ইতিহাসের বয়ানের পরিপ্রেক্ষিত
প্রচলিত যুগবিভাজনে এখনো আমরা অতীত ইতিহাসকে মৌর্যযুগ, গুপ্তযুগ, পালযুগ, সেনযুগ, সুলতানি আমল, মোগল আমল—এভাবে বিভিন্ন পর্বে ভাগ করি। শাসকদের বংশপরিচয়কেন্দ্রিক এ যুগবিভাজনের প্রধান ভ্রান্তি হলো অতীতের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, উৎপাদন ব্যবস্থা, শিল্পকলার ঘটনা, প্রক্রিয়া, অবস্থা আর কার্যকারণের জন্য কেবল শাসকদের ভূমিকা ও সক্রিয়তাকেই এমন বৃত্তান্তে মুখ্য বলে ধরে নেয়া হয়। রাজবংশের তালিকা ও কালানুক্রম লেখা ইতিহাসের বোঝাবুঝিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই ভূমিকাকে অতীতের বিভিন্ন পর্বের নামকরণে ব্যবহার করার অর্থ শাসকরাই ইতিহাসের একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল। অন্যান্য প্রভাবক, অবস্থা, মানুষজন, প্রতিবেশ, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়াগুলো এক্ষেত্রে নিতান্তই মামুলি অথবা শাসকদের তৎপরতার অধীনে ছিল। ইতিহাসের এমন যুগবিভাজন আর রাজবংশকেন্দ্রিক বোঝাপড়াকেই একমাত্র বা প্রধান ইতিহাসের আখ্যান হিসেবে বিবেচনা করাকেই আমরা আধুনিক ইতিহাসের শাস্ত্র হিসেবে বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করতে পারে। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে ও ঔপনিবেশিক পরিসরে উপনিবেশিতদের রপ্ত গঠন পাওয়া ও রপ্ত করা ইতিহাস লিখনে ও পঠনের পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে রেখে আমরা রাজরাজরা ও রাজবংশকেন্দ্রিক ইতিহাসের বয়ানের প্রবল হয়ে ওঠাকে বোঝার চেষ্টা করতে পারি। অতীতের বৃত্তান্ত ইতিহাস হলেও বর্তমান বা যে সময়ে বসে কেউ ইতিহাস রচনা ও বিশ্লেষণ করার কাজ করেন সেই সময়ে বহুবিধ দশা, বাসনা ও প্রভাবক ইতিহাস লেখাকে প্রভাবিত করে। ইতিহাসের রচয়িতার বাসনা, রাজনৈতিক, জাতীয়তা, জাতিগত, রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগত ও প্রচলিত বিভিন্ন প্রবল মতাদর্শ ও চিন্তাও ইতিহাসের বয়ানের স্বাভাবিক ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
‘পাল শাসনের’ ইতিহাস রচনা ও পঠন: ভিন্ন ভিন্ন ধারা
বাংলা অঞ্চল নামে পরিচিত ভূখণ্ডের বা বাংলাদেশে যে ইতিহাসের সঙ্গে আমরা জনপরিসরে ও বিদ্যায়তনে আলাপ করি সেখানে পাল শাসনামল বা পালযুগ বা পাল রাজবংশ একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে নানা কারণেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ঔপনিবেশিক জ্ঞানে ইতিহাস লিখনের যে ধারণা ও পদ্ধতি গঠন হয়েছিল এবং আমাদের উপনিবেশিত মধ্যবিত্ত সেই পদ্ধতি যেভাবে আধুনিক ও সভ্য হয়ে ওঠার ইতিহাস লেখার কাজে গ্রহণ (ও বর্জন) করেছিল, সেই প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ‘পাল রাজবংশ ও সাম্রাজ্যের’ ইতিহাস তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ভদ্রবিত্তীয় চৈতন্য ও বাসনার বিভিন্নমুখী প্রবণতা ও তৎপরতার মধ্যে তৈরি হয়েছে; লিখিত, পুনর্লিখিত হয়েছে। রাজবংশ বা শাসকদের পরিচয়কেন্দ্রিক যুগবিভাজনসমেত অতীত গৌরব, সমৃদ্ধি, পতন, উত্থান, উন্নতি, একক শাসকের অর্জন, বিজয়গাথা, পরাজয়ের কাহিনীর নানামুখী দিক ও বৈশিষ্ট্যাবলি নিয়ে আলাপচারিতার রূপরেখা উপনিবেশের ইতিহাস লিখনের মানদণ্ডকে অনুকরণ করেছে। পাশাপাশি ঔপনিবেশিক রূপরেখার ছাঁচকে গ্রহণ করে ঔপনিবেশিক আখ্যান ও বয়ানকে চ্যালেঞ্জ ও বিরোধিতা করে অতীতের বয়ানের ভিত্তিতে বর্তমানের বিভিন্ন পরিচয়, লড়াই, জাতীয়তাবাদী, আঞ্চলিক পরিচয়বাদী এবং ধর্মীয় পরিচয়বাদী নিরিখে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ইতিহাস লিখনেরও বিপুল তৎপরতা বহু মানুষ ও পণ্ডিতদের প্রভাবিত করেছিল। সেই প্রসঙ্গে বিশদ আলাপ করা এখনকার বর্তমান পরিসরে সম্ভব নয়।
কিন্তু বহু প্রণম্য পণ্ডিতের প্রতি সবিনয় শ্রদ্ধাসমেত বলা জরুরি যে বিভিন্ন সূত্র ও উৎস ব্যবহার করে ইতিহাস লিখনের বিশাল কর্মযজ্ঞ ও নিষ্ঠার সঙ্গে বিভিন্ন সূত্র সংগ্রহ, সংকলন আর বিশ্লেষণ করে এ অঞ্চলের ইতিহাস রচনার সব অবদান বিবেচনায় রেখেও রচয়িতাদের সমকালীন ও বর্তমানকেন্দ্রিক ইতিহাস বোধ ও বাসনাকে এখন প্রশ্ন করতেই হবে। কারণ এত বছরে ইতিহাস লিখনের বহুবিধ বুনিয়াদি চিন্তাভাবনা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তেমনই নতুন বহু সূত্র ও উৎস আবিষ্কৃত হয়েছে। পুরনো বহু নথিপত্র ও লিখিত সূত্রাদির পুনঃপাঠ ও পুনর্বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত নানা প্রসঙ্গ আলাপিত হওয়া বিদ্যাজাগতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশও বটে। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী ও অধ্যাপক রণবীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের ইতিহাস: আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা (আনু. ১২০০ সা. অব্দ পর্যন্ত)’ দুই খণ্ডের কিতাবটি এ পুনর্লিখন ও পুনর্বিশ্লেষণের একটি অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রমেশচন্দ্র মজুমদার, নীহাররঞ্জন রায়, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, দীনেশ চন্দ্র সেন, দীনেশচন্দ্র সরকার প্রমুখসহ এ অঞ্চলের ইতিহাসবিদরা, বিভিন্ন এলাকায় নিবিষ্টচিত্তে কাজ করে যাওয়া পণ্ডিতরা এবং ঔপনিবেশিক পরিসরে গড়ে ওঠা ইতিহাস-অন্বেষী ও উৎসাহী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অনেকেই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিপুল পরিমাণ লেখালেখি শুরু করেন ভারতের ইতিহাস ও বাংলার ইতিহাস নিয়ে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাকেন্দ্রিক আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক ও টানাপড়েনের মধ্যেও আঞ্চলিক পরিসরে অতীতের সমৃদ্ধি, গৌরব ও উন্নতির বয়ান রচনা জরুরি হয়ে উঠেছিল। বরেন্দ্র গবেষণা সমিতি ও বঙ্গীয় সাহিত্য পর্ষদসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আর বিভিন্ন সাময়িক পত্র আঞ্চলিক বিভিন্ন সূত্র, উৎস, লিখিত পাণ্ডুলিপি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইত্যাদি নিয়ে রচনা প্রকাশ করতে থাকে। পাল শাসকদের বাংলা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করা শাসকবংশ হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে বড় কেন্দ্রমুখী বিস্তৃত সাম্রাজ্য স্থাপনকারী রাজশক্তি হিসেবে নির্মাণ করা হয়।
ইতিহাসের সূত্র ও আলামত বিশ্লেষণের পদ্ধতি: রচয়িতা ও রচনার সম্পর্কের বদল
প্রথাগত রাজবংশকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যের ইতিহাস রচনায় রাজা বা শাসকের বংশলতিকা ও কালানুক্রম উদ্ধার করা ও পুনর্নির্মাণ করা একটি অবশ্য-অনুসরণীয় লক্ষ্য ও পর্যায় হিসেবে ধরে নেয়া হয়। পাল সাম্রাজ্য বা পাল বংশলতিকা তৈরির ক্ষেত্রে (অন্যান্য রাজবংশের মতোই) অভিলেখ (বিভিন্ন ধরনের লিপি, যেমন তাম্রলিপি, শিলালিপি, সিলমোহর, প্রতীমায় উৎকীর্ণ লিপি) আর লিখিত বিভিন্ন সূত্র ব্যবহার করা হতে থাকে। নাম, উপাধি, অনুক্রম, শাসনকাল, দিগ্বিজয়, পরাজয়, সাফল্য, পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদি ইতিহাস রচনায় মুখ্য প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি সেই সময়ের সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি, বাণিজ্য, বহির্বাণিজ্য প্রভৃতি প্রধানত রাজবংশের শাসন তরিকা আর তৎপরতার নিরিখে রচিত হতে থাকে। মোটামুটিভাবে ১৯৬০-এর দশকের পর ইতিহাসতাত্ত্বিক বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এ জাতীয়তাবাদী ধারাগুলো প্রশ্নের মুখে পড়ে। আগে ব্যবহৃত সূত্রাদির পুনঃপাঠ ও বিশ্লেষণ শুরু হয়। রামশরণ শর্মা ও ডিডি কোসাম্বির সামন্ততান্ত্রিক মডেলের প্রস্তাব প্রভাবশালী হয়ে উঠলেও এ অঞ্চলের ইতিহাস রচনায় জাতীয়তাবাদী এবং শাসককেন্দ্রিক, কেন্দ্রমুখী শাসনপ্রণালি আর স্থানিক-কালিক সমরূপিতা উৎপাদনমুখী ইতিহাস রচনার দাপট মোটামুটি অব্যাহত থাকে। পরবর্তী সময়ে ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় ও হারমান কুলকের নতুন ইতিহাস চিন্তা অঞ্চলভিত্তিক ইতিহাস রচনার জাতীয়তাবাদী ও সামন্ততান্ত্রিক মডেলকে নড়বড়ে করে দেয়। তারপর দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধারণা, পদ্ধতি ও উৎস ব্যবহার করে বহু দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিভিন্ন পর্বের ইতিহাস রচিত হয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক কিছু ব্যতিক্রম বাদে আমাদের বিদ্যায়তন ও জনপরিসরে এসব বাহাস ও নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস রচনার তৎপরতা খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। আমাদের বিদ্যায়তনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ঐতিহ্যে আধিপত্যশীল ধারাগুলোয় বিভিন্ন পুনর্নিরীক্ষামূলক ও পর্যালোচনামূলক ইতিহাস রচনায় অনাগ্রহ আর অবজ্ঞা যেমন একটা বৈশিষ্ট্য তেমনই আদি ও মধ্যযুগের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সক্রিয় ও আত্মপর্যালোচনামুখী প্রবণতাও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আত্মতুষ্টি আর প্রদর্শনকামিতার প্রভাবকে অস্বীকার করার উপায় নেই।
সংক্ষিপ্ত পরিসরে এসব আলোচনা করা দুরূহ। তার পরও কয়েকটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করা জরুরি। প্রধানত লিখিত উৎসনির্ভর ইতিহাস রচনায় প্রত্নতত্ত্বীয় নিদর্শনগুলো আধিপত্যশীল বয়ানে প্রমাণে সম্পূরক হিসেবে ব্যবহার করার চল এখনো খুবই প্রবল। এমনকি পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিকরাও তাদের বয়ান ও লেখনীতে এখনো মৌর্যযুগ, গুপ্তযুগ, পালযুগ, সেনযুগ বা সুলতানি আমলের মতো সময়ের বর্গীকরণ করায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী। যারা ভিন্ন ধরনের যুগবিভাজনের সঙ্গে পরিচিত হতে চান তারা রোমিলা থাপার, রণবীর চক্রবর্তী আর উপিন্দর সিংহের ভারত উপমহাদেশের আদি পর্বের ইতিহাসের বইয়ের সূচিপত্র দেখতে পারেন। বিভিন্ন মুদ্রা, অভিলেখ, প্রস্তর প্রতিমা, ধাতব প্রতিমা, পোড়ামাটির চিত্রফলক আর স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন বা স্থাপত্যের সমীক্ষার আলাপে শাসকদের সূত্রে ব্যাখ্যা করাই বেশির ভাগ পেশাদার ও অপেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এসব উপাদান ও উৎস গৌণ বা অগুরুত্বপূর্ণ—এমন কথা আমি বলছি না। বরং এসব উৎস ও উপাদান কীভাবে পাঠ, বিশ্লেষণ এবং সার্বিক আন্তঃসম্পর্কনির্ভর ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে সেদিকে নজর দেয়া অনেক বেশি জরুরি।
আবার ইতিহাস লিখনের প্রধান উৎস ও উপাদান হিসেবে অভিলেখ, মুদ্রা, লিখিত উৎসের প্রকৃতি, পরিপ্রেক্ষিত ও বিন্যাস নিয়ে পর্যালোচনা গত তিন দশকে অনেক চিন্তকই করেছেন। লিখিত উৎস এবং নির্বাচিত প্রত্নতাত্ত্বিক আলামত নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে বিবরণী ও বিশ্লেষণ করা হয়। এ বয়ানের অন্যতম বুনিয়াদ হলো ‘কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা গুপ্ত সাম্রাজ্য’ ভেঙে বিভিন্ন আঞ্চলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিকাশ হয় সাধারণ ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর পর। এ সময়কাল থেকে সাধারণ ত্রয়োদশ শতাব্দী (বা কোনো কোনো অঞ্চলে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত) সময়কালকে ‘আদি মধ্যযুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়। এ নতুন ধারাগুলোর ইতিহাস রচনায় ঐতিহাসিক কার্যকারণ ও প্রক্রিয়াগত বহুত্ব, স্থানিক-কালিক বিভিন্নতা, ভিন্ন ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতার ধারাবাহিকতা এবং পরিবর্তনকে পর্যালোচনা করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে রাজত্বগুলোয় রাষ্ট্রের গঠন, প্রকৃতি ও বিকাশ, স্থানীয় শ্রেণীবিন্যাস, জাতিবর্ণ বিভাজনের রূপান্তর ও বিস্তৃতি, সামন্তদের অবস্থান ও ভূমিকা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আবাদ, বসতির প্রকৃতি, বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্পর্কসহ বহু বিষয়ের ইতিহাস চিন্তা ও লিখনের আর বিতর্কের বিশ্লেষণ করা শুরু হয়।
এ ইতিহাস লিখনের বৈচিত্র্যময় পর্যালোচনা ও প্রস্তাবগুলোয় বিভিন্ন নতুন বিষয় সামনে আসে। যেমন সাধারণ সপ্তম শতাব্দী থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বদিকের অংশের বিভিন্ন স্থানিক পরিসরে কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থা বিকশিত হওয়া শুরু হয়। এ রাষ্ট্র ব্যবস্থা কোনোভাবেই আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের মতো নির্দিষ্ট সীমানাবদ্ধ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ করত না। পাল শাসনামল সেই হিসেবে এ রাষ্ট্রগঠন আর রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করে তৎকালীন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকশিত নতুন জনপদগুলোয়। নতুন পরিচয়বাহী, এক ধরনের সাদৃশ্যময় সাংস্কৃতিক চরিত্র অর্জনকারী এসব পরিসরকে উপাঞ্চল/সাব-রিজিওন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাল শাসকদের গৌড় বা বরেন্দ্র অঞ্চলের শাসক হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বিভিন্ন সময়ে তাদের শাসনের পরিধি ও নিয়ন্ত্রণের স্থানিক ভিন্নতা ছিল। মোটামুটিভাবে ভারতের বর্তমান বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরাংশের একটা বড় অংশ এবং বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী অঞ্চলে তাদের শাসন অন্ততপক্ষে দ্বিতীয় শাসক ধর্মপালের আমলে বিস্তৃত ছিল।
সাধারণভাবে গোপাল (প্রথম গোপাল; শাসনের শুরু আনু. ৭৬৪ সাধারণ অব্দ থেকে) থেকে শুরু করে চতুর্থ গোপাল ও মদনপালের শাসন (আনু. ১১৬২-১১৬৬ সাধারণ অব্দ) পর্যন্ত পাল রাজবংশের বংশলতিকা রচনা করা গেছে। এ বংশলতিকায় শাসকদের রাজত্বকাল/শাসনকাল এবং শাসনের প্রকৃতি ও বিস্তৃতি নিয়ে নানা বাহাস ও মতানৈক্য রয়েছে। উত্থান ও পতন অথবা সাম্রাজের বিস্তার ও বিকাশ, সমৃদ্ধি ও অবক্ষয়ের মতো সরল কার্যকারণগত ধারণা দিয়ে কোনো সময়ের, কোনো স্থানের, এমনকি কোনো শাসকগোষ্ঠীর শাসনকালকেও বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করা যায় না। আনু. প্রায় ৪০০ বছরব্যাপী শাসকদের বংশলতিকা দিয়ে একই কালপর্বব্যাপী পাল শাসনামল একই স্থানিক পরিসরজুড়ে বিস্তৃত ছিল বলে যদি ধরে নেয়া হয় তাহলে সেটা হবে বিরাট ভুল। বিভিন্ন শাসকের সময় শাসনের স্থানিক পরিসর সংকুচিত ও প্রসারিত হয়েছে। একই শাসকের সময়েও ওই শাসকের কর্তৃত্ব বিভিন্ন এলাকায় কর্তৃত্বকারী মহাসামন্ত/সামন্তদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভরও করেছে। আবার ভূমিদানের উল্লেখকারী তাম্রশাসনগুলোয় কোনো শাসকের প্রশস্তি অংশে বিভিন্ন স্থান/রাজ্য/শাসককে পরাজিত করে সেসব অঞ্চলে শাসন বিস্তারের যে কাহিনী উল্লিখিত হয়েছে, বহুক্ষেত্রেই সেই কাহিনীর সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব না। কারণ এখনকার মতো তখনো শাসকদের দপ্তর বা নিযুক্ত কর্মচারী/ব্যক্তির জারি করা এসব তাম্রশাসন বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিলালিপিও শাসকদের স্তুতিগাথা হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল।
যেমন অভিলেখতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ রয়োসুকে ফুরুই তার বিভিন্ন প্রবন্ধ ও কিতাবে দেখিয়েছেন, সংহত ও সুসমন্বিত রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থা ‘পাল শাসনামলের’ আনু. অষ্টম থেকে একাদশ শতক একইভাবে ছিল না। বিভিন্ন অভিলেখ ও অন্যান্য লিখিত সূত্র বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে এ কালপর্বে একদিকে কেন্দ্রীয় শাসক এবং বিভিন্ন স্থানীয় সামন্তদের মধ্যে নানা ধরনের বিরোধ ও টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। সামন্ত বা মহাসামন্ত বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বিভিন্ন কর্মকর্তা অথবা প্রশাসনিক একক হিসেবে ভুক্তি, বিষয় বা মণ্ডলের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছিল। পাশাপাশি ভূমিদান করার গ্রহীতা, ভূমিদানের ধরন, গ্রহীতার অধিকার ও কর্তৃত্বের ধরন, জাতি-বর্ণগত পরিচয়ের ধরন পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রচলনের সাক্ষ্যও তিনি উল্লেখ করেছেন। গ্রাম বা স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদের ধীরে ধীরে গুরুত্ব কমে যাওয়া, জাতি-বর্ণভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস বৃদ্ধি পাওয়া এবং ক্রমাগত ব্রাহ্মণদের নিষ্কর জমিদান করে বিভিন্ন বসতির পত্তন ঘটানোর প্রক্রিয়া বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছিল। সাধারণ দশম-একাদশ শতক থেকেই জাতি-বর্ণ ব্যবস্থার বিস্তৃতি, আধিপত্য ও ব্রাহ্মণায়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও ভূমি ব্যবস্থাগত বিরোধ ও সংঘাতের সাক্ষ্য ফুরুই ছাড়াও বিভিন্ন গবেষক ও বিশেষজ্ঞ (যেমন বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও ঐতিহ্যের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে অ্যালেক্সিস স্যান্ডারসনের গবেষণা বা প্রতীমা নিয়ে ক্লদিন বুদজে পিক্রোর গবেষণা, বৌদ্ধ ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্য নিয়ে গ্রেগোরি শোপেনের গবেষণা, বুদ্ধগয়া ও নালন্দা নিয়ে অভিষেক অমর এবং লিখিত তালপাতার পাণ্ডুলিপি নিয়ে জিনা কিমের গবেষণা ইত্যাদি) বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখ ও ব্যাখ্যা করেছেন।
প্রচলিত বয়ানে যেভাবে দাবি করা হয় সেভাবে শাসক বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও শাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বদলে যায় না। মানুষের খাওয়াদাওয়া, ধর্মাচার, অভ্যাস, উৎপাদন ব্যবস্থা, রাজস্ব ও কর ব্যবস্থা, বাণিজ্য ও বিনিময় ব্যবস্থা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক, সমসাময়িক জাতি-বর্ণগত ও ধর্ম-সম্প্রদায়গত বিভিন্ন পরিচয় পাল্টে যায় না। প্রচুর সংখ্যক স্থাপনা শাসক বা সামন্তদের পৃষ্ঠপোষকায় নির্মিত হওয়া ওই সময়কালের সমৃদ্ধি বা উন্নতিকেও নির্দেশ করে না। বরং উল্টোভাবে ওইসব ধর্মীয় স্থাপনা (যেমন বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধবিহার, ব্রাহ্মণ্য মন্দির ও মঠ, জৈন স্থাপনা, বিভিন্ন পাথরের ও ধাতব প্রতীমা অথবা নগরের পত্তন ও স্থাপনা ইত্যাদি) সাধারণের ওপর মাত্রাতিরিক্ত করারোপ ও বিভিন্নমুখী সংঘাতের মধ্যে কর্তৃত্ব ও বৈধতার আলামত হিসেবেও গণ্য হতে পারে। পাল শাসক এবং সেই শাসকদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্থানে সামন্তদের বা স্থানীয় শাসকদের বা উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় আমলা ও ব্যক্তিদের সংঘাত, টানাপড়েন আর আপসের প্রক্রিয়ার পরিসরেও বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় স্থাপনা, প্রতীমা কিংবা বসতির পত্তন ঘটে। এ ছোট্ট পরিসরে আমি কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় ধারণা নিয়েই আলাপ করতে চাই।
‘মাৎস্যন্যায়’ আর ‘প্রকৃতি কর্তৃক শাসক হিসেবে গোপালের নির্বাচন’
গৌড়রাজ শশাঙ্কের মৃত্যু বা হত্যার পর তৎকালীন গৌড় (বা অন্য উৎসে অঞ্চল হিসেবে বঙ্গালা, বরেন্দ্র, অথবা বঙ্গ নামও পাওয়া যায়) ‘মাৎস্যন্যায়ের’ (দণ্ডবিধি ও দণ্ডদাতার অনুপস্থিতিতে প্রবল অরাজক পরিস্থিতিতে সবলরা দুর্বলের ওপর অত্যাচার করার দশা) অবসান ঘটিয়ে সেই সময়কার জনগণকর্তৃক গোপালকে শাসক বা রাজা হিসেবে নির্বাচনের ঘটনা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বয়ান। এ ধারণা হালের জনপরিসরেও নানাভাবে উচ্চারিত হয়। পূর্বোল্লিখিত বাংলাদেশের ইতিহাস বইয়ের প্রথম খণ্ডেই এ প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় বয়ান নিয়ে নতুন বিশ্লেষণগুলো অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন আদর্শ স্থাপনকারী কিতাব (যেমন অর্থশাস্ত্র, নীতিসার ইত্যাদি) ও মহাকাব্যে (যেমন মহাভারত ও রামায়ণের কিছু সংস্করণেও) মাৎস্যন্যায়ের দশার বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাপ আছে। মাৎস্যন্যায় দশা কাটিয়ে গোপালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের যে প্রচলিত তত্ত্ব সেটি কোন সূত্র থেকে কীভাবে ইতিহাসবিদরা রচনা করলেন? তা নিয়েও মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ উপর্যুক্ত কিতাবে যেমন আছে তেমনই আছে ইতিহাসবিদ ড. সায়ন্তনী পালের পর্যালোচনায়। প্রধানত পাল শাসকদের দ্বিতীয় শাসক ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসন, আনুমানিক অষ্টম শতকে লেখা মঞ্জুশ্রীমূলকল্প আর সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে (আনু. ১৬০৮ সাধারণ অব্দে, গোপালের শাসক হয়ে ওঠার প্রায় ৮০০ বছর পর লেখা) লামা তারনাথের কিতাবের ভিত্তিতে মাৎস্যন্যায়ের দশা গোপালের রাজা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের আগে বিরাজ করছিল বলে ব্যাখ্যা করা হয়। কোনো কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে অরাজক পরিস্থিতি ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করার এ তত্ত্ব আর প্রজারা অথবা সামন্তদের কর্তৃক গোপালকে রাজা হিসেবে নির্বাচনের তত্ত্ব আলামত ও লিখিত উৎসের অনুপঙ্খ, পরিপ্রেক্ষিতায়িত ও অন্যান্য উপাত্তের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে রচিত হয়নি। বরং সায়ন্তনী পাল মনে করেন, আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার বাসনা ও বৈধতা অতীতে প্রক্ষিপ্ত করার জাতীয়তাবাদী প্রবণতা থেকেই মাৎস্যন্যায়ের দশা ও সেই দশা থেকে নির্বাচনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উত্তরণের বয়ান নির্মিত হয়েছিল। দিনাজপুর-জয়পুরহাটসহ উত্তরবঙ্গে পরিচালিত জরিপ ও খননে আমরা একটি নির্দিষ্টকালে সব স্থানে শনাক্তযোগ্য অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও সংঘাতের কোনো আলামত পাইনি। বরং বহুবিধ আর বহুমুখী কারণ ও প্রক্রিয়ার আলামত প্রত্নতাত্ত্বিক পরিপ্রেক্ষিতে পাওয়া গেছে।
কৈবর্তবিদ্রোহ ও পাল শাসনের পুনরুদ্ধারের বয়ান
একাদশ শতাব্দীর অন্তিমকালে দ্বিতীয় মহীপালকে পরাজিত করে কৈবর্তদের প্রধান দিব্য বরেন্দ্র থেকে পাল শাসনের অবসান ঘটান। পরবর্তীকালে মহীপালের ভাই রামপাল কৈবর্তদের পরাজিত করে পাল রাজ্য বা বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন। রামপালের কীর্তিগাথা হিসেবে রচিত সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত কাব্যের আলোকেই কৈবর্ত প্রধান দিব্য ও ভীমের সঙ্গে পাল শাসকদের যুদ্ধকে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ব্যাখ্যা করেছেন। রয়োসুকে ফুরুই ও সায়ন্তনী পাল উভয়েই কৈবর্তদের বিভিন্ন উল্লেখ ও অন্যান্য সূত্র ব্যবহার কৈবর্ত বিদ্রোহের বয়ানকে পুনর্বিশ্লেষণ করেছেন। কৈবর্ত বিদ্রোহকে যেভাবে একটি নিম্নবর্গীয় বিদ্রোহ হিসেবে অথবা কৃষক বিদ্রোহ হিসেবে কিংবা সামন্ত বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করা ভ্রান্ত বলে চিহ্নিত করেছেন দুজনই। রামচরিতে পুরো ঘটনা পরম্পরার বিশ্লেষণ করে ফুরুই দেখান যে যতটা সরলভাবে শাসকের বিরুদ্ধে শোষিতের বিদ্রোহ হিসেবে কিংবা কোনো এক জাতির সামন্তদের বিদ্রোহ হিসেবে কৈবর্তদের তৎপরতাকে নির্মাণ করা হোক না কেন, তৎকালীন পরিস্থিতি ও পুরো প্রক্রিয়া আরো অনেক বেশি জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে সংঘটিত হয়েছিল। কৈবর্তদের সাধারণ একটি মৎসজীবী বা জেলে সম্প্রদায় হিসেবে বা জেলে ও কৃষক হিসেবে অথবা নিম্নজাতি-বর্ণের সদস্য হিসেবে পরিচিত করানো ঐতিহাসিক আলামতের অনুপঙ্খ ও নিবিড় বিশ্লেষণ সমর্থন করে না। একদিকে বিভিন্ন লিখিত সূত্রে ও অভিলেখে কৈবর্তদের বিভিন্নভাবে উল্লেখ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎসের প্রকৃতি অনুসারে এ পরিচয় পাল্টেছে। কৈবর্তদের একটি সম্পন্ন, প্রভাবশালী ও সামন্তশ্রেণী হিসেবে শ্রেণী উত্তরণের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ঊনবিংশ ও বিশ শতাব্দীর শুরুতে চাষা কৈবর্ত (শুদ্র হিসেবে পরিগণিত) জাতি মাহিষ্য সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পরিচয় বা স্বীকৃতি দাবি করে আন্দোলন করেন। এ আন্দোলনের বয়ানে কৈবর্ত যোদ্ধা দিব্যকে মাহিষ্যরা তাদের পূর্বপুরুষ ও বীর হিসেবে পরিবেশন করেন। ধীবর ও কৈবর্তদের একই পেশার জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে নওগাঁর ধীবর দিঘীর যে স্তম্ভটি আছে সেই স্তম্ভটিকে ভীমের বা দিব্যকের প্রতিষ্ঠিত স্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা চিহ্নিত করেন অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়। মাহিষ্য সম্প্রদায়ের সর্বভারতীয় ছাত্র সংগঠনের আয়োজিত দিব্য স্মৃতি উৎসবে ১৩৪১ বঙ্গাব্দে বরেন্দ্র গবেষণা সমিতির অন্যতম পরিচালক রমাপ্রসাদ চন্দসহ রাখালদাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। মাহিষ্য ছাত্র সংগঠন দিব্যকে বাংলার জনগণ কর্তৃক গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবিও জানান। আমি সায়ন্তনী পালের প্রবন্ধ থেকে প্রসঙ্গটি উল্লেখ করলাম এ লেখার শুরুর দিকে বর্তমানের পরিচয়বাদী তৎপরতার সঙ্গে অতীতের বয়ান আবিষ্কার ও পুনর্বয়ান এবং প্রসার ঘটানোর সম্পর্কের প্রসঙ্গের সূত্র ধরে।
শাসকদের কুলুজী ঘাঁটার ইতিহাসের ভ্রান্তি
ওপরে কেবল সংক্ষেপে যে প্রসঙ্গগুলো উল্লেখ করলাম তাতে করে পাল শাসনের সমৃদ্ধি, অনন্যতা, সাম্রাজ্য বিস্তারের বয়ান আর সংহত-পরমতসহিষ্ণু-উদার শাসন ব্যবস্থার নির্মাতা হিসেবে বয়ানের বিভিন্ন ভ্রান্তি ও সমস্যা চিহ্নিতকারী আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও বিশ্লেষণের উল্লেখ আমি এখানে করিনি পরিসরের সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখে। কেবল কয়েকটি কথা বলে লেখাটি শেষ করব।
রাজবংশের ইতিহাস বা বংশলতিকার সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত কোনো বসতি বা স্থাপনার অবশেষের পত্তন, বিভিন্ন পর্বের রূপান্তর, পুনর্ব্যবহার আর পরিত্যক্ত হওয়াকে সম্পর্কিত করা যায় না। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্নতাত্ত্বিকরা পাল যুগ, সেন যুগ ইত্যাদি পর্বে কোনো স্থাপনার প্রকৃতি ও সময়ের সঙ্গে সেই স্থাপনার রূপান্তর ও পরিবর্তনকে সম্পর্কিত করে থাকেন। এ সম্পর্কের ভ্রান্তি প্রসঙ্গে দুটি উদাহরণ দিই আমাদের গবেষণা থেকে। পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারকে ধর্মপালের নির্মাণ বলে লেখা হয়। কিন্তু খননে বর্তমান পাহাড়পুরের কেন্দ্রীয় মন্দির ও বিহারের বাহুগুলোর নিচে দৃশ্যমান মহাবিহারের স্থাপনার পূর্ববর্তী বিভিন্ন পর্বের স্থাপত্য ও বসতির আলামত আমরা চিহ্নিত করেছি। খননের প্রতিবেদন ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে আমরা দেখিয়েছি যে সোমপুর মহাবিহারে অন্ততপক্ষে দুবার আক্রমণ বা হামলা করা হয়েছিল। যার একটির প্রমাণ আগুন পোড়া বিভিন্ন আলামত এবং অন্যটির প্রমাণ নালন্দায় প্রাপ্ত বৌদ্ধভিক্ষু বিপুলশ্রীমিত্র কর্তৃক বঙ্গাল (?) সেনাদের আক্রমণে বিহারের ক্ষতিসাধনের পর পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের জন্য দান করার উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া বন্যা ও নদীর প্রবাহপথের পরিবর্তনের সঙ্গেও সোমপুর মহাবিহার ও সংলগ্ন বসতির পরিবর্তনের সম্পর্ক ছিল। আবার নওগাঁর জগদ্দল বিহার (এ জগদ্দল বিহার আর রামচরিতে উল্লিখিত বিখ্যাত জগদ্দল মহাবিহার একই কিনা তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি) খননে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নমুখী পরিবর্তন, রূপান্তর, আগুন লাগার আলামত আর উপরিকাঠামো ধ্বংস হওয়ার আলামতও পাওয়া গেছে। যেকোনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে যেসব ঘটনা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয় তার ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা শাসক বা রাজা বা রাজবংশের সাফল্য-সমৃদ্ধি-বীরত্বগাথা-উত্থান-পতন-অবক্ষয়ের প্রচলিত ধারণা দিয়ে করা সম্ভব নয়।
কোনো রাজাকে নায়ক বা খলনায়ক বানিয়ে অথবা কোনো রাজবংশের শাসনকাল বা শাসনের অঞ্চলকে সমৃদ্ধি আর স্বর্ণযুগের চিহ্ন হিসেবে নির্মাণ করে বয়ান তৈরি করলে বর্তমান জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়বাদী আখ্যানগুলোকে বৈধতা দিতে সুবিধা হতে পারে। ইতিহাসের জটিল ও বহুবিধ কুশীলব, প্রভাবক, শর্ত, ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
স্বাধীন সেন: অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়







