতে থাকেন, “হা, পেটালাম, বাবাকে। সেদিন আমার মেজাজ এমনিতেই খারাপ। পাশের পাড়ার ‘গলাকাটা কামাল’ নামের একজন উঠতি মাস্তান আমার আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করেছে। একটি মেয়ের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তার নাকি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, তার ওপর পেটে পড়েছে বিধ্বংসী কিছু নেশার ট্যাবলেট। অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেছি, বাবা বারান্দায় বসে আছেন। ঘরে ঢোকার পর পরই তিনি উঠে এলেন, আমার হাত ধরে ডাকলেন, মিল্লাত... এটা কিন্তু আমার প্রচলিত নাম নয়, বাবার দেয়া নিজস্ব নাম। খুব আদরের মুহূর্তে তিনি আমাকে এ নামে ডাকতেন। কিন্তু তখন আমার আদর বোঝার ক্ষমতা নেই, মাথায় কিলবিল করছে অন্ধ নেশা। আমি এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিলাম। তিনি আবার আমার হাত আঁকড়ে ধরলেন। এবার আমার মাথায় উঠল চণ্ডাল রাগ, যে প্রলয়ঙ্করী রাগকে সবাই বাঘের মতো ভয় পায়, সেই রাগ। আমি এক দৌড়ে রান্নাঘরে ডুকলাম, সেখানে পড়েছিল মায়ের ডালঘুটুনি, একটানে তা হাতে নিয়ে পেছন পেছন আসা বাবাকে মারতে লাগলাম...।

বাবা, আমার বাবা, অপুষ্টিতে ভোগা অসহায় বাবা প্রথমে থমকে গেলেন, তারপর রোগা হাতে মার ঠেকাতে চেষ্টা করে, না-পেরে দড়াম করে পড়ে গেলেন।’

ভদ্রলোক হাঁপাচ্ছেন, যেন তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, তিনি আবার সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আবার শূন্য গলায় অনুচ্চ স্বরে ডাকলেন— ‘বাবা, বাবা।’

তারপর শুরু করলেন, ‘পরদিন বাবাকে যখন হাসপাতাল থেকে বাসায় আনা হয়, তখন তার সারা মাথায় ব্যান্ডেজ, একটা হাত ভেঙে গেছে, পায়ে প্লাস্টার। আমি অপলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছি, তিনি আমার দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় ডাকলেন, মিল্লাত...।

পুত্রের জন্য দেয়া তার একান্ত নিজস্ব নাম। আমি আমার ক্ষত-বিক্ষত বাবার দিকে তাকালাম, তারপর এক দৌড়ে বসলাম। পড়ার টেবিলে, যেখানে গত কয়েক বছর আমার বসা হয়নি। আমার সামনে বই, যে বইগুলোয় ধুলো পড়ে গেছে। এসএসসি পরীক্ষার তখন নয় মাস বাকি।

বছরখানেক পর সবাই রেডিওতে যখন শুনল যে, তাদের শহরের একটি ছেলে বোর্ডে তৃতীয় হয়েছে, কারো মাথাতেই আসেনি যে, সেটা আমি হতে পারি।’

আমার মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে আসে, ‘অবিশ্বাস্য।’

তিনি হাত ঝটকায় আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলতে থাকেন, ‘তারপর কে যেন ধাক্কা দিয়ে দিয়ে আমাকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সব শেষে রকফেলার ফাউন্ডেশন বৃত্তি নিয়ে রোডস ইউনিভার্সিটিতে ফেলল। আমেরিকান এ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অ্যালামনি ওয়েবসাইটে আমার নামের পাশে লিখছে, ন্যাচারাল জিনিয়াস, ভেরি রেয়ার উই এক্সপেরিয়েন্সড। মার্কেটিং টারনস টু মিউজিক ইন হিজ হ্যান্ডস। তারপর তো দেখতেই পাচ্ছেন আমাকে....।’

আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে বললাম— ‘আর বাবা?’

তার চেহারায় কে যেন আলকাতরা ঢেলে দিল, সেখানে নেমে উঠল ঘন অন্ধকার। তার ঠোঁট তিরতির করে কাঁপতে লাগল, তারপর তা ছড়িয়ে পড়ল সারা শরীরে, তিনি ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, ‘আমার এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়ার তিন মাস আগে তিনি মারা যান।’

তার শরীর আবার কাঁপতে থাকে, তারপর সব নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে, তিনি উঁচু স্বরে ডাকতে থাকেন— ‘বাবা, বাবা।’

তারপর দুহাতে মুখ ঢেকে শব্দ করে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে থাকেন। অদম্য কান্নার ফাঁকে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে— বাবা, বাবা...।

আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকি, আমার চলে আসা হয় না, অথচ নির্ধারিত ১০ মিনিট পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই...।