সাজিদ আলভি আজ দারুণ উত্তেজিত। মাত্রই সে সুইডেনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। ‘আমার পিএইচডি টার্বো জেট ইঞ্জিনের মধ্যে ঘর্ষণ নিয়ে। আমি নতুন অ্যারোস্পেস ম্যাটেরিয়াল তৈরির কাজ করব।’ আলভি তার পার্বত্য অঞ্চলের গ্রাম ছাড়বে, তাই তার আত্মীয়-স্বজনরা তাকে বিদায় জানাতে এসেছেন। নিজের গ্রাম ছেড়ে তিন হাজার মাইল দূরে পড়তে যাচ্ছে সাজিদ।
‘আবার দেখা হবে।’ সাজিদকে উদ্দেশ করে বলছিলেন এক পরিচিত। ‘এ রকম বড় দাড়ি নিয়ে কিন্তু তুমি খুব বেশি দূর যেতে পারবে না। তোমাকে তালেবানের মতো দেখাচ্ছে!’
আলভির পরনে খাটো শর্টস আর ইয়াংকি ক্যাপ, চরমপন্থা থেকে সে অনেক দূরে। আলভি একজন ওয়াখি, সে এমন একটি জাতিগোষ্ঠীর সদস্য, যাদের পূর্বপুরুষরা পারস্যের। এখানকার অন্যদের মতো আলভিও একজন ইসমাইলি— এরা ইসলামের একটি মডারেট ধারা— আগা খান তাদের ইমাম। আগা খান এখন ফ্রান্সে বসবাস করেন। দুনিয়ায় দেড় কোটি ইসমাইলি আছেন। উত্তর পাকিস্তানের এ গোজাল অঞ্চলে প্রায় বিশ হাজার ইসমাইলি বাস করে।
আমি গোজালে ভ্রমণ করছি আজ প্রায় ১৭ বছর যাবত্। আলভির মতো অনেকের জীবনযাত্রা আমি দেখেছি। শক্তিমান কারাকোরাম দিয়ে ঘেরা এ এলাকায় বাস করা ইসমাইলিরা তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করে, কিছু পর্যটকদের দেখা পেলেও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সঙ্গে তাদের পরিচয়টা বেশ কম। কিন্তু এখন উন্নত মহাসড়ক আর মোবাইল ফোন বাইরের দুনিয়াকে এখানে প্রবেশ করতে দিচ্ছে, আর বয়ে আনছে জীবনযাত্রার নতুন রীতি, সুযোগ। শিশুরা বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, ফ্যাশন বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি চিরাচরিত প্রথাকে নতুন চেহারা দিচ্ছে। প্রতিবারই আসার পর গোজাল আমাকে চমকে দেয়, প্রতিবারই ফেরার পর দেখে অবাক হই যে, তাদের ঐতিহ্য কতটা অভিযোজনক্ষম। অনেক পশ্চিমা নাগরিক পাকিস্তান বলতে কেবল সন্ত্রাস আর সহিংসতাকে বোঝেন। আমার আশা, এ লেখার সঙ্গে ব্যবহূত ছবিগুলোর মাধ্যমে তাদের সে ধারণায় সামান্য হলেও পরিবর্তন আসবে। এখানকার মানুষ এ বদনাম নিয়ে ভুগছে এবং অনেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করতে করতে হতাশ। যে পাকিস্তান আমি দেখেছি, তা দেশটি নিয়ে প্রচলিত জনপ্রিয় ধারণা থেকে ভিন্ন। এ বছর গ্রীষ্মে আমি আমার পরিবার নিয়ে গোজালে গিয়েছিলাম। এবং সেখানকার একটি প্রগতিশীল চিন্তার সমাজের ওপর মনোযোগ নিবিষ্ট রেখেছিলাম।
এখানে আমি প্রথম এসেছিলাম ১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে। আমার বয়স তখন ২৫, আমি আর আমার প্রেমিকা পাকিস্তানের উদ্দেশে ওয়ানওয়ে টিকিট কিনেছিলাম। আমরা চড়ার জন্য পার্বত্য ট্রেক খুঁজছিলাম। কারাকোরাম পর্বতমালায় আছে ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত শৃঙ্ঘের সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব। সে সময় প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার বিদেশী পর্যটক পাকিস্তানের এ উত্তরাঞ্চল সফরে আসত। আমরা সেবার এক মাস ছিলাম, নতুন নতুন গিরিপথে গিয়েছি, স্থানীয় ভাষা শিখেছি। কারাকোরাম, হিন্দু কুশ ও পামিরে ঘুরেছি। এর পর আমি বারবার এ অঞ্চলে ফিরেছি কিন্তু প্রতিবারই দেখেছি যে পর্বতারোহীদের সংখ্যা কমেছে। পর্যটন বিভাগের হিসাবমতে, এখানে এখন বছরে মাত্র হাজারখানেক পর্যটক আসেন। স্থানীয় এক ট্যুর গাইড বললেন, ‘১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ হামলার পরে এখানে পর্যটন ব্যবসায় জড়িতরা তাদের জিপ ও হোটেল বিক্রি করে দেন, কারণ এখানে আর পর্যটকরা আসার সাহস করেন না।’
তবে প্রতি বছর ফেরার পর আমি অন্য ধরনের কিছু পরিবর্তনও দেখতে পাই। বিদেশীরা এখন দুর্লভ হলেও কারাকোরাম হাইওয়ের উন্নয়নের পর পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের অনেক পর্যটক এখন ওয়াখি আসছেন। উন্নয়নের ফলে কারাকোরাম হাইওয়ে দিয়ে এখন জিপ বাদেও অন্য যানবাহন চলতে পারে।
তরুণ-তরুণীরা এখন উচ্চশিক্ষার জন্য পাকিস্তানের অন্য শহরে যাচ্ছে। গ্রীষ্মের ছুটিতে যখন তারা ওয়াখি ফিরছে, তখন তাদের পরনে থাকছে হিপ ফ্যাশন। রাস্তার পাশে দোকানের সংখ্যা বেড়েছে, সেখানে নতুন নতুন পণ্য, মিষ্টি স্ন্যাকস, সোডা পাওয়া যাচ্ছে। পাঞ্জাবের জনপ্রিয় ডিশ বিরিয়ানি অনেক ক্ষেত্রে এখন স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শালগমের স্যুপ ও গমের রুটিকে প্রতিস্থাপিত করেছে। বাহ্যিক যত পরিবর্তনই হোক না কেন গোজালের আত্মচেতনা আগের মতোই আছে।
জান বলল, ‘এই দুর্গম অঞ্চলে অতিথিদের প্রতি আমাদের সম্মান এতটুকু কমেনি। আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন শহরে পড়তে যায় কিন্তু অন্তরের গভীরে আমার কেবল এ পার্বত্য অঞ্চলের কৃষক। পশ্চিমা দুনিয়া আমাদের নিয়ে যে রকম ভাবে, তা নিয়ে আমার বেদনা অনুভব করি। আমরা কেবল অন্যদের এ ধারণা নিয়ে কৌতুক করতে পারি, এ নিয়ে আমাদের বিরক্ত হওয়া উচিত নয়।’
আলভির বিদায় উপলক্ষে পার্টির পরের দিন আমার কাছের এক পাহাড়ে উঠলাম, যেখানে অনেক তরুণ জমায়েত হয়েছিল। দূরে তুপোপদানের চূড়া দেখা যাচ্ছিল— ওয়াখিতে এ নামের অর্থ ‘সূর্যের আলো প্লাবিত পর্বত’। এটি একটি সবুজ মরূদ্যান ও পাসু গ্রামের পাশে টাওয়ারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন সিল্ক রোডের একটি শাখা বিরান উপত্যকার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে। এ চূড়াগুলোর ওপাশে মধ্য এশিয়া, চীন ও আফগানিস্তানের মরুভূমি আর সমতল। জড়ো হওয়া তরুণদের পরনে ছিল স্টাইলিশ টি-শার্ট, স্টাইলিশ দাড়ি ও পনিটেইল। আবার অনেকে এসেছিলেন ঐতিহ্যবাহী সাদা প্যান্ট ও লম্বা জামায়। চার তরুণ মিলে বয়ে এনেছিলেন এক বিরাটাকার স্পিকার, যাতে উচ্চৈঃস্বরে নাচের ট্র্যাক ও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী সংগীত বাজানো হলো। আমরা যখন নাচছিলাম, তখন মেয়েদের একটা দল আমাদের দেখে হাসছিল। আরেক দল মেয়ে আমাদের গুরুত্ব না দিয়ে ভলিবল খেলায় মেতে ছিল।
আলভি বলছিল, ‘তারা সবাই স্কুলে যায় এবং অন্ততপক্ষে পাঁচটি ভাষায় কথা বলতে পারে।’ আমাদের কথা চলছিল ইংরেজি, ওয়াখি ও উর্দুর সংমিশ্রণে। ‘আমাদের এখানে একটা কথা খুব বিখ্যাত: আপনার যদি দুই সন্তান থাকে এবং আপনার যদি কেবল এক সন্তানকে শিক্ষাদানের সামর্থ্য থাকে, তাহলে কেবল মেয়েকে পড়াশোনা করান।’
কয়েক দিন বাদে এসার আলী বলছিলেন, ‘সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো এসেছে শিক্ষা থেকে। এখন আমরা গ্রামের শহরে এমনকি বিদেশে যাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে।’ এর পর তিনি হাতের ফোনটির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘অনেক পরিবর্তন এ ফোনগুলো থেকেও আসছে।’ বাইরের দুনিয়া ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে এখানকার মানুষের সম্পর্ক স্মার্টফোন ও মোবাইল ডাটা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বদলে গেছে। আলী জানালেন, ‘শায়নার (তার স্ত্রী) সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্ আমাদের গ্রামের কাছের এক শহরে। সেখানে বেশ ভালো টুজি নেটওয়ার্ক ছিল।’ আলী বলে চললেন, ‘তার পর আমাদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান শুরু হলো। কেউ বাসায় না থাকলে আমাদের কথা বলাও শুরু হলো। আমাদের ঐতিহ্যে কারো সঙ্গে সম্পর্ক মানে একটা পবিত্র বিষয়। তাই যখন ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্ক গড়ে তুলছিলাম, তখন আমরা আমাদের অভিভাবক, গুরুজনদের মনে কোনো আঘাত দিতে চাইনি। ফোন থাকুক বা না থাকুক, আমাদের রীতিনীতিকে অবশ্যই জীবিত রাখতে হবে।’
আজ এসার আলীর সঙ্গে শায়নার বিয়ে। তবে ১০ বছর আগেও বিয়ের প্রক্রিয়াটা অনেক ভিন্ন ছিল। কারণটা এই নয় যে, সে সময় মোবাইল ফোন ছিল না। ‘আমাদের পিতা-মাতারাই পাত্র-পাত্রী বাছাই করতেন’, আলী জানাল। ‘কিন্তু এখন সত্যি বলতে সবই প্রেমের বিয়ে অথবা বলা যেতে পারে পরিবারের আয়োজনে প্রেমের বিয়ে। আমরা পিতা-মাতাকে জানাই যে, অমুক মেয়ে বা ছেলে আমার পছন্দ।’
বিয়ে বাড়ির সামনে দুটো লম্বা লাইন; এক লাইনে পুরুষরা আরেক লাইনে নারীরা। ঘোমটা আর এম্ব্রয়ডারি করা কাপড়ে মাথা ঢাকা একজন বয়স্ক নারী আমাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তিনি আমার ডান হাতটি নিয়ে তার ওপর চুমু খেলেন। আমিও তার হাতে চুমু খেলাম; এটা ওয়াখিদের সম্ভাষণ জানানোর রীতি। আমি লাইন ধরে এগিয়ে যেতে যেতে স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী সব নারীকে জিজ্ঞাসা করছিলাম যে, ‘প্রিয় মা, আপনার শরীর কেমন?’
ঘরটা এখানকার আর দশটা মাটির তৈরি ঘর। ভেতরে বিরাট এক খাবারের পাত্রের সামনে তরুণরা দাঁড়িয়ে আছে। আলী এগিয়ে এসে বলল, তার মনে হচ্ছে যে আমি ক্ষুধার্ত। পাত্রের খাবারের দিকে ইঙ্গিত করে সে বলল, ‘তারা ২০০ মানুষের জন্য বাট (স্থানীয় খাবার) তৈরি করেছে। ভেড়ার মাংস দিয়ে আমরা এই বাট খাব আর থাকবে অনেক চা।’
আমার স্ত্রী আর দুই পুত্র কাছেই কোথাও ক্রিকেট খেলেছে। বাইরে তাকাতেই দেখলাম নতুন বধূ তার বন্ধুদের নিয়ে আমার স্ত্রীর সঙ্গে সেলফি তুলছে। তারা আমাকেও সেলফিতে শামিল হতে আহ্বান জানাল।
এখানে অনিমন্ত্রিত অতিথি বলে কোনো ধারণার প্রচলন নেই। আমাদের সঙ্গে ছিল প্যারিস থেকে আসা ইমানুয়েল ও জুলিয়েন। তারা তাদের দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। ইমানুয়েল বলছিল, ‘আজকের বিশ্ব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমি যখন পাকিস্তানে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করছিলাম, তখন অনেকেই ভেবেছিল যে আমি কৌতুক করছি। আমরাও উদ্বিগ্ন হয়ে একবার সফর প্রায় বাতিল করে দিচ্ছিলাম।’ তবে এখন ইমানুয়েল খুশি যে, সে বাতিল করেনি। এখানে এসে সে যা দেখছে, তা তার অনুমানের থেকে ভিন্ন কিছু।
বারবার এখানে ফিরে আসি আর প্রতিবারই এখানকার মানুষদের সামনে আমাকে নত হতে হয়। এখন বাইরের দুনিয়ার অনেক পরিবর্তন স্থানীয় দৈনন্দিন জীবন ও সম্পর্কে প্রবেশ করেছে। আধুনিক দুনিয়ায় এক পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে গোজালের মানুষ তাদের নিজেদের ঐতিহ্য ও প্রেরণাকে অক্ষুণ্ন রেখেছে। এ রকম কম জানাশোনা বা ভুল ধারণা নিয়ে থাকা কোনো জায়গায় ভ্রমণ জীবনকে নতুন পরিপ্রেক্ষিতের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমার আশা এ স্থানের লাবণ্য আরো অনেককে স্পর্শ করবে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক






