তাদের সেই আকুল আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রত্যেক বাড়িতে স্বর্গ থেকে নেমে আসত বিশাল এক ধানের গোলা। ফলে খাদ্যের সংস্থান করতে তাদের কোনো কষ্টই করতে হতো না। কিন্তু একবার এক রমণী গোলককে বরণ করে নিতে ঘর ঝাড়ু দিচ্ছিল। এমন সময় গোলক এসে অবতরণ করে আর ঝাড়ুর আঘাতে সেটি টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এরপর থেকেই ভিয়েতনামের মানুষের জন্য স্বর্গীয় চালের আগমন বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে তাদের জমি চাষ করে ধান ফলানো শুরু করতে হয়।
লোককথার এমন গল্প বলে দেয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের জীবনে ধানের গুরুত্ব। বিশ্বে ধান উৎপাদনে শীর্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত রাষ্ট্রগুলো অন্যতম। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার কিংবা কম্বোডিয়ার বিস্তীর্ণ সবুজ ধানখেত শুধু কৃষির প্রতীক নয়; এগুলো এ অঞ্চলের ইতিহাস, অর্থনীতি ও জীবনদর্শনেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ অঞ্চলের সভ্যতায় ধান কেবল খাদ্য নয়, জীবনের উৎস ও ঐশ্বরিক আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ফসল হিসেবে ধানের যাত্রা শুরু হয়েছিল অন্তত বেশ কয়েক হাজার বছর আগে। ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা অনুযায়ী, সর্বপ্রথম ধান চাষের নিদর্শন পাওয়া যায় দক্ষিণ চীনের ইয়াংজি নদীর অববাহিকায়। ধান মূলত ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের একটি প্রজাতি। জলাভূমিতে নানা প্রজাতির ধান উৎপন্ন হতো। পরবর্তী সময়ে এসব বুনো ধানকে গৃহজাত শস্যে রূপান্তর করা হয়। জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্মানো এ ঘাস ধীরে ধীরে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ইয়াংজি বদ্বীপ থেকে এ ধান ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ ভিয়েতনাম, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জে।

কাগজে আঁকা ধানের শীষ, ১৮০৪ খ্রি. ছবি: লেইডেন ইউনিভার্সিটি
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। থাইল্যান্ডের বিখ্যাত প্রত্নস্থল বান চিয়াং থেকে উদ্ধার করা প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, প্রাগৈতিহাসিক জনগোষ্ঠী মিঠা পানির উৎসকে কেন্দ্র করে মাছ ধরা, ফাঁদ পাতা, সংগ্রহ ও শিকারের মাধ্যমে জীবনধারণ করত। একই সঙ্গে সেখানকার প্রাচীন মৃৎপাত্রের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাত্র নির্মাণে ব্যবহৃত কাদামাটির সঙ্গে কখনো কখনো চাল মেশানো হতো। এ আবিষ্কার ইঙ্গিত করে যে ধান তখনকার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। যদিও গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন যে তারা কেবল বুনো ধান সংগ্রহ করত, নাকি বসতির আশপাশের জলাভূমি ও তীরে ধানের পরিকল্পিত চাষাবাদও শুরু করেছিল। এসব নিদর্শন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধানের প্রাচীন উপস্থিতি ও গুরুত্বের সুস্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করে।
কম্বোডিয়ার খেমার বা আঙ্কোর সাম্রাজ্য ধাননির্ভর সভ্যতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আঙ্কোর অঞ্চলে নির্মিত বিশাল জলাধার বা ‘বারাই’ শুধু প্রকৌশল কীর্তি ছিল না; এগুলো ছিল ধান উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল। শুষ্ক মৌসুমেও যাতে ধান উৎপাদন অব্যাহত থাকে, সেজন্য পানি সংরক্ষণের বিশাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। গবেষকদের মতে, আঙ্কোরের কয়েক লাখ মানুষের নগরজীবন টিকে ছিল এ ধাননির্ভর সেচ ব্যবস্থার ওপর।
ধান কেবল এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্যের সংস্থান করেনি; এটি মানুষের জীবনযাত্রার ধরন বদলে দিয়েছিল। শিকার ও সংগ্রহনির্ভর সমাজে মানুষ ছিল চলমান ও যাযাবর। খাদ্যের সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রতিনিয়ত গমন করতে হতো। কিন্তু ধান চাষের জন্য প্রয়োজন ছিল স্থায়ী বসতি, নিয়মিত শ্রম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ফলে নদী ও জলাভূমির পাশে স্থায়ী গ্রাম গড়ে উঠতে শুরু করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়, জমির ওপর নির্ভরতা বাড়ে এবং সমাজে নতুন ধরনের সংগঠন গড়ে উঠতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ধান চাষাবাদই ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়াসহ সমগ্র অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিকাশের ভিত্তি হয়ে উঠেছিল।

ছবি: ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট
ধান দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের আধুনিক ভূখণ্ডের নির্মাণেও বড় ভূমিকা রেখেছে। খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের শেষদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নতুন নতুন রাষ্ট্রের উত্থান ঘটতে শুরু করে। বার্মা, সিয়াম, লাওস ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন রাজ্য ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর পেছনের কারণ ছিল ভেজা ধান চাষের বিপ্লব। আর ধান যেকোনো শস্যের চেয়ে বেশি উৎপাদনশীল। শত শত বছর ধরে একই জমিতে বারবার এ শস্য রোপণ করা যায়। ফলে ধানের ব্যাপক চাষাবাদের মাধ্যমে তারা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলে। ধানের জন্য উন্মুক্ত বাজার তৈরি হয়। বাজারে যার কাছে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ধান থাকত তাকেই পুরস্কৃত করা হতো।

ধানের দেবী শ্রীদেবী। জাভা ও বালি অঞ্চলে তার উপাসনা হতো ছবি: গুণা কর্তাপ্রান্ত
যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসাধারণকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখা। ভেজা ধান চাষ তাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছিল। উদ্বৃত্ত খাদ্যের ফলে জনসাধারণকে আর কৃষিকাজে যুক্ত থাকতে হয়নি। কেউ সৈনিক হয়েছে, কেউ কারিগর, কেউ পুরোহিত, কেউ প্রশাসক। এভাবেই গড়ে উঠেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আধুনিক সময়ের ভিত। নৃবিজ্ঞানী স্টিভ ল্যানসিং দেখিয়েছেন ধান কীভাবে বালিনিজ সমাজকে রূপ দিয়েছে।
এ অঞ্চলে ধানের সঙ্গে ধর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধান এখানকার মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রভাবিত করেছে। আগে মানুষের জীবন যেমন সহজ ছিল, তেমনি ছিল অলৌকিকতায় ভরপুর। বহু জনগোষ্ঠী ধানকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে কল্পনা করত। থাইল্যান্ড ও লাওসে প্রচলিত ছিল ‘মে খাও’ ধারণা, অর্থাৎ মে খাও হলো ধানের মা। তারা বিশ্বাস করত মে খাও তাদের খেতের রক্ষক ও উর্বরতার প্রতীক। ইন্দোনেশিয়ার বহু অঞ্চলে ধানের বীজ বপনের আগে বিশেষ আশীর্বাদ অনুষ্ঠান পালন করা হতো। ফসল কাটার সময়কে অত্যন্ত পবিত্র গণ্য করা হয়। ফলে এ সময় উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা, অশালীন আচরণ করা কিংবা অশুভ শব্দ উচ্চারণ করা ছিল নিষিদ্ধ। কারণ তারা বিশ্বাস করত এতে ধানের আত্মা রুষ্ট হতে পারে। অনেক জায়গায় ধানকে মানুষের জীবনচক্রের সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে। যেমন বীজ বপন হলো গর্ভধারণ, চারার বৃদ্ধির মানে শৈশব, পাকা ধান যেন পূর্ণতা এবং ফসল কাটা মানে মৃত্যু ও পুনর্জন্মের প্রতীক। মিয়ানমারে এখনো কেউ মৃত্যুবরণ করলে মরদেহ কবর দেয়ার আগে, পৃথিবীর রক্ষক ভুম্মাজো দেবতাকে হলুদ মাখানো চালের নৈবেদ্য উৎসর্গ করা হয়। এ প্রতীকী সম্পর্ক ধানকে শুধু খাদ্য নয়, পবিত্রতার মর্যাদা দিয়েছে। ধান উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধারাবাহিক ধর্মীয় প্রথাকে ন্যায্যভাবেই এশিয়ার প্রাচীনতম ধর্মীয় ভাবনাগুলোর মধ্যে অন্যতম বলা যেতে পারে।

চীনের ইয়াংজি অববাহিকায় প্রথম ধান চাষ শুরু হয়েছিল ছবি: অ্যান্ড্রু হিচকক
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা অন্যতম প্রধান খাবার হলো ভাত। তবে এ অঞ্চলে ভাতের গুরুত্ব কেবল একটি খাদ্যদ্রব্য হিসেবে নয়; বরং এটি জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার মালয়দের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হলো ‘নাসি লেমাক’। নাসি শব্দের অর্থ ভাত ও লেমাক অর্থ পুষ্টিকর বা মেদযুক্ত। সামাজিক বিভিন্ন উৎসবের পাশাপাশি পারিবারিক আড্ডার এক অন্যতম উপাদেয় এ নাসি লেমাক।
বিশ্বে মাথাপিছু আঠালো চাল খাওয়ার ক্ষেত্রে লাওস শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এখানে বছরে মাথাপিছু গড়ে ১৭১ কিলোগ্রাম (৩৭৭ পাউন্ড) আঠালো চাল খাওয়া হয়। লাওদের প্রধানতম খাদ্যদ্রব্য হলো আঠালো চাল। আঠালো চাল লাওসের সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। লাও সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সাধারণ বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে যে তারা বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, আঠালো চাল সর্বদা তাদের একত্রিত করে রাখবে। আঠালো চালের প্রতি এ অনুরাগকে লাও হওয়ার সারমর্ম বলে মনে করা হয়।
ভিয়েতনামের বাড়িতে খাবারের টেবিলের প্রধান খাবার হলো ভাত, যা কেন্দ্রে রাখা হয় এবং এর চারপাশে অন্যান্য খাবার সাজানো থাকে। এছাড়া চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি রাইস বল এবং ডাম্পলিং ভিয়েতনামি খাবারের তালিকায় সবচেয়ে জনপ্রিয় অবস্থানে রয়েছে। মিয়ানমারের জনসাধারণের প্রধান খাবার ভাত, যা স্থানীয় ভাষায় থামিন নামে পরিচিত। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় খাবার ‘তুম্পেং’ মানুষের বিশ্বাস, উৎসব ও সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িত। জাভানিজ সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের ভোজ হিসেবে তুম্পেং উপস্থাপিত হয়।
বর্তমানে জনপ্রিয় খাবার নাসি লেমাক, তুম্পেং বা এক বাটি আঠালো সাদা ভাতের পেছনে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের হাজার বছরের ইতিহাস। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনচক্রের প্রতিটি স্তরে, তাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও লোককথায় গভীরভাবে প্রোথিত আছে ধানের ঐতিহ্য। একসময় কৃষকরা নিজেদের পরিবারের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য ধান চাষ করলেও বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম চাল রফতানিকারক বাজারে পরিণত হয়েছে এ অঞ্চল। ধান এ অঞ্চলকে অর্থনীতির বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার পথ তৈরি করে দিয়েছে।
ডেইজি আক্তার: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা







