‘সরদার ফজলুল করিম ইজ এ বিগ গাই’
ব্যস্ত নগরীর চৌরঙ্গীর রাস্তায় ভিড়ে দাঁড়িয়ে তার মনে হয়েছে, এখানে কেউ তাকে চেনে না, কেউ অনুসরণ করছে না। এভাবে কয়েক দিন কেটে যাওয়ার পর হঠাত্ একদিন দৈনিক ইত্তেহাদ অফিসে কবি আহসান হাবীবের সঙ্গে দেখা হয়। বরিশাল জিলা স্কুলে পড়ার সময় থেকে আহসান হাবীবের সঙ্গে পরিচয়-জানাশোনা। যদিও সরদার ফজলুল করিমের রাজনৈতিক জীবন সে সময় তার ছিল অজানা। পার্ক সার্কাসে কবি আহসান হাবীবের বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইও একই বাড়িতে থাকতেন। বেশ কিছুদিন পর এক শেষরাতে সাদা পোশাকে কয়েকজন পুলিশ হাজির হয় সে বাড়িতে। ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের পুলিশ, আহসান হাবীবকে জানায়— ‘ইস্ট বেঙ্গলের একজন পলিটিক্যাল অ্যাবসকন্ডারকে খুঁজতে তারা এখানে এসেছেন।’
আহসান হাবীব পলিটিক্যাল অ্যাবসকন্ড নেই জানালেও পুলিশ বাসা তল্লাশি করে। পরিচয় জানতে চাইলে পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, ‘সরদার ফজলুল করিম, বরিশালের বি.এম. কলেজ থেকে বি.এ. পরীক্ষায় ফেল করেছেন।’ একহারা গড়নের সরদারকে দেখে পুলিশ অফিসারের প্রতিক্রিয়া, ‘নো নো, সরদার ফজলুল করিম ইজ এ বিগ গাই।’ পুলিশ চলে যাওয়ার পর কবি আহসান হাবীবের বাসা থেকে বের হয়ে তিনি অন্ধকারে অজানা গন্তব্যে মিশে যান। কিছুদিন বিভিন্ন ঠিকানায় অবস্থান শেষে ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে নিজ দেশে ফিরে আসেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায়।
‘স্যার, আপনি তো একটা ডেঞ্জারাস লোক’
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওসমান নামে এক লাইব্রেরি এসিষ্ট্যান্ট ছিলেন। এখনও অনেকেই ওঁকে চিনতে পারেন। স্বাধীনতার পর আমি যখন প্রথম দিন লাইব্রেরিতে গেলাম তখন ওই ওসমান আমাকে যেভাবে ওয়েলকাম করলো সেটা খুব সিগ্নিফিকেন্ট। ‘স্যার, আপনি তো একটা ডেঞ্জারাস লোক। আপনি সেই যে পাকিস্তান ভাঙবেন বইলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়লেন, পাকিস্তান না ভাইঙা আপনি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরলেন না।”
(উদ্ধৃতি: সরদার ফজলুল করিম রচিত সেই সে কাল: কিছু স্মৃতি কিছু কথা)
‘তিনি তাঁর নাম শুনেছেন, কিন্তু দেখেননি।’
চালাকচরে আত্মগোপনের জীবত্কালকে তার জীবনে খুব ‘রোমান্টিক লাইফ’ বলে অভিহিত করেছেন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লেখায়। নিরাপত্তার কারণে পার্টির নির্দেশে একই ঠিকানায় তিনি বেশিদিন থাকেননি। সে সময় বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে কমিউনিস্টদের ওপর হামলা শুরু হয়ে যায়। নিরাপত্তার কারণে ঘর ছেড়ে গোয়ালঘরে বিছানা করে রাত কাটিয়েছেন তিনি। একদিন সে এলাকার অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া এক ছাত্র মজিদ সাহেব নামধারী সরদারকে জিজ্ঞেস করে, ‘তিনি ঢাকা শহরের সরদার ফজলুল করিম নামে তাদের একজন বড় নেতাকে চেনেন কিনা?’ সরদার ফজলুল করিম তাকে বলেন, ‘তিনি তাঁর নাম শুনেছেন, কিন্তু দেখেননি।’
‘আমি তো বিলেত যাচ্ছি’
১৯৪৫ সালের শেষ দিকে তিনি কলকাতায় রওনা হন একটি স্কলারশিপের ইন্টারভিউয়ের জন্য। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ইন্টারভিউ দেয়ার আগে সরদার ফজলুল করিম কমিউনিস্ট পার্টির হেডকোয়ার্টারে যান। সেখানে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ ও নৃপেণ চক্রবর্তীকে বলেন, ‘আমি তো বিলেত যাচ্ছি’। তিনি অনার্স ও এমএতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছেন এবং স্কলারশিপটা ছিল মুসলমান ছাত্র ও দর্শন শাস্ত্রের জন্য সংরক্ষিত। বিভিন্ন কথার প্রতিক্রিয়া এবং কথোপকথনের একপর্যায়ে ইন্টারভিউ কার্ড ছিঁড়ে ফেলেন এবং কর্তব্য স্থির করেন দেশে থেকে দেশের জন্য কাজ করবেন।
‘আপনি তো বড় সাংঘাতিক মানুষ, সকলেই ক্ষমতার পেছনে দৌড়ায় আর ক্ষমতা আপনার পেছনে দৌড়ায়’
পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব সদস্যই ছিলেন সামন্তপ্রভু, জমিদার, পত্রিকার মালিক ইত্যাদি। ইস্কান্দার মির্জা, মিয়া ইফতেখার উদ্দিন ও অন্যান্য পশ্চিম পাকিস্তানের সাংসদের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের কোনো সদস্য একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না। যদিও একেএম ফজলুল হকের ভাগ্নে সৈয়দ আজিজুল হক সরদার ফজলুল করিমকে বলতেন, ‘আপনি তো বড় সাংঘাতিক মানুষ, সকলেই ক্ষমতার পেছনে দৌড়ায় আর ক্ষমতা আপনার পেছনে দৌড়ায়।’ কিন্তু সরদার ফজলুল করিমের গণপরিষদের সদস্য নির্বাচনে আমেরিকা প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ প্রকাশ করে। সেখানকার সংবাদপত্রে সংবাদ হয়— ‘ওয়ান কমিউনিস্ট ফ্রম জেইল ইলেক্টেড টু কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেমব্লি’। ওয়াশিংটন এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দাবি করে করাচিতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের কাছে। রাষ্ট্রদূত জানতে চান পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। অবশেষে করাচি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঢাকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সিদ্ধান্ত হয়, ‘সরদার ফজলুল করিমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুনরায় গ্রেফতার করা হবে।’
“আমি গুরুত্বের সাথেই বলি: সে বইয়ের নাম ‘জীবন’”
বইয়ের প্রসঙ্গে আমার সরল ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আর একটি সংলাপের উল্লেখ করতে ইচ্ছে হচ্ছে। হয়তো ক্লাসের মধ্যে কিংবা ক্লাসের বক্তৃতার পর সরল দৃষ্টিতে তরুণ ছাত্রটি বলল, স্যার, অত বই আমরা পড়তে পারব না। আপনি একটা বইয়ের নাম বলুন, যে বই পড়লে আমাদের সবকিছুই জানা হয়ে যাবে।
প্রশ্নটি শুনে আমি চমকিত হই। পাল্টা জবাবে কিছুটা রহস্য মিলিয়ে বলি: একটা বই? হ্যাঁ একটা বইতেও চলে। এমন একটা বইও আছে।
জবাবে প্রশ্নকারী ছাত্রটির চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে: আছে স্যার, এমন একটা বই? তার নাম বলুন। আমি গুরুত্বের সঙ্গেই বলি: সে বইয়ের নাম ‘জীবন’। ছাত্রটি গুরুতরভাবেই আবার প্রশ্ন করে, স্যার লেখকের নাম কী? আমি বলি: লেখকের নাম জীবন দত্ত। এ জবাব দিয়েই আমি কেটে পড়ার চেষ্টা করি। জীবন দত্তের রচিত একখানি মাত্র গ্রন্থ ‘জীবন’-এর রহস্য এই নিষ্পাপ শিক্ষার্থীর সামনে আর উদ্ঘাটন করতে সাহস পাইনে।
‘আপনি সরদার ফজলুল করিম! আপনিই ‘প্লেটোর সংলাপ’ লিখেছেন”
এই যে জীবনবোধ এটা আমি উপভোগ করেছি। একবার ব্যাংকে লাইনে দাঁড়িয়েছি বিল দিতে। তখন ক্লার্ক ডাকল, কে সরদার ফজলুল করিম? আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, “আমি সরদার ফজলুল করিম। কেনো, কি ভুল হয়েছে? তখন আবারো বললো ব্যাংক-কর্মচারী, ‘আপনি সরদার ফজলুল করিম! আপনিই ‘প্লেটোর সংলাপ’ লিখেছেন?” আমি তো হতবাক। একজন ব্যাংক কর্মচারী আমাকে এ কথা জিজ্ঞেস করায় আমি ধন্য হয়ে গেলাম।
সংকলক: মার্জিয়া লিপি





