রাসকিন বন্ড ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক। ১৯৩৪ সালে ভারতে ব্রিটিশ মা-বাবার ঘরে তার জন্ম। তাকে ভারতের জীবিত সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের অন্যতম বিবেচনা করা হয়। তিনি ইংরেজি ভাষায় লেখেন। ভারতের শিশুসাহিত্যের বিকাশে তার অবদানকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। পেয়েছেন ভারতের অন্যতম বেসামরিক সম্মান পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ। আরো পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার।
রাসকিন বন্ডের লেখায় সহসাই উঠে আসে হিমালয়ের প্রকৃতি, হিলস্টেশনের গল্প। বন্ড নিজের জীবনের প্রায় পুরোটাই কাটিয়ে দিয়েছেন পার্বত্য এলাকায়, কিছুটা নিঃসঙ্গভাবে। আ বুক অব সিম্পল লিভিং: ব্রিফ নোটস ফ্রম দ্য হিলস (২০১৫) গ্রন্থে বন্ডের ৮০ বছরের জীবনের নানা অভিজ্ঞতালব্ধ চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘এ বইটি কেবল এটুকুই জানাতে পারে যে, এই দুনিয়ায় আপনাদের আরো একজন সহযাত্রী ছিলেন।’ বন্ডের সেই নোটবইয়ের কিছু অংশের অনুবাদ এখানে উপস্থাপন করা হলো—
১.
এক পশলা বৃষ্টির পর রাতে ঘরের বাইরে উন্মুক্ত প্রকৃতিতে বসে ছিলাম। বাতাসে ভেসে আসছে ঝিঁঝি, ফড়িং আর ছোট ছোট ব্যাঙের কোলাহল। এসবের মধ্যে একটা সুরেলা শব্দ কাঁপছিল, বারবার সেই কম্পমান সুরের পুনরাবৃত্তি ঘটছিল— এই বিশেষ শব্দটির উত্স আমি শনাক্ত করতে পারিনি। হতে পারে এটা কোনো ক্ষুদ্র গেছো ব্যাঙ। আবার একটা ছোট সবুজ ঝিঁঝি পোকাও হতে পারে। আমি কোনো দিনই তার পরিচয় জানতে পারব না।
আমি ঠিক নিশ্চিত নই যে, আমি সত্যি সত্যিই তার পরিচয় জানতে আগ্রহী কিনা। আজকের দিনে তো আমাদের দেখা প্রায় সবকিছুরই বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দেয়া হয়। তাই নিজের কাছে একটা রহস্য থাকা মন্দ না; একটা মিষ্টি রহস্য, যার পুরোটাই আমার নিজের।
২.
জীবনে খুব ছোট ছোট জিনিসই আমাদের পাগল হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। খুব পছন্দের বা অনেক বেশি উত্তেজনাকর কাজের তুলনায় এরাই আমাদের জীবনের সুখ ও স্বাস্থ্যের জন্য বেশি অবদান রাখে।
একবার দিল্লির এক নার্সিং হোমে দু-তিনদিন আমাকে বন্দি থাকতে হয়েছিল। প্রায় পুরোটা সময়ই বিছানায় থাকতে হয়েছিল। অসুস্থতার চেয়ে বেশি ভয়ানক ছিল ডাক্তারের দেয়া একগাদা টেস্ট— ইসিজি, আলট্রাসাউন্ড, এন্ডোসকপি, এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা। সব পরীক্ষা শেষে যে মোটা বিলটা আমাকে ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তাতে আমার প্রায় হার্ট অ্যাটাক হয় হয় অবস্থা।
মনে হচ্ছিল দৌড়ে রাস্তায় গিয়ে মানুষের কাছে চিত্কার করে সাহায্য চাই। তবে তা করতে হয়নি শুধু একটা জিনিসের কারণে— আকাশে ভেসে বেড়ানো একটা কবুতর আমাকে সেদিন বাধা দিয়েছিল। কবুতরটা সেই নার্সিং হোমেই থাকত, দিনে কয়েকবার তার বাকবাকুম ধ্বনি আমার স্নায়ুকে শান্ত করে দিত। সে সময় আমার মানসিক সুস্থতার জন্য আমি সেই কবুতরটির কাছে ঋণী।
এ ঘটনাটি লিখতে লিখতে আমি এ রকম আরো কিছু বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই, যা আমাকে মানসিক প্রশান্তি দিয়েছে।
আমার বুড়ো শরীরের হাড়ে শীতের মিষ্টি রোদ।
শিশুর হাসি।
ছায়াঘেরা নির্জন কোনো ঘুপচিতে ঝিঁঝির গান।
পেঁয়াজ ভাজার ঘ্রাণ।
একটা ছোট পাখির বাসা।
অন্ধকারে একটি চুমু।
গাঢ় বেগুনি আকাশে নতুন চাঁদ।
৩.
কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘প্রকৃতিই কি আপনার ধর্ম?’ এ প্রশ্নটাই হঠকারী। কারণ প্রকৃতি আপনার কাছে কোনো ওয়াদা করে না— পরকাল, ভালো আচরণের জন্য পুরস্কার, শত্রুর হাত থেকে সুরক্ষা, সম্পদ, সুখ, বংশধর— যা যা মানুষের চাহিদা, যেসব পাওয়ার জন্য মানুষ প্রার্থনা করে, প্রকৃতি সেগুলোর কোনোটাই দেয়ার জন্য মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি দেয় না। প্রকৃতি নিজের মধ্যেই একটা আশীর্বাদ। প্রকৃতির মধ্যেই এর প্রশংসা করতে হবে, তাকে বুঝতে হবে, বাস করতে ও ভালোবাসতে হবে। প্রকৃতি তার নিজের পথেই ধরণীকে সুস্থতা দেয়, আরো দেয় সাগর, আকাশ, খাদ্য, পানি ও আমাদের শ্বাস নেয়ার জন্য বাতাস। এসবই আমরা প্রকৃতির দান হিসেবে গ্রহণ করি।
যখন আমরা প্রকৃতির দানশীলতাকে অপচয় বা অতিরিক্ত ব্যবহার করি, তখন সে আমাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। প্রকৃতি এমন সব শক্তিকে উন্মুক্ত করে দেয়, যা আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়— ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, টাইফুন, বন্যা, খরা। তারপর আবার একসময় সে শান্ত হয় এবং সবকিছু ঠিক করে দেয়।
সরকারের উত্থান ও পতন ঘটে, মেশিন নষ্ট হয়ে যায়, আকাশচুম্বী দালান ভেঙে পড়ে কিন্তু পর্বত তখনো দাঁড়িয়ে থাকে, নদী সাগরে বয়ে যায় এবং ধরণী ঘাস আর শ্যামলিমায় আচ্ছাদিত থাকে।
৪.
দুনিয়ায় পথ চলতে চলতে অবশ্যম্ভাবীরূপে আমাদের অনেক নীচতা ও স্বার্থপরতার মুখোমুখি হতে হয়। নিজেদের অস্তিত্বের জন্য লড়তে লড়তে অনেক সময়ই আমাদের নীতি-আদর্শগুলো ফিকে হয়ে আসে। আর তখনই আমাদের দরকার হয় একটা গুবরে পোকার! এই ক্ষুদ্র জীব কিংবা যে ফুলের মধ্যে এটি আশ্রয় নেয়, তার কথা চিন্তা করলে আমরা একটি সম্ভাবনা পাই— নিশ্চয়তা পাই যে, এ দুনিয়ায় সুদের হার, ডিভিডেন্ড, বাজার ও অসীম প্রযুক্তির বাইরেও আরো জীবন আছে। ছোট-বড়, আপনার ও আমার এবং এমনকি গুবরে পোকার জন্যও জায়গা আছে।
৫.
অর্থের জন্য অনেক সময় অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়।
-রালফ ওয়ালডো এমারসন
আপনার যদি কিছুই না থাকে তাহলে আপনি ধনী। অর্থ মানুষকে সুখী করতে পারে না।
তবে দারিদ্র্যও কাউকে সুখী করতে পারে না।
রহস্যটা হলো, আপনার প্রয়োজনমতো থাকা বা একটু বেশি থাকা এবং তারপর নিজের সবকিছু অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়া।
সেনেকা বলেছিলেন, ‘আমি জীবনকে উপভোগ করি। কারণ আমি একে ত্যাগ করতেও প্রস্তুত।’ আমরা যদি আমাদের জাগতিক বস্তুর ১০ ভাগের নয় ভাগের বোঝা ঘাড় থেকে সরিয়ে দিতে পারি তাহলে বাকিটাও ফেলে দেয়াটা কঠিন হবে না।
৬.
১৯৫৫ সালের মার্চ। তিন বছর যুক্তরাজ্যে কাটিয়ে আমি ভারতে ফিরছিলাম। যুক্তরাজ্যের সবকিছুই যেন মিস করছিলাম। আমার বয়স তখন একুশ, তিন বছর হতে চলল নিজের খরচ নিজেই উপার্জন করছি। কিন্তু অনেক বিবেচনায় আমি তখনো একজন বালক— মনের মধ্যে বালকসুলভ স্বপ্ন, চিন্তা, রোমান্স আর অভিযাত্রার স্বপ্ন। এবং আমি তখন একজন একাকী বালক, সেই বিরাট জাহাজে একাকী— যাত্রী, ক্রু সবাই আমার অপরিচিত— ভেসে চলছিলাম এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে।
জাহাজে আমার সঙ্গে দুটো বই ছিল— থরিউর ওয়ালডেন ও রিচার্ড জেফরির দ্য স্টোরি অব মাই হার্ট। দুটো বই-ই ছিল প্রাকৃতিক দুনিয়ার প্রতি আমার ক্রমবর্ধমান আগ্রহের চিহ্ন। কিন্তু দিনের বেলা কেবিনগুলো খুব গরম আর মানুষে পূর্ণ থাকত। ডেকেও ভিড় লেগে থাকত, তাই যাত্রা শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি মোটামুটি পড়াশোনাটা স্থগিত করেছিলাম। রাতে ডেক ঠাণ্ডা হয়ে যেত, বেশির ভাগ যাত্রী নিচে চলে যেত সিনেমা দেখতে নয়তো পোলিশ ভদকা পান করতে (আমাদের জাহাজটা ছিল পোলিশ)। আমি তখন রাতের তারাভরা আকাশের তলে বসে থাকতাম, জাহাজ ছুটে চলত লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে। কোনো শব্দ থাকত না, কেবল জাহাজের নাটবল্টু আর খোলা পোর্টহোল দিয়ে ভেসে আসা সংগীতের মৃদু শব্দই শোনা যেত।
জাহাজের ডেকে বসে সে সময় ভবিষ্যতের চিন্তা করতে করতে আমার মনে থরিউর লেখা দুটো লাইন ঘুরতে থাকত, ‘আমি কেন একাকী বোধ করব? আমাদের গ্রহ কি মিল্কি ওয়েতে ঘুরছে না?’





