[তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ব্রিটিশ পণ্ডিত ক্যারেন আর্মস্ট্রং ইউরোপে ইসলামকে বিকৃত করার একটি দীর্ঘ এবং কলঙ্কজনক ঐতিহ্যের অস্তিত্ব আবিষ্কার করছেন। ইসলাম আবশ্যিকভাবেই খ্রিস্ট ধর্ম থেকে বেশি সহিংসতাপ্রবণ হওয়ার ধারণার সমালোচনা করে আরববিশ্বের প্রতি পাশ্চাত্য ঘৃণার উত্পত্তি নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন ক্লডিয়া মেন্ডে]

মিজ আর্মস্ট্রং, গার্ডিয়ানের জন্য রচিত একটি নিবন্ধে আপনি লিখেছেন, আইএসের বর্বরোচিত সহিংসতা হয়তোবা ‘কমপক্ষে অংশত আমাদের ঘৃণায় পরিচালিত নীতিমালারই উত্তরসূরি হয়ে থাকতে পারে।’ প্যারিস হামলার পর আবারো কি আপনার বক্তব্য ঠিক থাকবে?
ক্যারেন আর্মস্ট্রং:
হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই। ‘শার্ল হেবদো’র ওপর হামলা সত্যিই আল কায়েদার অনুপ্রেরণা বা মদদে হয়ে থাকলে সেটা সমানভাবে রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবেও অনুপ্রাণিত ছিল। প্যারিসে আধুনিক সেক্যুলার সভ্যতার পবিত্র প্রতীকের ওপর হামলা চালিয়েছে এটা: মত প্রকাশের স্বাধীনতা। মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি আলোকন আদর্শ; জনগণ যেন গির্জা, শ্রেণী বা গোষ্ঠীর হাতে দমিত না হয়ে স্বাধীনভাবে উদ্ভাবন করতে পারে, সেজন্য পুঁজিবাদী সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারটি খুবই জরুরি। প্যারিসে সন্ত্রাসীরা আসলে বলছিল: ‘তোমরা আমাদের পবিত্র প্রতীক [পয়গম্বর মুহাম্মদ (স.)] আক্রমণ করলে তোমাদেরটাকেও হামলা করব আমরা। এখন দেখ কেমন লাগে।’

কিন্তু এর সঙ্গে পশ্চিমা ঘৃণার কী সম্পর্ক থাকতে পারে?
সাময়িকীর ওপর হামলা পশ্চিমা ঘৃণারই একটা অংশ। ইহুদি সুপারমার্কেটে আইএসআইএসের মদদে ঘটেছে বলে মনে হওয়া হামলা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সমর্থনের দিকেই পরিচালিত হয়েছে। এখানেও ঘৃণার এক ধরনের উপাদানের অস্তিত্ব আছে: যেমন গত গ্রীষ্মে গাজায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বাস্তব অর্থে সামান্যই শক্ত শোরগোল হয়েছে, কোনো কোনো মুসলিমের চোখে সেটা ফিলিস্তিনি নারী, শিশু এবং প্রবীণদের জীবন আমাদের জীবনের মতো মূল্যবান নয় বলে মনে হতে পারে।

এ ঘৃণার মূলে কী লক্ষ করেন আপনি?
স্বাধীনতার আলোকন আদর্শ বাস্তবে কেবল ইউরোপীয়দের বেলায় খাটে। আলোকনের ধারণায় গভীরভাবে প্রভাবিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাউন্ডিং ফাদাররা সগর্বে ঘোষণা করেছিলেন, ‘সব মানুষকে সমান হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে’ এবং জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পদের ওপর সমান অধিকার ভোগ করে। কিন্তু আফ্রিকান ক্রীতদাস রাখা এবং নেটিভ আমেরিকানদের স্বদেশভূমি থেকে বিতাড়িত করার বেলায় বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বোধ করেননি তারা।

সহিষ্ণুতার গুরুজন লক লিখেছিলেন, ‘দাসের ওপর মালিকের চরম ও স্বেচ্ছাচারী’ অধিকার রয়েছে, যেকোনো মুহূর্তে তাকে হত্যার অধিকারও তার অন্তর্ভুক্ত। এটা অব্যাহত রয়েছে: প্যারিসে মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে মিছিলে নামা অনেকেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে জনগণের অধিকারকে অস্বীকার করা শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন জোগানো বিভিন্ন রাজ্যের নেতা।  উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবিরাম সৌদি শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন জুগিয়ে চলেছে। আবারো সেই ঘৃণা: আমাদের স্বাধীনতা তোমাদের স্বাধীনতার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামী সন্ত্রাসের ব্যাখ্যার জন্য আমাদের কি একই সঙ্গে কোরআনের কিছু আয়াত এবং ইতিহাসজুড়ে সেগুলোর ব্যাখ্যার দিকেও নজর দেয়া উচিত নয়?
‘ইতিহাসজুড়ে,’ কোরআনের আয়াতগুলো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উস্কে দেয়নি। যেকোনো সাম্রাজ্যশক্তির ওপর নির্ভর করে: ভারতীয়, চীনা, পারস্য, রোমান, হেলেনিস্টিক ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেই এটা খাটে। আবার ইসলামী সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও এটা ঠিক। তাছাড়া আধুনিককালের আগে ইসলামের পাশ্চাত্য খ্রিস্ট ধর্মের চেয়ে ঢের উন্নত সহিষ্ণুতার রেকর্ড ছিল। ১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করার পর তারা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে হতচকিত করে তোলা গণহত্যায় ওই শহরের মুসলিম ও ইহুদি বাসিন্দাদের হত্যা করে, যে শহরটি এর আগে কখনো এ ধরনের সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেনি।  তার পরও ৫০ বছরের ভেতর কোনো মুসলিম প্রতিশোধের ঘটনা ঘটেনি। হিব্রু বাইবেল এবং নিউ টেস্টামেন্টে ঢের বেশি সহিংসতার অস্তিত্ব রয়েছে।

জনপ্রিয় ধারণা রয়েছে যে, একেবারে গোড়া থেকেই ইসলামের বিশ্বাসে সহিংসতা জড়িয়ে আছে। আপনি কী মনে করেন?
ক্রুসেডের সময় এ জনপ্রিয় বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। পশ্চিমের ক্রিশ্চিয়ানরাই তখন নিকট প্রাচ্যের মুসলিমদের হামলা করছিল। এটা হয়তো চাপা দেয়া উদ্বেগ ও অপরাধ বোধ তুলে ধরে থাকতে পারে। জেসাস তাঁর অনুসারীদের ভালোবাসতে বলেছিলেন, নির্মূল করতে নয়। দ্বাদশ শতকে পণ্ডিত সাধুদের হাতে ইসলাম বরাবর তলোয়ারের ধর্ম হওয়ার বিশ্বাস প্রচারিত হয়েছিল: নিজেদের শিকারের প্রতি আচরণের ব্যাপারে নিজস্ব উদ্বেগই প্রতিফলিত করছিলেন তারা।

কিন্তু ইসলামী সাম্রাজ্যের সূচনার বেলায় কি?
গোড়ার দিকে মুসলিমরা মক্কায় একটি আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থাকা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থাকার সময় কোরআন হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানো ও প্রতিশোধের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু ব্যাপক নির্যাতনের মুখে  মক্কা থেকে পালাতে বাধ্য হয়ে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পর যেকোনো রাষ্ট্র নির্মাতার মতোই মুসলিমদের যুদ্ধ করতে হয়েছে এবং কোরআন সেটা অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু সামরিক ইতিহাস আমাদের জানায় যে, মুহাম্মদ (স.) এবং প্রথম খলিফারা সহিংসতার চেয়ে বরং কূটনীতির সাহায্যে সাম্রাজ্য নির্মাণের ক্ষেত্রে অনন্য ছিলেন: মুহাম্মদ (স.) এর আগে যুদ্ধমান বিভিন্ন গোত্রীয় সমাজে গঠিত আরবীয় পেনিনসুলাকে ঐক্যবদ্ধ এবং প্যাক্স-ইসলামিয়া কায়েম করে এবং প্রথম খলিফা, রাশিদুনরা মধ্যপ্রাচ্যের আবাদি ভূমিতে। 

আরববিশ্বে ধর্ম ও রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতার অভাব পূর্ব ও পশ্চিমের ভেতর আরেকটি পার্থক্য। সেক্যুলারিজমের এমনই কঠিন অবস্থার কারণ কী?
অষ্টাদশ শতকে পশ্চিমে গড়ে ওঠা সেক্যুলারিজম একটি বিপ্লবী উদ্ভাবন ছিল। লোকে তাদের জীবনকে তাত্পর্যপূর্ণ করে তুলতে চাইত বলে আধুনিক কালের আগে ধর্ম সব মানবীয় কর্মকাণ্ডে মিশেছিল। অন্য সব তত্পরতা থেকে একেবারেই ভিন্ন ব্যক্তিগত, একান্ত অন্বেষা হিসেবে ধর্মের ধারণা প্রাক-আধুনিক ইউরোপ ও বিশ্বের বাকি অংশের কাছে অজানা ছিল। অন্য কোনো সংস্কৃতিরই এ রকম কিছু নেই। আমরা ‘ধর্ম’ হিসেবে যে শব্দটির তরজমা করে থাকি (যেমন আরবি ‘দ্বীন’ বা সংস্কৃত ‘ধর্ম’) সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার কথা বোঝায়। রাজনীতি থেকে ‘ধর্ম’কে বিচ্ছিন্ন করা ককটেইল থেকে জিন আলাদা করার মতোই কঠিন হতো। সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি তত্পরতাকে আলাদা করতে না পারার নির্বুদ্ধিতা নয়, বরং দরিদ্রের দুর্ভোগ, আইন-শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখা এবং ন্যায়বিচারের মতো ব্যাপারগুলোর কারণেই এমন ছিল।

তাহলে সেক্যুলারিজমকে নেহাতই পশ্চিমা ধারণা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে?
এটা পশ্চিমা উদ্ভাবন; আমরা নিজেদের গতিময়তা থেকে, অন্য কারো তাগিদে নয়, এটা গড়ে তুলেছি। আমাদের আধুনিকায়নের পক্ষে এটা জরুরি এবং অনেকেই একে মুক্তিদায়ী মনে করেন। কিন্তু আরববিশ্বে এটা স্রেফ বিদেশী আমদানি; ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে আরোপিত, রাজনৈতিক মুক্তির চেয়ে বরং রাজনৈতিক অধীনতার সঙ্গেই এসেছে। উপনিবেশবাদীরা বিদায় নেয়ার সময় এমন নিষ্ঠুরতার সঙ্গে একে আরোপ করা হয়েছে যে, ভীষণ অশুভ মনে হয়েছে।

আতাতুর্ক আধুনিক তুরস্ককে সেক্যুলার করার সময় মাদ্রাসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁর জাতিগত শুদ্ধিকরণ নীতি চিরকালের জন্য অটোমান তুরস্কের ক্ষমতা দখল করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আর্মেনীয় গণহত্যা চালানো ইয়াং তুর্কদের সহিংসতার সঙ্গে সেক্যুলারিজমকে মিলিয়ে দিয়েছে। এ শাসকরা তাদের দেশকে আধুনিক (অর্থাত্ ইউরোপীয়) দেখতে চেয়েছেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পশ্চিমা ধ্যান-ধারণার সঙ্গে কোনো পরিচয় ছিল না।

ইসলামীজমের মাতৃভূমি মিসর সম্পর্কে কী বলবেন?
১৯৫৪ সালে গামাল আবদেল নাসেরের প্রাণের ওপর হামলার পর তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সংখ্যালঘু অপরাধীদের পাশাপাশি হাজার হাজার নির্দোষ সদস্যকে কারারুদ্ধ করেন। বেশির ভাগকেই লিফলেট বিলি বা মিটিংয়ে অংশ নেয়ার চেয়ে বড় কোনো অপরাধ ছাড়া বিনা বিচারে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

তাদের একজন ছিলেন সায়িদ কুতব। জঘন্য কারাগারে ব্রাদারদের প্রহার, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড দেখে এবং নাসের মিসরকে পশ্চিমা কায়দায় সেক্যুলার করে ইসলামকে একেবারে ব্যক্তিগত বলয়ে সীমিত করার প্রতিজ্ঞা করছেন জেনে সেক্যুলারিজমকে তাঁর কাছে ভীষণ অশুভ মনে হয়েছে। কারাগারে থাকতেই সুন্নি মৌলবাদের ‘বাইবেল’ মাইলস্টোন লেখেন তিনি। নাসেরের বিশেষ অনুরোধে ১৯৬৬ সালে একেবারে কোণঠাসা করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত একজন মানুষের রচনা। এসব ভয়ঙ্কর কারাগারে অন্য ব্রাদাররা চরমপন্থীতে পরিণত হয়; ১৯৭০ সালে তাদের মুক্তি দেয়া হলে এ চরমপন্থাকে তারা মূলধারায় নিয়ে আসে।

ক্যারেন আর্মস্ট্রং: তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ব্রিটিশ পণ্ডিত। আ হিস্ট্রি অব গড, দ্য ব্যাটল ফর গড, দ্য গ্রেট ট্রান্সফরমেশনসহ ধর্মের ইতিহাস নিয়ে বেশ কয়েকটি বেস্ট সেলার গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। তাঁর সাম্প্রতিকতম গ্রন্থ ইহুদিবাদ, ক্রিশ্চানিটি ও ইসলামে সহিংসতা প্রসঙ্গে ফিল্ডস অব ব্লাড: রিলিজিয়ন অ্যান্ড দ্য হিস্ট্রি অব ভায়োলেন্স।

ভাষান্তর: এস হোসেন