মহাকালের লিখনই বলতে হয় এ সত্যকে। ওনারা তিনজনই ছিলেন বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক চরিত্রের অধিকারী। জীবদ্দশায় তিনজনের চিন্তাচেতনার অধিবাস ছিল তিন মেরুতে। কিন্তু সমাহিত হয়ে আছেন একসঙ্গে, যে জায়গাটাকে আমরা বলি তিন নেতার মাজার। তিনজন হলেন এক. এ কে ফজলুল হক; দুই. খাজা নাজিমউদ্দীন; তিন. হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। অবিভক্ত বাংলায় তিনজনই ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। আবার এ তিন মন্ত্রিসভার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, অবিভক্ত বাংলার শেষ মন্ত্রিসভার তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ওনার সময়টা ছিল বাংলার ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এক পর্ব।
১৯৩৭-৪৭ হলো ব্রিটিশ-ভারতে ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার শেষ দশক। বঙ্গীয় আইনসভার সময়ও এ বৃত্তে ঘেরা। এ সভায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা তিনজনই সমাহিত হয়ে আছেন সেদিনের পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। দুজন জন্মসূত্রে এ পূর্ববঙ্গেরই, একজন পশ্চিমবঙ্গের। তিনজনের একটা জায়গায় ছিল মিল, ওনারা মুসলমানের স্বাধীন সত্তায় বিশ্বাস করতেন। ভারতের হিন্দু-মুসলিম এক দেশের বাসিন্দা হয়েও দুটি আলাদা সত্তার অধিকারী। ওনারা বিশ্বাস করতেন এ দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এ দুই সত্তাকে আলাদাভাবে এগিয়ে নিতে হবে এবং তাতে সমতার চর্চা হওয়াটা জরুরি।
কিন্তু অন্য জায়গাগুলোয় ছিল বিস্তর ব্যবধান, মতদ্বৈধতা ছিল পদে পদে। অথচ ওনাদের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে এসব সীমাবদ্ধতার ওপরে ওঠা জরুরি ছিল। কারণ আকাঙ্ক্ষার ওই শীর্ষস্তরে ওঠার প্রথম শর্তই হলো সীমাবদ্ধতার এ সিঁড়িগুলোকে পেরিয়ে আসে। কিন্তু ক্ষমতার মোহ সেটা হতে দেয়নি। ফলে বঙ্গীয় আইনসভার এক দশক বাঙালি মুসলমানের একে অন্যের প্রতি বিশ্বাসহীনতার দিকটাকেই হাজির করেছে প্রকটভাবে।
তবে এ দিকটাও স্মরণে রাখা জরুরি যে বাঙালি মুসলমানের তখন সবেমাত্র বিকাশমান পর্ব শুরু হয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিসরে। এখনকার বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা যদি সাত দশক আগেকার সময়কে বুঝতে চাই, তাহলে সে সময়কে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করা দুরূহ হবে। সে সময়কে মূল্যায়ন করতে হবে তখনকার বাস্তবতায় এবং একই সঙ্গে ঘটমান নানা ঘটনার অভিঘাতের ভিত্তিতে। তবে হ্যাঁ, এ কথা তো বলা যায়, তখনকার রাজনীতিবিদরা যখন দলীয় সীমাবদ্ধতার ঘেরাটোপে এবং ব্যক্তিগত লাভালাভের প্রশ্নে নিজেদের মতকে গুরুত্ব দেয়ায় কিংবা অনিবার্য করে তোলায় প্রাণান্ত ভূমিকা পালন করে গেছেন, তখন সে রাজনীতির অংশীজন হয়েও হোসেন শহীদ সমগ্রর স্বার্থকে বড় করে দেখার লড়াইয়ে শামিল থেকেছেন।
১৯৪৬-এর ১৬ আগস্ট সংঘটিত ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’কে দেখা হয় হোসেন শহীদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে। কিন্তু গবেষকরা এটাও বলেন, ওই ঘটনায় কে বা কারা দায়ী, কোন পক্ষ ক্রীড়নকের ভূমিকায় বেশি সক্রিয় থেকেছে, এসব আলোচনায় যেসব সত্য বেরিয়ে আসে বা উন্মোচন হয়, তার মধ্যে অন্যতম ওই ঘটনায় মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছে। পাঁচদিনের মতো সংঘটিত ঘটনায় এটা স্পষ্টত হয় উভয়ের মধ্যে অবিশ্বাসের জায়গাটা এমন এক জায়গা নিয়েছে যে একসঙ্গে পথচলা আর সম্ভব নয়। একে অন্যের হন্তারক রূপ এমনভাবে প্রকাশ্য হয়েছে, ওই মুহূর্ত থেকে দুটো পথ দুদিকে বেঁকে গেছে। কিন্তু এ আলোচনার বাইরে আরো একটা সত্য রয়ে গেছে, যে সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসু, সত্যরঞ্জন বক্সী, কিরণশঙ্কর রায়ের মতো নেতারা। ফলে ১৯৪৬-এর যে দাঙ্গার ওপর দাঁড়িয়ে হোসেন শহীদকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। কোনো প্রকার যুক্তিতর্ক ছাড়াই মনগড়া এক রায় দেয়া হয়, সেটা যে মোটেই যৌক্তিক নয়, তা অবিভক্ত বঙ্গ বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টায় প্রতীয়মান হয়। আমরা এ সম্পর্কে আরো পরিষ্কার হওয়ার আগে জেনে নেয়া জরুরি বঙ্গীয় আইনসভার শেষ দশকের ঘটনাক্রমকে।
উল্লেখ্য, ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ভারত শাসন আইনের ধারাবাহিকতায় সাংবিধানিক সংস্কারের চূড়ান্ত পরিণতিস্বরূপ গঠিত হয়েছিল বঙ্গীয় আইনসভা। যার শুরু ১৮৬১ সালে এবং ১৯৩৫ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে ভারত শাসন আইন প্রণয়ন পর্যন্ত শাসন সংস্কারের শেষ পদক্ষেপ হিসেবে। এ আইনে বলা হয় ব্রিটিশ ভারতের সব প্রদেশের সাংবিধানিক পরিষদ প্রাপ্তবয়স্কদের দেয়া ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত হবে। বেঙ্গল লেজিসলেটিভ যাত্রা শুরু হয় ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। প্রথম নির্বাচনে বঙ্গীয় আইনসভায় বিভিন্ন দলের অবস্থান ছিল এ রকম: কংগ্রেস-৫৪, নিরপেক্ষ মুসলিম-৪২, মুসলিম লীগ-৪০, নিরপেক্ষ হিন্দু-৩৭, কৃষক প্রজা পার্টি (কেপিপি)-৩৫, অন্যান্য-৩২, ত্রিপুরা কৃষক পার্টি-৫, জাতীয়তাবাদী-৩, হিন্দু মহাসভা-২। সংগত কারণেই কংগ্রেসের সরকার গঠন করার কথা। কিন্তু সে সময়ে দলটির নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকে কোনো প্রকার সহযোগিতা না করা। ফলে বাংলার গভর্নর কৃষক প্রজা পার্টির প্রধান এ কে ফজলুল হককে দায়িত্ব গ্রহণ করে নিজেদের মধ্যে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানান। তিনি এ সুযোগ গ্রহণ করেন। হোসেন শহীদ ওই মন্ত্রিসভায় যুক্ত হন। বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে: ‘১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক সমস্যা এবং সৃষ্ট হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অচলাবস্থার কারণে বঙ্গীয় আইন সভার নির্বাচন স্থগিত করে রাখা হয়। তবে ইতোমধ্যে দুটি নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল। একটি এ কে ফজলুল হক এর নেতৃত্বে ১৯৪১-এ এবং অপরটি খাজা নাজিমউদ্দীনের নেতৃত্বে ১৯৪৩-এ। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারত বিভাগের পূর্বে শেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯-২২ মার্চ ১৯৪৬-এ।’ এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আসন সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ: মুসলিম লীগ ১১৩, কংগ্রেস ৮৬, নিরপেক্ষ হিন্দু ১৩, নিরপেক্ষ মুসলিম ৯, অন্যান্য ২৯। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
লক্ষণীয়, বঙ্গীয় আইনসভার সর্বশেষ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে এ সভার অধীনে হওয়া সব মন্ত্রিপরিষদে যুক্ত ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় ছিলেন শ্রম ও বাণিজ্যমন্ত্রী। এখানে তিনি কিছুদিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। নাজিমউদ্দীন মন্ত্রিসভায় ছিলেন বেসামরিক সরবরাহমন্ত্রী। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করার কারণেই বাংলার ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষাবস্থার জন্য ওনাকে দায়ী করা হয়। অথচ নানা গবেষণায় উঠে এসেছে ওই দুর্ভিক্ষের জন্য মূল দায় ছিল ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধ নীতি। ব্রিটেনের চার্চিল প্রশাসন, ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর ও বাংলার গভর্নরের দায় রয়েছে ওই দুর্ভিক্ষের পেছনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেয়া তাদের যুদ্ধনীতি ও বাংলার মানুষকে উপেক্ষা করার মনোভঙ্গির কারণেই ভয়াবহ এক দুর্ভিক্ষের জন্ম নেয়। এ প্রেক্ষাপটে দুর্ভিক্ষের জন্য যদি দায়ী করতে হয় তা হলে সেটা বর্তানোর কথা সে সময়ের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীনের ওপর। কিন্তু হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগের খাজা নাজিমউদ্দীন গ্রুপ সব দায় চাপিয়ে দেয় হোসেন শহীদের ওপর। ব্রিটিশ ভারতের শাসন নীতিতে বঙ্গীয় আইনসভার মন্ত্রিপরিষদের ক্ষমতা ছিল খুবই সীমিত। সেখানে একজন মন্ত্রী ও রকম একটা সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষাবস্থা মোকাবেলায় কতটুকু ভূমিকা পালন করতে পারেন, তা সহজেই অনুমেয়।
অবিভক্ত ভারতে আমরা স্মরণ করতে পারি নেহরু পরিবার, ঢাকার নবাব পরিবার, কিশোরগঞ্জের রায় পরিবার, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারও এ ধরনের গর্ব ও গৌরবের অধিকারী। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে সময় বিচারে এ তালিকায় সোহরাওয়ার্দী পরিবার সবচেয়ে বেশি সময় ধরে উপমহাদেশকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। যদিও এ পরিবার নিয়ে নেই কোনো বিশেষ অনুসন্ধান, এষণা ও মূল্যায়নধর্মিতার প্রয়াস এবং প্রচেষ্টা। স্বর্ণ যদি খনিতেই থেকে যায় তাহলে তা যেমন উন্নয়ন অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখে না। ঠিক তেমনি স্বর্ণসদৃশ পরশপাথর তুল্য কোনো ব্যক্তি কিংবা পরিবারের অবদান যদি আড়ালেই থাকে, আলোচনার আলোয় নিয়ে আসা না হয় তাহলে তা খনিতে থাকা স্বর্ণের মতোই অগোচরে থেকে যায়, কোনো কাজে আসে না।
উপমহাদেশের রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দী পরিবারের উত্তরসূরি হোসেন শহীদ রেখেছেন সদর্থক অর্থেই যুগান্তকারী ভূমিকা। বিংশ শতাব্দী ছিল বহুবিধ কারণেই উপমহাদেশের জন্য সবিশেষ গুরুত্ববহ ও ঘটনাবহুল বছর। এসব ঘটনার ভরকেন্দ্রে থেকে যারা পালন করেছেন দিকনির্দেশক ভূমিকা, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। অবিভক্ত ভারত ও স্বাধীন পাকিস্তানে তিনি ছিলেন রাজনীতির চালিকাশক্তি। হোসেন শহীদ ছিলেন অবিভক্ত বঙ্গের সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রী। দেশভাগের ঠিক এক বছর আগে রাজধানী কলকাতায় সংঘটিত হয় উপমহাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর এক দাঙ্গা। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টে এবং তার কয়েকদিন পর সংঘটিত হয় ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামের মর্মন্তুদ এক রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৪৬ সালের ২৮ জুলাই মুসলিম লীগের অধিবেশনে দলীয় সভাপতি জিন্নাহ ১৬ আগস্ট ভারতজুড়ে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেয়। ১৫ আগস্ট বঙ্গ প্রদেশের মুসলিম লীগ সরকার ১৬ আগস্ট বন্ধ ঘোষণা করে।
এসব ঘটনা প্রবাহের কারণে কোনো কোনো ঐতিহাসিকসহ গরিষ্ঠ সংখ্যার একদল মানুষ গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দিকে অভিযোগ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বিষয়টা যে অতটা সরল নয় তাদের আলোচনা, বিশ্লেষণ ও তথ্যানুসন্ধানে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয় না মোটেই। উপরন্তু তারা আমলে নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না, এ দাঙ্গা নিরসনে হোসেন শহীদ কী ভূমিকা পালন করেছিলেন। অথচ ইতিহাসের সত্য বলছে, হিন্দুদের জান, মাল ও সম্পদ বিনষ্ট রোধে তিনি কতটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বয়ানে লেখক-গবেষক আলিমুজ্জামান ‘সোহরাওয়ার্দী পরিবার ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার’ বইয়ে জানাচ্ছেন, ‘১৯৪৬ সালের সে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী কখনো একজন রক্ষী নিয়ে, কখনো বা একা কলকাতার অলিগলিতে বিপন্নকে রক্ষার জন্য ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। তখন দুর্বৃত্তের ছোরা উদ্যত; কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী অকুতোভয়। নিরস্ত্র জননেতাকে দেখে সশস্ত্র গুণ্ডারা পালিয়ে গেছে। তার অঙ্গ স্পর্শ করার সাহস পায়নি।’
হোসেন শহীদের কন্যাও ১৯৪৬-এর দাঙ্গায় জনসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। আখতার জাহান সোহরাওয়ার্দীর এ ভূমিকায় বলে দেয় সোহরাওয়ার্দী পরিবার মানবতার সেবায় কতটা আন্তরিক ও দায়বদ্ধ ছিলেন। হোসেন শহীদ আমৃত্যু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে উৎসর্গীকৃত একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। ওনাকে বলা হয়, ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’। গণতন্ত্রের প্রতি ওনার শ্রদ্ধা ও পক্ষপাত ছিল প্রশ্নহীন। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষ এবং দেশের মুক্তি ও সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলেও এর নেপথ্যে থেকে যারা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাদের অন্যতম। পাকিস্তানের দিনগুলোয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া বিভিন্ন সময়ের ভাষণ পাঠ করলে এ সত্যতার একটা মান্য রূপ খুঁজে পাওয়া যায়।
হোসেন শহীদের রাজনৈতিক জীবন পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি মানুষের মুক্তিকে কীভাবে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি রাজনীতির প্রথম দিকে হিন্দু-মুসলমানের যৌথতার মধ্যে দিয়েই ভারতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এ কারণে তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু দেশবন্ধুর মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে তিনি এখান থেকে সরে আসেন, যেমনটা আমরা দেখি জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন পরিক্রমায়। কিন্তু নানা ঘটনাপ্রবাহ ওনাদের বিকল্প ভাবনা নিতে বাধ্য করে। পরিষ্কারভাবে বুঝে যান, একসঙ্গে থেকে ভারতের মুসলিমের স্বার্থরক্ষা করা সম্ভব হবে না। ফলে মুসলমানের স্বার্থরক্ষা ওনাদের জন্য আপন শেকড় রক্ষার চ্যালেঞ্জ হিসেবেই প্রতিভাত হয়। ওনারা মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। হোসেন শহীদ অবশ্য প্রথম থেকেই মুসলিম লীগের মধ্যে থেকেই প্রগতিশীলতা চর্চায়, গণতন্ত্রের অনুশীলনে দায়বদ্ধ থেকেছেন।
দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে হোসেন শহীদের জীবনের বড় একটা উদাহরণ হলো দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান চলে না যাওয়া। কারণ উনি চলে গেলে পশ্চিমবঙ্গে থেকে যাওয়া যেসব মুসলমানে সংখ্যালঘু হয়ে গেলেন তাদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে তাই নিয়ে তিনি সক্রিয় থেকেছেন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে যুক্ত থেকে এ সমস্যা নিরসনের পথ খুঁজেছেন, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
হোসেন শহীদ যেহেতু অবিভক্ত বাংলার এবং দেশভাগ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সময়ের কেবল প্রত্যক্ষদর্শী প্রভাবক চরিত্র ছিলেন, ফলে ওনার দিকে নানা কারণেই ভ্রুকুটি হাজির করা হয়। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তা কতটা যথার্থ ও যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন তিনিই একমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আবার পাকিস্তান রাষ্ট্রেরও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সময়গুলো ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নানামাত্রিক ঘটনায় ভরা। এ অবস্থায় এবং বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক বিকাশের সূচনালগ্নে উনি যে মানবতাবাদের পরিচয় দিয়েছেন, মুসলমান ও হিন্দুর যুক্ত সাধনায় আস্থা রেখেছেন, মুসলমানের আত্মবিকাশের পথকে উন্নীতকরণ করতে চেয়েছেন, গণতন্ত্রকে সমুন্নত ও সংহত রাখার ক্ষেত্রে সর্বৈব প্রকারে প্রাণান্ত থেকেছেন, তার তুলনা বিরল ও ব্যতিক্রম। হোসেন শহীদকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা যেন এ দিকগুলোকে গুরুত্বেও সঙ্গে আমলে নিই।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এখন সমাহিত হয়ে আছেন ওনার বংশীয় নামাঙ্কিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তিন নেতার মাজারের একজন হয়ে। ওনার সঙ্গেই রয়েছেন আরো দুই নেতা। রাজনৈতিক জীবনে এ তিন নেতা যদি এভাবে পাশাপাশি থাকতেন তা হলে বাংলার ইতিহাস হয়তো অন্য রকম হতো, বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক বিকাশের অধ্যায় হয়তো আরো বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য হতো। কিন্তু সেসব হয়নি, যা হয়নি তা নিয়ে ইতিহাসের পাঠ থাকা জরুরি। কারণ ইতিহাস জীবন্ত এক সত্তা। যার সঠিক ব্যবহার বর্তমানকে কেবলই সমৃদ্ধ করে। হোসেন শহীদ বাঙালি মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক চরিত্র।
২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নতুন আকাঙ্ক্ষার পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। এ হাঁটায় অনেক কিছুকে যেমন যুক্ত করতে হবে, বিয়োগও নিশ্চয়। এ সময় আমরা স্মরণ করি আমাদের লোকধর্মের ঐতিহ্যকে। ‘আত্তীকরণ’ ও ‘সাঙ্গীকরণ’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে লোকধর্মের যে শক্তি হাজার-হাজার বছর ধরে এ বদ্বীপভূমে প্রবাহমান, তাকে যেন আমরা আজকের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও সাধনার অংশ হিসেবে নিই। আমাদের জাতিরাষ্ট্রের উদ্গাতা হিসেবে যারা স্মরণীয় ও বরণীয়, তাদের যেন আমরা ফাউন্ডার্স ফাদারের মর্যাদা দিয়ে প্রাপ্য সম্মান জানাতে কার্পণ্য না করি। সেক্ষেত্রে একাধিক জন হতে পারেন ফাউন্ডার্স ফাদার। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হোক ওনাদের একজন। কারণ তিনি বাঙালি মুসলমানকে একসূত্রে গ্রথিত করার এক আলোকরেখা।
ড. কাজল রশীদ শাহীন: চিন্তক, সাংবাদিক ও গবেষক







