সোসাইটি অব দ্য মুসলিম ব্রাদার্স বা মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠা ১৯২৮ সালে। সুন্নি চিন্তাবিদ হাসান আল বান্নার হাতে মিসরে গড়ে ওঠে এ পলিটিক্যাল ইসলামিস্ট সংগঠনটি। বান্না জন্মেছিলেন ১৯০৬ সালে আলেকজান্দ্রিয়ার কাছে ছোট্ট গ্রাম মাহমুদিয়ায়। ইসলামী পণ্ডিত পিতার ছায়ায় বান্না নিজেও পড়াশোনা শুরু করে দেন। ১৯২৩ সালে তিনি কায়রোয় হাজির হন শিক্ষক হওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে। কায়রোয় তখন পশ্চিমা উদারনৈতিক ভাবধারার ঢেউ থেকে তিনি চমকে যান। তখন তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও তার কলেজের একদল শিক্ষার্থীকে সংগঠিত করে মসজিদ ও ক্যাফেতে নিজেদের পক্ষে প্রচারণা শুরু করেন। ডিগ্রি নেয়ার পর তিনি সুয়েজ খালের কাছে ইসমাইলিয়া শহরে স্কুল শিক্ষকের চাকরি নেন। সেখানেও তার ধর্মীর প্রচারণা অব্যাহত রাখেন। একদিন শ্রমিকদের একটি দল তার কাছে দিকনির্দেশনা চাইতে আসে। পরবর্তী সময়ে এদের নিয়েই তিনি কয়েক বছর পর মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে সংগঠনটির কাজ ছিল সদস্যদের ইসলামী নিয়মানুযায়ী জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়া। তখন এ শিক্ষামূলক সভাগুলো হতো সুফি জমায়েতের মতো। শিগগিরই সুয়েজ খালসংলগ্ন এলাকায় সংগঠনটির শাখা গড়ে উঠতে থাকে।
১৯৩২ সালে বান্না রাজধানী কায়রোয় বদলি হয়ে যান। এবার সেখানেই মুসলিম ব্রাদারহুডের সদর দপ্তর পরিচালনা শুরু হয়। মিসরের অভ্যন্তরে ও বাইরেও এ সংগঠন বিস্তৃত হতে থাকে। সে সময়ের যে রাজনৈতিক উত্তাপ তাতে যুক্ত হয়ে যায় মুসলিম ব্রাদারহুড। বান্না এ সময় ব্রিটিশবিরোধী পশ্চিমা একনায়কতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদে আকৃষ্ট হন। ১৯৩০-এর দ্বিতীয়ভাগে মুসলিম ব্রাদারহুড আরো বেশি রাজনৈতিক ও স্পষ্টবাদী হয়ে ওঠে। তাদের তরুণ সংগঠন হলুদ শর্টের ‘রোভারস’ শরীয় কায়েমের দাবিতে মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বান্না অক্ষশক্তির পক্ষ নিয়েছিলেন। পরিণতিতে তাকে ও তার পরিষদকে কারাগারে যেতে হয় এবং সংগঠনটিকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারের সঙ্গে তার এই প্রথম সংঘাতের পর বান্না একটি গোপন প্যারামিলিটারি ফোর্স তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম ব্রাদারহুড আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। দেশের রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি সাধারণ মানুষের অবিশ্বাস ধীরে ধীরে ব্রাদারহুডকে আরো শক্তিশালী করতে থাকে। এছাড়া জীবনচারণে ধর্মীয় দর্শনে আকৃষ্টরাও সংগঠনে যোগ দিতে থাকে। মুসলিম ব্রাদারহুডের ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব ও ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন মিসরের জাতীয়তাবাদীদেরও আকর্ষণ করে। মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠা করা স্কুল ও হাসপাতালগুলো শহরের শ্রমিকশ্রেণীকে যথেষ্ট সেবা দিয়েছিল। ১৯৪৫ নাগাদ সংগঠনটি পাঁচ লাখ সদস্য এবং আরো অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তৈরি করে ফেলেছিল। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল তখন ওয়াফদ, বিশ্বযুদ্ধের পর যারা জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে। তখন মিসরের রাজনীতির মঞ্চ টালমাটাল। সংসদীয় ব্যবস্থায় সংকট, রাস্তায় নিত্য সশস্ত্র সংঘাত আর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। ব্রাদারহুডের সশস্ত্র শাখাটি তখন বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালের মার্চে বিচারক আহমাদ আল-খাজানদারের হত্যাকাণ্ড এবং তার কয়েকদিন পর ব্রাদারহুডের সশস্ত্র শাখা নিয়ে দালিলিক প্রমাণ প্রকাশ হওয়ায় সরকার নড়েচড়ে বসে। প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ আল নুকরাশি ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করেন। তিনি নিজেই ব্রাদারহুডের হাতে হত্যাকাণ্ডের হুমকিতে ছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার, ১৯৪৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি ব্রাদারহুডের এক কর্মীর হাতে নিহত হন। বান্না এ ঘটনার নিন্দা জানান। কিন্তু তিনিও রেহাই পাননি। ১৯৪৯-এর ১২ ফেব্রুয়ারি মিসরের সিক্রেট পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।
মোটাদাগে এসব সহিংসতার পরে ব্রাদারহুডের হাল ধরেন সঈদ কুতুব। ১৯৫০-এর দশকে তিনি সংগঠনে যোগ দেন। ১৯৫২ সালের জুলাইতে সামরিক ক্যু হয়। এতে মুসলিম ব্রাদারহুডের বড় ভূমিকা ছিল। ধারণা করা হয় তখন জামাল আবদেল নাসের ও আনওয়ার সাদাতও ব্রাদারহুডের সশস্ত্র শাখার সদস্য ছিলেন। ১৯৫৩ সালে যখন সব রাজনৈতিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়, তখন ব্রাদারহুড ‘সংগঠন’ হিসেবে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অনুমতি পায়। ধীরে ধীর সামরিক বাহিনীর নেতা ও ব্রাদারহুডের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। ব্রাদারহুড এ সামরিক নেতাদের ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমে তাদের লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার বিবেচনা করছিল। অন্যদিকে সামরিক নেতারা মাঠের সংগঠন হিসেবে ব্রাদারহুডকে ব্যবহার করতে চাইছিল। আবদেল নাসের যে একদলীয় ব্যবস্থা তৈরি করতে আগ্রহী ছিলেন, সেখানে সঈদ কুতুবকে বড় পদ দেয়ার প্রস্তাব ছিল, কিন্তু শরীয় প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার না থাকায় ব্রাদারহুড সেখানে সায় দেয়নি। ব্রাদারহুড ও কমিউনিস্টরা মিলে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন এবং বেসামরিক শাসনের দাবি তোলেন। পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে যখন ১৯৫৪ সালের অক্টোবরে ব্রাদারহুডের এক তরুণ নাসেরকে হত্যার চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় নাসেরের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় এবং তিনি ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার সমর্থন পেয়ে যান। ব্রাদারহুড়ের হাজার দশেক সদস্য গ্রেফতার হন। অনেককে বন্দি অবস্থায় নির্যাতন করা হয়। বিচারের মুখোমুখি হন অনেকে।

১৯৪০-এর দশকে মুসলিম ব্রাদারহুডের তরুণ স্কাউটদের জমায়েত
এরপর সঈদ কুতুব বাকি জীবনের বেশির ভাগ কারাগারে কাটান। কারাগারেই তিনি তার সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ মালিম ফিল-তারিক রচনা করেন। এটি ১৯৬৪ সালে প্রকাশ হয়। তিনি ঘোষণা করেন আধুনিক মুসলিম সমাজকে প্রকৃত মুসলিম হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, কারণ তারা আল্লাহর দেয়া নীতিভিত্তিক শাসন দ্বারা পরিচালিত নন। তার কথা ছিল স্পষ্ট—‘হয় ইসলাম, নয়তো জাহিলিয়া’। ১৯৬৫ সালে যখন মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে নতুন করে দমনাভিযান শুরু হয়, তখন পুলিশ সংগঠনটির প্রতিটি সদস্যের বাড়িতে মালিম গ্রন্থটি আবিষ্কার করে। সরকার নিশ্চিত হয় ব্রাদারহুড আবারো ক্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কুতুবকে এবার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
সঈদ কুতুবের লেখাপত্র নিয়ে ইসলামী আন্দোলনে বিভক্তি তৈরি হয়। সত্তরের দশকে তরুণরা তাদের পূর্বসূরিদের সমালোচনা শুরু করেন সরকারের বিরুদ্ধে আরো কঠোর আন্দোলনে না যাওয়ার জন্য। তারা ব্রাদারহুড ত্যাগ করে কুতুবের আদর্শে সশস্ত্র গ্রুপ তৈরি করেন। কিন্তু বয়স্ক ও বড় অংশ হাসান আল-হুদায়বির মধ্যমপন্থার প্রতি আস্থা রাখেন। এ হুদায়বি ১৯৭১ সালে প্রকাশ করেন দুয়া লা কুদা মানে প্রচারক, বিচারক নই। এটি ছিল কুতুব ও মওদুদীর মতবাদের একরকম সমালোচনা।
১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে আরব দেশগুলো ইসরায়েলের হাতে পরাজয় বরণ করে। মিসরের হাতছাড়া হয় সিনাই উপত্যকা এবং সুয়েজ খাল অবরুদ্ধ হয়। মিসরের ওলামাদের অনেকেই এ পরাজয়কে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া ও ইসলামী কর্মীদের ওপর সরকারের দমনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। এমন পরিস্থিতিতে নাসের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে শুরু করেন। ১৯৭০-এ তিনি মারা যান, তার স্থলাভিষিক্ত হন আনওয়ার সাদাত। তিনি নিজের জনপ্রিয়তা ও শাসনের বৈধতা উৎপাদনে ধর্মীর রাজনীতিকে সহায়তা দিতে শুরু করেন। রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে তাকে ‘ধার্মিক প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়। ব্রাদারহুডের বন্দি কর্মীরা মুক্তি পেতে শুরু করেন। ১৯৭৬ সালে রাজনীতি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ১৯৭৩ সালে হুদায়বির মৃত্যুর পর উমর আল-তিলমিসানি ব্রাদারহুডের নতুন নেতা মনোনীত হন। ছাত্রদের মধ্যে ব্রাদারহুড আবারো শক্তিশালী হতে থাকে। এ নতুন রক্ত সঞ্চালন ব্রাদারহুডের ইতিহাসের নতুন পর্ব। এদের নতুন-মুসলিম ভাই হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। সাদাতের সঙ্গে এবার দূরত্ব তৈরি হয়। তিনি ১৯৭৩ সালে নিহত হন।

ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে আনওয়ার সাদাত ও জামাল আবদেল নাসের, ১৯৬৪
এবার মিসরের হাল ধরেন হোসনি মুবারক। তিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদারীকরণে কাজ করেন। তার সময়ে ১৯৭০-এর দশকে মুসলিম ব্রাদারহুড মিসরের রাজনীতিতে শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৮০-এর দশকে ইসলামপন্থীরা বেশির ভাগ ছাত্র ও শিক্ষক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। অন্যদিকে সত্তরের দশকের ব্রাদারহুডের সেই ফ্রেশ ব্লাড এবার কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। তারা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনে কাজ শুরু করেন। উমর আল-তিলমিসানি ব্রদারহুডকে সশস্ত্র পন্থা থেকে সরিয়ে সিভিল সোসাইটি সংগঠনে পরিণত করার দিকে এগিয়ে যান। তবে এসব পেশাজীবী সংগঠনে ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক নীতি-আদর্শ অনেকটা ফিকে হয়ে যায়। এ নিয়ে সংগঠনের রাজনৈতিক নেতারা নতুন করে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেন। পেশাজীবীদের ইউনিয়নগুলো সংগঠনের বড় শক্তি হয়ে ওঠে। ডাক্তারদের ইউনিয়ন প্রথম সংগঠন যেটি ব্রাদারহুডের নিয়ন্ত্রণে আসে, এটা ১৯৮৪ সালের ঘটনা। দুই বছর পর প্রকৌশলীদের সংগঠন এবং ১৯৮৮ সালে ফার্মাসিস্টদের সংগঠন ব্রাদারহুডের মিত্র হয়ে যায়।
নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে হোসনি মুবারক স্বার্থোদ্ধার না হওয়ায় মিসরে রাজনীতির সুযোগ কাটছাঁট শুরু করেন। মুসলিম ব্রাদারহুড মুবারকের কোপানলে পড়ে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনায়ও তারা চাপে পড়ে। ১৯৯২ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ব্রাদারহুডের কিছু দলিলাদি উদ্ধার হয়, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের সদস্যদের নিযুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। অবশ্য সংগঠনের তরফে এ অভিযোগ নাকচ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে মোবারকের প্রাণনাশের জন্য হামলায় ব্রাদারহুডকে দায়ী করা হয়। এরপর শুরু হয় ব্যাপক সরকারি দমন।
নতুন সহস্রাব্দে নতুন ও পুরনোদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা ভাসতে থাকে। অবশ্য ব্রাদারহুডের পক্ষ থেকে তা নাকচ করা হয়।
এস এম রশিদ: লেখক








