অনন্ত আর মুহূর্ত

সবুজবুক প্রান্তরের পথে মুহূর্ত’র দেখা অনন্ত’র সাথে।

 

মুহূর্ত’র গায়ে রঙিলা টি-শার্ট, অনন্ত’র ধূসর আলখাল্লা;

মুহূর্ত চঞ্চলমতি, অনন্ত খুব গম্ভীর-স্থির।

তবু চুপকথায় দুজনায় হঠাত্ কী ঘটে গেল—

মুহূর্ত শিষ্যত্ব নিল অনন্ত গুরুর।

 

তারপর অনন্ত’র পিছু অনুগত হেঁটে হেঁটে

মুহূর্ত মিলিয়ে গেল গোধূলির দিগন্তরেখায়।

 

সেই মুহূর্তকে কেউ ফিরে আর দেখেনি কখনো। 

 

 

বিরহবিলের বেদনাসারস

বিরহবিলের আলের মাথায়

জোস্নাগন্ধী বেদনাসারস ওড়ে,

বাতাসের বেশে সারা রাত বাজে

একা আকাশের দীর্ঘশ্বাসের বাঁশি।

 

বিধবা নদীর ঢেউমরা বুকে

ধবধবে চাঁদ, তারার মোহর ধুঁকে...

জলমুকুরের ফ্রেমে ঝুলে আছে

ভাঙা সাঁকোটির বিপরীত দুই পার।

 

দাঁড়-মাঝি নেই, যাত্রীও নেই;

ঘাটে বোবা খেয়া অজানা অপেক্ষায়!

বাউল বটের জটাধারী মাথা

গ্রাম-তেমাথায় ঝুঁকে আছে কতকাল!

 

কোন দুখে নীল জোনাকির ঝাঁক

খুন হয়ে গেছে বিষকাঁটালির ঝোপে?

তারও বহু আগে ওমবন থেকে

গায়ক টিয়ারা পাহাড়ের পথে গুম।

 

এমন রাতের পাঁজরের ভাঁজে

অপরূপ কোনো কবিতা উড়াল খোঁজে—

শূন্যতারং ছবির কুহক

নীরব গল্পে মশগুল হতে থাকে।

 

 

অন্তত অনন্তকাল

অন্তত চূড়ান্ত কিছু বলো—

বোবাও থাকে না চিরচুপ।

 

অন্তত পড়ন্ত সূর্য ধরো—

জ্বলন্ত ভোরের তেজ মৃত।

 

অন্তত মহন্ত মেঘে ভাসো—

পাথরও প্রাণের ছন্দ মানে।

 

অন্তত দিগন্তে রাখো চোখ—

আশপাশ না হয় তাকালে না।

 

অন্তত অনন্তকাল থেকো—

তার আগে যেও না কোথাও।

মোহনপুর

জলের কার্পেট-পাতা বিজন বিলের ড্রইংরুমে

নানান পাখির মাঝে মান্যবর সাদা বক প্রধান অতিথি।

থোকা থোকা বাঁশঝাড়, অন্যপাশে পানের বরজ— সারি সারি

আম, জাম, নিম, কলা, শিমুল, কড়ই গাছের ফাঁকে ফাঁকে

পাতাবাহার, ইউক্যালিপ্টাস, ঘোড়ানিম যেন অভিবাসী বন্ধু।

 

গেঁয়োপথে পুরাতন পুলটির পায়ে বাঁশের ভ্যান পল্টি খেয়ে

লেগেছে যানজট— তাতে আটকা পড়েছে খড়ের রিকশা, হাটযাত্রী;

মাটির কলসিবোঝাই ঠেলাগাড়ি আর বালিকা মাদ্রাসাছাত্রী।

স্বেচ্ছাসেবক পল্লীযুবক কায়মনে নেমেছে উদ্ধারকার্যে—

শতবর্ষী মন্দিরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ঘটনাস্থানের দিকে

শুভকামনায় তাকিয়ে আছেন বহুদর্শী বুড়ি ঠাকুরমা।

 

অনতিদূরের বিলটি উঁচা, জলশূন্য শুকনা যার

সিনার পিঞ্জর ভেঙে উঠে গেছে ইটভাটার আকাশমুখী চোঙা—

তার দৈত্যরূপ মুখ অনর্গল উগরে দিচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী।

 

পেটে-ভাতে বেঁচে-থাকা এ-গাঁয়ের মানুষেরা কখনো ভাবে না—

কয়লায় কী পোড়ায়? মাটি না মোহনপুরের শ্যামল হূদয়?

 

আমাদের ভালোবাসা

আমাদের ভালোবাসা রাতদিন শেষহীন সামুদ্রিক ঢেউ—

নিখিল নীলের আলোড়নে ফেনিল ফণায় সাদা।

 

আমাদের ভালোবাসা অবিরাম কম্পমান জলের প্রতিমা—

তুমুল রোদের ডাকে লোনাঘর ছেড়ে উড়ে ধূসর মেঘপাখি...

বর্ষার অজস্র বর্শা হয়ে ফিরে আসে ফের প্রিয় ঠিকানায়।

 

কখনো নীলের বুকে তাজাতেজি দুপুরের রুপালি সাঁতার,

কখনো বিদায় কাঁদে; গোধূলির লাল-কমলা বিষাদের ফাঁদে।

আমাদের ভালোবাসা বহুদূরে শোঁ শোঁ ভাসা ঝাউয়ের ক্রন্দন—

বিরান বালুর চরে বালিয়াড়ির পিঠের মতো অন্ধকারে

বেজে ওঠা ঝিঁঝির গুঞ্জনে জোনাকিঝাঁকের জ্বলা-নেভা খেলা।

 

আমাদের ভালোবাসা মোহনার সীমানায় দিশারি গাংচিল,

তবুও ভাটির টানে তলে তলে ঘাপটি-মারা খুনি চোরাবালি।

ভালোবাসা— কখনো সে দমকা বাতাসের রোষে বেদম ধমকায়,

এভাবেই ঝড় ওঠে; সেই ঝড়ে তুমি-আমি-আশা-ভালোবাসা

ধ্বংসের থাবায় ক্ষুদ্র এক ডিঙির ভাসান, থরোথরো কাঁপা।