যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল।

বইটা পড়ি নাই, সিনেমা দেখেছি।

ভালো সিনেমা না মন্দ সিনেমা?

ব্যাপার না। ব্যাপার হলো সিনেমার বা বইয়ের নামটা।

যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল।

আজব।

কারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল?

‘আমি কখনো বৃষ্টিতে ভিজিনি। কখনো ভিজিনি।’

কবি তকি মীর বলে একদিন।

কবি তকি মীর আমাদের বন্ধু। সিনিয়র বন্ধু না, আমাদের বয়সী। ভাটি অঞ্চলের দূর এক পাড়াগাঁ, বড় লিরিক্যাল সেই পাড়াগাঁর নামটা, তরংগিয়া, সেই তরংগিয়া থেকে আট-নয় বছর আগে আমদানি হয়েছে ঢাকা সিটিতে। থাকে পুরান ঢাকার ভেতরবাড়ি লেনে। কবুতরের খুপরির মতো একটা ঘরে সাবলেট। আমরা কেউ কখনো যাইনি বলে সে ঘরের বর্ণনা দিতে পারব না।

ব্যাপার হলো, বাংলা ভাষায় কবিতা লিখেন, এমন কোনো কবি কি আছেন বৃষ্টি শব্দটা যিনি একবারও লিখেননি? আমরা এটা নিয়ে গবেষণা করি এবং আবিষ্কার করি কবি তকি মীরকে। একমাত্র সে-ই, সেই পাষণ্ড কবি, বৃষ্টি শব্দটা একবারও লিখেনি তার কোনো কবিতায়। কেন? ওপেন এয়ার ইন্টারোগেশন সেল বসে একদিন।

‘তোর কবিতায় বৃষ্টি নাই কেন?’

‘নাই। আমি কী করব?’

‘বৃষ্টি নিয়া তুই কোনোদিন একটাও কবিতা লিখিস নাই?’

‘না, লিখি নাই। কখনো লিখব না।’

‘লিখবি না কেন? বৃষ্টি কেউ ছিল?’

‘না।’

‘তাহলে কেন? খুলে বল শুনি।’

‘আমি কখনো বৃষ্টিতে ভিজিনি। কখনো ভিজিনি।’

‘কেন?’

‘আমি আসলে বৃষ্টি ভয় পাই।’

বৃষ্টি ভয় পায়!

আমরা বিস্মিত হতে হতে হই না। কত রকম ফোবিয়া থাকে মানুষের। হতেই পারে। আমি যেমন পানিভরা লাল রঙের বালতিতে সবুজ রঙের মগ ভাসতে দেখলে ভয় পাই। কেন ভয় পাই? আমার একটা লাশ মনে পড়ে যায়। মাঝপুকুরে ভাসছে সবুজ লুঙ্গিপরা লাশ। বিচিত্রমাদারের ফুল ফুটে আছে গাছে। আমাদের মফস্বল শহরের ঘটনা। তেইশ-চব্বিশ বছর আগের। লাল বালতিতে সবুজ ভাসমান মগ, কী করে যে দৃশ্যটার সঙ্গে মিলে যায়। আমি ভয় পাই।

বইপত্রে আমরা আরো নানা রকম পড়েছি। কেউ ফ্লাইওভার পেরোতে ভয় পায়, কেউ আন্ডারপাস পেরোতে ভয় পায়। ফোবিয়া। নামও আছে আবার এইসব বিদঘুটে ফোবিয়ার। বৃষ্টিভীতি কি বিদঘুটে না? নাম কী এই আজব ফোবিয়ার? রেইন ফোবিয়া? না, এত সহজ হবে না। বিদঘুটে ফোবিয়ার নামও বিদঘুটে হয়। আমরা দেখেছি। বৃষ্টিভীতি কী হবে তাহলে? আমরা কেউ বলতে পারি না। কবি তকি মীরও পারে না বলতে।

পরে আমি একদিন কবি তকি মীরকে বলি, ‘তুই মেহতাব আপার কাছে যা একদিন।’

‘মেহতাব আপা?’

‘মেহতাব খানম। মনস্তাত্ত্বিক। টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করেন দেখিস নাই?’

‘আমি তার কাছে কেন যাব?’

‘তোর কিছু একটা সমস্যা আছে অবশ্যই। আপা সল্যুশন দিতে পারবেন। না হলে এটা একটা কাজের কথা হলো? একজন কবি বৃষ্টি ভয় পায়! বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখে নাই কোনো দিন! বৃষ্টি শব্দটাই কখনো লিখে নাই!’

‘সমস্যাটা মনস্তাত্ত্বিক না।’

‘তাহলে কি দেহতাত্ত্বিক?’

বলে আমি হাসি। সেও হাসে।

যেটা সঙ্গত এবং স্বাভাবিক, অতঃপর কবি তকি মীরকে নিয়ে আরো কিছু গবেষণা আমরা করি। আরো যা আবিষ্কার করি অদ্ভুত। আট-নয় বছর ধরে চিনজান কিন্তু কবি তকি মীরকে সত্যি কখনো বৃষ্টিতে ভিজতে দেখে নাই আমাদের কেউ। বিড়ি-সিগারেট টানে কিন্তু চা খেতে দেখে নাই আমাদের কেউ। পানি খেতে দেখে নাই। কিছু খেতে দেখে নাই। অবশ্য আমাদের সঙ্গে কতক্ষণ থাকে সে। দিনের দুই-আড়াই-তিন-চার ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যে একটা মানুষের পানির তৃষ্ণা না পেতেই পারে, চায়ের তৃষ্ণা না পেতেই পারে। আর খেয়েদেয়েই আসে হয়তো। ভাবি কিন্তু ব্যাপারটা আমরা মন থেকে মেনে নিতে পারি না। আমাদের মনে হয়,  অবশ্যই কিছু একটা গড়বড় আছে এসবে। সহজ না অতি জটিল গড়বড়। অতএব এর পরও উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমরা ফলো করে যাই কবি শ্রীমান তকি মীরকে। সে যেদিকে যায়, যাই। কেউ না কেউ অনুগ হয়ে থাকে তার। কিন্তু কাজের কাজ তাতে কিছুই হয় না। আমাদের চোখে সবসময়ই ধুলো দেয় সে। কবি তকি মীর। কোনদিকে যে কোথায় চলে যায়!

শেষে পুরান ঢাকার ভেতরবাড়ি লেনেও আমরা যাই একদিন। শাহবাগ এলাকায় কবি তকি মীরকে পর পর কয়েক দিন উপস্থিত হতে না দেখে। না, ভুল তথ্য সে আমাদের দেয় নাই। ভেতরবাড়ি লেনে সাবলেট থাকে সে, সত্যি। তবে আমরা তাকে পাই না।

মূল ভাড়াটে জবানি দেন, দ্যাশের বাড়ি গেছে মোনে হয়।

‘মোনে’ হয়!

দ্যাশের বাড়ি?

তরংগিয়া?

সেটা কোথায়?

ভাটি অঞ্চলে।

সেটা কোথায়?

সুলুক সন্ধান দিতে পারে না কেউ।

আরো একবার মনে হলো আমাদের, এই যে আমাদের বন্ধু কবি তকি মীর, সে খুবই রহস্যময় একটা চরিত্র। আমরা আরো আবিষ্কার করি আমাদের কারোর মোবাইল ফোনেই তার কোনো ফোন নাম্বার সেভ করা নাই।

মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না সে। আবিষ্কার করি, সে ফেসবুকে নাই। আমাদের কেউ কখনো তাকে নেট ব্রাউজ করতে দেখে নাই।

আজব একটা ছেলে। খুবই আজব। সে ফিরলে আবার আমরা তাকে ধরব। কিন্তু সে কি আর ফিরবে? আমাদের অমূলক সন্দেহ হয় যে, সত্যি তরংগিয়ায় গিয়ে থাকে যদি, সে আর এই ঢাকা সিটিতে ফিরবে না।

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ সত্ত্বেও আমরা বিড়ি-সিগারেট টানি কনসাশলি। এবং আলোচনা করি কনসাশলি।

‘এটা কি সংখ্যালঘু কমপ্লেক্স?’

‘কী? কোনটা?’

‘এই যে সে বৃষ্টি ভয় পায়। এটা কি সংখ্যালঘুতাজনিত কমপ্লেক্স?’

‘আরে না। সংখ্যালঘুরা কি ভিজে না বৃষ্টিতে? এছাড়া সে কি সংখ্যালঘু?’

‘পলিটিক্যালি তাই নয় কি?’

‘তাতে কি? পলিটিক্যালি বৃষ্টি ভয় পায় সে?’

‘তা না। কিন্তু।’

দিন যায়, রাত যায়, আবার দিন যায়। দিনের পর দিন। রাতের পর রাত।

আমরা কোনো সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পারি না। এমত অবস্থায় ফিরে সে একদিন। কবি তকি মীর। আমরা আশ্বস্ত বোধ করি, যাক, আমাদের অমূলক সন্দেহ অমূলকই ছিল তাহলে। সে ফিরে আশ্বিনের এক নীল রঙের বিকালে। আমরা তাকে দেখি এবং শনাক্ত করতে পেরেও ভাবি, সত্যি কি সে?

সে না তো কে?

কবি তকি মীর তার মতো হাসে এবং বলে, ‘কেমন আছিস তোরা?’

‘তুই কোন মুল্লুকে ছিলে এত দিন?’

‘তরংগিয়ায়।’

‘তরংগিয়ায় কি বৃষ্টি হয় না?’

‘হয় তো। কেন হবে না?’

‘তরংগিয়ায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক নাই?’

‘আছে তো। কেন?’

‘তুই কেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করিস না।’

‘আমি কেন বৃষ্টি ভয় পাই, শুনবি?’

‘শুনব। বল।’

‘বৃষ্টি হোক একদিন।’

এ আবার কি রকমের কথা? আমরা তাও সম্মত হই কারণ, আমরা চাই আমাদের এই ফ্যান্টাসি শেষ হোক। আশ্বিন মাসের নীল রঙের আসমান, মেঘলা হয়ে যেতে কতক্ষণ?

 

বৃষ্টি হয়ে গেছে দুদিন আগেও, আশ্বিনে আষাঢ় মাসের বৃষ্টি। ঢাকা সিটি গতকাল দুপুর পর্যন্ত জলাবদ্ধ ছিল। যানজটের অজগর নড়ছিল না। নাকাল অবস্থা নগরবাসীদের। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম— সর্বত্র জলাবদ্ধতা এবং জলাবদ্ধতা। রেডিও ও টিভির টক শোতে জলাবদ্ধতা এবং জলাবদ্ধতা।

আসমান গতকাল বিকাল থেকেই নীল। এই নীল রঙ ধূসর হতে কতক্ষণ? কিংবা কতদিন? বেতফলের মতো ধূসর? আশ্বিনের হঠাত্ বৃষ্টির আকাশ যেমন যেমন ধূসর রঙের হয়?

হয় একদিন। দুপুরের পর। ঘটনাচক্রে আমরা তখন একটা অ্যালিয়েন গাড়িতে। কবি তকি মীর’সহ তিনজন। অ্যালিয়েনটা আমাদের এক ‘ভাই’য়ের। পলিটিক্যাল ভাই। মাঝে মধ্যে এহেন কবিকৃত্য করেন। গাড়ি দেন আমাদের। সিএনজির খরচ বাবদ কিছু দেন। আমরা ঘুরি ভাইয়ের অ্যালিয়েন নিয়ে। দুপুরে করার কিছু থাকে কি? অ্যালিয়েন নিয়ে? আমরা ফ্লাইওভারে চক্কর খাই অযথা। কবি তকি মীর ভাইয়ের গুডবুকে নাই। এখানে নোটা বেনে থাকতে পারে একটা। ভাইয়ের গুডবুকে না থাকাটা বিপজ্জনক একটা ঘটনা। গুডবুক আছে কিন্তু ব্যাডবুক বলে কিছু নাই ভাইয়ের। ব্যাডবুকে থাকার মতো কোনো নামের অস্তিত্ব ভাই বিলং করেন না। তবে ভাই এখন মালয়েশিয়ায়। তার গাড়িতে দেখছেন না কবি তকি মীরকে। ফ্লাইওভারে চক্কর খেতে খেতে নীল আসমান কখন ধূসর হয়ে যায় আমরা কেউ ধরতে পারি না। বৃষ্টি নামে হঠাত্ জানান না দিয়ে। সেই আশ্বিনে আষাঢ়ের বৃষ্টি। জলাবদ্ধ হবে আবার নগরী। জলাবদ্ধতা ঢুকে পড়বে সর্বত্র। সাইবার জগতে এবং টক শোসমূহে।

কবি তকি মীর বলে, ‘গাড়ি রাখ।’

‘কি করবি?’

‘আমি কেন বৃষ্টি ভয় পাই দেখবি।’

অতএব গাড়ি রাখতেই হয়।

ফ্লাইওভারের অন্যান্য লেন দিয়ে দুই-একটা গাড়ি যাচ্ছে এদিকে-ওদিকে। আমাদের গাড়ি আমরা সাইড করে রাখি। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে দেখি কবি তকি মীরকে। কবি তকি মীর শেষ একবার হাসে। বলে, ‘দেখ।’

বলে গাড়ি থেকে নেমে যায় বৃষ্টিতে।

মাথামুণ্ডু কী এসবের?

২-৩ সেকেন্ডের মধ্যে আমরা দেখি, হেঁটে চলে যাচ্ছে কবি তকি মীর। কিন্তু এ কী! তার একটা পা! বৃষ্টি হয়ে গেছে? আরেকটা পা! বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে? তার টরসো? বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। তার মাথা? বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। ১৮-১৯ সেকেন্ডের মধ্যে বৃষ্টি হয়ে যায় কবি তকি মীর। আমরা দেখি। আজব ঘটনা। কিন্তু তাই ঘটে। তরংগিয়ার কবি তকি মীরকে কেউ আর কখনো ঢাকা সিটিতে দেখে নাই। কোথাও দেখে নাই। কানাঘুষা শোনা যায় কিছু এখনো। কী যায় আসে?

আমি এনামুল কবির

পিতা: মোঃ কবির উদ্দিন

সাং: নোয়ারাই, ছাতক

আমি মাসুম বিল্লাহ

পিতা: মো. শাহিদ আলী

সাং: দিকযান, ধরমপাশা

যাহা বলিব সত্য বলিব।

কসম আমরা কবি তকি মীরকে বৃষ্টি হয়ে যেতে দেখেছি।

তাকে হত্যা করা হয়নি।