সাধারণভাবে দেখলে পিৎজা একটি খাবার বৈ কিছু নয়। তবে এর মধ্যে খুঁজে নেয়া যায় ইতালির ইতিহাস। ইতালির—বিশেষ করে নেপলস—রান্না ও সংস্কৃতির একটি রূপ ধরে রেখেছে পিৎজা। তবে সময়ের সঙ্গে এটি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। আর নানা অঞ্চলের রান্নার বিশেষত্ব, মানুষের রসনার চাহিদা অনুসারে উপাদান যুক্ত হয়েছে এতে। ফলে পিৎজা হয়ে উঠেছে কোনো কোনো অঞ্চলের মানুষের জীবনাচরণের অংশ। সেই সঙ্গে পিৎজার উপস্থিতি আমরা পাই সাহিত্যেও।
সাহিত্য মানবজাতির অভিন্ন অনুভূতি, ইতিহাস ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে পিৎজা এমন এক রূপক, যা আমাদের সামনে একটি প্লেটে পুরো পৃথিবীকে হাজির করে। যখন আমরা এ দুটিকে একসঙ্গে রাখি, তখন একটি চিন্তাশীল গল্প জন্ম নেয়।
প্রথমেই তাকানো যায় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘আ মুভেবল ফিস্ট’ বইয়ে। এর পটভূমি প্যারিস। বইয়ের চরিত্রগুলো যদি কোনো বিস্ত্রোতে বসে পিৎজা খেত, তাহলে হয়তো তাদের কথোপকথন কম কঠোর, আরো উষ্ণ হয়ে উঠত। অথবা জেডি স্যালিঞ্জারের ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’-এর হোল্ডেন কলফিল্ডের কথা ভাবা যায়। যদি সে নিউইয়র্কের রাস্তায় কোনো পিৎজারিয়ায় বসে নিজের জগতে ডুবে থাকত, তাহলে তার বিখ্যাত প্রশ্নগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে চলতে পারত। হয়তো নিঃসঙ্গতার মাঝেও পিৎজা এক ধরনের ‘অর্থ’ তৈরি করতে পারত।
তবে পিৎজা কেবল রূপক হিসেবেই নয়, আমেরিকান সাহিত্যেও সরাসরি নিজের স্থান করে নিয়েছে। এলিজাবেথ গিলবার্টের ‘ইট, প্রে, লাভ’-এ ইতালির সেই বিখ্যাত পিৎজা দৃশ্য পাঠকের মনে গেঁথে থাকে, যা আমাদের জীবন উপভোগ করতে মনে করিয়ে দেয়। নেপলসের সেই পিৎজাটিকে গিলবার্ট শুধু খাবার হিসেবে নয়, আত্ম-অন্বেষণের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। টমেটো সস আর মোজারেলার টুকরোর মধ্যে লুকিয়ে আছে মানুষের নিজের সঙ্গে শান্তিতে থাকার সংগ্রাম।
রে ব্র্যাডবারির ‘ড্যান্ডেলিয়ন ওয়াইন’-এর কথা ভাবা যায়। এ গ্রামীণ আমেরিকান শহরে পিৎজা হয়তো এমন এক বন্ধন তৈরি করতে পারত, যেখানে মানুষ জড়ো হয়ে নিজেদের গল্প শুনাত। অথবা এফ স্কট ফিটজেরাল্ডের ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’র জে গ্যাটসবির বিলাসবহুল পার্টিগুলোয় আধুনিক ও সহজলভ্য এক স্বাদ হিসেবে পিৎজাকে কল্পনা করা যায়। সমৃদ্ধ টেবিলের সঙ্গে মিলে পিৎজা শ্রেণীগত বিভেদ এবং অভিন্ন মুহূর্তগুলোর এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠতে পারত।
সাহিত্যের পাশাপাশি সাহিত্যিকরা পিৎজা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এর মধ্যে দি অ্যাডভেঞ্চারস অব পিনোকিওর লেখক কার্লো কল্লোদির (কার্লো লরেঞ্জিনির ছদ্মনাম) কথা স্মরণ করা যায়। নিজের দেখা পিৎজা নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘টোস্ট করা খোলের কালচে রঙ, রসুন ও অ্যাঙ্কোভির (হেরিং জাতীয় ক্ষুদ্র মাছ) সাদাটে ঝিলিক, তেল ও ভাজা মসলার সবুজাভ-হলুদ আভা, আর এখানে-সেখানে টমেটোর লালচে দাগ, সব মিলিয়ে পিৎজাকে এমন এক জটিল নোংরা চেহারা দেয়, যা বিক্রেতার ময়লার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মানিয়ে যায়।’
কার্লোর এ বর্ণনা অতিরঞ্জিত না। মূলত নেপলসে পিৎজার সূচনাকালে এটি ছিল ‘রোডসাইড ফুড’। ফলে বিক্রেতারা আসলেও নোংরা পোশাকে থাকত এবং পিৎজাও আজকের মতো চকমকা পরিষ্কার চেহারার ছিল না।
সাহিত্যে পিৎজা প্রসঙ্গ এসেছে নানা সময়। খাবারের প্রসঙ্গে পিৎজার প্রসঙ্গ আসতেই পারে, তবে পিৎজাকে ঘিরে সাহিত্য সুলভ না। এক পিৎজা ডেলিভারি গার্লকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন কুয়ো ফ্রেজার, নাম ‘পিৎজা গার্ল’। অবশ্য পিৎজা বিষয়ে বই আছে বেশকিছু। এর মধ্যে জেমস এলিয়ট ও থম এলিয়টের ‘পিৎজা: হিস্ট্রি, রেসিপিজ, স্টোরিজ, পিপল, প্লেসেস, লাভ’ উল্লেখযোগ্য। পিৎজার বাক্সের আকারে তৈরি করা হয়েছে বইটি। এতে পিৎজা, পিৎজার দুনিয়া, পিৎজার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার উঠে এসেছে।
অ্যান্থনি ফ্যালকোর বই ‘পিৎজা জার’। ফ্যালকো পিৎজার দুনিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তি। তিনি একজন পিৎজা উপদেষ্টা। প্রায় এক দশক তিনি ব্রুকলিনের বিখ্যাত রবার্তা’স-এ কাজ করেছেন। তিনি নিউইয়র্ক সিটির খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে নিয়ে এসেছেন। ঘুরেছেন ব্রাজিল, কলাম্বিয়া, কুয়েত, পানামাসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলে। তিনি সেসব অঞ্চলের রান্নার বিষয়ে জেনেছেন। ‘পিৎজা জার’ বইয়ে সারা বিশ্ব থেকে তুলে আনা এসব বিষয় তিনি জানিয়েছেন পাঠককে।
টনি গেমিগনানি ১১ বার বিশ্ব পিৎজা চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ধরেই নেয়া যায় পিৎজা সম্পর্কে তিনি প্রায় সবই জানেন। তাই তার বইয়ের নাম ‘দ্য পিৎজা বাইবেল’। এতে নানা ধরনের পিৎজার রেসিপি আছে। সেই সঙ্গে লেখক পিৎজাকে তুলে ধরেছেন নানা আঙ্গিক থেকে। বইটিতে পিৎজার ধরন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে এবং বিস্তারের পরিসর অবিশ্বাস্য রকমের বড়। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিকেই নয়, বরং বার্সেলোনা, ডাবলিন, গ্রিস ও মিউনিখ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ বিশাল পরিসর নিজেই যেমন অভিভূত হওয়ার মতো, তেমনি কিছু অভিনব ও প্রচলিত ধারা ভাঙা প্রযুক্তি নিয়ে লেখা অংশগুলো সে বিস্ময়কে আরো এক ধাপ বাড়িয়ে দেয়।
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক









