এলেনা ফেররান্তে— এটা একটা ছদ্মনাম। ১৯৯২ সাল থেকে মূল লেখক ছদ্মনামেই লিখছেন। নিউইয়র্ক টাইমস-এর ‘হতবুদ্ধিকর’ বলে বর্ণনা করা বেস্টসেলিং দ্য ডেইজ অব অ্যাবান্ডোনমেন্ট এবং ট্রাবলিং লাভ ও দ্য লাস্ট ডটারের-এর লেখক তিনি। তাঁর নিওপলিটান উপন্যাস-সিরিজ সমালোচকদের কাছে ‘মাস্টারপিস’ ও ‘একবিংশ শতাব্দীর সত্যিকারের প্রথম ধ্রুপদী সাহিত্য’ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। তার পরও এত দিন এই আলোচিত ইতালীয় লেখিকার মূল পরিচয় পুরো দুনিয়ার কাছে অজানা ছিল। সম্প্রতি ইতালির অনুসন্ধানী সাংবাদিক ক্লদিও গাত্তি এলেনা ফেররান্তে নামটির পেছনের মানুষটির পরিচয় উন্মোচন করেছেন। গাত্তি জানিয়েছেন মূল লেখকের নাম অনিতা রাজা। অনিতা একজন জার্মান অনুবাদক এবং রোমে বসবাস করেন। কিন্তু গাত্তির কর্ম দুনিয়াজুড়ে সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই ফেররান্তের পরিচয় উন্মোচনকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্নকারী কাজ বিবেচনা করে এর নিন্দা জানাচ্ছেন।
নিচের রচনাটি এদিজিওনি ই/ও থেকে লা ফ্রান্তুম্যাগলিয়া শিরোনামে সাক্ষাত্কার ও চিঠির একটি সংকলনে ইতালিতে প্রকাশিত হয়েছে। এসব রচনায় লেখক জনগণের চোখের আড়ালে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর অটল সিদ্ধান্তের কথা, লেখালেখির কৌশল সম্পর্কে তাঁর ভাবনা এবং তাঁর ভালো লাগার লেখক ও বই নিয়ে আলোচনা করেছেন। পূর্ণাঙ্গ সংকলনটি ইউরোপা এডিশন থেকে ফ্র্যাগমেন্টস: অন রাইটিং, রিডিং অ্যান্ড অ্যাবসেন্স নামে জানুয়ারি, ২০১৬তে প্রকাশিত হয়েছে।
‘যেকোনো কিছু নিয়ে লিখতেই নিজেকে তৈরি মনে করি।’
প্রিয় সান্দ্রা,
কি ভয়ঙ্কর কাজই না করেছ তুমি: তোমার প্রকাশনা উদ্যোগের বার্ষিকী নিয়ে খুশি মনে একটা কিছু লিখতে রাজি হওয়ার পরই জানতে পারি যে ফরমায়েশি লেখার ঢালটা পিচ্ছিল এবং উতরাইটুকু প্রীতিকরই বটে। এর পর কী?
তো এখন যখন ছিপি খুলিয়েছ, সব জলই কি ড্রেন দিয়ে বেরিয়ে যাবে? এই মুহূর্তে আমি যেকোনো কিছু নিয়েই লিখতে নিজেকে তৈরি মনে করি।
তুমি কি তোমার সদ্য কেনা গাড়ি নিয়ে আনন্দ করার কথা বলবে? কোথাও থেকে আমার প্রথম গাড়িতে চড়ার স্মৃতি খুঁড়ে এনে লাইনের পর লাইন লিখে গাড়ি নিয়ে তোমাকে অভিনন্দন জানিয়ে শেষ করতে পারি। আমাকে কি তোমার বিড়ালটা বাচ্চা দিয়েছে বলে অভিনন্দন জানাতে বলবে? বাবার দেয়া প্রথম বিড়ালটাকে আবার বাঁচিয়ে তুলব, যেটাকে পরে মিউ-মিউ ডাকে বিরক্ত হয়ে সেকোন্দিগ্লিয়ানোর পথে ফেলে এসেছিল। আমাকে আজকের নেপলস নিয়ে লিখতে থাকা তোমার একটা বই নিয়ে আলোচনা লিখতে বলবে? আমি সেই সময় থেকে শুরু করব, যখন আমার মা যে অতিব্যস্ত পড়শিকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পর তার সঙ্গে দেখা হওয়ার ভয়ে ঘরের বাইরে পা ফেলতেই ভীত বোধ করতাম, তার পর একটু একটু করে আজকের দিনে দ্বিগুণ হয়ে আমাদের কাছে এসে হাজির হওয়া ভয়ের কথা তুলতাম, যখন আমাদের পুরনো রাজনীতি এর চেহারায় মাঞ্জা দিচ্ছে আর আমরা জানি না যে নতুন রাজনীতিকে আমাদের সমর্থন দেয়ার কথা সেটাকে কোথায় পাওয়া যাবে। মাকে ভালোবাসার জন্য আমার কি নারীসুলভ চাহিদার কাছে কিছু বিসর্জন দিতে হবে? আমি ছোট থাকতে মা কীভাবে আমার হাত ধরে থাকত সেই কথা বলব: ওখান থেকেই শুরু করব আমি— আসলে, কথাটা ভাবতে গিয়ে, সত্যি কাজটা করতে ভালোই লাগবে আমার। পিছলে দূরে সরে গিয়ে এবড়োখেবড়ো পিচ্ছিল আর বিপজ্জনক পথে হারিয়ে যেতে পারি, এই আশঙ্কায় মায়ের শক্ত করে আমার হাত জাপ্টে ধরে রাখা ত্বকের সঙ্গে ত্বকের দূরবর্তী শিহরণ ধরে রেখেছি আমি: ওর ভীতিটুকু টের পেতাম আমি, ভীত ছিলাম। তার পর এমন একটা পর্যায়ে আমার ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা উপায় বের করতাম, যাতে লুসি ইরিগারে ও লুইসা মুরারোর কথা উল্লেখ করতে পারি। শব্দ শব্দ টেনে আনে: যে কেউই যেকোনো সময় যেকোনো প্রসঙ্গে গতানুগতিক, জাঁকালো, আন্তরিক, আমোদিত সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা পৃষ্ঠা লিখতে পারে, খারাপ বা ভালো, সহজ বা জটিল, তুচ্ছ বা মৌলিক।
তাহলে কী করা যেতে পারে, যাদের আমরা ভালোবাসি, বিশ্বাস করি, তাদের না করে দেব? এটা আমার রাস্তা নয়। সুতরাং আমি এতগুলো বছর ধরে তোমার চালিয়ে যাওয়া মহত্ যুদ্ধের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানোর চেষ্টায় কয়েকটা স্মৃতিচারণমূলক লাইন লিখেছি এবং আজকের দিনে আমি মনে করি, জয় লাভ করা ঢের বেশি কঠিন।
তাহলে আমার বার্তা হচ্ছে: শুভেচ্ছা। আপাতত লেখার জন্য একটা কাঁটা ঝোপই বেছে নিচ্ছি। এর পরের কথা, আমি জানি না। স্মৃতিচারণ, ভাবনা, বৈশ্বিকীকরণের ছবিতে ভাসিয়ে দিতে পারি তোমাকে। এজন্য কী লাগে? আমি আজকের দিনের তরুণসমাজ, টিভির বিভীষিকা, দি গিয়াকোমো, ফ্রান্সেস্কো ইওভাইন, হাইয়ের কৌশল, একটা ছাইদানি নিয়ে লেখার ক্ষমতা আছে বলে মনে করি। চেখভ, মহান চেখভ এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তাঁর গল্পগুলো কীভাবে শুরু হয় জানতে চাইছিলেন তিনি। হাতের কাছে পাওয়া প্রথম জিনিসটাই তুলে নিয়ে— একটা ছাইদানি আসলে— তাকে তিনি বলেছিলেন: এটা দেখতে পাচ্ছেন? আগামীকাল আসবেন। আপনাকে ‘ছাইদানি’ নামে একটা গল্প দেব আমি। চমত্কার একটা গল্প।
কিন্তু কীভাবে আর কখন লেখার জন্য সুযোগটা প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়? জানি না। আমি শুধু জানি যে লেখালেখির একটা বিষণ্নকারী দিক আছে, যখন উপলক্ষের উত্সগুলো দৃশ্যমান থাকে। তখন এমনকি সত্যিকেও কৃত্রিম মনে হতে পারে। তো ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে কাঁটা বা এ ধরনের কোনো কিছু, সাহিত্য বাদে মার্জিনে যোগ করে দেব যে আমার অভিনন্দন বাস্তব ও আন্তরিক।
আবার কথা হবে।
এলেনা।
ছোটবেলায় আমার থাকার অনেকগুলোর বাড়ির একটার পুবমুখী দেয়ালের গায়ে সব ঋতুতেই একটা কাঁটা ঝোপ গজিয়ে থাকত। ফাঁকফোকরে ভরা কর্কশ, নগ্ন দেয়াল ছিল সেটা, প্রতিটি বীজই জমিনের স্পর্শ পেত। কিন্তু বিশেষ করে ওই কাঁটা ঝোপটা দারুণ সূক্ষ্ম রঙ নিয়ে সগর্বে এমনভাবে বেড়ে উঠে ছড়িয়ে পড়েছিল যে সেটা আমার মনের ভেতর জুতসই শক্তি, সুদৃঢ় শক্তির ইমেজ হিসেবে রয়ে গেছে। বাড়িটা আমাদের যে ভাড়া দিয়েছিল সেই কৃষক প্রতি বছরই গাছপালা ছেঁটে ফেলত, কিন্তু অযথা। সে দেয়াল মেরামতের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ওটার গায়ে পলেস্তারার আস্তরণ দিয়ে অসহনীয় নীল রঙ চাপিয়ে দিয়েছিল। কাঁটা ঝোপের শিকড়ের জিতে গিয়ে সহসা দেয়ালের চ্যাপ্টা মসৃণতায় ফাটল ধরানোর জন্য অনেক লম্বা সময় আস্থার সঙ্গে অপেক্ষা করেছিলাম আমি।
আজ আমার প্রকাশককে অভিনন্দন জানানোর একটা উপায় খোঁজার সময় সেটা ঘটেছিল বলেই মনে হচ্ছে। পলেস্তারায় ফাটল ধরেছে, প্রথম চারা নিয়ে নতুন করে বিস্ফোরিত হয়েছিল ঝোপটা। সুতরাং আমি আশা করি যে এদিজিওনি ই.ও পলেস্তারার বিরুদ্ধে, বর্জনের ভেতর দিয়ে ছন্দ সৃষ্টিকারী সকল কিছুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। নাছোড়বান্দার মতো মৌসুমের পর মৌসুম কাঁটা ঝোপের ফুলের মতো বই বের করেই কাজটা করবে সে।
[এদিজিওনি ই/ও’র ১৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে সান্দ্রা ওজজোলাকে লেখা চিঠি। সেপ্টেম্বর ১৯৯৪। চিঠির শেষের অংশটুকু বার্ষিকী ক্যাটালগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।]
‘সাহিত্যকে সত্যিকারের ভালোবাসে এমন কেউ ধর্মবিশ্বাসীর মতো।’
কেমন আছেন?
‘কেমন আছেন?’ দিয়ে শুরু কোনো সাক্ষাত্কার কিছুটা ভীতিকর। আমার কাছে কি কথা আশা করছ তুমি? ‘কেমন’ নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করলে থামতে পারব না কোনোদিনই। তো আমি বলব: মনে হয় ভালোই। আশা করি তুমিও তাই।
এতগুলো বছর পরেও আপনি কি ছায়ায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিশ্চিত?
‘ছায়ায় থেকে যাওয়া’ আমার পছন্দের বুলি নয়। ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যার আভাস দেয় এটা। বলা যেতে পারে ১৫ বছর আগে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্যবাধকতা বোধ না করেই বই বের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত এ নিয়ে দুঃখ হয়নি। কেবল নিজের এবং প্রকাশকের কাছে টেক্সটের সামান্য মূল্য আছে মনে হলেই প্রকাশ করি আমি। তার পর বইটি নিজের মতো এগিয়ে চলে। আর আমি নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য ভিন্ন কিছু বেছে নিই। ব্যস, নিজের স্বভাব বদলানোর কোনো কারণ আমি দেখি না।
আপনার পরিচয় নিয়ে তোলা বিভিন্ন প্রশ্ন সম্পর্কে অনুভূতি কী— আপনি কি আমোদিত, বিরক্ত নাকি ভিন্ন কিছু?
সেসব বৈধ, কিন্তু হীনকারী। যারা পড়তে ভালোবাসে, তাদের কাছে লেখক নেহাতই একটা নাম। শেক্সপিয়ার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। হোমারকে না চিনলেও আমরা হোমারীয় কাব্য ভালোবেসে চলেছি। আর কোনো মেধাবী ব্যক্তি অপেরা, জীবনী, অসাধারণ রচনা, চলচ্চিত্র, গীতিনাট্যে পরিণত করলেই কেবল ফ্লবেয়ার, তলস্তয় আর জয়েস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তা নাহলে তাঁরা কেবল নাম, বলা যায় লেবেল। আমরা শেক্সপিয়ার আর হোমারের জীবনকাহিনী ছাড়াই চলতে পারলে আমার সামান্য ব্যক্তিগত কাহিনীর ব্যাপারে আগ্রহী হতে যাবে কেন কেউ? সাহিত্যকে সত্যিকার অর্থে যে ভালোবাসে, সে ধর্মবিশ্বাসীর মতো। বিশ্বাসী ভালো করেই জানে যে তার কাছে সত্যিকারের যিশু সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান সংস্থায় কিছুই নেই।
আপনার জন্য প্রস্তাবিত বিভিন্ন পরিচয়ের ভেতর [উপন্যাসিক দোমেনিওকা] স্তারনোন, গোফ্রিদো ফোফি [লেখক ফ্যাবিজিও] র্যামনদিনোত— কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করেছে?
কোনোটাই না। আমার কাছে একে তুচ্ছ মিডিয়া গেম বলেই মনে হয়েছে। আমার তাত্পর্যহীন নামকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নামের সঙ্গে মেলানো হয়েছে। উল্টোটা কখনো ঘটে না। আমার বইগুলো কোনো প্রবীণ আর্কাইভিস্ট বা কোনো তরুণ সদ্য চাকরি পাওয়া ব্যাংক কেরানির হাতে লেখা হওয়ার তত্ত্ব দিয়ে একটা পাতা ভরানোর কথা কোনো পত্রিকার মাথায় খেলেনি। তোমাকে কী বলব? আমার শ্রদ্ধার মানুষগুলোকে এভাবে বিরক্ত করা হচ্ছে দেখে আমি খুবই দুঃখিত।
লোকে আপনার উপন্যাস নিয়ে কথা বলার সময় আপনার পরিচয়ের সমস্যা প্রায়ই সাহিত্যিক জিজ্ঞাসাকে আড়াল করে। এটা কি আপনাকে অস্বস্তিতে ভোগায়? কীভাবে সেটা এড়ানো যেতে পারে বলে মনে করেন?
হ্যাঁ, আমাকে অস্বস্তিতে ভোগায়। কিন্তু মিডিয়া যে খোদ সাহিত্য নিয়ে খুব সামান্য বা মোটেই কেয়ার করে না, আমার কাছে একে তারই প্রমাণ বলে মনে হয়। তোমার প্রশ্নগুলোর কথাই ধরা যাক। আমি একটা বই বের করেছি, কিন্তু আমি একেবারে সাধারণ কায়দায় জবাব দেব জানা থাকা সত্ত্বেও গোটা সাক্ষাত্কারকে আমার পরিচয়ের ব্যাপারেই কেন্দ্রীভূত করেছে। এখন পর্যন্ত, যদি বলার সুযোগ দাও, দ্য লাস্ট ডটার-এর বিষয়বস্তু বা এর লেখনী নিয়ে স্পর্শ করার মতো কিছুই নেই। তুমি জিজ্ঞেস করেছ মানুষকে কীভাবে বইকে উপেক্ষা করে কেবল আমি কে সে ব্যাপারে কথা বলা থেকে বিরত রাখা যাবে। আমি জানি না। নিশ্চয়ই তুমিও— আমাকে ক্ষমা করবে— পরিস্থিতি পাল্টে দেয়ার জন্য এবং যাকে সাহিত্যিক প্রশ্ন বলছ, তার মুখোমুখি হতে কিছু করছ না...
আপনার গোপনীয়তা রক্ষার অন্য কারণগুলোর ভেতর একটাকে কি তবু বৈধ বলা যেতে পারে, আপনার উপন্যাসগুলোয় আত্মজৈবনিক ভূমিকার উপস্থিতি নানাভাবে সমন্বিত ও গোপন হলেও শনাক্তযোগ্য বলে?
হ্যাঁ। লেখালেখি করে এমন যে কারো মতোই আমি খুবই ঘনিষ্ঠভাবে আমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ঘটনা, অনুভূতি, আবেগ নিয়ে কাজ করি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সমস্যা বদলে গেছে। আজ আমার কাছে সবার উপরে সেলফসেন্সরশিপ আরোপ না করেই আমার কাহিনীগুলোর গভীরে খোঁড়ার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখাটা জরুরি...
নেপলসের প্রতি সাম্প্রতিককালে কেন্দ্রীভূত মনোযোগ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা? আপনার দৃষ্টিতে এটা কি মিডিয়া অতিরঞ্জন, নাকি অপরাধের চাপই বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে?
এটা মিডিয়ার অতিরঞ্জন। নেপলসের সবসময়ই স্পটলাইটে থাকা উচিত। পতনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এর। এটা ইতালি এবং সম্ভবত ইউরোপের বিভিন্ন সমস্যা আঁচ করতে সক্ষম একটি মেট্রোপোলিস। তো আমাদের কখনই এর দিক থেকে নজর সরে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু মিডিয়া একে ব্যতিক্রমের ওপর টিকিয়ে রেখেছে: খুনখারাবি, আবর্জনার স্তূপ হয়ে থাকা, [রোবার্তো] সাভিয়ানোর একটা চমত্কার বই। বসবাসের অযোগ্যতার দৈনন্দিন মান কোনো খবর নয়। তো ব্যতিক্রম যখন অতিক্রান্ত হয়ে যায়, সবকিছু নীরব হয়ে পড়ে, সবকিছু পচতে থাকে।
আপনি একবার বলেছিলেন নেপলস আপনাকে দারুণ অস্বস্তিতে ফেলে দেয়: একটা সহিংস নগর, আকস্মিক ঝগড়াবিবাদ, মারধরের শহর, অশ্লীল একটা শহর, যেখানে লোকজন উচ্ছৃঙ্খল, বড়াইপ্রবণ ছোটখাটো ব্যাপারে চট করে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। এখনো কি আপনাকে একই অনুভূতি দিচ্ছে এটা?
হ্যাঁ, কিছুই বদলায়নি, কেবল এটা ছাড়া যে, ঐতিহাসিক চরিত্রের কারণে যে জিনিসটা আমার শহর, আমার অঞ্চলের পক্ষে নির্দিষ্ট বলে মনে হয়েছিল, সেটা এখন ইতালির বাকি অংশেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে।
আপনি যত দ্রুত সম্ভব নেপলস থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তার পরও আপনি ‘অস্তিত্বের অন্যায় ধারা জীবনের শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত, অপমানিত হয়েছে কথাটা সবসময় মনে রাখার জন্যে’ একে ধারণ করে গেছেন। আপনি কি কখনো ফিরে গেছেন? আপনি কি আবার ওখানে বাস করবেন?
সময়ে সময়ে ফিরে গেছি। থাকার ব্যাপারে বলতে পারছি না। পরিবর্তন বাগাড়ম্বরসুলভ কৌশল নয়, বরং সত্যিকারের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব বুঝতে পারলে যেতেও পারি।
[৪ঠা ডিসেম্বর ২০০৬ তারিখে লা রিপাবলিকায় প্রকাশিত ‘লো, স্ক্রিতত্রিসে সেনসা ভোলতো’ (আমি, অবয়বহীন লেখক’) শিরোনামে ফ্রান্সেস্কো এরবানির সঙ্গে সাক্ষাত্কার থেকে।]
‘আমি কর্মে নিয়োজিত নারী দেহের দিকে মনোযোগ দেয়া সবকিছুতেই আগ্রহী।’
প্রিয় সান্দ্রা,
তোমার কাছে একটা ব্যাখ্যা দেয়ার আছে। তোমাকে যে টেক্সটা পাঠানোর কথা দিয়েছিলাম, সেটা তোমার কাছে পৌঁছাবে না। দেখতে পাচ্ছি এরই মধ্যেই শিরোনামের খোঁজ করছ তুমি (কর্মজীবী নারী আমার পছন্দ; তবে নারী কর্মী বাতিল করে দেব), কিন্তু মত পাল্টেছি আমি; গল্পটা এখন আর পড়ার মতো হয়নি বলে মনে হচ্ছে। গত সপ্তাহে আমি নিজেই বমির ভাব বোধ না করে একটা লাইনও পড়তে পারিনি। প্রশান্তভাবে আবার এটার কাছে ফিরে কী করা যেতে পারে বুঝতে সময় লাগবে। তবে আমি মনস্থির করামাত্রই জানাব তোমাকে।
আমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণেই গল্পটা লিখেছি। দীর্ঘ সময় ধরে ওটার ভেতরে ছিলাম আমি।
এখন আবার দোষটা তোমার ভাবতে যেয়ো না। চাপ দিয়ে ঠিকই করেছ তুমি। এতগুলো বছর ধরে তোমাকে একটা কিছু পড়তে দেয়ার জন্য চাপাচাপি করার পরই বিপুল উত্সাহে লিখতে শুরু করেছি। অন্তত একজন হলেও— তুমি— আমার নতুন বইয়ের অপেক্ষা করছে জেনে আনন্দিত হয়েছি। সম্ভবত এবার তোমার কাছে বইয়ের বিষয়বস্তুর সারাংশ জোগানো ভুল ছিল। তোমার সম্পাদকসুলভ হতাশা নিশ্চয় আঁচ করতে পেরেছিলাম আমি, কিংবা পাণ্ডুলিপির দৈর্ঘ্য নিয়ে উদ্বেগ বোধ করেছি— তুমি সবসময় বলেছ যে অ্যাডভেঞ্চার থ্রিলার বাদে যেসব বই অনেক বড়, সেগুলো পাঠকদের দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু, ব্যাপারটা এমন কিছু ধরে নিলেও আমার কথা না রাখার সিদ্ধান্তের অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে। আমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণেই গল্পটা লিখেছি। দীর্ঘ সময় ওটার ভেতরে ছিলাম আমি। মূল চরিত্র ও নিজের মাঝের দূরত্ব ক্রমাগত কমিয়ে এনেছি, আমি তার সব গহ্বর অধিকার করে নিয়েছি এবং আজ তার এমন কিছু নেই, যেটা আমি করব না। তো আমি ক্লান্ত, এখন এটা শেষ হয়ে যাওয়ায় আমাকে শক্তি ফিরে পেতে হবে। কীভাবে? জানি না, হয়তো নতুন একটা বইয়ের কাজ শুরু করে। কিংবা এই বিষয়ের ওপর যতগুলো সম্ভব বই পড়ে, যাতে এর কাছাকাছি, সাইডলাইনে থাকতে পারি আর কেক বেক হয়েছে কিনা দেখতে যেমনটা করে কেউ, খিলাল দিয়ে খোঁচায়, তেমনিভাবে শেষ হয়েছে কিনা দেখতে টেক্সট পরখ করে। লেখালেখিকে এখন দীর্ঘ, ক্লান্তিকর, প্রীতিকর আকর্ষণ বলে মনে হয়। তুমি যে গল্পগুলো বলো, যেসব শব্দ ব্যবহার করো, যেগুলো নিয়ে খেলো, যেসব চরিত্রকে প্রাণ দেয়ার চেষ্টা করো, সেগুলো কেবল তোমার নামহীন, আকারহীন অধরা জিনিসের চারপাশে ঘুরে বেড়ানোর উপায় মাত্র, যা কেবল তোমারই মালিকানায় থাকে এবং সব দরজার এক ধরনের চাবির মতো, তোমার জীবনের বেশির ভাগ সময় টেবিলে বসে একের পর এক চাবি টিপে পাতার পর পাতা ভরিয়ে তোলার মূল কারণ। প্রতিটি গল্পের প্রশ্নটা সবসময় এমন: আমার ভেতরে নীরবে পড়ে থাকা এটাই কি বেছে নেয়ার পক্ষে সঠিক গল্প, যে জীবন্ত জিনিসটিকে ধরলে সব পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে গিয়ে সেগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলবে? উত্তরটা অনিশ্চিত, এমনকি যখন কেউ গল্পের শেষে পৌঁছায় তখনো। প্রায়ই লড়াই আর আনন্দ শেষে পৃষ্ঠাগুলোয় কিছুই থাকে না— ঘটনাপ্রবাহ, সংলাপ, নাটকীয় বাঁক, স্রেফ এটা— আর নিজেরই হতাশায় সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ো তুমি।
আমার বেলায় ব্যাপারটা এভাবে ঘটে: প্রথমে আমি সংগ্রাম করি, শুরু করাটাই কঠিন, কোনো সূচনাই আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকে না; তার পর গল্পের শুরু হয়, কিংবা এরই মধ্যে লেখা টুকরোটাকরাগুলো শক্তি লাভ করে সহসা একসঙ্গে মিলে যাওয়ার উপায় পেয়ে যায়; তার পর লেখাটা পরিণত হয় আনন্দে, তীব্র সুখের সময়ে পরিণত হয় ঘণ্টাগুলো, চরিত্রগুলো আর তোমাকে ছেড়ে যায় না, তাদের নিজস্ব স্থান-কাল তৈরি হয় যেখানে তারা সজীব আর ক্রমেই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, তারা তোমার ভেতরে আর বাইরে থাকে, নিরেট হয়ে রাস্তায়, বাড়িতে, ঘটনা যেখানে রূপ লাভ করবে সেসব জায়গায় থাকে; গল্পের হাজার হাজার সম্ভাবনা নিজেরাই নির্বাচিত হয় আর সিদ্ধান্তগুলো অনিবার্য, নিশ্চিত বলে মনে হয়। প্রতিদিন তুমি শক্তি ফিরে পেতে পড়ার ভেতর দিয়ে কাজ শুরু করো এবং গল্পের ভবিষ্যতের সঙ্গে মানানসই করে তুলতে, অতীতকে নিখুঁত, সমৃদ্ধ করে তুলতে নতুন করে পাড়াটা আনন্দের। তার পর এই সুখের কাল ফুরিয়ে আসে। গল্পটা শেষ হয়। তুমি আর গত দিনের গল্প নয়, বরং পুরোটা পড়ো। সন্ত্রস্ত থাকো তুমি। তোমার পরীক্ষা সামনেই, যেমনটা ভেবেছিলে সেভাবে কিছুই লেখা হয়নি। সূচনা তাত্পর্যহীন, বিকাশটুকু মনে হচ্ছে আনাড়ি, ভাষার ধরন অপর্যাপ্ত। এমন একটা মুহূর্তে দরকার ঘুম, বইটাকে জায়গা দিতে একটা ভিত্তি স্থির করার জন্য আর আসলে ওটা কি সারবস্তু তৈরি করেছে বুঝতে।
এখন আমি ঠিক সেই কষ্টকর মুহূর্তে পৌঁছেছি। সুতরাং পারলে আমাকে সাহায্য করো। যেসব উপন্যাস কোনো অলস বৈরী আর কখনো কখনো হিংস্র দৃষ্টির বিকারগ্রস্তের মতো পর্যবেক্ষণ করা নারীদের কাজের কথা বলে, সেগুলো সম্পর্কে কি জানো? আছে কোনো কিছু? আমি কর্মে নিয়োজিত নারী দেহের দিকে মনোযোগ দেয়া সবকিছুতেই আগ্রহী। তোমার মনে কোনো শিরোনাম থাকলে— ভালো বা মন্দ বই হলে কোনো সমস্যা নেই— আমাকে লিখো। কাজ পুরুষকে মহান করে কিনা তাতে আমার সন্দেহ আছে, আর নারীকে মহান করার ব্যাপারটা সরসারি করে নাকচ করে দিই। সুতরাং উপন্যাস কাজের কষ্টকর দিকের ওপর, জীবিকা অর্জনের প্রয়োজনীয়তায় লুকিয়ে থাকা ভীতির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, খোদ ঘৃণিত একটা অভিব্যক্তি। কিন্তু ভেবো না: তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, যদিও কেবল নিজে করেছি বলে গভীরভাবে পরিচিত সব কাজই নয়, বরং আমার সুপরিচিত ও বিশ্বস্ত লোকদের কল্যাণে যেসব কাজ সম্পর্কে জানি, সেগুলোও ব্যবহার করেছি। আমি নারীদের কাজ নিয়ে কোনো অনুসন্ধানী রচনা লিখিনি: গল্পের প্রচুর টেনশন আছে, সব ধরনের ব্যাপার ঘটছে। কিন্তু পরিণামের বেলায় কী বলতে হবে সত্যিই জানি না। এখন বইটা আমার কাছে শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হওয়ায় নিজেকে শান্ত করার কারণ খুঁজে পেতে হবে। শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ প্রশান্তিতে উপন্যাসটা পড়া যাবে কি যাবে না, কিংবা প্রকাশ করা যাবে, নাকি আমার লেখার অনুশীলনীতে যোগ হবে, সেটা বলতে পারব তোমাকে। শেষের ক্ষেত্রে তোমাকে ফের হতাশ করার জন্য যারপরনাই দুঃখ পাব আমি। অন্যদিকে আমি বিশ্বাস করি যে, যারা লিখতে ভালোবাসে, লেখার পেছনে দেয়া সময় কখনই নষ্ট হয় না। এবং এক বই থেকে আরেক বইয়ের ভেতর দিয়েই কি কেউ আমরা সত্যিকার অর্থে যে বইটি লিখতে চাই, সেটার দিকে অগ্রসর হই না?
আবার কথা হবে
এলেনা
[সান্দ্রা ওজজোলাকে লেখা চিঠি থেকে। এখানে উল্লিখিত উপন্যাসটি কখনই প্রকাশকের হাতে তুলে দেয়া হয়নি।]
ভাষান্তর: শওকত হোসেন





