পিৎজা আজ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারের একটি। আমেরিকানরা বর্তমানে বিশ্বের অন্য যেকোনো জাতির চেয়ে এটি বেশি খায়। খাবারটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ইতালির নেপলস শহরে। এটি আমেরিকায় আসার পর দ্রুত জনপ্রিয় হয়। আমেরিকানরা তাকে নতুন আকৃতি ও স্বাদে রূপান্তর করে। অভিবাসন, যুদ্ধ ও প্রযুক্তির সংযোগে পিৎজা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে।

প্রথম ইতালীয় অভিবাসীরা নিউইয়র্কের সড়কে পিৎজা বিক্রি করতেন। ১৯৩০-এর দশকে লোমবার্ডি তার পিৎজা দোকানকে রেস্তোরাঁয় রূপান্তর করেন। লোমবার্ডির রেস্তোরাঁকে আমেরিকার প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পিৎজারিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি নিউইয়র্কের ‘লিটল ইতালি’ কমিউনিটির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অপেরাশিল্পী থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটের শিশুরাও লোমবার্ডির দোকানে যেতেন, পিৎজা খেতেন।

লোমবার্ডির পিৎজা চুলা এখনো কিংবদন্তিস্বরূপ। একটি সংবাদপত্রের নিবন্ধে বর্ণিত হয়েছে এভাবে: বাইরে কালো ও সাদা এনামেল ইট, ভেতরে টেরাকোটা ইট। নিচে প্রচুর তাপ ধারণকারী বালি। প্রায় সাত ফুট উঁচু, ১২ ফুট প্রশস্ত ও ১২ ফুট গভীর। একসঙ্গে ১৫টি পিৎজা রাঁধা যায় এখানে।

লোমবার্ডি সরাসরি নিউইয়র্ক পিৎজারিয়া প্রথার সূচনা করেন। কারণ যারা তার সঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন, তারা নিজেদের রেস্তোরাঁ খোলেন। উদাহরণস্বরূপ, জন সাসো ‘জন’স পিৎজা’ খোলেন ১৯২৯ সালে এবং অ্যান্থনি পেরো কনি আইল্যান্ডে টোটোনো’স খোলেন ১৯২৪ সালে।

আমেরিকার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ‘পিৎজা বেল্ট’ হিসেবে পরিচিত পায়। ম্যানহাটন ও নিউ জার্সিতে ছড়িয়ে পড়ে খাবারটি, যেখানে ইতালীয় অভিবাসীরা পিৎজারিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়ায়। ইতালীয় অভিবাসী অধ্যুষিত শহর নিউ হ্যাভেনে ফ্র্যাঙ্ক পেপে ‘হোয়াইট পিৎজা’ বিক্রি শুরু করেন। পরে ১৯২৫ সালে পেপে রেস্তোরাঁ খোলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগপর্যন্ত খাবারটি মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এর বাইরে কম আমেরিকানই পিৎজা সম্পর্কে জানতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পিৎজা আংশিকভাবে আঞ্চলিক ও জাতিগত বাজার থেকে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। ইতালিতে গিয়ে ফিরে আসা সৈন্যদের প্রভাব খাবারটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট খাদ্য গবেষকরা।

খাদ্য নিয়ে লেখালেখিও পিৎজা প্রচারে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। তারা ঘরে তৈরি সহজ ও মজাদার স্ন্যাকস বা মিল হিসেবে (সালাদ ও ফলের সঙ্গে) পিৎজা উপস্থাপন করার পদ্ধতি তুলে ধরেন। পিৎজার আরেকটি ঐতিহাসিক প্রভাব আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এবং পরে এ খাবার একটি খাদ্যগত দূত হিসেবে কাজ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির সম্পর্ক উন্নয়নে সাহায্য করেছে।

পিৎজা ফ্র্যাঞ্চাইজি যেমন পিৎজা হাট, ডোমিনোজ এবং পাপা জনের দোকানগুলো স্ট্রিট কর্নারে খুচরা বিক্রি ম্যাকডোনাল্ডস ও স্টারবাক্সের মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। আমেরিকানরা পিৎজার রূপ ও উন্নতি নিয়ে ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বর্তমানে নিউইয়র্কের পাতলা স্লাইস থেকে শিকাগোর ডিপ ডিশ, হাওয়াইয়ান বা বারবিকিউড চিকেন পিৎজা পর্যন্ত তৈরি হয়। এভাবে আমেরিকানরা ইতালীয় পিৎজার পদ্ধতিকে আরো বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। সরাসরি ফ্ল্যাটব্রেডের ওপর কিছু টমেটো ও চিজ দেয়ার পদ্ধতিকে একটি শিল্পে রূপান্তর করেছে। এর মধ্যে নিউ হ্যাভেন পিৎজা এবং হলিউডের স্পাগো রেস্তোরাঁয় পরিবেশিত রোস্ট ডাক ও গোট চিজ দিয়ে সজ্জিত উচ্চমানের পিৎজা অন্যতম।

কিছু অদ্ভুত পিৎজা আঞ্চলিক ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে। আবার কিছু শহর ও রাজ্যের সীমা অতিক্রম করে দেশের খাদ্য সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। যেমন বারবিকিউড চিকেন পিৎজা (বারবিকিউড চিকেন, লাল পেঁয়াজ ও স্মোকড গুঁড়া চিজ দিয়ে তৈরি)। এটি মূলত ক্যালিফোর্নিয়ার একটি উদ্ভাবন। এখন তা দেশের বিভিন্ন শহরে পিৎজারিয়া ও চেইন রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায়। আর আনারসের টুকরা ও কানাডিয়ান বেকন দিয়ে সজ্জিত হাওয়াইয়ান পিৎজা বেশ জনপ্রিয়।

ইতিহাসবিদ ডোনা গ্যাবাকিয়া বলেন, ‘আমেরিকানরা প্রায়ই তাদের খাদ্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে খাবার মিশিয়ে নতুন ধরনের খাবার তৈরি করেন।’

১৯৬০-এর দশকে প্রথম ফ্রোজেন পিৎজা বিস্তৃত হয়। ১৯৮০-এর দশকে এটি আরো জনপ্রিয় হয়। ১৯৯০-এর দশকে পিৎজার বিবর্তনে পুনরাবৃত্তি হয়। তখন পিৎজায় উচ্চমানের উপাদান ব্যবহার বাড়ে।

প্রযুক্তি ও ফ্রোজেন পিৎজার আবিষ্কার

যুদ্ধোত্তর আমেরিকায় পিৎজার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। তখন ভোক্তারা চাইতেন এমন পিৎজা, যা বাড়িতে সহজে বানানো, সংরক্ষণ ও গরম করে খাওয়া যায়। ফ্রোজেন পিৎজা এ চাওয়াকে সহজ করে দেয়। পাশাপাশি এটি প্রস্তুতকারকদের সময়ের চাপও হ্রাস করে। তবে ফ্রোজেন পিৎজা তৈরি করতে গিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। প্রধান সমস্যাটি ছিল ক্রাস্ট স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়া। এর কারণ টমেটোর উচ্চ আর্দ্রতা। টপিং ও ক্রাস্ট একই সঙ্গে জমিয়ে ফেলার চেষ্টা করলে টমেটোর পানি গলে গিয়ে পিৎজাকে নরম ও ভেজা করে দিত। এ সমস্যার সমাধান করেন রোজ টোটিনো, যিনি পিৎজার প্রস্তুতি ও ব্যবসাকে আরো জনপ্রিয় করেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেন, টপিং যুক্ত করার আগে ক্রাস্টকে হালকা সেঁকে নিলে স্যাঁতসেঁতে ভাব কমে যায়। ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ রেসিপির জন্য তাকে ফ্রোজেন পিৎজার প্রথম পেটেন্ট প্রদান করে।

এরপর ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ফ্রোজেন পিৎজা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সুপারমার্কেটের ফ্রোজেন খাবারের শেলফে পিৎজা একটি গৃহস্থালি প্রধান খাদ্য হিসেবে জায়গা করে নেয়। এটি এত সহজলভ্য হয়ে যায় যে শহর ও উপশহরের খাদ্য সংস্কৃতিতে পিৎজা একেবারে সাধারণ খাবার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

পিৎজা হাটের উত্থান

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম অঞ্চলে পিৎজা চেইনের বিস্তার শুরু হয়। ১৯৫৮ সালে কানসাসের উইচিটায় প্রথম পিৎজা হাট খোলা হয়। ১৯৭৭ সাল নাগাদ পিৎজা হাটের শাখার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪০০। তখন এটি বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণের পরিকল্পনা শুরু হয়।

পিৎজা হাট পরিবারে জনপ্রিয় হওয়ার কারণ ছিল প্রথমত খাবারের স্বাদ ছিল পূর্বানুমেয় ও নিরাপদ। দ্বিতীয়ত এর খাবার শিশুদের নিয়ে যাওয়ার জন্য সুবিধাজনক।

পিৎজা আমেরিকানদের খাদ্য ছিল না। কিন্তু এখন সেখানে খুবই জনপ্রিয়। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে খুব কম মানুষই জানত পিৎজা আসলে কী? কিন্তু মাত্র দুই দশকের মধ্যে দেশজুড়ে নানা রূপে পিৎজা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে এটি এড়িয়ে চলাই কঠিন হয়ে যায়। এমনকি আমেরিকানা অল্প সময়ের মধ্যেই পিৎজার সংস্কৃতিকে পর্যন্ত বদলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক খাতে পিৎজার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে। পিৎজার বৈশ্বিক বিস্তার ঘটেছে অসাধারণভাবে। এ বিস্তারে আমেরিকান প্রযুক্তিগত অগগ্রতি ভূমিকা রেখেছে।

বাশার খান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা