৪০০ বছর ধরে শেক্সপিয়ারের নাট্যভাণ্ডার নিয়ে বিশ্বময় যে মাতামাতি, তার কি কিছু হেরফের হতো যদি তাঁর কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাটক আদৌ আলোর মুখ না দেখত! আর সেগুলো যদি হতো দ্য টেমপেস্ট, মেজার ফর মেজার, ম্যাকবেথ, জুলিয়াস সিজারের মতো মহাকালজয়ী নাটক!

আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত শেক্সপিয়ারের ফার্স্ট ফোলিওর প্রদর্শনীতে গিয়ে এ কথাই ভাবছিলাম। শেক্সপিয়ারের ৪০০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ফার্স্ট ফোলিও ছাড়াও প্রদর্শনীতে দ্রষ্টব্য হিসেবে আকর্ষণীয় অনেক কিছু ছিল।

বড়সড় (সম্ভবত বুলেটপ্রুফ) কাচের চৌকোনো আধারে বিশালাকায় বস্তুটিকে বই বলা অসঙ্গত। এটি গ্রন্থ, ৪০০ বছর বয়স। পুরু, হলদেটে কাগজ, মেলে রাখা অবস্থায় আয়তাকার দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে প্রায় পৌনে ১ ফুট, উচ্চতায় জোড়া ইট, আর যে জায়গায় পৃষ্ঠা ভাগাভাগি হয়ে দুই পার্ট, সেখানে ওপরের দিকে চোখ রাখলে: দ্য ট্র্যাজেডি অব হ্যামলেট (Tragedy নয়, Tragedie)। তার পর নজর খানিকটা এপাশ-ওপাশে ঘোরালে সেই অমর টু বি অর নট টু বি সোলিলোকি। অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে কাছঘেঁষে কাচের আধার ছুঁয়ে ফেললে মুশকিল, পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠবে। দেখাদেখি যা করার, অন্তত ইঞ্চি ১০-১২ তফাতে থেকে।

শেক্সপিয়ারের জীবদ্দশায় তাঁর সব রচনা গ্রন্থিত হয়নি। যা হয়েছিল, তাতে অন্তত ১৮টি নাটক বাদ পড়েছিল। ফার্স্ট ফোলিওর গুরুত্ব এখানে যে, এতে এই ১৮টি নাটক প্রথমবারের মতো পুস্তকাকারে মুদ্রিত হয়েছিল। শেক্সপিয়ারের মৃত্যুর সাত বছর পর ১৬২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর এটি প্রকাশিত হয়। যে চারটি নাটকের উল্লেখ করা হলো, এ ছাড়াও এতে অন্তর্ভুক্ত হয় অ্যান্টোনিও অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা, কোরিওলোনাস, কমেডি অব এরারস, টুয়েলফ্থ নাইট, দ্য টেমিং অব দ্য শ্রু, অলস্ ওয়েল দ্যাট এন্ডস্ ওয়েল, রিচার্ড দ্য থার্ড, রিচার্ড দ্য ফোর্থ ইত্যাদি।

যে কথা বলছিলাম। উল্লিখিত নাটকগুলো ছাড়া কিছু খামতি কি থেকে যেত না শেক্সপিয়ারের মূল্যায়নে? ডার্ক কমেডিখ্যাত মেজার ফর মেজারের ক্লোডিও চরিত্র হিসেবে যেমন চিরকালীন, তেমনি আমাদের জীবনচর্চায় এ নাটকের প্রাসঙ্গিকতাও গূঢ় ব্যঞ্জনাময়। টেমপেস্টের প্রসপেরো ও ক্যালিবান যুগ যুগ ধরে কত ভাবনারই-না খোরাক জুগিয়েছে, উপনিবেশিক ও উত্তর-উপনিবেশিক পৃথিবীতে এ নাটক যেন অদৃশ্য নাটাই থেকে কড়কড়ে মাঞ্জা দেয়া সুতোই ছেড়ে যায়নি, রেখে গেছে এক বিশদ প্রতিবেদনও। ম্যাকবেথ, জুলিয়াস সিজারের কথা না-ই বললাম।

আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ ও আমেরিকান স্টাডিজের লাইব্রেরিয়ান স্টিভেনসন। কোঁচকানো জামাকাপড়, এলোমেলো চুল ও অন্তত চার-পাঁচদিনের না-কাটা দাড়িতে বছর চল্লিশের স্টিভেনসন নিজেও দর্শনীয় বটে, বিশেষ করে যখন সে শেক্সপিয়ার ও ফার্স্ট ফোলিও নিয়ে মুখ খোলে। ভারী কাচের আড়ালে নিভু-নিভু চোখের পাতা না ফেলে সে যখন একনাগাড়ে বলে যেতে থাকে ফোলিও-বিষয়ক নানা ইতিবৃত্ত, একের পর এক নাটক ধরে ধরে, এমনকি অ্যাক্ট-সিন উল্লেখ করে বর্ণনা করে ফোলিও প্রকাশের সময় কী ধরনের ঝামেলা পাকিয়েছিল এবং কীভাবে সেসবের নিরসন হয়েছিল, তখন মনে হয় না দিনের পর দিন বলে গেলেও তার কথা ফুরাবে। নিজের কাজের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থাকলেই যে এমন পাণ্ডিত্য রপ্ত করা সম্ভব, স্টিভেনসন এর উন্নত দৃষ্টান্ত। স্টিভেনসনের মুখ থেকে শোনা গেল, আজ অব্দি ফার্স্ট ফোলিওর ২৩৫, মতান্তরে ২৩২ কপি পৃথিবীর নানা জায়গায় টিকে আছে বলে দাবি করা হয়, যদিও এমন তথ্যে স্টিভেনসনের আস্থা নেই। কেন নেই জিগ্যেস করতে তার অনাস্থার কারণ ব্যাখ্যা না করে ঘাড় ঝাঁকাল, আনমনা ভঙ্গিতে বলল, অসম্ভব, ইট কান্ট বি। একটু পর গলা নামিয়ে বলল, ১০-১২ কপি থাকলে থাকতে পারে। হালকা চালে জিগ্যেস করলাম, দরদাম কেমন ওঠে, নিলামে উঠেছিল কখনো? স্টিভেনসন মুখে তেমন কোনো ভাবান্তর না এনে জানাল, বছর কয়েক আগে এই ফোলিওটাকেই উঠানো হয়েছিল, সর্বোচ্চ সাড়ে ৬ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, এটা একটা দাম হলো! অবশ্য ২০-২৫ মিলিয়ন উঠলেও বিক্রি তো আর হতো না। জানেই যখন বিক্রি হবে না, ১-২ বিলিয়ন হাঁকলে ক্ষতি কী হতো!

২.

ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে আছে অনুবাদ কর্মশালা (ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সলেশন ওয়ার্কশপ)। প্রতি বছর এ কর্মশালার মাধ্যমে বেশকিছু লেখালেখির ইংরেজি অনুবাদ হয়ে থাকে। লেখাগুলো অবশ্যই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণকারী লেখকদের। আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীরা তাদের কারিকুলামের অংশ হিসেবে অনুবাদ কর্মশালায় যোগ দিয়ে থাকে এবং যে যতটা করে, তা কোর্স ক্রেডিটে যোগ হয়। আমার ধারণা ছিল অনুবাদে ফরাসি, জার্মান ও স্প্যানিশ লেখকদের রচনা প্রাধান্য পাবে।

বাস্তবে দেখা গেল, মাত্র একজন ফরাসি ঔপন্যাসিক ও একজন স্প্যানিশ নাট্যকারের লেখার অনুবাদক জুটল। অনুবাদে মূল ঝোঁকটা অন্য জায়গায়, আর তা আরবি থেকে ইংরেজিতে। আমাদের সঙ্গী মিসরের আলখামাচ্চি, ইরাকের মোর্তাজা ধার, ইসরায়েলের ওডে বিসারাতকে নিয়ে রীতিমতো টানাটানি। ইরাকের মোর্তাজার জন্য এ এক মধুর বিপদ। চার-চারজন দাঁড়িয়ে গেল তাকে ঘিরে, সবাই তাকে চায়, মানে তার লেখা করতে চায়। ঘটনা কি? ক্লারা নামে যে মেয়েটা অন্যদের চেয়ে বেশি আগ্রহী, তার কাছে এক ফাঁকে জানতে চাইলাম মোর্তাজার লেখার প্রতি তার এত আকর্ষণের কারণ কি শুধুই লেখা, না অন্য কিছু— ওতো ন্যাড়া মাথা, তার ওপর তোমার চেয়ে অন্তত ১ ফুট বেঁটে, তার ওপর ইংরেজি প্রায় বলতেই পারে না, অনুবাদের কাজ যদি পাও, যোগাযোগটা কি সাইন ল্যাংগুয়েজে করবে? হেসে জবাব যা দিল তা কিন্তু সাইন ল্যাংগুয়েজে। বুড়ো আর কড়ে আঙুল খুব কাছাকাছি এনে বোঝালো লেখাগুলো ছোট-ছোট, মানে তার ধারণা খুব একটা ঝামেলা ছাড়াই করা যাবে। মোর্তাজা ফ্লাস ফিকশন লেখে, একেকটা লেখা বড়জোর এক পৃষ্ঠা, নিজে সে ভিস্যুয়াল আর্টিস্টও, সেজন্য প্রতিটি লেখার সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে তার আঁকা ছবি।

মোর্তাজার লেখার প্রতি আগ্রহের কারণ না হয় কিছুটা বোঝা গেল (যদিও পরে দেখা গেছে, ছোট ছোট লেখাগুলো নিয়ে চারজনই নাস্তানাবুদ হয়েছে), কিন্তু অনুবাদের ক্ষেত্রে আরবি এত পরাক্রমী হয়ে ওঠার যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা কারো কাছে পাইনি। অবশ্য যুক্তি খোঁজার কোনো মানেও হয় না। বিদ্যানুরাগ ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের পথ ধরেই চলার কথা।

আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক ড্যান ঘানির ধ্যানজ্ঞান বলতে আরবি। জন্ম হাঙ্গেরিতে, অল্প বয়সে মা-বাবার সঙ্গে আমেরিকায় এসেছে, পড়াশোনা করেছে থিওলোজি নিয়ে। তবে ১০ বছর ধরে আরবি ভাষা নিয়ে নিরন্তর সাধনা তাকে পরিণত করেছে প্রাচীন আরবি পাণ্ডুলিপি গবেষক হিসেবে। ঘানি এবার ঝুঁকেছে বাংলার দিকে। মোটামুটি বলতে পারে, অক্ষর চেনে, বানান করে যুক্তাক্ষরহীন বাক্য পড়তেও পারে। তার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা বাংলা নিয়ে পড়াশোনা ও মৌখিক বুলি রপ্ত করতে ঢাকা ও কলকাতায় অন্তত বছরখানেক বাস করা।

মোর্তাজার কথা বলছিলাম। পেশায় প্রকৌশলী মোর্তাজা একাধারে অ্যানিমেশন শিল্পী, ঔপন্যাসিক, ফ্লাস ফিকশন লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার অ্যানিমেশন ছবি আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃতও হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে বোমা-বারুদের বর্বর গন্ধের সঙ্গে মৃত্যুর মিছিল সেই ২০০৩ সাল থেকে। এমন মৃত্যু উপত্যকায় লেখক-শিল্পীর চোখে বাস্তবের চিত্রপট কি কেবলই বিরান দগ্ধ ভূমির সত্কারহীন হাহাকার, না ধ্বংসের তাণ্ডবে বেঁচে থাকার আশ্বাস খোঁজা — জবাব মোটেও সহজ-সরল নয়। বেঁচে থাকা জরুরি এ কথা যত জোরেশোরেই বলি না কেন, নিরন্তর ধ্বংস আর মৃত্যুর সহগামী জীবনে বেঁচে থাকার তৃষ্ণা কতটা আশা-উদ্দীপক বা মৃত্যুকবলিত আকাঙ্ক্ষার কুহকী সঞ্চার তা ধ্বংসের নরককুণ্ডে বসবাসকারীদের চেয়ে কারা ভালো জানবে! মোর্তাজার আবাসস্থল রাজধানী বাগদাদের দক্ষিণে বসরায়, গোলাপের জন্য বিখ্যাত বসরার শিশুরা এখন গোলাপ চেনে ছবি দেখে, যুদ্ধে নিহত মা-বাবাকে চেনে দেয়ালে টাঙানো ছবি হিসেবে। মোর্তাজার খুদে-খুদে গল্পে হাহাকার নেই, আছে বাকরুদ্ধ তিমিরময় শূন্যতা। অনুবাদে অনেক কিছু হারিয়ে যাওয়ার পরও ৩০০-৪০০ শব্দের একেকটা লেখা পড়ার পর মনে হয় সেগুলো শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে। তার একটা গল্পে দুটো শিশু স্কুলের হোমওয়ার্ক না করে রোজ শিক্ষকের টেবিলে খাতা জমা দেয়। শূন্য, সাদা খাতার কারণে শিক্ষকের কাছে প্রতিদিনই তাদের লাঞ্ছনা সইতে হয়। একদিন শিক্ষকের হম্বিতম্বিতে নিতান্ত বাধ্য হয়ে দুজনের একজন জানায় রোজ রাতে হোমওয়ার্ক তারা ঠিকই করে রাখে, দেয়ালের ছবি থেকে দুজনের বাবা নেমে এসে তাদের     সাহায্য করে, কিন্তু সকাল না হতেই বাবা যেই ছবির ফ্রেমে ঢুকে পড়ে, খাতা থেকে হোমওয়ার্ক মুছে যায়।

৩

রাইটিং প্রোগ্রামে দিন যত গড়াচ্ছে লেখকরা ক্রমেই নিজেদের খোলস ছেড়ে যার যার শক্তিমত্তা নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। লেখালেখির জগতে আফ্রিকা, বিশেষত পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকা যে দিন দিন পরাক্রমী হয়ে উঠছে, যারা খোঁজখবর রাখেন, তাদের জন্য এ কোনো নতুন খবর নয়। নাইজেরিয়া, কেনিয়া, সেনেগালের লেখকেরা অনেক দিন ধরেই বিশ্বমহলে আদৃত। ইদানীং গায়ানা, ইথিওপিয়ার লেখকদেরও কদর বাড়ছে। আমাদের দলে রয়েছে দুজন নাইজেরিয়ান, বয়সে অনতি-তরুণ, প্রায় সমবয়সী— ওবারাই গোম্বা ও উকামাকা ওলিসাকে। প্রথমজন কবি, দ্বিতীয়জন ঔপন্যাসিক— যথাক্রমে পুরুষ ও নারী। দুজনকেই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, বিশেষ করে ওবারাইকে, তার বেশকিছু কবিতা শোনার ও পড়ার পর। গায়ানার রুয়েল জনসন ঔপন্যাসিক, শরীরকাঠামোয় যেমন শক্তসমর্থ, তার গদ্যেও রয়েছে শক্তির এক আশ্চর্য মাদক বিচ্ছুরণ। মোটেও অবাক হব না যদি রুয়েল শিগগিরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হুলুস্থুল ফেলে দেয়।

     আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাইটিং প্রোগ্রামে গত ৫০ বছরে ১৪০টি দেশের প্রায় দুই হাজার লেখক অংশ নিয়েছেন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন, অনেকে নিজ নিজ দেশে বিপুল মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, আবার হারিয়েও গিয়েছেন অনেকে। পুলিত্জার, মানবুকার পুরস্কারজয়ীরা যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন নোবেলবিজয়ীও। আশির দশকে ওরহান পামুক এ প্রোগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন। সেসময় তরুণ পামুক নাকি অধিকাংশ সময় লেখালেখি নিয়ে নিজের কামরাবন্দি থাকতেন, কদাচিত্ তাঁকে বাইরে দেখা যেত। যে কারণে পামুকিং শব্দটি এখানে আজো বেশ প্রচলিত। কাউকে যদি এক বেলা দেখা না যায়, ধরে নেয়া হয় সে পামুকিংয়ে ব্যস্ত ছিল।