কবি মুহাম্মদ ইকবাল ও রাজনীতিক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দুজনেই মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকারের জোরালো প্রবক্তা এবং নিশ্চিতরূপে ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার অধিকারী। পাকিস্তান-চিন্তার জনক হিসেবে পরিচিত ইকবাল হাতেগোনা সেই মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম, যারা ১৯২২ সালে তুরস্কে খিলাফতের অবসানে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। অটোমান খিলাফতের অবসানের ফলে মুসলমান রাষ্ট্রে কার্যত ধর্ম ও রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে সম্পর্কোচ্ছেদ হয়। তিনি চেয়েছিলেন মুসলমান সমাজে প্রচলিত আইনকে ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব ওলামাদের ওপর ছেড়ে না দিয়ে মুসলমান সমাজ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভাকে (উম্মা) দেয়া হোক। এককথায় প্রচলিত আইনকে সমসাময়িক নিরিখে ব্যাখ্যা করার (ইজতিহাদ) প্রতিষ্ঠানকে ইকবাল আধুনিক ও গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক জনক জিন্নাহ চেয়েছিলেন স্বাধীন পাকিস্তানের সংবিধান যেন অবশ্যই ধর্মনিরপেক্ষ হয়, রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে দূরত্ব নিশ্চিত করা হয় ও সংখ্যালঘুদের অধিকারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেয়ার ব্যবস্থা হয়।

ইসলামী রাজনীতির এ সংস্কারপন্থী চিন্তাভাবনাকে সরিয়ে দিয়ে কী করে ধীরে ধীরে চরমপন্থী চিন্তাভাবনা মাথা তুলল তা ভালোভাবে বোঝা যাবে ঔপনিবেশিকতা থেকে ওপনিবেশিকতা-পরবর্তী যুগে উত্তরণ পর্বকে খুঁটিয়ে দেখলে, বিশেষ করে মিসরের ‘সোসাইটি অব মুসলিম ব্রাদার্স’ গণসংগঠনটির ইতিহাস পরীক্ষা করলে। ইসমাইলিয়া শহরের শ্রমিকদের আর্জিতে সাড়া দিয়ে আল আফগানির চিন্তাদর্শে অনুপ্রাণিত তরুণ শিক্ষক হাসান আল বান্না ১৯২৮ সালের মার্চে এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। আল আফগানির কথারই প্রতিধ্বনি করে তিনিও দাবি করেন, অন্যদের অনুকরণ করার বদলে নিজেদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের মধ্যেই মুসলমানদের উন্নতির পথ খুঁজতে হবে। অনুকরণ প্রবৃত্তির নিন্দা করে তিনি বলেন, ‌এটা করার অর্থ নিজেদের ‘সাংস্কৃতিক দিক থেকে দো-আঁশলা সারমেয়’র স্তরে নামিয়ে আনা। আল বান্না যে ছয় দফা কর্মসূচি তৈরি করেন, তাতে ব্যাপক হারে সামাজিক উন্নয়নের সংগঠন গড়া এবং সেই সঙ্গে হিংসাকে পরিত্যাগ করার কথা বলা হয়।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধে আরব সেনাবাহিনীর পরাজয় ও তার পরে ইসরায়েল রাষ্ট্রগঠনের ঘটনা থেকেই মুসলমান সমাজের উপলব্ধিতে পরিবর্তন হয়। তারা উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে হিংসাত্মক রাজনীতির পথে সরতে শুরু করে। হাসান আল বান্না ফিলিস্তিনে যুদ্ধ করার জন্য একটি বিশেষ ব্যাটালিয়ন তৈরির ডাক দেন। নিজস্ব সেনা, হাসপাতাল, স্কুল, কারখানা ও ব্যবসা কেন্দ্র মিলিয়ে ‘সোসাইটি অব মুসলিম ব্রাদার্স’ এমনিতেই মিসর রাষ্ট্রের মধ্যে কার্যত আলাদা একটা রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করছিল। ১৯৪৮ সালের ৬ ডিসেম্বর মিসরে ওই সোসাইটি নিষিদ্ধ করা হয়, কিন্তু ১৯৫১ সালেই আবার সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। ১৯৫২ সালে যখন তরুণ সেনা অফিসার জামাল আবদেল নাসের মিসরের ক্ষমতা দখল করেন, তখন সোসাইটি তাকে পূর্ণ সমর্থন জানায় । কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই সোসাইটি নাসেরের সঙ্গে সম্পর্কোচ্ছেদ করে এবং যেসব মহল রাজনৈতিক দল গঠন করার অধিকারের স্বীকৃতি ও অসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার জন্য সেনাবাহিনীকে চাপ দিচ্ছিল তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। নাসের যখন অসামরিক সরকার গঠনের দাবিতে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার শুরু করলেন, তখন সোসাইটির এক হাজারেরও বেশি সদস্য বন্দি হয়। নাসেরের জেলে বন্দি থাকাকালীনই তাদের অনেকে সংস্কারপন্থী চিন্তা ছেড়ে দিয়ে ইসলামী রাজনীতির এক নতুন এবং সশস্ত্র কার্যকলাপের সম্ভাবনাময় ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেন। সোসাইটির আদিপর্বের সংস্কারপন্থী চিন্তাভাবনাকে যদি হাসান আল বান্নার সঙ্গে এক করে দেখা যায়, তাহলে তার চরমপন্থী দিক পরিবর্তনের বিষয়টি অবশ্যই সঈদ কুতুবের ভাবনা (১৯০৬-৬৬) দ্বারা অনুপ্রাণিত। নাসেরের কারাগারে বসেই কুতুব তার চরমপন্থী চিন্তাকে একের পর এক লেখায় রূপ দিয়েছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের হাতে বর্বরোচিত দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা অবশ্যই মিসরে ইসলামী চিন্তাভাবনায় চরমপন্থা আমদানি করার ক্ষেত্রে একটা উপাদান জুগিয়েছিল। দ্বিতীয় উপাদানটি এসেছিল তাত্ত্বিক আকারে, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ থেকে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়, তখন তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী হতে পারে, সে বিতর্কে ততদিনে ইসলামী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ এসে হাজির হয়েছে।

2018-636658553163658954-365

মিসরের প্রধানমন্ত্রী আহমেদ মাহির পাশাকে হত্যা। ১৯৪৫ সালে মানডে ম্যাগাজিনের অলংকরণ ছবি : আরহাম অনলাইন

Capture

প্রেসিডেন্ট নাসেরকে হত্যাচেষ্টার পর তার সমর্থকরা কায়রোয় মুসলিম ব্রাদারহুডের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা চালায়। ২৭ অক্টোবর, ১৯৫৪ ছবি: এপি

সঈদ কুতুব ১৯৩৩ সালে কায়রোর প্রসিদ্ধ শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর মিসরের শিক্ষা দপ্তরে সরকারি কাজে যোগ দেন। তার প্রথম বই ‘‌দ্য টাস্ক অব দ্য পোয়েট ইন লাইফ’ থেকে কিন্তু তিনি সাহিত্যচর্চার দিকেই ঝুঁকবেন বলে মনে করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে কুতুবকে সরকার থেকে গবেষণার জন্য আমেরিকায় পাঠানো হয়। সেখানে যাওয়ার আগেই বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ শেষ হলেও তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বই ‘স্যোশাল জাস্টিস ইন ইসলাম’ আমেরিকায়ই প্রকাশ হয়। বইয়ের প্রথম পরিচ্ছেদেই কুতুব তার উদ্দেশে ব্যাখ্যা করে বলেন—

একবার আমাদের চারপাশে চোখ মেলে তাকালেই বুঝতে পারব যে আমাদের সামাজিক পরিস্থিতি যতটা খারাপ হওয়া সম্ভব, ততটাই খারাপ। দেখাই যাচ্ছে, আমাদের সমাজের নিয়মকানুনের সঙ্গে ন্যায়বিচারের কোনো সম্পর্ক নেই, সেজন্যই আমরা ইউরোপ, আমেরিকা বা রাশিয়ার দিকে তাকাচ্ছি। আশা করছি, ওইসব দেশ থেকে আমাদের সমাজের সমস্যাগুলোর সমাধান আমদানি করতে পারব...আমাদের যা কিছু আধ্যাত্মিক সম্পদ ছিল, যা কিছু বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ছিল, সেসবই আমরা দূরে ছুড়ে ফেলছি। সেই সঙ্গে ছুড়ে ফেলছি সেসব সমাধানের চাবিকাঠিও, যা ওইসব ঐতিহ্যের দিকে তাকালে পরে আমাদের চোখে ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল। আমাদের নিজস্ব শাস্ত্র, ধর্মীয় নীতি সবই ছুড়ে ফেলে দিয়ে বরণ করে আনছি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমকে।

এভাবে ইসলামকে আঁকড়ে ধরেই আধুনিক যুগে প্রবেশের পথ খোঁজার চেষ্টায় কুতুব তার পূর্বসূরি আল আফগানি ও আল বান্নার সমগোত্রীয় হয়ে ওঠেন। ১৯৫১ সালে মিসরে যখন ‘সোসাইটি ফর মুসলিম ব্রাদার্স’ সংগঠনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়, সে বছরেই কুতুব আমেরিকা থেকে ফিরে আসেন। আমেরিকা যাওয়ার আগে কুতুব ছিলেন রাজতন্ত্রবিরোধী ওয়াফদ পার্টির সক্রিয় সদস্য। দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি মুসলিম ব্রাদার্সের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পরে কুতুব বিপ্লবী পরিষদের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা নিযুক্ত হন এবং তিনিই একমাত্র অসামরিক ব্যক্তি হিসেবে পরিষদের বৈঠকে যোগ দেয়ার অধিকার পান। ১৯৫২ সালে নাসের তাকে জেলে পাঠান। কিন্তু কারাগার থেকেই কুতুব তার ভগিনীর হাত দিয়ে তার চিঠিপত্র বাইরে পাচার করতে সক্ষম হন এবং সেসব চিঠি ব্যাপক হারে বিলি করা হয়। ওইসব চিঠিপত্রের সংকলন পরে বই আকারে ‘মাইলফলক’ নামে প্রকাশ হয়। ‘মাইলস্টোনস’ নামে তার ইংরেজি অনুবাদও বেরিয়ে যায়। ওই পত্রসংকলন কার্যত বৈপ্লবিক ইসলামী রাজনীতির ইশতেহার হয়ে ওঠে। ১৯৬৪ সালে জেল থেকে ছাড়া পেলেও কুতুব আবারো গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৬ সালে (বলা হয়) নাসেরের প্ররোচণায়ই তাকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

মিসরে ‘সোসাইটি অব দ্য মুসলিম ব্রাদার্স’ সংগঠনের ইতিহাসে হাসান আল বান্নার নরমপন্থার তুলনায় সঈদ কুতুবকে চরমপন্থী ইসলামী রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়। নরম ও চরম পন্থার মধ্যে পার্থক্যটা এই রকম—নরমপন্থীরা যেমন সমাজের মধ্যে থেকেই সংস্কারের চেষ্টায় লড়াই করেছে, চরমপন্থীরা কিন্তু সে রকম কোনো আশা পোষণ করেনি। তারা বিশ্বাস করত রাষ্ট্রক্ষমতা দখল না করে কোনো অর্থপূর্ণ সামাজিক সংস্কার করা সম্ভব নয়। একই সমাজে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের সহাবস্থান অসম্ভব, এ রকম একটা ধারণা নাসেরের জেলে দীর্ঘ ১৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করার কারণেই কুতুবের মনে দৃঢ়বদ্ধ হয়েছিল কিনা, তা আজ বোঝার উপায় নেই। বরং দেখা যেতে পারে, এ সহাবস্থান ও সংস্কারের পথ ছেড়ে লড়াইকে চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য অগ্রগামী বাহিনীর প্রয়োজনের যে কথা কুতুব বলেছেন, তাতে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদসহ সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তাধারাগুলোর প্রভাব কতটা পড়েছিল।

মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক অভিধা ও রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে যেভাবে চুলচেরা বিচার ও তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়তে আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাতে এ একটা ব্যাপারে তাদের সঙ্গে ধর্মীয় জগতের বাইরে থাকা অন্য বুদ্ধিজীবীদের খুব একটা তফাত নেই। ইসলামী বুদ্ধিজীবীরা তাদের মতাদর্শগত বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় শুধু ওলামাদের সঙ্গেই লড়েননি, তাদের সেসব ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গেও লড়তে হয়েছিল যারা ইসলামী ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে প্রধানত পশ্চিমী উদারনৈতিক ভাবাদর্শ বা মার্ক্সবাদ থেকে অনুপ্রেরণা জোগাড় করেছিলেন। এ দুমুখী লড়াই লড়ে মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা যে ইসলামী রাজনীতির মতাদর্শগত ভিত্তি তৈরি করেন, তা স্বাভাবিক কারণেই বহুমুখী দিশা নিয়েছিল। তার মধ্যে যেমন মানুষের মুক্তির কথা ছিল, তেমনই একনায়কতন্ত্রের উপাদানও ছিল। ধর্মীয় মৌলবাদের সঙ্গে ইসলামী রাজনীতিকে এক করে দেখাটা যেমন ভুল, তেমনই ইসলামী রাজনীতির সব ক’টি ধারাকেই চরমপন্থী রাজনীতি বলে দাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করাটা ভুল। মুহাম্মদ ইকবাল, মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, আবুল আলা মওদুদী ও সঈদ কুতুব—এ চার বুদ্ধিজীবীর মধ্যে একমাত্র মওদুদীই ইতিহাসের চালিকাশক্তি হিসেবে এক আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের কথা খোলাখুলি বলেছিলেন। তুলনায় কুতুবের চিন্তাধারা অনেক বেশি সমাজকেন্দ্রিক, ইকবাল চেয়েছিলেন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-ভৌগোলিক মানচিত্রের সীমান্তের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে মুসলমান সংস্কৃতির পরিচয়ের ভিত্তিতে এক বৃহত্তর ইসলামিক সমাজ বা উম্মা গড়তে। আর জিন্নাহ নিজে ধর্মনিরপেক্ষ মুসলমান, তার কাছে ইসলাম ঔপনিবেশিক ভারতে একটা উপযুক্ত রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবেই গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। তাই জিন্নাহ পাকিস্তানকে এমন একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন, যেখানে রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ও অন্য ধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘুদের গণতান্ত্রিক অধিকার একইভাবে সুরক্ষিত রাখবে।

এর বিপরীতে চরমপন্থী মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের এককাট্টা করেছিল একটাই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা—রাষ্ট্রক্ষমতা কী করে দখল করা যায়? তারা বিশ্বাস করতেন, কমিউনিজম ভেঙে পড়ার সময়টাই সে ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে পারে। কমিউনিজম ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামকে গোটা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের কাছে একমাত্র বাস্তবোচিত মতাদর্শ হিসেবে তুলে ধরতে হবে মুসলমানদের। ১৯৬৩ সালে সঈদ কুতুব তার রাজনীতির ইশতেহার ‘মাইলস্টোনস’ এভাবেই শুরু করেছেন:

মানবজাতি এখন একেবারে খাদের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। এজন্য নয় যে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সত্যিকারের আশঙ্কা মাথার ওপর ঝুলছে, কারণ তা শুধুই রোগের লক্ষণ, রোগ নয়। এর কারণ মানবসভ্যতার সত্যিকারের অগ্রগতি ও বিকাশের জন্য যেসব গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ থাকা দরকার, আজ মানবজাতি সেসবই হারিয়ে ফেলেছে ।... পশ্চিম ইউরোপে গণতন্ত্র এখন এতটাই বন্ধ্যা হয়ে পড়েছে যে তাদের বুদ্ধিজীবীদের এখন পূর্ব ইউরোপ থেকে চিন্তা ধার করতে হচ্ছে।... এটা বিশেষ করে ঘটছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, সমাজতন্ত্রের নামে ।.... অথচ মার্ক্সবাদ কিন্তু যুক্তির দিক থেকে আগেই পরাজিত এবং এটা বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না যে বিশ্বে এমন একটাও দেশ নেই, যাকে সত্যিকারের অর্থে মার্ক্সবাদী রাষ্ট্র বলা যায়।.... বিজ্ঞানের অগ্রগতির যে জোয়ার এসেছিল, সেকালও এখন শেষ হতে চলেছে।... আধুনিক যুগে যত ধরনের জাতীয়তাবাদী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হয়েছে এবং তা থেকে যত ধরনের মতাদর্শগত তত্ত্ব এসেছে, সেসবও তাদের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। এককথায় মানুষের তৈরি সব রকমের চিন্তা ও তত্ত্ব, তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক উন্নয়নই হোক বা সমষ্টিকেন্দ্রিক, বাস্তবে ব্যর্থ প্রমাণিত। ইতিহাসের এ সন্ধিক্ষণে ইসলাম ও মুসলমান সমাজের সামনে সুযোগ এসেছে, কারণ তার কাছে সে মূল্যবোধ আছে।

(লেখকের Good Muslim, Bad Muslim: America, the Cold War, and the Roots of Terror গ্রন্থের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ। শিরোনামটি আমাদের দেয়া)

মাহমুদ মামদানি: কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক