বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিপিন পালের পুতুলনাচের দলের নাম ছিল ‘গোবিন্দ পুতুলনাচ’। বিভিন্ন পূজা-পার্বণে এ দলের পরিবেশনায় পুতুলনাচের মাধ্যমে তুলে ধরা হতো নানা ধর্মীয় পালা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনপদে পুতুলনাচের এ ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেয়া আরো কয়েকজনের নামও জানা যায়। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. তারু মিয়া, ধন মিয়া, কালু মিয়া, মো. রাজ হোসেন ও পৌর শহরের কাজীপাড়া এলাকার শরীফ মালদার। তাদের অনেকেই আজ আর জীবিত নেই। কিন্তু তাদের হাত ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে পুতুলনাচ পেয়েছে নতুন প্রাণ।

সার্কাসও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যের অংশ। ঐতিহ্যবাহী ‘দি নিউ স্টার সার্কাস’-এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৫ সালে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বর্তমান পৌর শহরের দাতিয়ারার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এমএ সামাদ ওই বছর দলটি গঠন করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা সার্কাস দলটি অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রামীণ জনপদ ও বিভিন্ন উৎসবের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আমোদী ও শারীরিক কসরতের নানা খেলা প্রদর্শনের মাধ্যমে ‘দ্য নিউ স্টার সার্কাস’ অর্জন করে ব্যাপক খ্যাতি। গ্রামবাংলার মেলা ও উৎসবের আসরে সার্কাসের তাঁবু ঘিরে তৈরি হতো মানুষের ভিড়, আর নানা কসরত ও খেলা হয়ে উঠত দর্শকদের বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ। এভাবেই দলটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিনোদন ও লোকঐতিহ্যের একটি অংশ হয়ে ওঠে।

তবে সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের বিনোদনের ধরন। আধুনিক নানা মাধ্যমের বিস্তার ও পরিবর্তিত বিনোদন সংস্কৃতির প্রভাবে একসময় বন্ধ হয়ে যায় ঐতিহ্যবাহী ‘দ্য নিউ স্টার সার্কাস’। মূল দলটি আজ আর সক্রিয় না থাকলেও এর কিছু সরঞ্জাম এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয়ভাবে অন্যান্য দল এ ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে ‘বুলবুল সার্কাস’ অন্যতম। ফলে মূল দলের যাত্রা থেমে গেলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি থেকে সার্কাসের সেই ঐতিহ্য একেবারে হারিয়ে যায়নি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাত্রাপালার আছে নিজস্ব ইতিহাস। স্বদেশী যাত্রার ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জয়দুর্গা অপেরা। এ দলের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বত্বাধিকারী ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় যতীন চক্রবর্তী। অনেকে তাকে সম্বোধন করতেন ‘কর্তা’ বলে। একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যাত্রাপালার যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, জয়দুর্গা অপেরা ছিল তারই অন্যতম অংশ। উল্লিখিত দলগুলোর কার্যক্রম অবশ্য অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে তাদের মঞ্চায়ন, আর এ ঐতিহ্যকে ধরে রাখার উত্তরাধিকারীও এখন আর কেউ নেই।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভোলানাথ অপেরা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬০ সালে। ১৯৭০-৭১ সালের যাত্রা মৌসুমে, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে, এ দলের নৃত্যশিল্পী ছিলেন অঞ্জু ঘোষ—পরবর্তীকালে ঢাকার সিনেমার আবেদনময়ী নায়িকা হিসেবে যার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। যাত্রাদলে অঞ্জু ও মঞ্জু—দুই বোন ডুয়েট গান পরিবেশন করতেন। তাদের কণ্ঠে শোনা যেত কিশোর কুমারের সেই সময়ের জনপ্রিয় গান—‘এক পলকের একটু দেখা, আর একটু বেশি হলে ক্ষতি কি!’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস অপেরার যাত্রাপালার বিষয়বস্তুতেও ছিল বৈচিত্র্য। প্রতি বছরই বিষয়বস্তুর দিক থেকে মূলত দুই ধরনের যাত্রাপালা মঞ্চায়িত হয়ে আসছে। এর একটি নাটকীয় গুণসম্পন্ন, সংলাপনির্ভর মূল যাত্রা। এর মধ্যে রয়েছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মা-মাটি-মানুষ, সোহরাব-রুস্তম, জানোয়ার ও একটি পয়সা।

অন্যদিকে রয়েছে রূপকথা কিংবা লোককাহিনীভিত্তিক সংগীতবহুল পালা। রহিম বাদশা ও রূপবান কন্যা, লাইলী মজনু, আলোমতি-প্রেমকুমার, কমলার বনবাস এবং গুনাইবিবি প্রভৃতি ছিল এমনই কিছু জনপ্রিয় পালা। এসব পালা পরিবেশনকারী দলগুলোকে বলা হতো গীতিনাট্য বা ঝুমুর দল।

এভাবে সংলাপ, গান, অভিনয় ও লোককাহিনীর সমন্বয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যাত্রাপালা একসময় হয়ে উঠেছিল জনমানুষের বিনোদন ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের স্রোতে অনেক দল হারিয়ে গেলেও তাদের পালা, শিল্পী ও মঞ্চের স্মৃতি আজও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।