নির্বাসনে যাচ্ছেন রাম। সঙ্গে সীতা। তাদের বিদায় দিতে অযোধ্যার নাগরিকরা রাজপ্রাসাদের সামনে ভিড় জমিয়েছে। রাম সীতাকে ঘুঙ্গট সরাতে বললেন। জড়ো হওয়া প্রজারা যেন জঙ্গলে নির্বাসনে যাওয়ার আগে তাকে এক নজর দেখতে পায়।
বাল্মীকি মুনির মহাকাব্য রামায়ণে এ ঘটনার উল্লেখ আছে। রামের আদেশে ঘুঙ্গট সরানোর পর সীতা পুনরায় মুখমণ্ডল আবৃত করেছিলেন কিনা, তার উল্লেখ রামায়ণে আর নেই। সীতার ঘুঙ্গট সরানোর ঘটনায় বাল্মীকি অনুতাপ করে লিখেছিলেন, ‘যাকে দেবতারাও কখনো দেখেননি, সেই নারীর চেহারা এখন সবাই দেখছে।’ বাল্মীকির এ উক্তি থেকে বোঝা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় নারীদের মাঝে পর্দাপ্রথা প্রচলিত ছিল। আর তাদের পর্দার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল ঘুঙ্গট।
রামায়ণের শেষাংশে আরেকটি ঘটনায় ঘুঙ্গটের উল্লেখ আছে। রাবণ মারা গেছেন। তার রানীরা শোকে বিলাপ করতে করতে ঘুঙ্গট ছাড়াই অন্দরমহল থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন। তখন রাবণের প্রধান মহিষী মন্দোদরী স্বামীর মৃতদেহের পাশে বসে মাতম করে বলতে লাগলেন, ‘কেন তুমি রাগ করছ না? আমি ঘুঙ্গট ছাড়াই বেরিয়ে এসেছি। তুমি কেন আমাকে বাধা দিচ্ছ না? তোমার স্ত্রীরা ঘুঙ্গট খুলে ফেলেছে। তুমি তাদের নিষেধ করবে না? তারা সবাই বাইরে চলে এসেছে। তা দেখেও কি তোমার রাগ হচ্ছে না?’
মহাকবি কালিদাস রচিত ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’ কাব্যেও ঘুঙ্গটের উল্লেখ আছে। রাজা দুষ্মন্তের প্রাসাদে এসে হাজির এক নারী। তার চেহারা দেখা যায় না। ঘুঙ্গটে ঢাকা। রাজা তাই তাকে চিনতে পারেন না। প্রশ্ন করেন, ‘ঘুঙ্গটে আবৃতা কে এই নারী?’ এমনকি তিনি তার দিকে তাকাতেও অস্বীকৃতি জানান। তার ভাষায়, ‘পরস্ত্রীর দিকে তাকানো সমীচীন নয়।’ রাজা দুষ্মন্ত তখনো জানেন না, তার সামনে দাঁড়ানো নারীটি আর কেউ নন, স্বয়ং শকুন্তলা! স্বামীর কাছে এসেছেন স্ত্রীর মর্যাদা ফিরে পেতে।
রামায়ণ ও অভিজ্ঞানশকুন্তলমের গল্প বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলোর পূর্বাপর জানতে আগ্রহীরা সেগুলো পড়ে দেখতে পারেন। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষে ঘুঙ্গটের ব্যবহার প্রচলিত থাকার রেফারেন্স হিসেবে এসব ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে ঘুঙ্গট ছিল বিবাহিত নারীদের ভূষণ এবং সম্মানের প্রতীক।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে কোনো একটি সময়ে বর্তমান ছিলেন নাট্যকার শূদ্রক। তার রচিত বিখ্যাত নাটক মৃচ্ছকটিক। সেখানে তিনি এমন কিছু নারীর কথা উল্লেখ করেছেন, যারা ঘুঙ্গট পরিধান করত। তবে তারা সবসময় ঘুঙ্গট পরত না। বিয়ে, বিশেষ অনুষ্ঠান কিংবা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সময় তারা ঘুঙ্গটে নিজেদের মাথা ও চেহারা ঢেকে নিতেন। শূদ্রক লক্ষ করেন যে বাইরে যাওয়ার সময় বিবাহিত নারীদের ঘোমটা পরা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে এমন কোনো রীতি ছিল কিনা, তা জানা যায় না। তবে মৃচ্ছকটিক থেকে ঘুঙ্গট সম্পর্কিত আরেকটি মজার তথ্য জানা যায়। এ নাটকের একটি চরিত্র বসন্তসেনা। সে গণিকা। এক ধনী শেঠ তাকে রক্ষিতা হিসেবে রাখতে চান। বসন্তসেনার মাকে তিনি অনেক অলংকার দেন। বসন্তসেনার মা সেসব অলংকারে মেয়েকে সাজিয়ে একজন পরিচারিকাসহ শেঠের কাছে পাঠানোর সময় তাকে ঘুঙ্গট পরতে বলেন। এ থেকে বোঝা যায়, যদি কোনো গণিকাকে কেউ নিজের রক্ষিতা হিসেবে গ্রহণ করতেন, তখন তাকেও বিবাহিত নারীদের মতো ঘুঙ্গটে মাথা ও মুখ ঢাকতে হতো। তাছাড়া প্রতিমানাটক, দশকুমারচরিত, কথাসরিৎসাগর ইত্যাদি প্রাচীন সংস্কৃত নাটকেও নারীদের ঘুঙ্গট পরিধানের প্রমাণ মেলে।
ঘুঙ্গট, ঘুঙ্গটা, ঘোমটা, ওড়নি, ওড়ানি, লাজ, চুনারি একই পরিচ্ছদ। কিন্তু একেক জায়গায় একেক নামে পরিচিত। বাংলায় তা ঘোমটা নামেই জনপ্রিয়। তবে ঘুঙ্গট শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘অবগুণ্ঠন’ থেকে। এর অর্থ পর্দা, চাদর, ঢেকে রাখা ইত্যাদি। প্রাকৃত শব্দ ‘অগুণ্ঠেটি’ থেকেও এর উদ্ভব বলে অনেকে মনে করেন। মূল শব্দ যেটিই হোক না কেন, অর্থের ক্ষেত্রে কোনো তফাত কিন্তু নেই। সাধারণত শাড়ির আঁচল মাথার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে মুখ পর্যন্ত টেনে দেয়াটাই ঘুঙ্গট বা বাংলায় ঘোমটা নামে পরিচিত। অনেক সময় দোপাট্টা কিংবা ওড়নার মতো আলাদা বস্ত্রখণ্ডও ঘুঙ্গট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেভাবেই হোক না কেন, কোনো আচ্ছাদন দিয়ে মাথা ও মুখ ঢাকলে তা ঘুঙ্গট নামে পরিচিত। সংস্কৃত সাহিত্যে ঘুঙ্গটের বহুল উল্লেখ আছে। প্রধানত ভারতবর্ষের বিবাহিতা হিন্দু, জৈন ও শিখ নারীদের মধ্যে এর ব্যবহার প্রচলিত ছিল। ঘুঙ্গট ছাড়াও প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতীয় নারীদের বিভিন্ন ধরনের পর্দার কথা জানা যায়। কাঁধ ঢাকার জন্য উত্তরীয়, গলা আবৃত করার জন্য অধিকণ্ঠ পট, মাথা ঢাকার জন্য শিরবস্ত্র ইত্যাদি পর্দার প্রচলন ছিল। তবে হিন্দু নারীদের মধ্যে ঘুঙ্গটের প্রচলন বর্তমানে অনেক কমে গেছে। তা সত্ত্বেও হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশ, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, বিহার, সিন্ধু ও পাঞ্জাবে দৈনন্দিন পোশাকের অংশ হিসেবে ঘুঙ্গট অদ্যাবধি স্বমহিমায় টিকে আছে।
বিবাহিতা নারীরা যে ঘুঙ্গট পরিধান করে, তা ‘লাজ’ নামেও পরিচিত। অর্থাৎ ঘুঙ্গট পরিধানের মাধ্যমে নারী তার শালীনতা, লজ্জা ও সম্মান বজায় রাখে। ‘লাজ’ ও ‘অবগুণ্ঠন’-এর সমন্বয়ে একটি শব্দ ‘লজ্জাবগুণ্ঠন’। রামায়ণে এ শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। ঘুঙ্গটের সমার্থক হিসেবেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিয়ের সময় কনেকে একধরনের পর্দায় নিজেকে ঢেকে রাখতে হতো। কনের অভিভাবক এ পর্দার ব্যবস্থা করতেন। শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর শাশুড়ি ঘুঙ্গট দিয়ে নববধূর মাথা ও মুখ ঢেকে দিতেন। বিয়ের পর ‘মুখ দেখানো’ নামে একটি অনুষ্ঠান হতো। এর মাধ্যমে কনেকে শ্বশুরবাড়ির সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো। প্রত্যেক সদস্য নববধূর ঘুঙ্গট তুলে তার চেহারা দেখত। তারপর কোনো একটি উপহার দিয়ে তাকে আশীর্বাদ করত। এ অনুষ্ঠানের পর কয়েক মাস তাকে ঘুঙ্গট পরে থাকতে হতো, যতদিন না তার শ্বশুর তাকে ঘুঙ্গট খোলার অনুমতি দিতেন। এখনো অনেক জায়গায় এ রীতির প্রচলন আছে।
আগেই বলেছি, ঘুঙ্গট ছিল বিবাহিতা নারীদের সম্মানের প্রতীক। বিশেষত রাজপুতদের কাছে। রাজপুত সমাজে ঘুঙ্গট ফেলে বিবাহিতা নারীদের বাইরে আসাকে স্বামীর জন্য অকল্যাণকর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আবার ঘুঙ্গটে মাথা ও মুখ না ঢেকে কোনো নারী বাইরে গেলে তার ওপর ভূত-প্রেতের আছর পড়তে পারে বলেও মনে করা হতো। ধুলাবালি ও বিরূপ আবহাওয়া থেকে বাঁচতেও নারীরা ঘুঙ্গট ব্যবহার করত। আরেকটি বড় কারণ ছিল। রাজপুতদের সঙ্গে প্রায় বিভিন্ন শক্তির যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকত। শত্রুপক্ষের লোকেরা রাজপুত নারীদের চেহারা দেখে আকৃষ্ট হয়ে তাদের ছিনিয়ে নেয়ার ভয় ছিল। তাই রাজপুত পুরুষেরা নারীদের জন্য ঘুঙ্গটে মাথা ও মুখ ঢেকে রাখার বিধান জারি করেছিল। রাজপুত নারীরা এ অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলতেন। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের নারীদের ঘুঙ্গট পরিধানের পেছনেও এ ধরনের কারণই বলবৎ ছিল।
অভিজাত ও অবস্থাসম্পন্ন নারীদের ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবেও ঘুঙ্গটের প্রচলন ছিল। ঘুঙ্গটের আড়ালে ঢাকা প্রিয়ার সলাজ মুখ নিয়ে অনেক রোমান্টিক সাহিত্যও তৈরি হয়েছে। তবে নিম্নবর্গীয় নারীদের মাঝে ঘুঙ্গট ব্যবহারের তত চল ছিল না।
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে নারীদের ঘুঙ্গটকে আপন করে নেয়ার গল্প যেমন আছে, তেমনি এর বিরোধিতার চিত্রও আছে। তার অন্যতম উদাহরণ বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান পন্থার গ্রন্থ ‘ললিতবিস্তার সূত্র’। সেখানে নববধূ যশোধারা শ্বশুরবাড়ির গুরুজনদের সামনে আসার সময় ঘুঙ্গট পরতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তার মতে, যদি চিন্তা ও চেতনায় মানুষ সংযমী হয়, তবে তার আলাদা কোনো আচ্ছাদনে মুখ ঢাকার প্রয়োজন নেই। যশোধারার এ দৃষ্টিভঙ্গি তার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল।
পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক-বিতর্ক যা-ই থাকুক না কেন, ওপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ ঘুঙ্গট। ভারতীয় নারীদের পোশাক-পরিচ্ছদে অনন্য ব্যঞ্জনা সংযোজনের ধারাবাহিকতায় তা এখনো টিকে আছে।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক




