সৈয়দ শামসুল হক একজন বহুমাত্রিক এবং উর্বর লেখক। বয়স ত্রিশের কোটায় পৌঁছাতে পৌঁছাতেই তার লেখা বইয়ের সংখ্যার বিপুলতা বিস্ময় জাগায়। আরো অবাক করার বিষয় হচ্ছে, তিনি সাহিত্যের কোনো শাখাকেই অবহেলা করেননি। এখন আমরা তাকে দেখি সিনেমার চিত্রনাট্য, সংলাপ লিখতে। এখন তিনি নাটক লিখছেন, এর পর কবিতা নিয়ে স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যাবেন। এসব মাধ্যমের কোনটিতে তিনি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন, নাকি কোনোটাতেই করেননি— সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়াটা কঠিন। কবিতা নিয়ে আমি এখনো কথা বলিনি। কারণ আমার মতে, এক্ষেত্রেই তিনি সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দ। এটা আমি বলছি এবং আমি এটাও নিশ্চিত যে, বেশির ভাগ মানুষই তাকে কবি হিসেবে সেরা মনে করেন। সবে ত্রিশের কোটায় পৌঁছেই তার সৃষ্ট কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটকের সংখ্যা ঈর্ষণীয়। তার পরও আমার মনে হয়, অন্য সব ক্ষেত্রকে বাদ দিয়ে সৈয়দ শামসুল হককে একটি ক্ষেত্র বেছে নিতে হবে। তবে এজন্য যে তাকে সবকিছুকে বিদায় করতে হবে, এমনটাও নয়। কারণ সেটা করলেও তার লেখার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানমূলকই হবে। এ অনুসন্ধানই তার লেখার উদ্দেশ্য। সম্ভবত এটা একটা কারণ যে, কেন বহুমুখী প্রতিভা থাকার পরও সৈয়দ শামসুল হক খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি, বিশেষত তার মতো এতগুলো বই লেখার পর যা কোনো লেখকের অধিকার হয়ে পড়ে। আমার মনে হয়, কবিতাই শামসুল হকের পথ। এটা আমি তার এযাবত্ লেখা কবিতার বিশ্লেষণ থেকে বলছি না, বরং কবিতায় তিনি যে প্রতিশ্রুতি রেখেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে বলছি। আমি তার দুটি উপন্যাস পড়েছি, কিন্তু এগুলো আমাকে আনন্দ দিয়েছে তেমনটা বলতে পারছি না। উপন্যাসগুলোয় মনে হয়েছে, তিনি বইয়ের পাতায় দুনিয়াকে দেখেছেন।
পরিস্থিতি
সৈয়দ শামসুল হক যে পরিস্থিতি তৈরি করেন, তা হলো আবছায়া। চরিত্রগুলোকে নিয়ে তিনি খেলা করেন, আর তখন পাঠকরা সেই চরিত্রের প্রকৃত বাস্তব চেহারাকে খুঁজে পেতে চান। পাঠকরা পরিচিত মুখ খোঁজেন, যে চেহারাগুলো অন্তত সে চিনতে পারে কিন্তু তারা শুধু চরিত্রগুলোর ছায়া দেখতে পান, চরিত্রগুলোকে খুঁজে পান না। তার অপ্রকৃত চরিত্রগুলো সম্পর্কে এটাই আমার পর্যবেক্ষণ।
যাই দেখেন, সেটাকেই রোমান্টিসাইজ করার একটি প্রবণতা আছে সৈয়দ শামসুল হকের। তিনি তার চারপাশের প্রতিদিনকার জীবনের নিস্তেজ আর মলিনতায় কোনো সৌন্দর্য কখনই খুঁজে পান না, যদিও একজন সূক্ষ্ম বোধের লেখকের কাছে এ মলিনতা নিয়ে অনেক কিছু করার থাকে। এভাবে সৈয়দ শামসুল হক সব সময় নিজের বিশ্বাস থেকে একটি জগত্ নির্মাণ করেন। কিন্তু এ জগত্ তার তৈরি করা সমস্যা ধারণ করতে অক্ষম, তেমনি এটি তার মধ্যে কোনো সত্যিকার বিশ্বাসকেও বিকশিত করে না।
উদাহরণস্বরূপ তার নতুন উপন্যাস ‘অনুপম দিন’র কথাই ধরা যাক। কাহিনীতে কোথাও পরিষ্কার করা হয়নি যে বড় ভাই হাশেম কেন ভবঘুরে প্রকৃতির। তার ফেলে রেখে যাওয়া প্রেমপত্রগুলো নায়িকা বীথি খুঁজে পায়। চিঠিগুলো থেকে বোঝা যায়, হাশেম কয়েকজন রহস্যময় মেয়ের প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু হাশেম যখন ফিরে আসে তখন আমরা দেখি যে, সে সমগ্র মানবতার ক্ষত প্রশমনে ঘর ছেড়েছিল। হাশেম সব সময়ই কথা বলছে— কখনো সুস্থ স্বাভাবিকভাবে, আবার কখনো চিত্তবিভ্রমের প্রলাপে। এ দুই অবস্থায় হাশেমের বলা কথার মধ্যে পাঠক কোনো তফাত খুঁজে পাবেন না। দুই ক্ষেত্রেই কথাগুলো একই রকম এবং অন্তঃসারশূন্য। এভাবে একটি অসামান্য চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি কেবল মূল্যহীন বিরক্তিরই উত্পাদন করেছেন। ছোট ভাই আবুর কথা বলা হয়েছে, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আবুর বন্ধু, গার্লফ্রেন্ডরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কিন্তু লেখক যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে চিত্রিত করেছেন, তাতে মনে হয় না সেখানে পড়াশোনা বলে কোনো বিষয় আছে।
একমাত্র যে চরিত্রটি আমাদের দুনিয়ার মতো, তিনি হলেন মা মরিয়ম। লেখক সব সময় ব্যস্ত ছিলেন তার মূল চরিত্র নির্মাণে। মা তার কাছে খুব সামান্য মনোযোগ পেয়েছে, চরিত্রটি উপজাতের মতো বিকশিত হয়েছে। আর ঠিক এ কারণেই চরিত্রটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রাণবন্তভাবে বিকশিত হয়েছে।
সৈয়দ শামসুল হকের আরেকটি সাম্প্রতিক উপন্যাস হচ্ছে ‘একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস’, যা একটি সাপ্তাহিকের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। আমি লেখকের অনায়াস গল্প বলায় মুগ্ধ। গল্পটার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু শেষমেশ গল্পের বয়ানই ভালো ছিল, গল্পটা নয়। এখানে লেখকের ভাষা এবং স্টাইলও আমার পছন্দ হয়েছে। সবগুলো চরিত্রের নির্মাণ ভালো হয়েছে। তারা স্বল্পসময়ের জন্য মঞ্চে হাজির হয়েছে এবং নিজেদের চরিত্রকে ভালোভাবেই উপস্থাপন করেছে। এটা একটা মিষ্টি প্রেমের গল্প হতে পারত, কিন্তু নাটকীয়তা সৃষ্টি করতে গিয়ে সৈয়দ শামসুল হক সব নষ্ট করেছেন। নায়ক নিসার আলী পাঠকদের কাছে একজন প্রেমিক হিসেবেই ধরা দিয়েছিলেন। তার সামান্য সুযোগ নেয়া, প্রেমের অভিযানে ছিল সরলতা। গল্প যত এগিয়েছে প্রেমের উত্তাল সে াত এক দুর্নিবার আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। পাঠকরা কখনই অনুমান করতে পারেননি যে, নায়ক তার ছোট ভাইয়ের হত্যাকারীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গোপনে দৃঢ়সংকল্প করছিলেন। নিসারকে কখনই মনে কোনো গোপন প্রতিশোধস্পৃহা লুকিয়ে রাখার মানুষ মনে হয়নি। নিজের ছোট ভাইয়ের হত্যাকারী বলে যে ব্যক্তিকে সন্দেহ করত, তাকে সে হত্যা করে। এর পর তার গন্তব্য কারাগার। নায়কের এ কারাবরণ শুধু গল্পের সমাপ্তিই নির্দেশ করেনি, বরং একই সঙ্গে গল্পের সব শৈল্পিক সম্ভাবনাকেও হত্যা করেছে। সৈয়দ শামসুল হকের শ্রেষ্ঠ গল্প ‘রক্ত গোলাপ’। এ গল্পেও লেখক তার চরিত্র নির্মাণের ক্ষমতাকে প্রকাশ করেছেন। গল্পের সব চরিত্রই খুব সাধারণ মানুষ। এমনকি গল্পের খলনায়কও তার শয়তানিতে খুব সরল। এটা লক্ষণীয় যে, সৈয়দ শামসুল হক তার সব সাফল্য পেয়েছেন যখন তিনি সাধারণ মানুষদের নিয়ে কাজ করেছেন। তার কাল্পনিক বুদ্ধিজীবীদের চরিত্রায়ন খুব সুবিধার হয়নি।
অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব





