তারা আবিষ্কার করেছিল, মেয়েটির মস্তক কাদামাটির গর্ত থেকে বের হয়ে আসছে, চোখ দুটো বড় বড় করে তাকানো, আর শব্দহীনভাবে সে ডাকছে। মেয়েটির নাম আজুচেনা, অর্থাত্ পদ্মফুল। চার্চের প্রথম কমিউনিয়ন তাকে এ নাম দিয়েছিল। যেখানে এরই মধ্যে মৃতদের দুর্গন্ধ দূর থেকে ডেকে আনছিল শকুনগুলোকে, এতিম শিশুদের কান্না এবং আহতদের বিলাপে ভারি হয়ে ছিল বাতাস, সেই বিশালাকার সমাধিক্ষেত্রে, জীবনের দিকে ঝুঁকে থাকা এই জেদি ছোট্ট মেয়েটিই হয়ে উঠেছিল এক অতল দুঃখগাথার প্রতীক।

কাদামাটি থেকে বের হয়ে আসছে একটি কালো কুমড়ার মতো বিকাশোন্মুখ মস্তক। কিছুক্ষণ পর পরই টেলিভিশনের ক্যামেরাগুলো সম্প্রচার করেছিল এমন একটি অসহনীয় দৃশ্য। ফলে মেয়েটি সবার কাছেই দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠল, এমনকি সবার মুখে মুখে তার নামটাও ছড়িয়ে গেল। আর প্রত্যেকবারই আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখছিলাম মেয়েটির ঠিক পেছনে রোল্ফ কার্লেকে, যে অফিসের অ্যাসাইনমেন্টে সেখানে গিয়েছিল। রোল্ফ কার্লে কখনই ভাবতে পারেনি, এখানে এসে সে তার অতীতের এমন একটি চিহ্ন খুঁজে পাবে, যা হারিয়ে গিয়েছিল ঠিক ৩০ বছর আগে।

প্রথমে একটি ভূগর্ভস্থ কম্পন; কার্পাস তুলার জমিগুলো লণ্ডভণ্ড করে দেয় এবং ফেনিল তরঙ্গের মতো তাদের কুঁকড়ে দেয়। মাত্র সপ্তাহখানেক আগে ভূতাত্ত্বিকরা তাদের সিসমোগ্রাফ যন্ত্র ব্যবহার করে জানতে পান, পর্বত আবারো জেগে উঠেছে। কিছু সময়ের জন্য তারা এমন আশঙ্কাও করে যে, অগ্ন্যুত্পাতের উত্তাপে গলে যেতে পারে আগ্নেয়গিরির ঢালের প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে জমে থাকা বরফ। কিন্তু কেউ তাদের এ সতর্কতা আমলে নেয়নি। বরং তাদের কথাবার্তা থেকে মনে হয়েছিল, যেন ভীত শঙ্কিত কোনো বুড়ির গালগল্প শুনেছে। উপত্যাকার এ শহরটির বাসিন্দারা তাদের দৈনন্দিন জীবন নিয়েই মেতে থাকে। তখনো পৃথিবীর ক্রন্দন তাদের কানে পৌঁছেনি, যতক্ষণ না নভেম্বরের সেই বুধবারের ভয়ঙ্কর রাত তাদের জীবনে নেমে আসে। একটি প্রলয়ঙ্করি গর্জন যেন সেই রাতে পৃথিবীর সমাপ্তি ঘোষণা করে, ভেঙে পড়ে তুষারের স্তূপ, ভূমি ও পাথরের ধস নামে, পানির প্রবল ধারা পুরো গ্রামকে ডুবিয়ে দেয়, আর পৃথিবীর উগরে দেয়া বমির অতল গভীরতায় সমাহিত হয় অসংখ্য মানুষ। ভয়ঙ্কর ওই পরিস্থিতির প্রাথমিক ঘোর কাটিয়ে উঠতেই মানুষেরা দেখতে পায়— বাড়িঘর, বাজারঘাট, চার্চ, কার্পাস তুলার বিস্তৃত ভূমি, গাঢ় কফির বন, গবাদি পশুর চারণভূমি— সবই বিলীন হয়ে গেছে। এ ঘটনার বেশ পরে, বেঁচে আছে এমন মানুষদের উদ্ধারে সৈন্য ও স্বেচ্ছাসেবকরা সেখানে পৌঁছে। তারা চেষ্টা করে ভয়ঙ্কর ঘটনার ফলে সৃষ্ট ক্ষতি পরিমাপ করতে। তখন হিসাব করা হয়েছিল, কাদামাটির নিচে পড়ে আছে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং আঠালো থকথকে কাদার নিচে আরো অসংখ্য প্রাণী পচেগলে যাচ্ছে। বন আর নদীগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। গভীর কাদার এক বিশাল প্রান্তর ছাড়া দেখার মতো আর কিছুই ছিল না।

 যখন স্টেশন থেকে ফোনে ডাক এল, তখনো ভোর হয়নি, রোল্ফ কার্লে আর আমি একসঙ্গেই ছিলাম। আমি ধীরে বিছানা ছেড়ে ঘুম চোখে রান্নাঘরে গেলাম কফি তৈরি করতে, ততক্ষণে কার্লে চটপট পোশাক পরে নিয়েছে। সে তার সবুজ ব্যাগটিতে প্রয়োজনীয় জিনিস তুলে নিল, যে ব্যাগটি সবসময়ই সে বহন করে, আমরা পরস্পরকে বিদায় সম্ভাষণ জানালাম, যা আমরা প্রায়ই করে থাকি। আমার কোনো পূর্বানুমান ছিল না। রান্নাঘরে বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছিলাম আর পরিকল্পনা করছিলাম— কেননা তাকে ছাড়া দীর্ঘ সময় থাকতে হবে। যদিও নিশ্চিত ছিলাম যে, সে ফিরে আসবে পরদিনই।

কার্লে ছিল সেই দৃশ্যপটে প্রথম পৌঁছা মানুষের একজন। কারণ তখনো অন্য রিপোর্টাররা সেই কাদায় তলানো স্থানটিতে পৌঁছার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল জিপগাড়ি, বাইসাইকেল নিয়ে কিংবা হেঁটে, যে যেভাবে পারে সেখানে পৌঁছতে চাইছে। টেলিভিশনের হেলিকপ্টার ব্যবহারের কারণে রোল্ফ কার্লের এ সুযোগ হয়েছিল। ফলে সে দ্রুতই সেই ধ্বংসস্তূপের কাছে যেতে পেরেছিল। আমরা কার্লের সহকারীর ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজগুলো টিভি পর্দায় দেখলাম। রোল কার্লের হাঁটু পর্যন্ত ছিল কাদামাটির ভেতর, আর হাতে একটি মাইক্রোফোন, তার চারপাশে সন্তান হারানোদের আর্তনাদ, আহত অবস্থায় বেঁচে যাওয়া মানুষ, অসংখ্য মরদেহ ও ধ্বংসযজ্ঞ। তার শান্ত কণ্ঠে পুরো ঘটনাটি আমাদের জ্ঞাত হলো। কয়েক বছর ধরেই কার্লে সবার কাছেই পরিচিত হয়ে উঠেছিল খবরের কারণে, যে অত্যন্ত স্থিরভাবে যুদ্ধ বা আকস্মিক বিপর্যয়-সংক্রান্ত খবর লাইভ রিপোর্টিং করত। কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারত না। আমি সবসময়ই বিস্মিত হতাম ভয় ও সংকটের মুহূর্তেও তার স্থিরতা দেখে। মনে হতো যেন কোনো কিছুই তার আগ্রহকে দমাতে পারে না। ভয় তাকে স্পর্শ করছে, এমনটি কখনো দেখিনি আমি। যদিও সে আমাকে বলত, সে আসলে সাহসী কেউ নয়, বরং এ থেকে অনেক দূরের মানুষ। আমার বিশ্বাস, ক্যামেরার লেন্স তার ওপর ভিন্ন রকম একটা প্রভাব ফেলে, আর এটা এমন যে, সে কোনো ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে সেই ঘটনার অংশ না হয়ে। যখন তাকে আরো ভালোভাবে জানলাম, বুঝতে পারলাম, তার ক্ষেত্রে একটা কাল্পনিক দূরত্বই তাকে দৃঢ় রাখে।

আজুচেনার এ ঘটনার শুরু থেকেই রোল্ফ কার্লে সেখানে ছিল। সেসব স্বেচ্ছাসেবকের দৃশ্য ধারণ করে সে প্রচার করছিল, যারা মেয়েটিকে আবিষ্কার করেছিল, আর সেই ব্যক্তির দৃশ্যও প্রচার করছিল, যে প্রথম আজুচেনার কাছে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তার ক্যামেরা জুম করে আজুচেনার তমসাচ্ছন্ন মুখ, বিধ্বস্ত বড় বড় চোখ, জট পাকানো কাদামাখা চুলও দেখানো হয়েছিল। মেয়েটির চারপাশের কাদামাটি ছিল চোরাবালির মতো, এমন ভয়ও ছিল যে, যদি কেউ তাকে উদ্ধার করতে যায়, তবে সেও তলিয়ে যাবে। তারা তাকে চিত্কার করে বলার আগ পর্যন্ত দড়িটি ধরার চেষ্টাই করেনি সে। এরপর মেয়েটি কাদামাটির ভেতর থেকে হাত তুলে দড়িটি ধরার চেষ্টা করতেই কাদামাটিতে আরো দেবে যায়। রোল্ফ ব্যাগসহ যা কিছু ছিল, সব নামিয়ে রেখে চোরাবালির মতো সেই কাদামাটির দিকে এগিয়ে যায়। এগিয়ে যাওয়ার সময় সহকর্মীর উদ্দেশে বলে, কাদামটি খুব ঠাণ্ডা, এগিয়ে যেতে যেতে লাশের দুর্গন্ধ পেতে শুরু করে।

‘তোমার নাম কি?’ রোল্ফ কার্লের এ প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটি তার ফুলের নামের নামটি বলে।

‘আজুচেনা, নড়বে না’— রোল্ফ কার্লে তাকে নিদের্শনা দেয় আর কী বলছে, এমন ভাবনাকে দূরে ঠেলে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলা চালিয়ে যায়, তাকে অন্যমনস্ক করতে যখন কার্লে কোমর পর্যন্ত কাদায় ডুবে এগিয়ে যেতে থাকে, তখন চারপাশের বাতাসও তার কাছে ঘোর অন্ধকার মনে হয়।

 

কার্লে যেভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছিল, তাতে মেয়েটির কাছে পৌঁছা অসম্ভব, তাই সে ক্ষান্ত দিল এবং পায়ের তলায় একটু শক্ত মাটির জন্য চারদিক বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকল। যখন সে একেবারেই কাছে চলে গেল, সে দড়ি হাতে নিল এবং মেয়েটির বাহুর নিচে তা বেঁধে দিল। এতে আজুচেনাকে একটু ওপরে ওঠানো সম্ভব হলো। কার্লে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসল, এ হাসিতে তার চোখগুলো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল, যার ফলে তাকে মনে হচ্ছিল একটা ছোট্ট বালক। সে আজুচেনাকে বলল, চিন্তার কিছু নেই, সে এখন তার সঙ্গেই আছে। বলল, দ্রুতই তারা এখান থেকে তাকে তুলে নেবে। কার্লে অন্যদের দড়ি টানতে সংকেত দিল, কিন্তু দড়িতে টান পড়তেই মেয়েটি চিত্কার করে উঠল। তারা আবারো চেষ্টা করল। আর এবার কাঁধ ও বাহু আরেকটু উঠে এল, কিন্তু এরপর আর তাকে ওঠানো যাচ্ছিল না। সে কোনো কিছুর সঙ্গে আটকে ছিল। কেউ বলল, মেয়েটির পা হয়তো তার বাড়ির ভেঙে পড়া দেয়ালের নিচে আটকে আছে। কিন্তু আজুচেনা জানায়, বাড়ির ভেঙে পড়া দেয়ালের টুকরোগুলোই শুধু নয়, তার মৃত ভাইবোনদের লাশ শক্তভাবে দুই পা আঁকড়ে ধরে আছে।

‘চিন্তা করো না, আমরা তোমাকে এখান থেকে মুক্ত করবই’— রোল্ফ আজুচেনাকে আশ্বস্ত করল। আজুচেনা তখন রোল্ফের দিকে তাকাল, কিন্তু নিরুত্তর। সম্প্রচারজনিত ত্রুটি সত্ত্বেও আমি শুনতে পেলাম, আবেগে রোল্ফের কণ্ঠস্বর কাঁপছে, আর আমিও তার প্রতি এত ভালোবাসা অনুভব করলাম, যা আগে কখনই করিনি।

রোল্ফ কার্লে প্রথম কয়েক ঘণ্টা আজুচেনাকে উদ্ধারের জন্য নিজের কাছে থাকা সব উপকরণ ব্যবহার করল। খুঁটি ও দড়ি নিয়ে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাল, কিন্তু প্রতিবারই দাড়িটা টানা মানেই তা ছিল বন্দি মেয়েটির জন্য অসহ্য যন্ত্রণার কারণ। সে একটি খুঁটিকে লিভার হিসেবে ব্যবহার করলেও কোনো ফল এল না। তাই এ ধারণাটিও বাদ দিল। সে তখন কথা বলল কয়েকজন সৈন্যর সঙ্গে, যারা রোল্ফের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাজ করেছিল। কিন্তু সেই সৈন্যদেরও চলে যেতে হলো। কারণ আরো অনেক আহত মানুষ তাদের সাহায্যের জন্য ডাকছিল। মেয়েটি নড়ছিল না, কোনোমতে নিঃশ্বাস নিতে পারছিল। কিন্তু তবু তাকে অস্থির মনে হচ্ছিল না, বরং তাকে এমন মনে হয়েছিল, যেন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো নির্লিপ্ততা তার ভাগ্যকে মেনে নিতে বলছে। আর অন্যদিকে রিপোর্টার রোল্ফ অটল ছিল, সে মেয়েটিকে মৃত্যুর হাত থেকে কেড়ে নেবে। কেউ তাকে একটি টায়ার এনে দিয়েছিল। তখন রোল্ফ টায়ারটিকে বয়ার মতো করে মেয়েটির বাহুর নিচে দিয়ে দিল। এরপর নিজের ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য একটি তক্তা ব্যবহার করে, যেন মেয়েটির আরো কাছে থাকতে পারে। যদিও এটা অসম্ভব ছিল যে, অনুমান করে সে কাদামাটির ভেতরে ভেঙে পড়া দেয়ালের টুকরো সরিয়ে ফেলবে। রোল্ফ একবার কি দুবার মেয়েটির পায়ের দিকে ডুব দিয়ে অগ্রসর হয়, কিন্তু তাতেও ব্যর্থ হতে হয়। কেননা কাদামটিতে নুড়িপাথর, ভেঙে পড়া দেয়ালের টুকরাটাকরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। অবশেষে রোল্ফ এ সিদ্ধান্তে আসে যে, পানি নিষ্কাশনের জন্য তার একটি পাম্প দরকার। তাই সে বেতারের মাধ্যমে একটি পাম্পের অনুরোধ জানায়। কিন্তু ফিরতি বার্তা আসে, পরিবহন সংকটের কারণে পরদিন সকাল ছাড়া পাম্প পাঠানো সম্ভব হবে না।

‘আমরা এতক্ষণ অপেক্ষা করতে পারব না!’— রোল্ফ কার্লে চিত্কার করে ওঠে। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর হইচইপূর্ণ স্থানটিতে কেউই সমবেদনা জানায় না। কার্লের আরো অনেক সময় পেরিয়ে যাবে এটুকু মেনে নিতে যে, সময় নিশ্চল হয়ে গেছে, এবং বাস্তবতা পর্যবসিত হয়েছে মিথ্যাচারে।

একজন সামরিক চিকিত্সক আসে মেয়েটিকে পরীক্ষা করতে। পর্যবেক্ষণ করার পর বলে, হার্ট ভালোভাবেই সচল আছে। যদি বেশি ঠাণ্ডা না লাগে, তবে এ রাতটা সে টিকে থাকতে পারবে।

কার্লে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছিল এই বলে যে, ‘একটু অপেক্ষা করো আজুচেনা, কালই আমরা পাম্প পেয়ে যাচ্ছি।’

আজুচেনা অনুনয় করে বলে, ‘আমাকে একা ফেলে যেয়ো না।’

‘অবশ্যই না, আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।’

কেউ একজন রোল্ফকে কফি এনে দেয়, আর সে আজুচেনাকে একটু একটু করে চুমুক দিতে সাহায্য করে। এ তরল উষ্ণতা তাকে প্রশান্তি এনে দেয় এবং সে তখন তার ছোট্ট জীবন, পরিবার আর তার স্কুল সম্পর্কে বলতে শুরু করে। বলতে শুরু করে, অগ্ন্যুত্পাতের আগে পৃথিবীর এ ছোট্ট অংশটি কেমন ছিল। আজুচেনার ১৩ বছর বয়স হলেও কখনই সে তার গ্রামের বাইরে যায়নি। রোল্ফ কার্লে একটি অপরিপক্ব আশায় উজ্জীবিত হয়ে নিজেকে বিশ্বাস করায় যে, সবকিছুই ভালোয় ভালোয় শেষ হবে, পাম্প আসবে, তারা পানি নিষ্কাশন করে ফেলবে, ইট-পাথরের টুকরো সরিয়ে ফেলবে আর আজুচেনাকে হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে মেয়েটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠবে, আর সে তাকে দেখতে যাবে উপহার নিয়ে। কার্লে ভাবে, যদিও মেয়েটির এরই মধ্যে পুতুল খেলার বয়স পার হয়ে গেছে এবং ‘আমি জানি না, কিসে সে আনন্দিত হয়, হয়তো পোশাকে। আমি জানি না এসব সম্পর্কে, যদিও তার জীবনে সে অনেক মেয়েকেই জেনেছে, কিন্তু এ বিষয় নিয়ে তারা কেউ তাকে কিছু বলেনি। সময় কাটানোর জন্য সে আজুচেনাকে বলতে শুরু করে তার ভ্রমণ আর খবরের জন্য ছুটে চলা কাহিনীগুলো। যখন এসব গল্প শেষ হয়ে আসতে থাকে, সে তখন বানিয়ে গল্প বলে আর ভাবে, হয়তো এতে মেয়েটির ভালো লাগবে। মাঝেমধ্যে আজুচেনা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল, তবু রোল্ফ তার কথা চালিয়ে যেতে থাকে অন্ধকারে, মেয়েটিকে নিশ্চিত করতে যে, সে এখনো তার কাছেই আছে, যেন মেয়েটি তার অনিশ্চিত শঙ্কা থেকে মুক্তি পেতে পারে।

আর সে রাত ছিল বড় দীর্ঘ।

অনেক মাইল দূর থেকে আমি টেলিভিশনের পর্দায় রোল্ফ কার্লে ও মেয়েটিকে দেখছিলাম। টেলিভিশনের সেই দৃশ্যগুলো আমাকে বাড়িতে থাকতে দিচ্ছিল না। তাই আমি গিয়েছিলাম ন্যাশনাল টেলিভিশন স্টেশনে, যেখানে আমি কার্লের সঙ্গে প্রায়ই সারা রাত এডিটিং প্রোগ্রামগুলো দেখতাম। সেখানে গিয়ে মনে হলো, কার্লের পৃথিবীর খুব নিকটে আছি। অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে, সেই বিপর্যস্ত তিনটি দিন সে কীভাবে কাটিয়েছিল। ফোন করেছিলাম শহরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের— সিনেট সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর কামান্ডার, উত্তর কোরিয়ার অ্যাম্বাসেডর ও ন্যাশনাল পেট্রোলিয়ামের প্রেসিডেন্টকে। তাদের কাছে একটি পাম্পের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম, যেন কাদামাটি সরিয়ে ফেলা যায়, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছিলাম শুধু অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি। এরপর আমি জরুরি সাহায্য চেয়ে রেডিও ও টেলিভিশনেও বলি, যদি এমন কেউ থেকে থাকে, যে আমাদের সাহায্য করতে পারে। কথা বলার মধ্যেই দৌড়ে যাচ্ছিলাম নিউজরুমের মনিটরের কাছে, সেই ধ্বংসস্তূপের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে। যখন রিপোর্টাররা এমন দৃশ্য নির্বাচন করছিল, যা খবর প্রচারের ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলবে; আর আমি আজুচেনাকে নিয়ে করা প্রতিবেদনের ফুটেজ খুঁজছিলাম। যখন টিভির পর্দায় আজুচেনা ও এ দৃশ্য দুর্যোগের প্রতিমূর্তি করে তুলেছিল এবং রোল্ফের সঙ্গে আমার ভৌগোলিক দূরত্বকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল, তথাপি আমি তার সঙ্গেই ছিলাম। সেই শিশুটির ভয়ানক দুর্ভোগ আমাকেও ব্যথিত করেছিল, যেভাবে কার্লেকে। আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম তার হাতাশা, তার অক্ষমতার যন্ত্রণা। জানতাম, তার সঙ্গে যোগাযোগ করা অসম্ভব। তবু আমার মনে এক অভূতপূর্ব কল্পনা আসে, যা সফল করতে কাজে লেগে পড়ি। আমি রোল্ফ কার্লের কাছে চলে যাই আমার মনের শক্তি দিয়ে, একই উপায়ে আমি তাকে উত্সাহ দিতে থাকি। আমি মগ্ন ছিলাম এ পন্থায়, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি বিমূঢ় হয়ে পড়ি। যতক্ষণ পর্যন্ত না উন্মাদ হওয়ার উপক্রম হয় এবং আমার অক্ষমতা সামনে আসে। মাঝেমধ্যে তার করুণাসিক্ত রসে আমি ভিজে যেতাম, আবার অন্য সময় এতটাই নিষ্পেষিত হতাম যে, মনে হতো আমি টেলিস্কোপ দিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে মৃত একটি তারার আলোর দিকে তাকিয়ে আছি।

সকালের খবরে সেই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ দেখছিলাম, বিগলিত বরফ থেকে তৈরি হওয়া নতুন নতুন স্রোতস্বিনী নদীতে ভেসে যাওয়া অসংখ্য প্রাণী ও মানুষের মরদেহ, কাদার ওপরে জেগে ওঠা গাছের চূড়া এবং গির্জার বেল টাওয়ার, যেখানে কিছু মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল এবং ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষমাণ ছিল উদ্ধারকর্মীদের জন্য। শত শত সিভিল ডিফেন্স থেকে আসা সৈন্য ও স্বেচ্ছাসেবক জীবিতদের উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। সারি সারি বিধ্বস্ত মানুষ এক কাপ গরম ঝোলের জন্য অপেক্ষা করছিল। রেডিওতে বলা হয়েছিল যে, তাদের ফোন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। কেননা অনাথ শিশুদের আশ্রয় দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কলের পর কল আসছিল। পেট্রল ও খাদ্যসহ সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছিল। চিকিত্সকরা অজ্ঞান না করে হাত-পা কেটে ফেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তারা বলেছিল, অন্তত তাদের যেন ব্যথনাশাক ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক ও সিরাম পাঠানো হয়। অথচ বেশির ভাগ রাস্তাই চলার অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। তার ওপর এর সঙ্গে পথের প্রতিটি মোড়ে যোগ হয়েছিল আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা। সবচেয়ে বড়ো বিষয়, কাদামাটির সঙ্গে গলিত মরদেহ মিশে জীবিতদের জন্য মহামারীর হুমকি সৃষ্টি করেছিল।

টায়ারের ভেতর থেকে আজুচেনা কাঁপছিল। এ টায়ারটিই তাকে কাদার ওপর ধরে রেখেছিল। অসাড়তা আর অনিশ্চয়তা তাকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে তুলেছিল। কিন্তু তবু সে জ্ঞান হারায়নি। তার দিকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিলে কথাও শোনা যাচ্ছিল। মেয়েটির কণ্ঠস্বর ছিল নম্র, যেন সবকিছুর জন্যই সে দুঃখ প্রকাশ করছে। রোল্ফ কার্লের মুখে দাড়ি আর চোখের নিচে কালো দাগ। তাকে অবসাদগ্রস্তর মতো দেখাচ্ছিল। এমনকি এত দূর থেকেও আমি তার ক্লান্তির ভার অনুভব করতে পারছিলাম, যা তার খবর সংগ্রহের অন্যান্য অবসাদ থেকে ভিন্ন ছিল। সে সম্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়েছিল ক্যামেরার কথা। ক্যামেরার লেন্স দিয়ে সে আর মেয়েটিকে দেখছিল না। আমরা যে ছবিগুলো দেখছিলাম, তা তার সহকারীর তোলা ছিল না। এগুলো ছিল অন্যান্য রািপোর্টারের, যাদের ফোকাস ছিল আজুচেনার ওপর। সেখানে ঘটে যাওয়া ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরার করুণ দায়িত্ব তারা যেন চাপিয়ে দিয়েছিল আজুচেনার ওপর। দিনের প্রথম আলো ফুটে উঠলে রোল্ফ কার্লে আবারো মেয়েটিকে মুক্ত করতে বাধাগুলো সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু এ কাজে তাকে শুধু দুই হাত ব্যবহার করতে হয়েছিল। মেয়েটি আঘাত পেতে পারে, এ ভয়ে সে কোনো যন্ত্র ব্যবহার করতে পারছিল না। রোল্ফ আজুচেনাকে এক কাপ নরম খাবার ও কলা খাওয়ায়, যে খাবারগুলো সেনাবাহিনী বণ্টন করছিল, কিন্তু খাওয়ার পর দ্রুতই মেয়েটি বমি করে ফেলল। চিকিত্সক জানালেন, মেয়েটির জ্বর এসেছে, কিন্তু তার কিছুই করার নেই। কেননা তার কাছে যে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো আছে, তা শুধু গ্যাংগ্রিন আক্রান্ত রোগীদের জন্য সংরক্ষিত। একজন ধর্মযাজক যেতে যেতে আজুচেনাকে আশীর্বাদ করল আর সন্ধ্যার পর দেখা গেল, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ঝরতে শুরু করেছে।

‘আকাশ কাঁদতে শুরু করেছে’ আজুচেনা বিড় বিড় করে এবং সেও কাঁদতে শুরু করে।

‘ভয় পেয়ো না’— রোল্ফ অুননয় করে বলে। তোমাকে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে এবং শান্ত থাকতে হবে। সবকিছুই সুন্দর হবে দেখো। আমি আছি তোমার সঙ্গে এবং যেকোনো উপায়েই আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাব।’

রিপোর্টাররা আজুচেনার ছবি তুলতে ফিরে আসে এবং আবারো তাকে একই প্রশ্ন করতে থাকে। তখন মেয়েটি সেসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার কোনো চেষ্টা করে না। এরই মধ্যে অনেক তার, টেপ, ফিল্ম, ভিডিও, উন্নত লেন্স, সাউন্ড কনসোল, লাইট, প্রতিফলনকারী পর্দা, সহায়ক মোটর, কার্টন, ইলেকট্রিশিয়ান, সাউন্ড টেকনিশিয়ান ও ক্যামেরা নিয়ে আরো টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র তৈরির দল চলে আসে। তখন আজুচেনার মুখ ঝলসে ওঠে সারা বিশ্বের মিলিয়ন মিলিয়ন টেলিভিশনের পর্দায়। আর প্রত্যেকটি সময়ই রোল্ফ কার্লে অনুনয় করে যাচ্ছিল একটি পাম্পের জন্য। উন্নত প্রযুক্তির সুবিধাগুলো ফল বয়ে আনে এবং ন্যাশনাল টেলিভিশন ঝকঝকে ছবি ও নিখুঁত শব্দ গ্রহণ করতে শুরু করে। দূরত্ব তখন হঠাত্ কমে আসে আর আমার মধ্যে এক ভয়ানক সংবেদনশীলতা তৈরি হয়। মনে হয় যে, আজুচেনা আর রোল্ফ আমার পাশেই ছিল, কিন্তু তাদের কাছ থেকে আমাকে আলাদা করে দিয়েছে এই দুর্ভেদ্য কাচ। আমি প্রতি ঘণ্টার খবর অনুসরণ করতে সক্ষম ছিলাম। কার্লে মেয়েটিকে আটকে পড়া দশা থেকে মুক্ত করতে এবং তার কষ্ট উপশমে যা যা করেছিল, আমি সবই জানতাম। আমি তাদের টুকরো আলাপ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি টিভির সামনে ছিলাম, যখন মেয়েটি রোল্ফকে প্রার্থনা করতে শেখাল আর রোল্ফও মেয়েটিকে অন্যমনস্ক করতে সেই গল্পটি বলে, যা এক হাজার এক রাত্রী ধরে আমাদের বিছানায় সাদা মশারির নিচে আমি তাকে শুনিয়েছি।

যখন এ ঘটনার দ্বিতীয় দিনে অন্ধকার হয়ে এল, রোল্ফ কার্লে চেষ্টা করছিল আজুচেনাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য গান শোনাতে, পুরনো অস্ট্রিয়ার সেই লোকসংগীত, যা সে তার মায়ের কাছ থেকে শিখেছিল। কিন্তু আজুচেনা ছিল ঘুম থেকে অনেক দূরে। তারা সেই রাতে বেশির ভাগ সময় কাটিয়ে দিচ্ছিল কথা বলে আর ঠাণ্ডায় কাঁপছিল। দুজনই ছিল বিপর্যস্ত ও ক্ষুধার্ত। সেই রাতেই অব্যক্তভাবে অতীত সামনে আসে, যা কার্লের মনে বহু বছর ধরে আটকে ছিল। তার স্মৃতির রহস্যময় স্তর ও গভীর পোপনে থাকা সেসব স্মৃতি প্রবল জলধারার মতো ঝরতে শুরু করে। সে আজুচেনাকে সব বলতে পারেনি। মেয়েটি হয়তো জানেও না যে, তার নিজের আগেও সময়ের এ সমুদ্রের বাইরে একটি জগত ছিল; যুদ্ধের বছরগুলোয় ইউরোপ কেমন ছিল, তা কল্পনা করার সক্ষমতা তার ছিল না। তাই সে আজুচেনাকে পরাজয়ের কথা এবং সেই বিকালের কথাও বলে না, যে বিকালে রাশিয়া তাদের নির্দেশ দিয়েছিল যুদ্ধবন্দিদের ক্যাম্পে সেসব কয়েদিকে কবর দিতে, যারা অনাহারে মারা গিয়েছিল। আর কেনই বা তারা মেয়েটিকে বলতে যাবে, জ্বালানি কাঠের একেকটি পাহাড়ের মতো কীভাবে নগ্ন মৃত শরীরগুলো স্তূপ করা ছিল, যা নরম চীনামাটির কথা মনে করিয়ে দিত? এই মরতে চলা শিশুটিকে তার পক্ষে কীভাবেই বা বলা সম্ভব চুল্লি আর ফাঁসিকাঠের কথা? সেই রাতের কথাও তাকে বলে না, যে রাতে সে মাকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখেছিল। তিনি উঁচু গোড়ালির এক জোড়া লাল বুট পায়ে, অপমান আর দুঃখ-যন্ত্রণায় তিনি কাঁদছেন। অনেক কিছুই ছিল যা সে বলেনি, কিন্তু ওই মুহূর্তগুলোয় সে প্রথমবারের মতো সেই স্মৃতির সঙ্গে পুনরায় বসবাস করে, যা সে সবসময়ই মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। আজুচেনা তার ভয়কে সমর্পণ করেছিল রোল্ফের কাছে। অনিচ্ছাকৃতভাবে রোল্ফকে বাধ্য করেছিল তার নিজের ভয়ের সামনেও দাঁড়াতে। সেই কাদার নারকীয় গর্তের পাশে রোল্ফের পক্ষে নিজের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব ছিল না এবং বালকবেলার একটি দুর্দমনীয় আতঙ্ক তাকে চেপে ধরল। সে ফিরে গেল সেই বয়সে, যখন সেও ছিল আজুচেনার বয়সী, কিশোর এবং সে মেয়েটির মতোই দেখতে পেল, আটকে পড়েছে একটি গর্তে, উদ্ধার পাওয়ার উপায় নেই, জীবন্ত অবস্থায় সে এক কবরে, সেখান থেকে শুধু তার মাথাটি বের হয়ে আছে, তার চোখের সামনে দেখতে পায় বাবার জুতাজোড়া আর দুই পা। তার বাবা তখন কোমরের বেল্ট খুলে ফেলেছে আর চাবুকের মতো করে বাতাসকে পেটাচ্ছে। কুণ্ডলী পাকানো বিষধর সাপের মতো সে আঘাত করতে কেমন করে ফুঁসছিল, যা কখনো ভুলে যওয়ার নয়। একটি নিখাদ ব্যথাস্রোত তার ভেতর বয়ে যাচ্ছিল, যেন তা সবসময়ই তার মনেই ছিল অপেক্ষারত। আরো একবারের ঘটনা, অশোভন আচরণের মতো মিথ্যা অভিযোগের কারণে শাস্তি দিতে তাকে তার বাবা আলমারিতে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। সেই শেষ না হওয়া মুহূর্তগুলো সে গুটিসুটি মেরেছিল চোখ বন্ধ করে, যেন তাকে অন্ধকারও না দেখতে হয়। সে হূত্স্পন্দনের শব্দ শোনার ভয়ে কান চেপে ধরেছিল। সে শিউরে উঠছিল, নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল আতঙ্কিত কোণঠাসা প্রাণীর মতো। স্মৃতির কুয়াশায় ছোটাছুটি করে সে খুঁজে পেল তার বোন ক্যাথেরিনাকেও। ক্যাথেরিনা ছিল প্রতিবন্ধী আর খুবই মিষ্টি একটা মেয়ে, যে সারা জীবন নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল এটুকু আশা নিয়ে যে, তার বাবা তাকে জন্ম দেয়ার অনুশোচনার কথা একদিন ভুলে যাবে। ক্যাথেরিনার সঙ্গে রোল্ফ হামাগুড়ি দিয়ে ডাইনিং রুমের টেবিলের নিচে চলে যেত আর সেখানে লুকিয়ে থাকত তারা দীর্ঘ সাদা টেবিল ক্লথের নিচে, বাবার পদধ্বনি আর কণ্ঠস্বর থেকে সতর্ক থাকতে দুটি শিশু পরস্পরকে আলিঙ্গন করে থাকত। ক্যাথেরিনার ঘ্রাণে মিশ্রিত হতো তার নিজের ঘাম। এর সঙ্গে রান্নার সুগন্ধ, রসুন, সুপ, সিদ্ধ রুটি ও অপ্রত্যাশিত পচনশীল কাদার গন্ধ এসে সব একাকার হয়ে যেত। তার বোনের হাত থাকত তার হাতে। ভীত নিঃশ্বাস, গালের ওপরে রেশমি চুল, চোখগুলোর সরল স্থির দৃষ্টি। ক্যাথেরিনা... ক্যাথেরিনা, এবার সাদা টেবিলক্লথ গায়ে তার সামনে বাস্তব হয়ে ওঠে। বাতাসে একটি পতাকার মতো পত্পত্ করতে থাকে এবং অবশেষে বোনের মৃত্যুতে এবং তাকে ত্যাগ করার অনুশোচনায় কার্লে কেঁদে উঠতে পেরেছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, একজন রিপোর্টার হিসেবে তার যে খ্যাতি, যে যোগ্যতা, যা তাকে পরিচিত ও বিখ্যাত করেছে, এগুলো ছিল তার সেই প্রাচীন ভয়কে নিছক দূরে ঠেলারই চেষ্টা। লেন্সের পেছনে আশ্রয় নেয়ার কৌশল গ্রহণ মূলত এ পরিপ্রেক্ষিত থেকে বাস্তবতা আসলেই অধিক সহনীয় কিনা, তা যাচাই করতে চাওয়া। সাহসের পরীক্ষা দিতে সে বড় বেশি ঝুঁকি নিয়েছিল। দিনে অনুশীলন করত সেই দৈত্যকে জয় করতে, যা রাতে তাকে তাড়া করত। তবু সে সত্যও সেই মুহূর্তে একবারে মুখোমুখি চলে আসে। সে অতীতকে ভুলে থাকার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারেনি। সে হয়ে উঠেছিল আজুচেনা; সেই ছিল থকথকে কাদায় সমাহিত। তার ভয় আর দূর অতীতের প্রায় ভুলে যাওয়া শৈশবের আবেগ ছিল না। এ ছিল গলায় বিঁধে যাওয়া কাঁটার মতো। তার অশ্রুধারার মাঝে সে দেখল তার মাকে, কালো পোশাক পরিহিত এবং কুমিরের নকল চামড়ার হাতব্যাগটি বুকে চেপে ধরা, ঠিক যেমনটা সে তাকে শেষবার দেখেছিল, যখন তার মা তাকে দক্ষিণ আমেরিকাগামী জাহাজে তুলে দিতে এসেছিল। তার মা তার অশ্রু মুছে দিতে এগিয়ে আসেনি, বরং তাকে বলতে এসেছিল একটি কোদাল তুলে নিতে: যুদ্ধ শেষ আর এখন মৃতদেরই কবর দিতে হবে।

‘কাঁদবে না। আমি আর কষ্ট পাচ্ছি না। আমি ভালো আছি’— আজুচেনা যখন এ কথাগুলো বলেছিল, তখন ভোর হলো।

‘আমি তোমার জন্য কাঁদছি না’— রোল্ফ কার্লে হাসল। ‘আমি কাঁদছি নিজের জন্য। কারণ আমি বেদনাক্রান্ত, ভেতরে-বাইরে।’

ধ্বংসযজ্ঞের তৃতীয় দিনে উপত্যকাজুড়ে ঝড়ো মেঘ ফাঁকি দিয়ে ফ্যাকাসে আলো দেখা দিল। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি সাফারি জ্যাকেট পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এলেন এটি নিশ্চিত করতে যে, এ বিপর্যয়টি ছিল শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ানক বিপর্যয়। পুরো দেশই তখন কাঁদছিল। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোও সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেন। সশস্ত্র বাহিনীকে আরো কঠোর হতে বললেন। চুরিসহ যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিলেন। তিনি আরো বললেন, সব মরদেহ অপসারণ করা কিংবা হাজার হাজার মানুষ যারা নিখোঁজ হয়ে গেছে, তাদের সংখ্যা নির্ধারণ করাও অসম্ভব; পুরো উপত্যকাই পুণ্যভূমি ঘোষণা করা হবে এবং নিহতদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠান করতে আসবেন বিশপরা। প্রেসিডেন্ট সেনাবাহিনীর তাঁবুতে গেলেন এবং উদ্ধারকৃত জনতাদের ত্রাণ দেয়ার জন্য অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিলেন, আর সেখানে নির্মিত অস্থায়ী হাসপাতালে গেলেন দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রমের কারণে ক্লান্তবিধ্বস্ত চিকিত্সক ও সেবিকাদের উত্সাহের বাণী শোনাতে। এরপর তিনি আজুচেনাকে দেখতে চাইলেন, যে মেয়েটিকে এরই মধ্যে সারা পৃথিবী দেখেছে। তিনি রাষ্ট্রপতিসুলভ নয়, এমন নিস্তেজভাবে আজুচেনার প্রতি হাত নাড়লেন এবং টিভির মাইক্রোফোনগুলো তার আবেগমণ্ডিত কণ্ঠ ধারণ করল। তিনি পিতৃসুলভ সুরে মেয়েটিকে উদ্দেশ করে বললেন, তার সাহস পুরো জাতির জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। রোল্ফ কার্লে প্রেসিডেন্টের কথার মধ্যেই পাম্প চাইলে তিনি নিশ্চয়তা দিয়ে বললেন, তিনি নিজে এ বিষয়টি দেখবেন। আমি কার্লেকে টিভিতে এক ঝলক দেখতে পেলাম। তখনো সে কাদামাটির গর্তের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। সেদিন সন্ধ্যার খবরেও সে একইভাবে ছিল। যেভাবে একজন ভাগ্য গণনাকারী তার ক্রিস্টাল বলের দিকে তাকিয়ে থাকে, আমিও টিভির সামনে আঠার মতো বসে থেকে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বুঝতে পারলাম, তার মধ্যে মৌলিক কোনো পরিবর্তন এসেছে। আমি কোনো একভাবে জেনে গিয়েছিলাম, সেই রাতে তার সমস্ত প্রতিরোধক্ষমতা আশা-জেদ সব ভেঙেচুরে গেছে এবং সে বিষাদে তলিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত সে হয়ে পড়েছিল ভঙ্গুর। মেয়েটি রোল্ফের এমন একটি অংশকে স্পর্শ করেছিল, রোল্ফ নিজে যে অংশ কখনো স্পর্শ করার সুযোগ পায়নি। এমনকি এ অংশ আমার সঙ্গেও সে কখনো ভাগাভাগি করেনি। রোল্ফ মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আজুচেনাই বরং তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল।

আমি ঠিক সেই মুহূর্ত টের পেলাম, যখন কার্লে সমস্ত লড়াই ছেড়ে দিল। মেয়েটির মৃত্যু দেখার যন্ত্রণার কাছে সে নিজেকে সমর্পণ করল। আমি তাদের সঙ্গেই ছিলাম তিনদিন এবং দুই রাত। তাদের দিকে চোখ রাখছিলাম জীবনের অন্য প্রান্ত থেকে। যখন কার্লেকে মেয়েটি বলেছিল যে, তার ১৩ বছর বয়সে কেউ তাকে ভালোবাসেনি, আর ভালোবাসা কী তা না জেনেই এ পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া কত মর্মান্তিক। রোল্ফ তাকে নিশ্চিত করে বলে, সে তাকে ভালোবাসে। আর তা এমন, সারা জীবন ধরে যা কিছু তার ভালোবাসার, সবকিছুর চেয়েও বেশি। তার মায়ের চেয়ে, বোনের চেয়ে এবং সেসব মেয়ের চেয়েও, যারা তার বাহু জড়িয়ে ঘুমিয়েছে। রোল্ফ মেয়েটিকে বলে, এমনকি তার জীবনসঙ্গী অর্থাত্ আমার চেয়েও রোল্ফ তাকে বেশি ভালোবাসে, যে আমি কিনা সবকিছুর বিনিময়েই আজুচেনার পরিবর্তে ওই গর্তে আটকে পড়তে চাইতাম, যে কিনা আজুচেনার জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন বিনিময় করতেও রাজি হতো, আর আমি দেখলাম, মিষ্টি এক বিষাদে তলিয়ে গিয়ে রোল্ফ একটু ঝুঁকে আজুচেনার হতভাগ্য কপালে চুমু খেল। এ এমন এক আবেগ, যার নাম রোল্ফ নিজেও জানে না। আমি অনুভব করলাম, কীভাবে তত্ক্ষণাত্ দুজনই হতাশা থেকে দুজনকে রক্ষা করল, কীভাবে তারা দুজনই সেই কাদা থেকে মুক্ত হলো, কীভাবে হেলিকপ্টার আর শুকুনদের ছাড়িয়ে তারা আরো ওপরে উড়ে গেল, দুর্নীতি, অবক্ষয় আর বিলাপের বিশাল জলাভূমি ছাড়িয়ে কীভাবে তারা একসঙ্গে উড়েছিল। আর সবশেষে কীভাবে মৃত্যুকে তারা গহনে সমর্থ হয়েছিল। রোল্ফ কার্লে নীরবে প্রার্থনা করেছিল, যেন মেয়েটি দ্রুত মারা যায়, কেননা এমন ব্যথা তো বহন করা যায় না।

এরই মধ্যে আমি একটি পাম্প সংগ্রহ করলাম এবং একজন জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম, যে রাজি হলো পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর কার্গো বিমান পাঠাতে। কিন্তু তৃতীয় দিনের সেই রাতে শত শত ক্যামেরা আর ল্যাম্পের স্থির আলোর নিচে আজুচেনা মারা গেল। তার অনিঃশেষ দৃষ্টি আটকে ছিল সেসব বন্ধুর দৃষ্টিতে, যারা তার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত ছিল। রোল্ফ কার্লে জীবনরক্ষার সেই টায়ারটি সরিয়ে দিল, চোখের পাতা বন্ধ করে দিল, বুকের মাঝে চেপে ধরল কয়েক মুহূর্তের জন্য। এরপর তাকে ছেড়ে দিল। কাদার ভেতরে একটি ফুল, ধীরে অস্তগামী হলো।

তুমি আমার কাছেই ফিরে এসেছ, কিন্তু তুমি আর সেই মানুষটি নেই। আমি প্রায়ই তোমার সঙ্গে টিভি স্টেশনে যাই, বসে থাকি, আমরা আবারো আজুচেনার ভিডিওগুলো দেখি; সেগুলো তুমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখো, হয়তো মেয়েটিকে রক্ষার জন্য আরো কিছু করতে পারতে কিনা এমন কিছু ভাবো, যা তুমি সময়মতো ভাবোনি। হতে পারে, তুমি সেগুলো নিয়ে বসে থাকো নিজেকে দেখতে, যেন আয়নার সামনে বসে আছ, নগ্ন। তোমার ক্যামেরাটা আলামারিতে পড়ে থাকে। এর কথা আর মেনও পড়ে না। তুমি কিছু লেখো না, তুমি আর গান গাও না; জানালার সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকো পর্বতমালার দিকে তাকিয়ে। আর আমি তোমার পাশে অপেক্ষা করি, প্রাচীন ক্ষত কবে মুছে যাবে আর তুমি নিজের ভেতরের অভিযাত্রা শেষ করবে। আমি জানি, যখন তুমি তোমার দুঃস্বপ্ন পেছনে ফেলে ফিরে আসবে সেই আগের মতোই, আমরা হাতে হাত রেখে আবারো হাঁটব।