[সিরিয়ার গল্পকার ও সমালোচক ইবরাহীম সামুইল জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫১ সালে দামেস্কে। দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষিত সামুইল লেখালেখি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘রাইহাতু আল খুতওয়া আল সাকিল’ তরুণ পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ‘আল ওয়ারুল আজরাক’ ও ‘ফাদাআত মিন ওরাকিন’ও তার দুটি জনপ্রিয় গল্পগ্রন্থ। এছাড়া সাহিত্য সমালোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নিয়মিত কলাম লিখছেন আল জাজিরার সাহিত্য পাতায়]

 

অবিশ্বাস্য! আহ যদি সত্যি হতো যা বলছ।

অবশ্যই সত্যি। নেতারা রাজি হয়েছেন আমার কথায়। তোমাদের দেখা হচ্ছে। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সবকিছু যেন ঠিকঠাকমতো হয়।

হুম। এর চেয়ে সুখের কিছু আর হয় না। বলো, কখন আর কীভাবে তাকে দেখতে পাব?

উত্তরটা শোনার জন্য সে অস্থির। তার বিষণ্ন মুখটা অনেক দিন পর আনন্দে লালচে হয়ে উঠেছে।

হতে পারে আগামীকাল বা তার পরের কোনো দিন। এটা নির্ভর করছে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর।

অবশ্যই আগামীকাল দেখা হবে। কালকেই।

মুচকি হেসে বলে, এত অস্থির হয়ো না সালমা। দুই বছর ধরে তার সঙ্গে তোমার দেখা নেই। অথচ এখন এ খবর শোনামাত্রই অস্থির হয়ে পড়লে!

উদ্ভ্রান্তের মতো হেসে সালমা বলে, তুমি হয়তো জানো না, দুই বছর ধরেই এমন অস্থির হয়ে আছি আমি। আমার স্বভাবই এমন।

ঠিক আছে বন্ধু। সবসময় এমনই থেকো, কিন্তু অনুগ্রহ করে এ রকম পরিস্থিতিতে স্থির থাকো। নিশ্চয় চাইবে না, কোনো ভুলের জন্য দুজনকেই কঠিন মূল্য দিতে হোক।

ভীষণ বিরক্ত সালমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ফ্যাকাসে মুখে জানতে চায়, তুমি কি আজ আমাকে নীতিকথা শোনাতে এসেছ? বক্তৃতা বন্ধ করে বলো, কোথায় আর কীভাবে তাকে দেখব।

মুচকি হেসে কাগজ-কলম বের করে ব্যাগ থেকে। খুব মনোযোগ দিয়ে এখন শোনো আমার কথা। আগামীকাল সম্ভবত রাতে তোমাদের দেখা হতে পারে। হাতঘড়ির দিকে একনজর দেখে বলে, প্রায় এ সময়ই।

সালমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

কাগজে একটা গোল বৃত্ত এঁকে তার মধ্যে গুণ চিহ্ন দেয়। তুমি নিশ্চয় মুজতাহিদ হাসপাতাল চেনো। এ হাসপাতালের ঠিক বিপরীতে একটা রাস্তা গেছে চত্বরের দিকে।

আমি চিনি। এখানেই?

না। এ রাস্তা থেকে বাম দিকে দুটো রাস্তা গেছে। সমান্তরাল দুটো রাস্তা আঁকে সে।

প্রথম রাস্তাটা অতিক্রম করে তুমি পরেরটা ধরে এগোবে। এ সংকীর্ণ রাস্তায় যে এলাকায় ঢুকবে, সখানে কোনো বাড়িঘর নেই। রাস্তার পাশে একটা মাঠ, আর সেখানে একটা সিনকোনা গাছ দেখবে। এ গাছের আড়ালেই থাকবে সে।

(সিনকোনা ঔষধি গাছ, যে গাছের বাকল থেকে কুইনাইন ওষুধ তৈরি হয়।)

আনন্দে প্রায় লাফিয়ে ওঠে সে। দুই হাত ঘষে উল্লাস প্রকাশ করে। কী দারুণ! একদম অবিশ্বাস্য। বিশ্বাস হচ্ছে না, আমাদের কাল দেখা হবে। কয়টার সময়?

ঠিক ৯টায়। হাত ইশারা করে বলে। ১ মিনিট আগে বা পরে নয়। ঠিক কাঁটায় কাঁটায় ৯টা।

কালো লম্বা চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে সরায় সালমা। ভ্রু দুটো ওপরে তুলে আবারো বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, আচ্ছা, ঠিক আছে।

আরো কিছু কথা ভালো করে শোনো।

শুরু করলে আবার সেই লেকচার!

আমার বক্তৃতা এখন ভালো না লাগলেও তোমাকে শুনতে হবে। নাকি তুমি চাও অসতর্কতার জন্য সে ধরা পড়ুক?

কোন আশঙ্কার কথা অতি আনন্দের কারণে মনে ছিল না। যেকোনো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে কাল।

হুম। সব মনে আছে। দুই বছর আগে দেখা করার আগে তুমি কী কী বলে সাবধান করেছিলে। সালমা তার গলা নকল করে বলে, খবরদার! দেরি করবে না। কাউকে কিছুই বলবে না। কোনো রকম দুর্বলতা প্রকাশ করবে না। আশপাশের সবার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। চেষ্টা করবে...

সালমাকে থামিয়ে দেয়। আবারো সেসব কথাই বলব। রাস্তায় বের হয়েই আশপাশের মানুষের দিকে নজর দেবে। তোমার বাড়ি কিন্তু এখনো নজরবন্দি। তোমাকে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে, কেউ তোমাকে অনুসরণ করছে কিনা। আবু উমরকে বলেছি যে, তুমি ব্যাগের মাধ্যমে পরিস্থিতি বোঝাবে। আর কথা বলার ফাঁকে তার একটা ছবি নেবে। এটা তার বাবা চেয়েছেন। ব্যাগ যদি ডান কাঁধে নাও, তাহলে সে বুঝবে, সবকিছু ঠিক আছে। আর যদি কোনো কিছু সন্দেহজনক মনে হয়, সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাগটা বাম কাঁধে নেবে। একইভাবে সে নেবে একটা তসবি। সবকিছু ঠিক থাকলে সে ডান হাতে তসবি রাখবে। আর যদি কিছু আশঙ্কা করে তাহলে তসবিটা নেবে বাম হাতে। ঠিক আছে?

জি। ঠিক আছে। সালমার উচ্ছল মুখটা মলিন এখন। খারাপ কিছুর কথা হঠাত্ করে ভুলে গিয়েছিল।

যাব এখন? আর কিছু লাগবে তোমার?

ধন্যবাদ বন্ধু। কিছু লাগবে না।

কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে লোকটা। খুব সাবধান সালমা! কেউ জানে না, সে এখন দেখতে কেমন। একমাত্র তোমাকে অনুসরণ করেই তাকে শনাক্ত করা সম্ভব।

চিন্তা করো না। আমি সাবধানেই থাকব। নেতাদের আমার কৃতজ্ঞতা জানিও।

আবু মাজেদকে বিদায় দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে অজানা নানা আশঙ্কায় তার বুক কাঁপতে শুরু করে। বাড়িতে ঢুকে চিন্তা আরো বাড়ে। দেখা হওয়ার কথা শুনে যে আনন্দ হয়েছিল, তা ম্লান হয়ে যায় বিপদের আতঙ্কে। উমরের ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে সেও ধপ করে শুয়ে পড়ে ছেলের পাশে। ক্লান্ত তবু ঘুম আসে না। অবশ্য ঘুম না হওয়ায় আজ ভালোই লাগছে। পুরনো স্মৃতিগুলো একের পর এক আসছে মনের পর্দায়। আহ! কি সুখের সব স্মৃতি। চিত হয়ে শুয়ে তার মনে পড়ে তাদের প্রথম দেখা হওয়া দিনের কথা। একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল কোনো দিন কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। অনেক দিন তার আসতে দেরি হওয়ায় মাজিদ রাগারাগি করেছে। আবার অনেক দিন তার দেরি হওয়ায় সেও উদ্বিগ্ন বসে থেকেছে।

পাশ ফিরে শোয় সালমা। ঘুমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু চোখজুড়ে বিগত দিনের এত এত স্মৃতির ভিড় যে, দুই পাতা আর এক করা যায় না। পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিল তারা। দুই পরিবারের কেউ তাদের বিয়ে মেনে নেয়নি। বহুদিন কঠিন ঝগড়ার পর দুজনই চিত্কার করে পরস্পরকে বলেছে, তোমার সঙ্গে আর এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব নয়। অথচ ছেড়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারত, আসলে কেউ কাউকে ছেড়ে এক মুহূর্তও ভালো থাকতে পারবে না। তীব্র আবেগে একজন আরেকজনের সঙ্গে মিশে গেছে যেকোনো বড় ঝগড়ার পরই। ভালোবাসার অদৃশ্য বাঁধনে আটকে পড়ে গেছে চিরদিনের জন্য। সব মনোমালিন্য আর দুঃখগুলো বারবারই ভেসে গেছে তাদের অপরিমিত ভালোবাসার জোয়ারে।

হঠাত্ লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসে সালমা। সেই ভয়ঙ্কর দিনটার কথা মনে পড়তেই এখনো গা শিউরে ওঠে। যেন গতকালের ঘটনা। ওরা বাড়িতে এসেছিল মাজিদের সন্ধানে। না পেয়ে তল্লাশি শুরু করে। সারা বাড়ি ঘিরে রাখে। তছনছ করে বাড়ির সবকিছু। এমনকি প্রতিটা বিছানার তোশক পর্যন্ত উল্টেপাল্টে দেখে। অত আতঙ্কের মধ্যেও তার হাসি পায়, আচ্ছা, তারা কি ভাবছে মাজিদ তোশকের নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে!

আর পারছে না। চোখ দুটো ভারি বন্ধ হয়ে আসছে ঘুমের জন্য। আস্তে শুয়ে পড়ে ঘুমিয়ে যায়। অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে সেই রাতে। সিনকোনা গাছটা ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর মাজিদ তার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে নবজাতক শিশুর মতো শুভ্র সুন্দর হয়ে। সে এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নেয় মাজিদকে। বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদে। মাজিদের গা থেকে গাছের আর্দ্র গন্ধ বের হচ্ছে। হঠাত্ সালমা সামনে এক নীল সমুদ্র দেখতে পায়। সমুদ্রের বুকে অস্তগামী সূর্যের ঝিকিমিকি আলো। মাজিদকে নিয়ে সে এগিয়ে যায় সমুদ্রের দিকে। আস্তে আস্তে সূর্যটা ডুবে যায় আর ধীরে ধীরে সব আলো মুছে যায়।

পরদিন বাড়ি থেকে বের হয় দুশ্চিন্তা আর সীমাহীন আতঙ্ক নিয়েই। আকাশি রঙের জামাটা অকারণেই বারবার ঠিক করে। ব্যাগটা কথামতো ডান কাঁধে। রাস্তায় অসংখ্য গাড়ি থাকলেও পথচারী হাতেগোনা। তবু মনে হচ্ছে, সবাই যেন তাকেই দেখছে। চোরের মতো লাগছে নিজেকে। কীভাবে সবার দৃষ্টি থেকে পালাবে, সে পথ পাচ্ছে না। ৯টা বাজতে তখন ১৫ মিনিট বাকি। নিজেকে শক্ত করে ইবনে আসাকির রাস্তা ধরে বাব মুসাল্লা চত্ব্বরের দিকে এগিয়ে যায়।

সত্যি সত্যিই কি আজ দেখব তাকে! যদি আজ ওকে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারতাম। বাড়ির প্রতিটি জিনিস যেন ওর অপেক্ষায় আছে। আর উমর তো সারাক্ষণ বাবার জন্য অপেক্ষায় থাকে। ইস! আজ যদি ছেলেটা সঙ্গে নেয়ার অনুমতি দিত ওরা। তাড়াতাড়ি ব্যাগটা খুলে দেখে নেয় উমরের ছবিটা নিয়েছে কিনা। মাত্র ১৫ মিনিট দিয়েছে দেখা করার জন্য। দুইটা বছর এত যন্ত্রণাময় অপেক্ষার পর মাত্র ১৫ মিনিটে কথা শেষ করা যায় কি। না না, এটা মেনে নেয়া যায় না। কেন সে একটু সময় বেশি চেয়ে নিল না।

এই যে সাইয়্যেদা! একটু যাওয়ার জায়গা দিন। আনমনে হাঁটছিল সালমা কিছুটা ফুটপাতের মাঝখান দিয়ে। সংবিত্ ফিরে পায় যুবকটার কথা শুনে। চিন্তার জাল ছিঁড়ে যাওয়ায় খুব বিরক্ত হয় সে। মনে মনে গালি দিয়ে একপাশে সরে যায়। আল্লাহ তোকে ধ্বংস করুক! কিন্তু এ তিক্ত অনুভূতি বেশিক্ষণ থাকে না। মাজিদের কথা মনে পড়তেই আবার মনটা খুশিতে ভরে যায়। খুব দ্রুতই তাকে পৌঁছতে হবে। হাতে আর মাত্র ৭ মিনিট। মুজতাহিদ সরণি পার হয় সাবধানে।

আমি আজ অবশ্যই জানতে চাইব, আর কত দিন চলবে এ লুকোচুরি। ওরা তো মাত্র দুবার তল্লাশি করতে এসেছিল দুই বছর আগে। আর কখনো আসেনি। কত দিন ওরা ওকে খুঁজবে আর তাকে নজরে নজরে রাখবে। ওদের নেতারা কবে এ দুরবস্থার সমাধান করতে পারবে? কবে সে মুক্তি পাবে এ নজরদারির দুশ্চিন্তা থেকে। ‘নজরদারি’ শব্দ মনে পড়তেই তার গা ছমছম করে। নির্জন রাস্তা, তবু ভয় লাগে। এদিক সেদিক তাকাতেই চমকে ওঠে। তার ঠিক পেছনেই যেন কেউ আসছে। এতক্ষণ অন্য খেয়ালে ছিল, তাই শুনতে পায়নি এ ভারী পায়ের শব্দ। এক ঝটকায় মনে পড়ে, লোকটা হয়তো বাড়ির কাছ থেকেই তার পিছু নিয়েছে। এ ১০ মিনিট তার পিছে পিছেই আসছে। আবার লোকটা গোয়েন্দা নাও হতে পারে। হতে পারে ফালতু টাইপ লোক, যারা মেয়েদের একা পেলেই বিরক্ত করার চেষ্টা করে। হয়তো ভয়ের কিছুই নেই। লোকটার হাঁটার মৃদু শব্দ তার কাছে হাতুড়ির মতো তীব্র লাগছে খেয়াল করার পর থেকে। পুরনো দোকানটার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বুকের মধ্যে হাঁপরের শব্দ টের পায়। দ্বিতীয় সরু রাস্তা দিয়ে ঢোকার পর সালমার পা আর নড়তে চায় না। যেন আঠালো কাদায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গেছে। পেছনে একটা নির্বাক মানুষ। সালমা এ ভয়ঙ্কর নীরবতা সহ্য করতে পারে না। মনে হচ্ছে লোকটা কিছু বলুক তাকে। কে সে, সেটা পরিষ্কার হয়ে যাক এখানেই। যদি সে আমাকে সন্দেহ করে, তাহলে কিছু বলছে না কেন। আস্তে আস্তে সে পৌঁছে যায় রাস্তার পাশের গাছটার কাছে। দূর থেকেই দেখে, ডান হাতে তসবি নিয়ে মাজিদ দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গেই সে ব্যাগটা বাম কাঁধে নিয়ে আসে। আরো কাছে আসতে আসতে দেখে, মাজিদের এখন মুখভর্তি দাড়ি। আতঙ্কিত চোখে প্রশ্ন। উফ! এত কাছে এসেও পেছনের একটা পায়ের শব্দ তার জীবনটা শেষ করে দিল। দ্রুত পায়ে চোখে চোখে কথা বলেই পার হয়ে যায় সালমা। দ্রুত পায়ে মোড় ঘুরেই মেইন রাস্তায় উঠে আসে। হাসপাতালের দিকে এগোতে থাকে। রিসেপশনে অপ্রয়োজনীয় কিছু তথ্য জানতে চায়। ভেতর থেকে একটা চক্কর দিয়েই বাইরে আসে। আশপাশে কোথাও কেউ নেই। দৌড় দেয় আবার সেই গলির দিকে। তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হতে গিয়ে একটি দ্রুতগামী কারের সামনে পড়ে। ড্রাইভার জোরে ব্রেক কষে কোনোমতে গাড়ি থামায়। খেঁকিয়ে ওঠে পশুর মতো। নোংরা ইঙ্গিত করে বলে, আরে আস্তে ধীরে। তোর খদ্দের তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না!

সালমা কিছুই শুনতে পায় না। ঝড়ের বেগে পথটুকু পাড়ি দিয়ে সিনকোনা গাছের কাছে আসে। কিন্তু গাছের আশপাশে কেউ নেই। কাঁপছে সে, যেন জ্বরের রোগী। চারদিকের অসীম শূন্যতা যেন তাকে গিলে খাচ্ছে। বিশাল ডালপালাওয়ালা গাছটা বোবা বোকার মতো শুধু দাঁড়িয়েই আছে। সে কিছুই বুুঝতে পারছে না। যেন সে জানেই না, এখানে কারো অপেক্ষা করার কথা ছিল। দুইটা বছর নিদারুণ অপেক্ষার পর তার নিচেই দুইটা মানুষের এক হওয়ার কথা ছিল। খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকার পরও গাছের আড়াল থেকে কেউ বের হয়ে আসে না। সালমা দুই হাত বাড়িয়ে তবু এগিয়ে যায়। তীব্র আবেগে জড়িয়ে ধরে গাছটাকে। জড়িয়ে থেকেই গাছটার চারপাশে ঘোরে। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। মাঝেমধ্যে শুধু তার নিঃশ্বাসের শব্দ এ জমাট নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিচ্ছে।

গাছটার সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সালমা অনুভূতিশূন্য হয়ে। ডান কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা অবচেতনভাবে শুধু খামচে ধরে থাকে।

(মূল আরবি থেকে অনূদিত)