মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে অবস্থিত লাইব্রেরি অব আলেকজান্দ্রিয়া বা আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারটি প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগারগুলোর একটি। প্রায় ৩০০ খ্রিস্টপূর্বে মিসরের রাজা টলেমি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় উৎস। পৃথিবীর সব ধরনের জ্ঞান একই জায়গায় একত্র করার ইচ্ছা থেকে এ লাইব্রেরি তৈরি হয়েছিল, সমগ্র পৃথিবীর প্রতিটি বইয়ের একটি কপি সংরক্ষণ করাই ছিল যার লক্ষ্য। এ ‘বিশ্বজনীনতার স্বপ্ন’ এখনো গ্রন্থাগারিক এবং বই সংগ্রাহকদের মনে অমর হয়ে আছে এবং আধুনিক কপিরাইটভিত্তিক রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের মূল ভিত্তি দেশের প্রকাশিত সব বইয়ের কমপক্ষে একটি কপি সংগ্রহে রাখা এ স্বপ্নেরই ফল বলা যায়। এখানে লাইব্রেরিটির পাশেই রয়েছে একটি থিয়েটার, একটি ঐতিহাসিক জাদুঘর ও কনফারেন্স হল। এটি ছিল মিসরের ঐশ্বর্য ও ক্ষমতার প্রতীক। সারা পৃথিবী থেকে বই ধার করে তার অনুলিপি তৈরি করে বা মূল বইটি এখানে সংরক্ষণ করা হতো। এ গ্রন্থাগারে কোন যুগের ঠিক কতগুলো বই ছিল, তা অনুমান করা আর সম্ভব নয়। তবে অনেকের মতে, সাত-আট লাখ বইয়ে সমৃদ্ধ হয়েছিল এ লাইব্রেরি। গ্রন্থ সংগৃহীত হতো প্যাপিরাসের আকারে। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পর অবশ্য কোডেক্সও ব্যবহার হয়েছে। তবে কখনো পার্চমেন্ট কাগজ ব্যবহার করা হয়নি। গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইব্রেরি অব আলেকজান্দ্রিয়ায় গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও অন্যান্য নানা বিষয়ের গ্রন্থ ছিল।
সব সফল গ্রন্থাগারিকের মতোই মিসরের রাজা ও তাদের গ্রন্থাগারিকরা ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং নিজেদের সংগ্রহে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে অকৃপণ। চুরি, ধার, ভিক্ষা যেকোনো উপায়েই বই সংগ্রহে ছিলেন তারা সিদ্ধহস্ত। এমনকি বিশাল আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের প্রসারে আলেকজান্দ্রিয়া দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজ তল্লাশি করার এবং জাহাজে পাওয়া যেকোনো পুঁথি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। পুঁথিগুলো ‘জাহাজ থেকে প্রাপ্ত’ ট্যাগ দিয়ে গ্রন্থাগারে রাখা হতো। এমনকি যখন আথিনিয়ানরা মূল্যবান পুঁথি (স্ক্রল) কপি করার জন্য ধার দিয়েছিল, মিসরীয়রা তা ফিরিয়ে না দিয়ে মূল স্ক্রল রেখে শুধু কপি ফিরিয়ে দিয়েছিল। অতীতে গ্রন্থ সংগ্রহের পাশাপাশি এ গ্রন্থাগারে একদল আন্তর্জাতিক গবেষক সপরিবারে বাস করত। তারা রাজার কাছ থেকে বৃত্তি পেতেন।
গ্যালেনের মতে, তৃতীয় টলেমি এথেন্সবাসীর কাছ থেকে এস্কাইলাস, সফোক্লিস ও ইউরিপিডিসের মূল বইগুলো সংগ্রহের অনুমতি চেয়েছিলেন। এর পরিবর্তে এথেন্সবাসী প্রচুর মূল্যবান ধাতু বন্ধক রাখতে চেয়েছিলেন। তৃতীয় টলেমি সে পরিমাণ অর্থ জমা রাখলেও মূল বইগুলো গ্রন্থাগারেই রেখে দেন। তবে গল্পটি টলেমিক রাজবংশের অধীনে এথেন্সের ওপর আলেকজান্দ্রিয়ার ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য প্রচারিত অসত্য গল্পও হতে পারে।
এ নিখুঁত কিংবা দখলদারি যা-ই বলি না কেন, সংগ্রহ নীতির ফলে কয়েক বছরের মধ্যে গ্রন্থাগারটি পুঁথি ও গ্রন্থে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রান্না থেকে শুরু করে ইহুদি ধর্মতত্ত্ব—হাজার হাজার বইয়ের সমন্বয়ে এটি এমন একটি সংগ্রহে পরিণত হয়, যা আকার ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে পৃথিবীর অন্য কোথাও ছিল না। তবে টলেমি বা তার পরবর্তী মিসরের রাজারা কেবল বই সংগ্রহই করেননি, তারা সংগ্রহ করেছিলেন মানুষের মনও। তারা একটি বিদ্বান সমাজ গঠনের লক্ষ্যে গ্রিক শিল্প ও বিজ্ঞানের দেবী মিউজের সম্মানে একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরটির নাম ছিল মিউজিয়াম (Mouseion), যা গ্রন্থাগারের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। মিসরের প্রতিষ্ঠানটির টানে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নানা জায়গা থেকে পণ্ডিতরা এখানে এসে কাজ করতেন।
পরে সেরাপিসের মন্দিরে (যেটি ‘সেরাপিয়াম’ নামে পরিচিত) আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের একটি শাখা স্থাপিত হয় ক্রমবর্ধমান সংগ্রহগুলোর স্থান সংকুলান করার জন্য।
গ্রন্থাগারটির উৎপত্তি নিয়ে বহু বছর ধরে ইতিহাসবিদরা আলোচনা করে এসেছেন। প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বই সংগ্রহ শুরু করেছিলেন অ্যারিস্টটল। এ মহান দার্শনিকের প্রভাবে পরবর্তীতে অনেক শহরেই গ্রন্থাগারের ভিত্তি স্থাপন হয়, বিশেষ করে তার শিষ্য আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বিজিত অঞ্চলে। অ্যারিস্টটলের জ্ঞানের প্রতি এ ব্যাপক আগ্রহই সম্ভবত আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের ‘বিশ্বজনীনের’ ধারণাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অ্যারিস্টটলের আরেক শিষ্য ডেমেট্রিয়াস অব ফ্যালেরাম ছিলেন এ গ্রন্থাগারের নকশাকার ও প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান কারিগর।

ইউক্লিডের এলিমেন্টস বইয়ের পাণ্ডুলিপি ছবি: দ্য ম্যাপ অব নলেজ
শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যখন ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বে মিসর বিজয় করেছিলেন তখন। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, তিনি নিজে শহরের স্থান নির্বাচন করেছিলেন, যা নীল নদের ডেল্টা অঞ্চলে লেক মেরিওটিস ও সাগরের মাঝে অবস্থিত। এখানকার পরিবহন ব্যবস্থা ছিল দুর্দান্ত আর ভূমধ্যসাগরের উপকূলে ছিল দুটি বড় প্রাকৃতিক বন্দর। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর গ্রিক সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী অঞ্চল মিসর তার বিশ্বস্ত একজন জেনারেল টলেমি সোটারের হাতে চলে আসে। বাকি সাম্রাজ্য ভাগ করা হয়েছিল অন্য দুজন জেনারেলের মধ্যে এবং এ তিন অঞ্চল একত্রে পরিচিত ছিল হেলেনিস্টিক রাজ্য হিসেবে।
টলেমি সোটার নিজেকে রাজা ঘোষণা করেন এবং একটি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ২৭৫ বছর ধরে মিসর শাসন করে। রানী ক্লিওপেট্রার নাটকীয় আত্মহত্যার মাধ্যমে এ শাসন শেষ হয়। তবে এ দীর্ঘ শাসনকাল কোনোভাবেই সুস্থির ছিল না। টলেমি ছিলেন একজন বহিরাগত মেসিডোনিয়ান অধিবাসী এবং শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে তাকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের এক বিশাল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হয়েছিল। আলেকজান্ডারের অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ছিল টলেমি সোটার ও তার পুত্র সোটার দ্বিতীয়ের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এ প্রতিযোগিতার বড় একটি অংশ যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে, গ্রন্থাগার ও মিউজিয়ামের ডেস্ক এবং বুকশেলফে সংঘটিত হয়েছিল।
অবাক করা বিষয় সে সময়ে এ পাঠাগারে জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ কোনো ভেদাভেদ ছিল না। হাইপেশিয়া ছিলেন ওই সময়ের আলেকজান্দ্রিয়ার একজন বিখ্যাত নারী গণিতবিদ। সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য তীর্থস্থান হিসেবে গণ্য হওয়ায় আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিল এ পাঠাগার থেকেই। এখানে বসেই অ্যারিস্টারকাস বলেছিলেন, পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ক্রমাগত ঘুরছে। হেরোফিলাস এখানে জমাকৃত স্কুলগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য হতে বলেছিলেন, মানব মস্তিষ্কই হচ্ছে শরীরের নিয়ন্ত্রক এবং উন্মোচন হয় চিকিৎসাশাস্ত্রের এক নতুন অধ্যায়। অ্যাপোলোনিয়াস ও আর্কিমিডিসের মতো জ্ঞানীরাও কোনোকালে এ পাঠাগারে এসেছিলেন তাদের জ্ঞান তৃষ্ণা মেটাতে। সিসিলির সিরাকুসে আর্কিমিডিস বাস করতেন। শিক্ষার দিক থেকে তা ছিল তুলনামূলক অবহেলিত। তিনি অভিযোগ করেছিলেন সহকারী কনন মারা যাওয়ার পর তিনি গাণিতিক সমাধানে পারদর্শী কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এ জাতীয় অভিযোগ থেকে একটা বিষয় বোঝা যেত এত বিশাল সংগ্রহশালা সম্পন্ন আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি থাকার পরেও খুব সীমিতসংখ্যক মানুষ বিজ্ঞান চর্চা করত।
গণিতবিদ ইউক্লিড আলেকজান্দ্রিয়ায় বসেই লিখেছিলেন Elements of Geometry, যা এখনো জ্যামিতি নিয়ে লেখা সবচেয়ে সফল ও প্রভাবশালী পাঠ্যপুস্তক হিসেবে বিবেচিত। পুরো লেখাটি ১৩টি খণ্ডে বা ১৩টি বইতে বিভক্ত। পরে আরেকজন বিখ্যাত গণিতবিদ থিয়ন (খ্রিস্টাব্দ ৩৩৫-৪০৫) ইউক্লিডের লেখার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আরেক মহান দার্শনিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী হাইপেশিয়ার বাবা। যখন থিয়ন দি এলিমেন্টস পড়তে শুরু করেন, তখন এটি ৬০০ বছর পুরনো এবং আধুনিকায়নের প্রয়োজন ছিল। তিনি ইউক্লিডের কাজ সম্পাদনা ও পরিষ্কার করেন, নতুন প্রমাণ যোগ করেন, ভাষা উপযোগী করেন, এমনকি এমন কিছু অংশ মুছে দেন, যা বোঝা কঠিন মনে হয়েছিল। তার নতুন সংস্করণটি খুব সফল হয়েছিল, এটি বহুবার পুনর্লিখিত হয়েছিল এবং ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি হয়ে উঠেছিল অন্যান্য সংস্করণের একক উৎস ও মানদণ্ডস্বরূপ, যা মধ্যযুগ ও পরবর্তী সময়ে চালু ছিল ১৮০৮ সাল পর্যন্ত। তবে এ সময় একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে।

নবম শতাব্দীর জার্মান মানচিত্রে আলেকজান্দ্রিয়া ছবি: দ্য ম্যাপ অব নলেজ
একজন ফরাসি পণ্ডিত ফ্রাঁসোয়া পেরার্ড নেপোলিয়নের সংগ্রহে থাকা বইয়ের একটি স্তূপ ঘেঁটে দি এলিমেন্টসের একটি পাণ্ডুলিপি পান, যা থিয়নের সংস্করণের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। এ বইয়ের সংগ্রহটি নেপোলিয়ন ভ্যাটিকান গ্রন্থাগার থেকে প্যারিসে নিয়ে এসেছিলেন। শিগগিরই পণ্ডিতরা বুঝতে পারলেন পাণ্ডুলিপিটি থিয়নের সম্পাদনা ও সংযোজনগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি পুরনো ও একটি অক্ষত সংস্করণ যা ইউক্লিডের আসল টেক্সটের কাছাকাছি। পেরার্ড যে পাণ্ডুলিপিটি খুঁজে পেয়েছিলেন তা কনস্টান্টিনোপলে খ্রিস্টাব্দ ৮৫০-এর আশপাশে কপি করা হয়েছিল, তাই এটি প্রায় এক হাজার বছর ধরে গুপ্ত ছিল, শতাব্দীকাল ধরে পণ্ডিতদের চোখে পড়েনি। পাণ্ডুলিপিটি আমাদের ইউক্লিডের সঙ্গে এবং একই সঙ্গে প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়া শহরের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
৮০ বছর পর ডেনিশ পণ্ডিত জেএল হেইবার্গ, অন্যান্য সংস্করণ ও রেফারেন্স ব্যবহার করে একটি চূড়ান্ত সংস্করণ তৈরি করেন। হেইবার্গ সংস্করণ এখনো ইউক্লিডের এলিমেন্টসের আধুনিক মানদণ্ড।
যা-ই হোক, আলেকজান্দ্রিয়া শহর এবং গ্রন্থাগার একাধিকবার ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হয়েছে। মূলত খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে মিসরের পতন শুরু হলে লাইব্রেরির অবনতি ঘটতে থাকে। খ্রিস্টপূব চতুর্থ শতকের শেষ দিকে আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌত্তলিকতার প্রভাব কমতে থাকে। পুরনো এবং নব্য খ্রিস্টানরা তখন এটিকে নাস্তিকতা ও ব্যভিচারের কেন্দ্র বলে মনে করত। তবে ধ্বংসযজ্ঞের সময় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কে অগ্নিসংযোগ করেছেন তা নিয়েও মতান্তর রয়েছে। একটি জনশ্রুতি হলো বহু বছর ধরে জ্বলতে থাকা আগুনে এ গ্রন্থাগার বিনষ্ট হয়। ৪৭-৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজারের মিসর আক্রমণের সময়, ২৭০ খ্রিস্টাব্দে আরেলিয়ান আক্রমণের সময়, ৩৯১ খ্রিস্টাব্দে কপটিক পোপ থেওফিলাসের নির্দেশে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে এবং ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে মিসরে মুসলমান আক্রমণের সময় সংঘটিত পৃথক পৃথক অগ্নিকাণ্ডে আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে ভূমধ্যসাগরতীরে যেখানে প্রাচীন গ্রন্থাগারটি একসময় দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই পুরনো লাইব্রেরিটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। নির্মাণকাজ ১৯৯৫ সালে শুরু হয় এবং কমপ্লেক্সটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৬ অক্টোবর ২০০২ তারিখে উদ্বোধন করা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গ্রন্থাগারটির সঙ্গে থিয়েটার, ঐতিহাসিক জাদুঘর ও কনফারেন্স হল দেখতে এখানে প্রতিদিন অনেক পর্যটক আসে।
পুনর্নির্মিত এ গ্রন্থাগারে বর্তমানে ৮০ লাখ বই রাখার মতো শেলফের ব্যবস্থা আছে। মূল পাঠকক্ষের আয়তন প্রায় ৭০ হাজার বর্গমিটার, যা ১১টির মতো চৌবাচ্চার ওপর অবস্থিত। মূল কমপ্লেক্সে একটি বিশাল কনফারেন্স সেন্টার, চারটি মিউজিয়াম, চারটি গ্যালারি। অস্থায়ী প্রদর্শনীর জন্য একটি প্লানেটেরিয়াম, পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণে আছে ল্যাব।
মূল পাঠকক্ষের ওপর রয়েছে ৩২ মিটার দীর্ঘ কাচ দিয়ে ঘেরা ছাদ, দেয়াল তৈরি করা হয়েছে ধূসর বর্ণের আসওয়ান গ্রানাইট দিয়ে, যাতে ১২০ রকমের হস্তলিপি খোদাই করা আছে। লাইব্রেরিতে ইন্টারনেট আর্কাইভে পুস্তক, দলিলগুলোর অনুলিপি সংরক্ষিত আছে, প্রয়োজনবোধে সেখান থেকে এসপ্রেসো বুক মেশিনের সাহায্যে বই প্রিন্ট করে নেয়া যায়।
ভূমধ্যসাগরের উপকূল ঘেঁষে একটি সুবিশাল ছয়তলা ভবনের প্রথম তলায় দর্শন, ধর্মীয় বিষয়াবলি, ভূগোল, ইতিহাস, মানচিত্র, দুর্লভ গ্রন্থগুলো এবং এগুলোর সিডি প্রভৃতি রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কিত গ্রন্থগুলো, শ্রবণ ও দর্শনযোগ্য যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ। তৃতীয় তলায় শিল্পকলার ৭০০, সংগীতের ৭৮০ ধরনের এবং এতৎসংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও গ্রন্থ। চতুর্থ তলায় পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার নিদর্শন, বিশ্বকোষ, সাধারণ জ্ঞান, গ্রন্থাগার বিজ্ঞান, ইউরোপ, মিসর প্রভৃতি সম্পর্কে লক্ষাধিক গ্রন্থ। পঞ্চম তলায় কনফারেন্স হল, মিটিং রুম, টলেমি গ্যালারি, ত্বহা হুসাইনের গ্রন্থাগার ও মানববিদ্যা সম্পর্কিত হাজার হাজার বই। ষষ্ঠ তলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং গবেষণার জন্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ও আন্তর্জাতিক স্টাডি সম্পর্কিত শাখাগুলো রয়েছে।
লাইব্রেরি চত্বরে বিশাল গম্বুজের জাদুঘর রয়েছে। যেখানে প্রাচীন মিসরীয় ক্যালেন্ডার ছাড়াও সুপরিচিত অনেক শাসক বিশেষত সুলতান মাহমুদ গজনভী ও সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেকসহ পৃথিবীর বিখ্যাত শাসকদের ছবি রয়েছে।
ফাহাদ হৃদয়: লেখক ও সাংবাদিক







