লঙ্গরখানা। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস বা অন্য কোনো দুর্যোগময় পরিস্থিতি। বহু মানুষকে একসঙ্গে সুষম খাদ্য দিতে হবে। এ অবস্থায় সহজে সুষম খাদ্য দেয়ার জন্য তৈরি হয় খিচুড়ি। চাল-ডালের সঙ্গে কখনো যুক্ত হয় নানা প্রকার সবজি। এদিকে মোগল শিবিরে সৈন্যদের পুষ্টিকর খাবার সহজে তৈরির জন্যই উদ্ভব হয়েছিল বিরিয়ানি। পরবর্তী সময়ে দুটো খাবারই হয়ে উঠেছে শখের, বিলাসের। আজকের দিনে পিৎজা বিক্রি হয় শহরের দামি রেস্টুরেন্ট, ফুড কোর্ট এমনকি পিৎজার জন্য বিশেষায়িত দোকানে। কিন্তু পিৎজার শুরুটা বিলাসী ছিল না। প্রয়োজন থেকে তৈরি হয়েছিল খাবারটি। রুটির সঙ্গে এমন কিছু যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল, যা ভারী খাবার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একে একে যুক্ত হয় নানা টপিং। আর এ পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলেছিল ইতালির নেপলসে।
ইতালির পিৎজা নিয়ে আলোচনা নেপলসে শুরু হয়ে নেপলসেই শেষ হবে। এর অন্যতম কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে খাবারটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এরপর তা আর ইতালির নিজস্ব ছিল না। তবে এর আগে ইতালিতেও পিৎজা তুলনামূলকভাবে নেপলসেই সীমাবদ্ধ ছিল। আঠারো শতকে ইতালির এ অংশে পিৎজা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। পিৎজার ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশ্লেষকরা বলেছেন এটি জনপ্রিয় হওয়ার কারণ মূলত খাবারটি ছিল একদিকে সস্তা, সহজে প্রস্তুতযোগ্য এবং তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। বিশেষ করে প্রাথমিক অবস্থায় দরিদ্ররাই ছিল পিৎজার প্রধান ভোক্তা। এর মূল উপাদান রুটি জনপ্রিয় ছিল শহরের শ্রমিক ও গ্রামের কৃষকদের মধ্যে। তাদের প্রয়োজনে পিৎজার উন্নতি ও নতুন নতুন ধারা তৈরি হয়।
ইতালির শ্রমজীবীদের মধ্যে ‘ফোকাসিয়া’, ‘সিয়াসিয়াটা’, ‘পিয়াদিনা’, ‘ফারিনাটা’ ও ‘পানেলে’ নামের ফ্ল্যাটব্রেড জনপ্রিয় ছিল। এগুলোকে ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল পিৎজা। পিৎজার সবচেয়ে কাছাকাছি ধরনের ফ্ল্যাটব্রেড ছিল সিসিলির ‘সিনসিওন’। এক বা দুই পরতের এই মসলাদার রুটির ওপরে বিভিন্ন ধরনের ‘টপিং’ ব্যবহার করা হতো। নাম উল্লেখ করা প্রতিটি রুটিরই ওপরে নানা উপকরণ যুক্ত করার প্রচলন ছিল। রুটির ওপরে তেল, পশুর চর্বি, বিভিন্ন শাকপাতা, লবণ ও পেঁয়াজ দিয়ে এর স্বাদ বাড়ানো হতো। সেই সঙ্গে পুষ্টিও নিশ্চিত করত এই ‘টপিং’গুলো। এরপর নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে সহজে তৈরি করা খাদ্যের দিকে হেঁটেছিল নেপলস।
পিৎজা এখন থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল—এমনটা বলতে চান অনেক গবেষক। সে হিসেবে পিৎজা প্রথম তৈরি হয়েছিল সতেরো শতকে। নেপলসের পিৎজার ইতিহাসও এ সময়কে সমর্থন করে। সতেরো শতকের নেপলসে দারিদ্র্য ছিল। সে কারণেই সাধারণ মানুষের খাদ্য সহজে তৈরির পাশাপাশি সস্তা করার প্রয়োজন দেখা দেয়। সহজ করে বলতে গেলে, রুটিকে প্রধান খাদ্য উপকরণ হিসেবে রেখে এর সঙ্গে কিছু গুল্ম (সবজি), এক চিমটি বেশি লবণ যুক্ত করলেই তার স্বাদে বেশ পরিবর্তন হতো। রাঁধুনিরাও সেটাই আত্মীকরণ করেছিলেন। পাস্তাও তৈরি হয়েছিল এভাবে। বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে একটি পদ তৈরি করাই ছিল লক্ষ্য। পিৎজা এখন নানা স্বাদ ও টপিংয়ে পাওয়া যায়, কিন্তু নেপলসে এর সূচনা ও ভিত্তি ছিল রুটি।
আধুনিক পিৎজায় ব্যবহৃত মূল উপাদানগুলো হলো রুটি, পনির ও টমেটো। নেপলসে প্রাথমিক পর্যায়ে রুটির ওপর পনির দিয়ে সবচেয়ে সস্তা যে পিৎজাটি তৈরি হতো তার নাম ছিল হোয়াইট পিৎজা। রুটির ওপর পনিরের সঙ্গে এতে থাকত রসুন, পশুর চর্বি ও লবণ। এর চেয়ে বেশি দামের আরেকটি পিৎজা হলো ‘ক্যাসিওকাভেলো’। এটি ঘোড়ার দুধের পনির দিয়ে তৈরি হতো। এ ধারার পনির এখন মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি হয়। ক্যাসিওকাভেলোর ওপরে তুলসী দেয়া হতো। একই প্রণালিতে তৈরি টপিংয়ে মাছ দেয়া পিৎজার নাম ছিল ‘সিসিনিয়েলি’। এ দুই ধারার পিৎজাই প্রথমে নেপলসে প্রচলিত ও জনপ্রিয় ছিল। পরবর্তী সময়ে টপিংয়ে আসে টমেটো।
ইতালির বাইরে থেকে টমেটো এসেছিল দেশটিতে। সে সময় ইউরোপের অনেক দেশই টমেটোকে বিষাক্ত মনে করত। ষোলো শতকে নেপলস টমেটোর সঙ্গে পরিচিত হলেও টমেটোর চাষ শুরু হয় সতেরো শতকে। আবহাওয়ার কারণে নেপলসের টমেটো ছিল মিষ্টি। ফলে তা দ্রুতই পিৎজায় যুক্ত হতে শুরু করে। ধারণা করা হয়, পাস্তার সঙ্গে স্বাদ ও উপকরণে প্রতিযোগিতা করার জন্য নেপলসের পিৎজা প্রস্তুতকারকরা এতে টমেটো দেয়া শুরু করে। আরেকটি মত অনুসারে, ফ্ল্যাটব্রেড, পনির ও টমেটো মিলিয়ে খাবার তৈরি হয়েছিল আঠারো শতকের শুরুতে।
নেপলসের বিখ্যাত পিৎজারিয়াগুলোর (পিৎজা তৈরি ও বিক্রির স্থান) সূচনাকাল দেখা যাক। জি সিসিও ১৭২৭, নতুয়নো ১৭৩২, ক্যাপাসো ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয়। আর আঠারো শতকের মধ্যভাগেই এসব দোকানে টেবিল সেট করা হয় যেন ক্রেতারা সেখানে বসে পিৎজা খেতে পারে।
পিৎজা তৈরি হয়েছিল শ্রমজীবী মানুষের জন্য, সে কথা একাধিকবার বলা হয়েছে। নেপলসে পিৎজারিয়ায় টেবিল-চেয়ার দেয়ার কারণ ছিল স্প্যানিশ সৈন্যরা। তারা পিৎজার ভোক্তা ছিলেন। এছাড়া নানা শ্রেণীর মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে এবং বাড়িতে নিয়েও পিৎজা খেত। জেলেরা পিৎজার বড় ভোক্তা ছিল। তারা নাশতায় পিৎজা খেত, ক্ষেত্রবিশেষে প্রচুর পরিমাণেই খেত। সে কারণেই একটি পিৎজার নাম হয় পিৎজা মারিয়ানা। শব্দটি ইতালিতে নাবিক বা সমুদ্রযাত্রী বোঝাত।
নেপলসের রাস্তায় বসা পিৎজা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনে খেত ওই নগরের গরিব মানুষেরা। তবে তখনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের কাছে পিৎজা ছিল সপ্তাহে প্রতিদিন খাওয়ার মতো ডিশ। এরা সপ্তাহান্ত বা ছুটির দিন ম্যাকারনি কিনত।
বর্তমানে ইউরোপের বহু পিৎজাপ্রেমী নেপলসে যায় সেখানকার পিৎজা চেখে দেখতে। কিন্তু পিৎজার পীঠস্থানের মানুষেরা খাবারটি নিয়ে এভাবে কখনো ভাবেনি। তাদের কাছে জিনিসটা খুব সাধারণ এক খাবার বৈ কিছু তো ছিল না। টেলিগ্রাফের আবিষ্কারক স্যামুয়েল মোর্স ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে পিৎজা নিয়ে লেখেন, ‘এক ধরনের অত্যন্ত বমি উদ্রেককারী কেক...যার ওপর পোমোদোরো বা টমেটোর স্লাইস, আর ছোট মাছ, গোলমরিচ এবং আরো কী সব উপাদান ছড়ানো থাকে—সব মিলিয়ে এটি এমন এক টুকরো রুটির মতো দেখায়, যেন নর্দমা থেকে টেনে বের করা হয়েছে।’
নেপলসের মানুষের জীবন ও জীবনাচার নিয়ে লিখেছেন মাতিলদে সেরাও। ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত ‘ভেন্ত্রে দি নাপোলি’তে তিনি পিৎজাকে গরিবের খাবার বলে উল্লেখ করেছেন। সকালে মাত্র এক পেনি বা তারও কম খরচে এটা খাওয়া যায়। একজন স্কুলছাত্রের দুপুরের খাবার হয়ে যাবে দুই পেনির একটা পিৎজায়।
তবে পিৎজা প্রস্তুতকারকদের কাজের কমতি ছিল না। তারা গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। তারা ডো তৈরি করতেন। সেই সঙ্গে টমেটো, রসুন ও অরিগানো প্রস্তুত রাখতে হতো। এরপর দিনের বেলা তারা বাক্সে নিয়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পিৎজা বিক্রি করতেন।
নেপলসে পিৎজা বিক্রির ধরনটাও বেশ ভালো ছিল। বিক্রেতারা আস্ত পিৎজা নিয়ে ঘুরতেন। আর ক্রেতারা তাদের চাহিদামতো কেটে দিতে বলতেন। সেই অনুসারে বিক্রেতারা টুকরো কেটে বিক্রি করতেন। অনেক সময় কাজটা তারা হাতে নিয়েই করতেন। আর কখনো রাস্তার পাশে ছোট টেবিল-চেয়ার বসিয়ে সেখানে করা হতো।
পিৎজার এত জনপ্রিয়তা নেপলসের বাইরে ছিল না। সেরাও জানাচ্ছেন নেপলসের এক ব্যবসায়ী রোমে পিৎজারিয়া খুলেছিলেন। সেখানে তিনি নেপলসের আদি বাসিন্দাদের জন্য পিৎজা বিক্রি করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তিনি সাফল্য পাননি। বলা হয় নেপলসের মতো রোমের পিৎজায় স্বাদ ছিল না, যার কারণে নেপলসের লোকজনও সেখানে পিৎজা খেতে আগ্রহ দেখায়নি। ক্রেতার অভাবে লোকটিকে পিৎজারিয়া বন্ধ করে দিতে হয়। এছাড়া নেপলসের বেশির ভাগ মানুষ গরিব ও শ্রমজীবী হওয়ায় তাদের সবার রান্না করার সুযোগ ছিল না বলে পিৎজার বিক্রি ছিল বেশি। এছাড়া অনেকে শখ করেও পিৎজা খেত।
নেপলসের অধিবাসীদের মতে, সেখানকার দুটো মৌলিক পিৎজার একটি হলো পিৎজা মার্গারিটা। এটির জনপ্রিয়তার একটি বিশেষ কারণ আছে। স্যাভয়ের রানী মার্গারিটা পিৎজা পছন্দ করতেন এবং তার নামেই পিৎজাটির নামকরণ হয়। আরো বলা হয় এটা নেপলসের সমাজের সব শ্রেণীর মানুষই খেত। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে রানীর পছন্দই ডে মার্গারিটাকে জনপ্রিয় পিৎজায় পরিণত করেছে, এতে কারো সন্দেহ নেই।
যুদ্ধ বহু সংস্কৃতি বদলে দেয়। খাদ্যাভ্যাসও বদলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পিৎজার জনপ্রিয়তা বাড়ে। ইতালিতে নিযুক্ত ব্রিটিশ ও আমেরিকান সৈন্যরা পিৎজা খেয়ে এর ভক্ত বনে যাওয়ায় তাদের মাধ্যমেই খাবারটি ছড়িয়ে পড়েছিল। এটা একটা কারণ, তবে দেশময় মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমেও পিৎজার জনপ্রিয়তার পরিসর বেড়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতেই সংকট তৈরি হয়েছিল। ইতালির এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলে চলে যেতে বাধ্য হয়। সে সময় তারা নিজেদের প্রিয় খাবারটিও সঙ্গে নিয়েছিলেন। এ সময়ে ইতালির বাইরেও ইতালিয়ানরা চলে গিয়েছিলেন। ফলে দক্ষিণ ইতালীয়রা তাদের খাবার ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ইউরোপের অন্যত্র। ফলে স্টকহোমে যেমন পিৎজারিয়া তৈরি হলো, তেমনি তৈরি হলো মিলানে।
ইতালিতে এ সময় পিৎজা একটা লাভজনক পণ্যে পরিণত হয়। রোম, ফ্লোরেন্স, মিলানসহ বড় বড় শহরে পিৎজারিয়া তৈরি হয়। সেসব জায়গায় বিভিন্ন স্বাদ ও ধরনের পিৎজা তৈরি ও বিক্রি শুরু হয়। এসব পিৎজারিয়া ও রেস্টুরেন্টে বহু ভ্রমণকারী আসতে শুরু করে। পিৎজা তাদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। প্রথমদিকে সব রেস্টুরেন্টে পিৎজা তৈরির উপকরণ ছিল না। ফলে ভোক্তাদের তরফ থেকে অভিযোগ আসতে শুরু করে। এরপর তারা ভালো পিৎজা তৈরির জন্য সব রকম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক উন্নতির সময়ে ইতালি তাদের পিৎজাকে বহির্বিশ্বের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে। সময়টিকে ‘ইকোনমিক মিরাকল’ বলা হয়। অলৌকিকতা হোক বা যা-ই হোক, এই সময়টাতেই গরিবের খাবারকে ইতালি বৃহত্তর পরিসরে আনতে শুরু করে। এরপর তারা নিজেদের জীবনযাপনেও উন্নতি লক্ষ করতে শুরু করেছিল। দেশটির জনগণ গৃহস্থালি আসবাব, তৈজসপত্র কিনতে শুরু করে। তবে তারা ঘরে খাবার তৈরির পাশাপাশি ঘরের বাইরে খাওয়ার বিষয়টিতে অভ্যস্ত হতে শুরু করে। এ খাবারের মধ্যেও তাদের পছন্দের তালিকায় শুরুর দিকে থাকত পিৎজা।
ষাট ও সত্তরের দশকে ইতালির শহুরে মানুষেরা হালকা খাবারে বেশি খরচ করতে শুরু করেছিল। তাদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণে অর্থ ছিল। তবে ইতালিয়ানদের পাশাপাশি বাইরের ভোক্তারাও এ সময় পিৎজায় আগ্রহ দেখাতে থাকে। এ সময়েই দেখা যাচ্ছিল ইতালির চেয়ে আমেরিকানরা বেশি পিৎজা খাওয়া শুরু করেছে। ইতালি থেকে তারা পিৎজা খেয়ে নিজের দেশে গিয়েও এর স্বাদ ভুলতে পারত না। ফলে পিৎজা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
তাতে পিৎজার সঙ্গে ইতালির নাম জুড়ে বসেছিল আরো বেশি। মূলত নেপলসকে কিছুতেই পিৎজা থেকে আলাদা করা যায় না। পিৎজা নিয়ে আলাপ করতে গেলে নেপলসের নাম চলে আসবেই। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রান্নার বই-ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে পিৎজার প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। আর প্রতিবারই সেসব জায়গায় পিৎজাকে নেপলসের খাবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিখ্যাত অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন ছিলেন নেপোলিটান (নেপলসের অধিবাসী)। তিনি রোমে জন্মেছিলেন, তবে নেপলসের কাছে পোজ্জুয়োলিতে বড় হয়েছেন। যুদ্ধোত্তর সময়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে পিৎজার বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা গর্বের বিষয়। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ সারা বিশ্ব, বিশেষ করে তরুণরা, পিৎজা আর পিৎজারিয়ার প্রতি পাগল। এটি একটি সান্ত্বনাদায়ক এবং তাৎপর্যপূর্ণ সত্য; কারণ পিৎজার মধ্যে সবসময় এমন কিছু থাকে—এতটাই সহজ, এতটা পরিষ্কার এবং আনন্দদায়ক—এটি সবসময় তার অনুরাগীদের প্রতি আমার মনে একধরনের মমতার জোয়ার এনে দেয়।’
এ জনপ্রিয়তার মধ্যেই পিৎজার ধরন বদলাতে শুরু করে। নেপলস যে পিৎজা তৈরি করত তা শ্রমজীবী ও নেপলসের মানুষদের পছন্দের হলেও বৃহত্তর ক্রেতাশ্রেণীকে আকর্ষণ করতে এ বদল প্রয়োজন ছিল। ইতালিই অঞ্চলভেদে পিৎজার নতুন ধারা শুরু করে। যেমন রোমান পিৎজায় রুটি তুলনামূলক মচমচা করা হয়। সেই সঙ্গে ভোক্তার রুচি ও ইচ্ছা অনুসারে এর টপিং বদলানো বা নতুন টপিং যুক্ত করার প্রচলনও শুরু হয়।
বদলের সঙ্গে সঙ্গে পিৎজার স্বাদ-গন্ধ বদল হয়েছে। এমনকি পিৎজা দেখতেও হয়েছে আলাদা ও নতুন। যেমন এল লিবার্তো নামের পিৎজা বইয়ের মতো ভাঁজ করা যায়। ভেনিসের পিৎজায় বিশেষ ধরনের পনির কোরানোর মতো করে দেয়া হয়। অনেক পিৎজাবিশারদের সেটা পছন্দ না-ও হতে পারে, কিন্তু এ পিৎজার ভক্তও কম না। এর মধ্যে এখনো ইতালির বহু পিৎজারিয়া কাঠের চুলায় পিৎজা তৈরি করে। এসব পিৎজায় একদম তাজা সবজি ব্যবহার করা হয় টপিং হিসেবে। ভোক্তার পছন্দ অনুসারে টপিং দেয়া হয়। আবার কোনো কোনো পিৎজারিয়ায় মেনু থাকে না। তারা নিজেদের মতো সার্ভ করে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, সময়ের পরিক্রমায় ইতালি তার পিৎজাকে নিজের মতো করে নিয়েছে। তবে নেপলসের আদি পিৎজায় আটকে থাকেনি। ভোক্তা, প্রয়োজন ও নানা কারণে তাকে সময়ের সঙ্গে বদল করে নিয়েছে বলেই এখনো জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। উঠে এসেছে দামি রেস্টুরেন্টের দামি প্লেটে।
মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক









