সৌদি আরবের রাজপরিবার নিয়ে আছে নানা কথা ও কিংবদন্তি। সৌদির এ রাজপরিবারকে কখনো কখনো সৌদ পরিবার বলেও উল্লেখ করা হয়। মূলত প্রতিষ্ঠাতার নাম অনুসারেই পরিবারের নামকরণ করা হয়। আজ যাকে হাউজ অব সৌদ বলা হয় তার প্রতিষ্ঠাতা মূলত সৌদ বিন মুহাম্মদ আল-মাকরিন। যদিও আধুনিক হাউজ অব সৌদের প্রসঙ্গ এলে সে আলোচনায় মাকরিনের নাম ততটা আসে না। এর অন্যতম কারণ তিনি কেবল সূচনা করেছিলেন একটি নতুন বংশ ও সাম্রাজ্যের। পরবর্তী সময়ে যেভাবে সৌদ পরিবার গড়ে ওঠে সেই গঠনের সঙ্গে মাকরিনের সংযুক্তি তুলনামূলক কম। কিন্তু সৌদি আরব বা সৌদ বংশের ইতিহাসের পাতা উল্টে অতীতের দিকে গেলে তাকে প্রতিষ্ঠাতার আসনেই পাওয়া যাবে।
সৌদ বংশের গল্পটা শুরু হয় দিরিয়া থেকে। রিয়াদের নিকটবর্তী এ অঞ্চলের ওপর অধিকার ছিল সৌদ বিন মুহাম্মদ আল-মাকরিনের পরিবারের। পরিবারটি আরবের আমির ইবনে সাসা গোত্রের অন্তর্গত। সৌদের পরিবারের উত্থান এই দিরিয়া থেকেই হয়েছিল। মূলত নজদের ওয়াদি হানিফা উপত্যকায় পঞ্চদশ শতাব্দী থেকেই লোকবসতি স্থাপন শুরু হয়। সে সময় দিরিয়া ছিল সাধারণ একটি ছোট গ্রাম। দিনে দিনে তা বর্ধিত হতে শুরু করে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে দিরিয়ায় ক্ষমতার অধিকার লাভ করেন সৌদ বিন মুহাম্মদ আল-মাকরিন। এ সময়ের মধ্যে দিরিয়া বহু রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে এসব রক্তক্ষয় হতো।
সৌদ পরিবারের প্রথম ক্ষমতাসীন ছিলেন মানি আল-মুরাইদি। তার চতুর্থ উত্তরাধিকারী মারখানের পর পরিবার বিভক্ত হয়। একদিকে রাবিয়া ও অন্যদিকে মিকরিন। এ দুই শাখার মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু তা অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত স্পষ্ট ছিল না। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দশকে দিরিয়ার ক্ষমতা ছিল রাবিয়ার পৌত্র ইদরিস ইবনে ওয়াতবার হাতে। তিনি হাসার সুলতান হামদ আল-কোরেশি কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হন। বনু খালিদ গোত্রের সঙ্গে এদের সদ্ভাব ছিল। আল-কোরেশি গুপ্তহত্যার শিকার হন ১৭০৮ খ্রিস্টাব্দে। ক্ষমতা যায় তার ভাই আবদুল্লাহর হাতে কিন্তু সেও পরের বছর নিহত হয়। এরপর দিরিয়ার ক্ষমতা লাভ করেন মুসা ইবনে রাবিয়া ইবনে ওয়াতবা (ইদ্রিসের ভ্রাতুষ্পুত্র)। ওয়াতবার উত্তরাধিকারীরা যখন ক্ষমতায়, মিকরিনের বংশ তখন ছিল নির্বাসিত। মুসাকে হটিয়ে ক্ষমতার দখল নেন মিকরিনের উত্তরপুরুষ সৌদ ইবনে মুহাম্মদ আল-মাকরিন। ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিরিয়ার আমির হন এবং তার হাত দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় সৌদ বংশ।
সৌদ ইবনে মুহাম্মদ আল-মাকরিন বেশিদিন শাসন করেননি। ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দেই তার মৃত্যু হয়। এরপর ক্ষমতা আবার চলে যায় জ্ঞাতিদের হাতে। দিরিয়ার আমিরের পদে আসীন হন জাইদ ইবনে মারকান ইবনে ওয়াতবা। কিন্তু বেশিদিন শাসন করতে পারেননি তিনি। দিরিয়ার উত্তরে উয়াইনায় কয়েকটি মহামারী আক্রমণ করে। অঞ্চলটি ছিল সেকালের আরবের সবচেয়ে কর্মব্যস্ত শহর। সেখান থেকে মহামারী ছড়িয়ে পড়ে দিরিয়া পর্যন্ত। একটিতেই থেমে থাকেনি। সেই বেশ কয়েকটি মহামারী ও অন্যান্য কারণে জাইদের শাসন ভেঙে পড়ে। জাইদের ক্ষমতা হারানোর পর সৌদ বিন মুহাম্মদ আল-মাকরিনের পুত্র মুহাম্মদ বিন সৌদ আল-মাকরিন ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতা লাভ করেন। শাসন করেন ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তার পুত্র আবদুলআজিজ ক্ষমতা লাভ করেন ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে এবং শাসন করেন ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।
সৌদ বিন মুহাম্মদ আল-মাকরিন যে বংশের পত্তন করেন তা মাত্র বছর দেড়েকের জন্য ক্ষমতা হারায়। কিন্তু সৌদ বিন মুহাম্মদ আল-মাকরিনের পুত্র ক্ষমতা লাভ করার পর এ বংশের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সৌদ বিন মুহাম্মদের মৃত্যুর দুই দশক পর তার পুত্র মুহাম্মদ ইবনে সৌদ একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আবদ আল-ওয়াহাবের সঙ্গে। প্রথম সৌদি রাষ্ট্র স্থাপনের ক্ষেত্রে এটি ছিল অন্যতম বড় একটি পদক্ষেপ। এর মধ্য দিয়েই বর্তমান সৌদির ভিত রচিত হয়।
কিন্তু পুরো বিষয়টির পেছনে সৌদ বিন মুহাম্মদ আল-মাকরিনের তৈরি করা ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ। পার্শ্ববর্তী অন্য ক্ষমতাসীনরা যখন দিরিয়ার ওপর শকুনের দৃষ্টি দিয়েছিল সে সময় তিনি নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। দিরিয়ার তুরাইফে তিনি একটি দুর্গ তৈরি করান। সেখানেই বসবাস করত তার পরিবার। উত্তরাধিকারী অর্থাৎ প্রিন্সদের সুরক্ষার বিষয়ে তিনি মনোযোগী ছিলেন। মুহাম্মদ ছাড়াও তার ছিল তিন পুত্র—থুনায়ান, মিশারি ও ফারহান। এদের মধ্যে মুহাম্মদই ইতিহাসে বিখ্যাত। তিনি সৌদের উত্তরাধিকার বহন করেছেন পূর্ণরূপে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো সৌদ বিন মুহাম্মদ আল-মাকরিন যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন সে বংশটির নাম তার পূর্বপুুরষ মানি আল-মুরাইদির নামে ‘মানি’ বলে পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইবনে সৌদের সময় থেকে বংশটি সৌদ বংশ নামে পরিচিত হতে থাকে।
এ তো ছিল প্রথম সৌদের কথা। সৌদি তথা সৌদ বংশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মূলত ইবনে সৌদ। ১৯৩২-১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি সৌদি আরবের ‘রাজা’ হিসেবে একচ্ছত্র শাসন করেন। তার উত্থান, শাসন ও শাসনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ১৯০২-৩২ পর্যন্ত তিনি ছিলেন নজদের আমির। এর মধ্যে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে হেজাজ আসে তার হাতে। এরপর ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে সৌদি আরব নামে আমরা যে অঞ্চলকে চিনি তার শাসকে পরিণত হন। ইবনে সৌদ নামে পরিচিত এ ব্যক্তির পুরো নাম আবদুলআজিজ বিন আব্দুল রহমান আল-সৌদ। তার সময়ে আধুনিক সৌদি তথা সৌদি আরবের পত্তন হয়।
ইবনে সৌদের জন্ম ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি। সৌদরা ততদিনে দিরিয়া থেকে ছড়িয়ে পড়েছেন এর আশপাশে। ইবনে সৌদের জন্ম রিয়াদে। তার পিতা আব্দুল রহমান বিন ফয়সাল এবং মাতার নাম সারা বিনতে আহমেদ আল-সুদাইরি। আল-সৌদ, আব্দুল রহমানের চতুর্থ সন্তান। আব্দুল রহমান ছিলেন নজদ আমিরাতের শেষ সুলতান বা আমির। রিয়াদকেন্দ্রিক শেখ ছিলেন আব্দুল রহমান। ইবনে সৌদের যখন জন্ম হয় তার প্রায় ১৩০ বছর আগে থেকে মধ্য আরবে সৌদ বংশের আধিপত্য ছিল। কিন্তু সে আধিপত্যে তিনিও অংশীদার হতে পারবেন বা হবেন এমন নিশ্চয়তা ছিল না। তিনি তার পিতার বহু সন্তানের মধ্যে একজন ছিলেন। এর সঙ্গে ছিল বহিঃশত্রুর আক্রমণের সম্ভাবনা এবং তা সত্যও হয়েছিল।
সৌদ বংশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-রশিদ। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি রিয়াদ আক্রমণ করে সৌদদের পরাস্ত করেন। ইবনে সৌদের বয়স তখন ১৫ বছর।
রশিদের এ আক্রমণের পর সৌদ ও তার পরিবার দক্ষিণ আরবের মরুভূমিতে বসবাসকারী বেদুইন গোত্র আল-মুরার কাছে আশ্রয় নেন। ইবনে সৌদ এরপর কাতারে গিয়ে দুই মাস বসবাস করেন। এরপর বাহরাইন এবং তারপর অটোমান রাষ্ট্র তাদের কুয়েতে বসবাসের অনুমতি দেয়। সেখানে প্রায় এক দশক পরিবারটি বসবাস করে এবং মুবারক আল-সাবাহর সঙ্গে তিনি সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৯০১ সালের ১৪ নভেম্বর ইবনে সৌদ তার সৎ ভাই মুহাম্মদ ও অন্য আত্মীয়দের নিয়ে নজদে ঝটিকা আক্রমণে বের হন।
সৌদ ও তার দল ১২ ডিসেম্বর আল-আশায় পৌঁছে। রশিদ সমর্থকদের বিরুদ্ধে এ অভিযানে বিভিন্ন গোত্র সৌদকে সমর্থন জানিয়ে তার সঙ্গে যুক্ত হয়। রশিদের পক্ষ থেকে কাতারের শাসক জসিম বিন মোহাম্মাদ আল-থানিকে অনুরোধ করেন যেন উদ্যোগী হয়ে সৌদকে থামানো হয়। এতে সৌদের বাহিনীতে কিছু প্রভাব পড়ে এবং তার বাহিনী থেকে সৈন্য কমে যেতে শুরু করে। কিন্তু সৌদ পিছু হটার মানুষ ছিলেন না। ১৯০২ সালের ১৫ জানুয়ারি ৪০ জন লোক দেয়ালঘেরা রিয়াদ শহরে ঢুকে এর দখল নেয়। শহরের গভর্নরকে হত্যা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো এ অঞ্চলের দখল সৌদ পরিবারের হাতে আসে। শুরু হয় ইবনে সৌদের জয়যাত্রা।
বর্তমান সৌদি আরব বা আরব উপদ্বীপের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল নজদ। সেখান থেকেই সৌদ বংশের উত্থান। নজদ থেকেই উত্থান ওয়াহাবিদের। রিয়াদ দখলে সফল হওয়ার পর পুরো নজদে নিজের দখল বজায় রাখার চেষ্টা করেন ইবনে সৌদ। এ কাজে তিনি সফলও হন। রিয়াদ দখলের দুই বছরের মধ্যে অর্ধেক নজদে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন ইবনে সৌদ। নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী। সেই প্রভাব ও কূটনীতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজ অনুসারীদের অনুগত রাখতে সক্ষম হন। তাদের নিয়মিত অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সক্ষম ও কর্মঠ রেখেছেন ইবনে সৌদ। তার প্রভাবের কারণে আল-রশিদের শাসন খর্ব হয় এবং তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন করেন।
নজদের উপত্যকায় ইবনে সৌদের অভিযান চলে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরবের পূর্ব উপকূল। আরবে তিনিই ভ্রাতৃত্বের ধারণা চালু করেন। ইখওয়া নামে এ ব্যবস্থায় সৈন্যরা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সালাফি ওলামার অনুমোদনে যুদ্ধে গমন করত। এর ফলে সৈন্যদের মধ্যে একত্ব তৈরি হয়।
তবে সৌদ কেবল যুদ্ধবাজ ছিলেন না। আরবের কৃষিতেও তার অবদান রয়েছে। অতি প্রাচীনকাল থেকেই আরবের জনগণ যাযাবর এবং পশুপালন তাদের একমাত্র পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ইবনে সৌদ একটি কৃষি নীতি গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে বেদুইন গোত্রগুলোর সঙ্গে ইখওয়াকে যুক্ত করে বিশেষ ব্যবস্থায় কৃষিকাজের ব্যবস্থা করা হয়। সৌদির উৎপাদন ব্যবস্থায় এটি ছিল নতুন সংযোজন।
ব্যক্তি ইবনে সৌদ তার চেষ্টা ও তত্পরতার মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সাফল্য লাভ করেন। অটোমানদের সঙ্গে শুরু থেকেই তার ভালো সম্পর্ক ছিল। সৌদ মূলত সমসাময়িক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করেন। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন উইলিয়াম শেকসপিয়ার ব্রিটিশ এজেন্ট হিসেবে আরবে আসেন এবং বেদুইনরা তাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করে। ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে দারিনের চুক্তিতে ব্রিটিশরা যুক্ত হয়। এ চুক্তি অনুসারে সৌদ বংশের অধীনে থাকা সম্ভাব্য অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। এর সঙ্গে বলা হয় নতুন গঠিত এ অঞ্চলের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা সহযোগিতা প্রদান করবে। এ চুক্তির মধ্য দিয়েই নতুন একটি রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
আল-রশিদের প্রতি ইবনে সৌদের ক্রোধ তখনো কমেনি। তিনি রশিদকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রশিদিদের ধ্বংস করার মাধ্যমে সৌদির আয়তন প্রায় দ্বিগুণ হয়। এরপর সৌদ একটি বাহিনী প্রেরণ করেন তাল্লাহ গোত্রের ইকাব ইবনে মোহায়ার বিরুদ্ধে। ১৯২৫ নাগাদ শরিফ হোসেনকে পরাজিত করার মাধ্যমে মক্কা শহর দখল করে সৌদের বাহিনী। এর মধ্য দিয়ে মক্কায় হাশেমিদের ৭০০ বছরের শাসনের সমাপ্তি হয়। পরের বছরের জানুয়ারিতে মক্কা, মদিনা ও জেদ্দার অভিজাতরা ইবনে সৌদকে হেজাজের আমির হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বাইয়া গ্রহণ করেন। একদিকে নজদ আগে থেকেই ছিল, এরপর যুক্ত হয় হেজাজ। ১৯২৭ থেকে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাঁচ বছর ধরে আলাদাভাবে দুটি রাজ্য শাসন করেন।
ইবনে সৌদের সবচেয়ে বড় সাফল্য আন্তর্জাতিক মৈত্রী। হেজাজের আমির হওয়ার পর থেকে তিনি হেজাজ ও নজদকে একীভূত করে একক রাষ্ট্র তৈরি করার চেষ্টা করেন। আন্তর্জাতিক সমর্থনের মাধ্যমে তা সম্ভব হয়েছিল। এক্ষেত্রে ব্রিটিশদের সমর্থন অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে কিছু কিছু বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ইখওয়া নেতাদের মধ্যে ফয়সাল আল-দুয়াইশ, সুলতান বিন বাজাদ ও দায়দান বিন হিথলাইনকে নিয়ে ইবনে সৌদ রিয়াদে একটি আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। কিন্তু সেখানে কেউই আসেনি। ১৯২৮ সালের এই ঘটনার পর ইখওয়া বিদ্রোহ করে। কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে সাবিলার যুদ্ধে সৌদের বাহিনীর কাছে তারা পরাজিত হয়।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম রাষ্ট্র সৌদি আরবের ভিত্তি রচিত হয় ইবনে সৌদের হাত ধরে ত্রিশের দশকে। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নজদ ও হেজাজকে একত্র করে ‘কিংডম অব সৌদি আরব’ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই আবদুলআজিজ বিন আব্দুল রহমান ইবনে সৌদ হন এর রাজা। মজার ব্যপার হলো সৌদির শাসককে ইসলামী কেতায় সুলতান, খলিফা বা আমির বলা হয় না। তিনি ‘কিং’। ব্রিটিশ সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অবশ্য এমনই হওয়ার কথা। আর সেই প্রথম কিং তার প্রাসাদ ১৯৩৮ সালে মাসমাক থেকে মুরাব্বা প্যালেসে স্থানান্তর করেন। কিন্তু এ পর্যন্ত ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক সৃষ্টি। সৌদি রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হয় তেলের মাধ্যমে আর তাও আবিষ্কার হয় ইবনে সৌদের আমলে।
সৌদি আরবে তেল আবিষ্কৃত হয় ১৯৩৮ সালে। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অব ক্যালিফোর্নিয়া সৌদিতে পেট্রোলিয়াম আবিষ্কার করে। এই সময় থেকে সৌদির সঙ্গে যুক্ত হয় আমেরিকার সরকার। ১৯৩৩ সালে ইবনে সৌদ একটি কনসেশন দেন। তার উপদেষ্টা সেন্ট জন ফিলবি ও আমিন রিহানির পরামর্শ অনুসারে ১৯৪৪ সালে তিনি সৌদির তেলক্ষেত্রে আমেরিকান কোম্পানিকে কাজ করার অনুমতি দেন। পেট্রোলিয়াম উৎপাদন শুরু হতেই ইবনে সৌদ হেজাজে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। আগে কেবল হজ থেকে আয় হতো, সে জায়গায় পেট্রোলিয়ামের মধ্য দিয়ে অধিক আয় করতে শুরু করে নতুন রাষ্ট্রটি। ইবনে সৌদ এ সময় থেকে মুহাম্মদ ইবনে আবদ আল-ওয়াহাবের দর্শন অনুসারে চলতে শুরু করেন।
সৌদি প্রতিষ্ঠার পরও সৌদকে বেশকিছু যুদ্ধ লড়তে হয়েছে। তিনি প্রতিবেশীদের সমর্থন লাভে সক্ষম হন। রাশেদ-আল-খুজাইর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। এর মধ্যে ১৯৩৪ সালে ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদির যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে সৌদিই জয়লাভ করে। এ যুদ্ধে সৌদি বাহিনী রোলস রয়েস এবং ফ্রেঞ্চ রেনল্ট এফটি-১৭ ট্যাঙ্ক নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল।
দাতব্য কাজের জন্য বিখ্যাত ও প্রশংসিত ইবনে সৌদ। তিনি সরাসরি নিজ হাতে প্রার্থীদের দান-খয়রাত করতেন। ফলে তিনি যেখানে সফর করতেন সেখানে সাহায্যপ্রার্থীরা অপেক্ষা করত। তিনি দুস্থদের জন্য থুলাইম নামে একটি লঙ্গরখানা স্থাপন করেন। তিনি ক্রমেই তার দানের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছিলেন, কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন তার সম্পদ ছিল আল্লাহর দান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিরপেক্ষতা রক্ষার সিদ্ধান্ত নেন ইবনে সৌদ। তবে যুদ্ধের সময় ইবনে সৌদ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। ১৯৪৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এ বৈঠকে আমেরিকার সঙ্গে সৌদির ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। একই মাসে তিনি কায়রো থেকে ৫০ মাইল দূরে ফায়ুনে উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদির পক্ষ থেকে জানানো হয় এ বৈঠকে মূলত ফিলিস্তিন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কেননা ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে সৌদি আরব অংশ নিলেও তাদের অংশগ্রহণ সামান্য বা প্রতীকী বলেই মনে করেন সবাই।
সৌদি আরবের ইতিহাসে ইবনে সৌদ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। একটি রাষ্ট্র স্থাপনের কৃতিত্ব তাকে দিতে হয়। সেখানেই তিনি থেমে থাকেননি। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও স্থায়ী করারও সর্বাত্মক চেষ্টা তিনি করেছেন। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনিই সৌদির রাজা ছিলেন, কিন্তু একটা সময়ে এসে তার পুত্র সৌদকে যুবরাজ ঘোষণা করে বেশির ভাগ দায়িত্ব তার হাতে তুলে দিয়ে নিজে তায়িফে সময় কাটাতেন। তিনি দূরদৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। কেননা তিনি চেয়েছিলেন বাগিচা, প্রাসাদ তৈরি না করে পারস্য উপসাগর থেকে রিয়াদ পর্যন্ত একটি রেলপথ তৈরি করা হোক। তার উপদেষ্টারা এর গুরুত্ব বোঝেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৭ কোটি ডলার খরচে আরামকো এ রেলপথ তৈরি করে। এ রেলপথ রিয়াদকে আধুনিক শহরে পরিণত করে। সৌদ বিন মুহাম্মদ আল-মাকরিন ফিরে এলে রিয়াদকে চিনতে পারতেন না।
মাহমুদুর রহমান: লেখক




