এক কুঁড়ে ব্রাহ্মণ আর তাঁহার কুঁদুলে ব্রাহ্মণী, একদা তাহাদের ঘরে ডোলভরা সোনামুগ, মটকাভরা শালিধান, কপিলাগাইয়ের দুধে গোয়ালের মাটি ভাসিত। অন্নের অভাব ছিল না। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীতে  সুখের অভাব ছিল না,বাঁধা-ছাঁদার অভাব ছিল না, সেই কাল গিয়াছে। এখন পূজা করিয়া আর কয় পয়সাই আসে, ব্রাহ্মণী ঢেঁকি ভানিয়া তুষ খান, তুষ কুটিয়া ভুষি খান। স্নান সারিয়া আসিয়া গায়ের কাপড় গায়েই শুকাইতে হয়, খ্যাংরা লইয়া ব্রাহ্মণী কথায় কথায় ব্রাহ্মণকে তাড়া করেন। যে পুরুষ মজুদ থাকিতে সংসারে অর্থসমাগম হয় না, তাহাকে স্ত্রীলোক ভালোবাসিবার মর্যাদা দিতে পারে না।

একদিন দুপুরবেলা, দিনের রৌদ্র চমচম করিতেছে, দীঘিতে স্নান সারিয়া ঘাট হইতে উঠিতে গিয়া  ব্রাহ্মণী পৈঠায় ঠন করিয়া কীসের শব্দ শুনিলেন, যেন মোহরভরা ঘড়ায় কাহারও কাঁকন লাগিয়া আওয়াজ হইলো। এদিক-ওদিক চাহিয়া তিনি কাহাকেও দেখিলেন না। ঘাটের পাকুড়গাছটার পিছে দুষ্টলোকে লুকাইয়া দরিদ্রঘরের মেয়ে-বউয়ের স্নান দ্যাখে, ব্রাহ্মণী ঠাহর করিয়া দেখিয়া সেইখানেও কিছু দেখিতে পাইলেন না। আর্দ্রবস্ত্রে ঘরে ফিরিয়া কাপড় বদলাইলেন। রাইখরিয়ার চড়চড়ি দিয়া ভাত খাইতে খাইতে ঘাটের কথা ভুলিলেন।

পরদিনও ঘাটের শেষ পৈঠায় ঠন করিয়া শব্দ হইলো। এদিক-ওদিক চাহিয়া আজিও তিনি কাহাকেও দেখিলেন না। বাড়ি ফিরিয়া ক্ষুদের পুড়পুড়ি আজ আর গলা দিয়া নামিল না, বাকি বেলা শঙ্কায় কাটাইলেন। পরের দিনও এমন শব্দ হইবার পর ব্রাহ্মণী আথিবিথি করিয়া ছুটিয়া আসিয়া স্বামীকে সেই গল্প বলিলেন। স্বামী স্ত্রীলোকের বিভ্রম এবং স্বল্পবুদ্ধিযোগ বলিয়া এই গল্প উড়াইয়া দিলেন। ব্রাহ্মণ যেদিন স্বয়ং দীঘির ঘাটে এই ঠন শব্দ পাইলেন, সেদিন হইতে তিনি সভয়ে তোলা জলে স্নান করিতে লাগিলেন। দিনকাল ভালো নয়। আগে লোকে তেনাদের ভয় পাইতো, এখন ভূতের পাশাপাশি মানুষকেও লোকে ডরায়। তাঁহার ভীতি দেখিয়া ব্রাহ্মণী দুই কথা শুনাইয়া দিলেন, যেমন—ঘর আর গোলাঘর মিলিয়া তাঁহাদের এমন কী রহিয়াছে, যাহা দুর্বৃত্ত ভূতের লহিবার মতো, দুধটা-ফলটা খাইতে না পারিয়া তাঁহার আপনার দেহশ্রীও হত হইয়াছে— দস্যুর লুণ্ঠন করিবার মতো ইহসংসারে কী আছে ইত্যাদি। এইসব আকথা ক্বাংস্যবিনিন্দিত স্বরে শুনিয়াও ব্রাহ্মণ তোলা জলেই স্নান করিতে লাগিলেন। কিন্তু ভূত কপালে থাকিলে দীঘিই কি আর কূপই কি। কূপে বালতি ফেলিলে রজ্জু ধরিয়া কি নিতল হইতে এক বালতি ভূত উঠিয়া আসিতে পারে না?

ভূত একদিন দেখা দিল। একটি দুইটি নহে, একঘড়াতে সাতভাই ভূত। একখানা পেতলের ঘড়ায় কাউমাউ করিতে করিতে তাহারা স্বমূর্তি ধারণ করিয়া ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর সামনে আসিল। দরিদ্র ব্রাহ্মণ আছাড় খাইয়া পড়িলেন, ব্রাহ্মণীও ভয়ে বিড়বিড় করিতে লাগিলেন। তাহাদের ভিতরে কী আলাপ হইলো, তাহা জানা যায় না। ভূতের পাল হিজলগাছে গিয়া ঝাঁক বাঁধিল। ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী আগেকার মতোই দিন কাটাইতে লাগিলেন। গৃহকর্মে তিলার্ধ ফুরসত পাইলে ব্রাহ্মণী হাতের কাজ করিতেন, ব্রাহ্মণও অলসতা করিতেন না, বরং আগের কালের তেজস্বী বিপ্রের ন্যায় বিদ্যা-আরাধনায় দিনযাপন করিতেন। ভূতের আজ্ঞা বলিয়া কথা।

বছর পুরিলে ব্রাহ্মণের ঘরে ছেলে হইলো, ছেলেকে মা চক্ষে হারায় তাই তাহার নাম ‘হারু’। ব্রাহ্মণ যে জমিদারবাড়িতে পূজা-আচ্চা করিতেন, সেই বাড়িতেও বড় তরফে একটি সুকুমার ছেলে জন্মিলো, সুন্দর দেখিতে বলিয়া তাহার নাম ‘চারু’। ভূতের বরেই কিনা কে জানে, হারু শৈশব হইতেই অত্যন্ত শ্রমনিষ্ঠ এবং পড়ুয়া হইলো, পাঠশালা তাহার মনের স্বপ্নের কবাট খুলিয়া দিল, জীবনের পথে অনিবারণ চলার এই তো শুরু হইলো। বড়ঘরের ছেলে চারু, সুন্দর দেখিতে বলিয়া সকলেই তাহাকে কোলে করিত, সে সোনার মল পরিয়া কাঁকাল বাঁকাইয়া নাচিয়া নাচিয়া এঘর-ওঘর করিয়া বড় হইতে লাগিলো, শ্রমের মর্যাদা কিংবা পাঠের অধ্যবসায়ের সহিত তাহার দেখা হইলো না। একটু বড় হইবার পর বিদ্যার অভাবে চারু যদি কলু কি ঘেসেড়া হইতে যায়, সেই ভয়ে তাহাকে একসময় হারুর সাথে একই পাঠশালায় ভর্তি করা হইলো।

ব্রাহ্মণের ঘরে হারুর পরে জন্মিল নাড়ু, নাড়ুগোপাল। মায়ের ডোলঝাড়া কোলপোঁছা সন্তান বলিয়া তাহার অনেক আদর । হারুর মা সারাবেলা নাড়ুকে নাওয়ান, খাওয়ান, তেল মাখান। হারু চাটাইঘেরা দাওয়ায় মাদুরে বসিয়া দুলিয়া দুলিয়া একাগ্রচিত্তে পড়া করে। একদিন তাহার তপস্যার অমৃতফল ফলিবে, ভূতের বাণী কি মিথ্যা হইতে পারে!

চারু পাঠশালায় কোনোমতে যায়, রূপবাবু রঘুবাবু সেকালের মস্ত জমিদার ছিলেন— শোনা যায় তাহাদের বাড়ির ছেলেরা কেবল মুখ দেখাইতে পাঠশালায় যাইত, পরীক্ষা দিতে হইতো না, পাসকরিতে হইতো না সেইরকম। সেকাল কাটিয়া গিয়াছে বলিয়া অবশ্য চারুকে পাস দিবার জন্য পরীক্ষা দিতে হয়, সে খাতায় লেখে হাঁসের ডিম আর ডাহুকের ঠ্যাঙ, সাথে বকের ঠোঁট। এই হাতের লেখা পণ্ডিত মহাশয় বুঝিতে পারেন না, চারুর বাবা-মা বলেন, ‘আহা বাছা আমার।’ পণ্ডিত মহাশয়ও বাধ্য হইয়া বলেন, ‘বাছা আমার।’ যেদিন রোদ বেশি ওঠে, সেদিন চারুর পাঠশালা যাইতে হয় না, বৃষ্টিবাদলার দিনেও তাহাকে পড়িতে আসিতে হয় না।

হারু প্রতি ক্লাসে প্রথম হয়। কেমন কেমন করিয়া চারু প্রথম না হইতে পাক, পাস করিয়া যায়। অথচ চারুর চেয়ে ভালো হাতের লেখা সত্ত্বেও গয়লাদের ভুষোকালি ছেলেটা পাস করে না। হারু পড়ায় ভালো বলিয়া পাঠশালার বাকি পোড়োরা তাহাকে লইয়া হাসে, চারু ইত্যবসরে পড়া-পারা ব্যাপারখানা হাস্যকর এবং সাধারণ লোকের কীর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করিতে পারিয়াছে, অসাধারণ লোকে পড়া পারে না— যেমন চারু। খেলার মাঠেও হারু চৌকস, সকলেই তাহাকে দলে লইতে চায়। ননির পুতুল চারুকে কেহ দলে নিতে চায় না বলিয়া সে পাড়ার পঞ্চু-মতি-ভূতো-হরিশ এইসকল দুষ্ট ছেলের সহিত দল পাকাইয়া অন্য খেলোয়াড়দের ঘুঁটে ছোঁড়ে, ঢিল ছোঁড়ে। দৌড়ে হারু প্রথম হয়, মেডেল পায়। দৌড়ে চারু শেষমেশ হাঁপাইতে হাঁপাইতে আসে, তাহাকে শিক্ষকরা একটি সান্ত্বনা পুরস্কার মেডেল দিয়া কান্না থামান। গয়লাদের কেলেকুলো ছেলের কান্না কেহ থামাইতে আসে না, না তাহার মা, না শিক্ষককুল।

চারুকে টিফিনে মানুয়া-চাকর দুধ-জিলিপি খাওয়ায়। বাড়ি ফিরিয়া চারু খেলিতে বসে, কত তাহার খেলনা হাতি-ঘোড়া, কত না ভেঁপু, বাঁশি। বেলা পড়িলে তাহাকে পড়াইতে মাস্টার আসে, পড়ার মাস্টার গেলে বেহালা শিখাইবার ওস্তাদ আসে। হারু বাড়ি ফিরিয়া একবারে পান্তা খায়, খাইয়া উঠিয়া বুধী গাইয়ের যত্ন করে, ভাইয়ের দোলনা দোলায়, কলাবাসনার ক্ষার দিয়া কাপড় কাচে। হারুর মা নিভিয়া আসা উনোনের আঙায় আনাজ পোড়ান, হারু তাঁহাকে কাঠ কুড়াইয়া, শাক কুড়াইয়া আনিয়াদেয়, উদয়াস্ত কাজের মাঝে একসময় হারু গিয়া হিজলগাছে একখানা নমো করিয়া আসে,বাপমায়ের আদেশ। সন্ধ্যাকালে হারু পড়িতে বসিবার আগে ভাইকে কোলে করিয়া সুর করিয়া কবিতা শোনায়— ‘ঝিকিমিকি দেখা যায় সোনালি নদীর, ওইখানে আমাদের পাতার কুটীর।’

দক্ষিণাবাবু শিশুকিশোরদের ভালো-হিংসা, খারাপ-হিংসা ইত্যাদির তফাত শিখাইতে কত কী লিখিলেন। ভালো হিংসা হইলো ভালো হইবার প্রতিযোগিতা, এই হিংসা বহুকাল আর কেহ করে না, সেইসব ছিল ঘড়াভরা ভূতের কালে। ছিল বলিয়া শোনা যায়। আজকাল খারাপ হিংসায় জগত ভরপুর। নিষ্ঠায় কাহারও সহিত প্রতিযোগিতা চলে না, প্রতিযোগিতা করিবার জন্য নিষ্ঠাবান খুঁজিলে পাইবে না। যদি বা কাহারও মাঝে নিষ্ঠা দেখিবে, তাহার প্রতিযোগিতা করিবার উদ্যম চলিয়া গিয়াছে।

যাহা হউক, প্রকৃতিদত্ত বুদ্ধিবলে হারু যত প্রশংসিত হইতো, তাহার চারিপাশ খারাপ-হিংসায় ভরিয়া যাইত, চারু এবং তাহার দল মিলিয়া তাহাকে পদে পদে জব্দ করিত। হারুর নাম করিয়া চারু পণ্ডিত মহাশয়কে মিথ্যা নালিশ করিয়া আসিত, বলিত দর্পভরিয়া হারু কী কী বলিয়াছে, এমনকি শিক্ষকের বিদ্যার দৌড় নিয়া কী বলিয়াছে। পণ্ডিত মহাশয় তাঁহার আদর্শ ছাত্র হারুর নামে সেই নালিশ শুনিয়া বিশ্বাস করিতে পারিতেন না, কিন্তু চারু বড়লোকের ছেলে, তাহাদের দান ছাড়া পাঠশালা চলিবে না, চারুর কথাও ফেলিতে পারিতেন না। অতএব, পাঠশালায় হারুকে অল্পবিস্তর শাস্তি পাইতে হইতো। হারুর চক্ষের জল বুকের উষ্মার উনোনে ধোঁয়া হইয়া উবিয়া যাইত। বাড়ি ফিরিয়া সে খাইত না, শুইয়া পড়িত। দরিদ্র ব্রাহ্মণ সেই চারুদের বাড়িতেই চাকুরি করেন, তিনি পিতা হইয়াওভরসাবিশেষ দিতে পারিতেন না, বলিতেন, হারু, চারুর অত্যাচার মানিয়া লইয়া তাহাকে নমস্কার করিবে। প্রাণান্ত ক্লেশে হারু এই অন্যায় উপদেশ মাথা পাতিয়া লইত। হারু নিঃশব্দে যত মানিয়া লইত, তত জো পাইয়া চারুর দল হারুকে নাস্তানাবুদ করিত।

এমনি একদিন হারু মুখ-হাঁড়ি করিয়া শুইয়া ছিল, চক্ষের জল তাহার বাঁধ মানিতেছিল না। সন্ধ্যার অন্ধকারে সাতভূতের একঘড়া গড়াইয়া আসিল তাহার কাছে। হারু ভয় পাইলো না, মানুষ-ভূতের কিল যে খাইয়াছে, তাহার বায়বীয় ভূতে ভয় কী! ভূত আসিয়া তাহাকে পরামর্শ দিল, ‘তুমি এমন মুখ কালি করিয়া থাকিও না। আমরা সাতভূতে গাছে বসিয়া তোমার মা-বাপ আর তোমার সুকর্মেরই তো সুফল পাই। আমরা তোমার হইয়া শোধ লইব।’ হারু চোখ মুছিয়া মাকে গিয়া বলিল, ‘মা পান্তা দে, আমানি দে। নয়নামাছের ঝোল দে।’ খাইয়া দাইয়া হূতোদ্যম হারু আবার বুক বাঁধিয়া পড়িতে বসিল।

চারু শখের ফুটবল খেলিত। জেলাপর্যায়ের টুর্নামেন্টে তাহার দল খেলিতে নামিল। হারু দেখিল, মাঠে ভূতের ঝাঁকও নামিল, আর কেহ তাহাদের ভয়ালমূর্তি দেখিতে পাইল না। চারু যত গোল দিতে যায়, বল বাঁকিয়া বিপক্ষের পোস্টে না যাইয়া তাহার আপনার গোলপোস্টের মাঝ দিয়া ঢুকিয়া বাগদিপাড়ার সেই ছেলের মতন জাল মুড়ি দিয়া শুইয়া পড়ে। টুর্নামেন্টে চারুর লজ্জাজনক হার হইলো, যাহারা তাহাকে কাঁধে করিয়া লইয়া গিয়াছিল, তাহারা দুয়ো দিল। ফিরিবার পথে কাহারা গাছ হইতে চারু আর তাহার দলের গায়ে দোয়াতের কালি উপুড় করিয়া দিল, কালিমাখা মুখে চারুরা বাড়ি ফিরিল। হারুর খুশির সীমা রহিল না। এতকাল পরে উচিত শাস্তি হইয়াছে। হারু হাডুডু খেলিয়া মেডেল পাইলো, চনমন করিতে করিতে ঘরে ফিরিলো। আগামীতে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষা দিয়া সে জলপানি পাইবে। কালে কালে একদিন এইভাবে শুভ জয়ী হইবে, অশুভ পরাস্ত হইবে। ভূতের বর বলিয়া কথা।

কালে কালে যাহা হইলো তাহা এই— হারু বামুনপিসির শিম-বেগুন তুলিয়া দিয়া, ক্ষ্যান্তমাসিকে রামায়ণ পড়িয়া শুনাইয়া বড় হইতে লাগিলো, ভাবিলো গুরুজনদের নিঃশব্দ আশীর্বাদের ফুল তাহার জীবনের মার্জিনে মার্জিনে ফুটিয়াথাকিবে। চারু অন্ধ-খোঁড়া ভিখিরিদের হেনস্তা করিয়া, পাখির বাসা হইতে ছ্যানা চুরি করিয়া, ছিপ তোয়ের করিয়া বড়শি ফেলিয়া, পাঠশালা পলাইয়া তামাক খাইয়া দিব্য বড় হইতে লাগিল। সভয়েকেহ তাহার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করিল না, উপদ্রুতরাও চোখ মুছিয়া বলিল, আহা বেশ ছেলে। ক্রমেই হারু দেখিল, বামুনপিসির বেগুন তুলিতে হারুকে লাগে সত্য, গুড়ের সন্দেশগুলি তিনি চারুকে বসিয়া খাওয়ান। ক্ষ্যান্তমাসির ছেঁড়া শাড়ির পাড় হইতে সুতা তুলিয়া ছুঁচে ভরিতে হারুকে লাগে সত্য, চারুর সুনজরে পড়িলে চারু কোনোক্রমে তাহার মাকে বলিয়া দিলেই তিনি একখানা নতুন থান আপনি পান। চারুর সুনজরে পড়িবার উপায় হইতেছে হারুর দুর্নাম করা, তিনি হারুকে দিয়া ছুঁচে সুতা ভরাইলেন এবং আড়ালে তাহার দুর্নাম করিলেন। জগতে সুকর্মের পরাজয় এবং দুষ্কর্মের জয়ধ্বনি হইতে লাগিল। হারুর মন গ্লানিতে ভরিয়া উঠিল। কিন্তু সে হার মানিল না। একদিনবিভাগের মধ্যে সে সর্বপ্রথম হইবে, সোনার পদক গলায় দিয়া বাপ-মাকে আসিয়া প্রণাম করিবে, এই দুঃখের কাল যশের সোনা রোদে কাটিয়া যাইবে।

বিভাগের ভিতর হারু প্রথম হইলো না। শোনা গেলো চারুর পিতা শিক্ষা বিভাগের হর্তাকর্তাদিগকে হাত করিয়াছেন। চারু পরীক্ষার খাতায় অর্ধেক লিখিয়া বাকিটা কাটিয়া, মানচিত্র নকল করিয়া উলটা আঁকিয়া বিভাগের ভিতরে সর্বপ্রথম হইলো। হারু সারা বেলা পরীক্ষার খাতা মুক্তাক্ষরে ভরাইয়া বিভাগের ভিতর সর্ববিষয়ে দশম হইলো। সম্বত্সর চারু সোনার হার, মখমলের কাপড় আর মশমশে কালি করা জুতা পরিয়া আসিয়া বইয়ের পাতায় মুখ লুকাইয়া হারুকে নিয়া হাসিত আর হারুর বুক জ্বলিয়া যাইত। এখন চারু বইয়ের পাতার আড়াল রাখিল না, ক্লাসের মাঝখানটিতে দাঁড়াইয়া হা-হা করিয়া হাসিল। নির্লজ্জ পণ্ডিতমহাশয় চারুর প্রশংসা করিতে লাগিলেন এবং তিনি যে দূরদৃষ্টিতে আগেই এই কৃতিত্বের সম্ভাবনা দেখিয়াছেন, তাহা সকলকে শতমুখ করিয়া বলিতে লাগিলেন, শুধু লেখাপড়া নয়, চারু যে বেহালাও বাজাইতে পারে, সেইসব যোগ করিতে ভুলিলেন না।পণ্ডিতমহাশয়ের এই ঘোষণা একখানা কলম-তরাশের মতন হারুর প্রাণে বিঁধিল। হতোদ্যম হারু জলকাচা জামা গায়ে বাড়ি ফিরিল। ফিরিবার পথে ধানক্ষেতগুলি-পাটগাছগুলি-শনগাছগুলি সকলি তাহার কানে শনশন করিয়া বলিতে লাগিল, ‘কলাপোড়া খাও।’

হারু আসিয়া শুইয়া পড়িল। তিনদিন বাড়ির বাহির হইলো না। এই তিনদিনে বামুনপিসি-ক্ষ্যান্তমাসিরা চারুর বাড়ির উত্সবের সন্দেশ-রসগোল্লা-অমৃত্তি খাইয়া আসিয়া বাড়ি বহিয়া হারুরমাকে শুনাইয়া গেল, ‘কেমন ছেলে পেটে ধরিয়াছিলে, ছেলের পেটে এত হিংসা যে, অন্যের কীর্তি সহিতে পারে না গো!’ যে ভিখিরির দল চারুর হাতে বিনাদোষে মার খাইত, তাহারা প্রহারের বেদনা ফলারে ভুলিয়া ঢেকুর তুলিতে তুলিতে বলিল, ‘বড়ঘরের রকমসকমই আলাদা।’ হারু একাকী কুরুক্ষেত্রের অন্ধকারে শরশয্যায় শুইয়া ভাবিল, ভগবান তাহা হইলে মিথ্যা, ভগবানের নামে যাহা কিছু বৃহত্, মহত্ ও শুভ, তাহাও মিথ্যা। লোকের সুবিধা হইবে বলিয়া ফাঁপাইয়া তোলা হইয়াছে। ভগবান মিথ্যা হইলে তো ভূত সত্য।

‘পুনশ্চ পরীক্ষা দিব সবাকার আগে।

দেখিয়া লোকের যেন চমত্কার লাগে ’

পাড়াগাঁয়ে গোবাঘা ডাকিতেছে। কোলের ছেলে দুলাইয়া মায়েরা ঘুমপাড়ানি গান গাহিতেছে। হারুর মা হারুর বাপকে ভিতরঘরে বলিতেছিলেন, ‘বুধীগাইকে বেচিয়া দিয়া নাড়ুগোপালকে সদরের ইস্কুলে পাঠাও, টাকা দিয়া বিদ্যা কিনিবার যুগ আসিয়াছে, শ্রমে বিদ্যালাভ করিতে হইলে গরিবের পোকে হারুর মতন হতাশ— হারুর মতন নাকাল হইতে হইবে।’ এতকাল মা তুলনা দিতেন, হারুর মতন বলিষ্ঠ, হারুর মতন নিষ্ঠাবান! হারু বাহির হইয়া আঙিনার অন্তিমে হিজলগাছটির তলে আসিয়া সাত ভূতকে ডাক দিল। কেহ আসিল না। কেহ ঘড়াভরা মোহরের মতন ঠন করিয়া শব্দ করিল না। কাহার বাড়ি হইতে কলহংস কঙ্ক কঙ্ক করিয়া ডাকিয়া উঠিল। অন্ধকারে পায়ে পায়ে হারু গ্রামের প্রায় বাহিরে আসিয়া পড়িল। ফসলের মাঠ জোছনায় ভাসিয়া যাইতেছে। চারুদের বাড়ির নহবতখানায় এখনো উত্সবের বাজনা বাজিতেছে। চারুদের বাগানবাড়ির আঁশফলগাছগুলিতে মুকুল আসিয়াছে, মৃদু নিবিড় সুবাসে আমোদিত সেই গাছগুলির তলে সাতজন দিব্যপুরুষ দাঁড়াইয়া আছে। হারুকে দেখিয়া তাহারা হাসিল, তাহাদের মধ্যে একজন বলিল, ‘আমরা সাত ভূত চারুর বাড়িতে আনন্দযজ্ঞের পুণ্যে উদ্ধার পাইয়া দেহ ছাড়িয়া স্বর্গে চলিয়াছি। গ্রামের গাছপালা উজাড় হইতেছে,গ্রিনভ্যালি হাউজিং হইবে, অতএব আমাদের বসত বলিতে কিছু থাকিবে না। আমরা চলিলাম। মনে রাখিও, কর্ম হোক যাহা-তাহা/ জন্ম হউক ভালো। ভালো থাকিও,’ (বলিয়া ইতস্ততঃ করিল), তাহাদের ভিতরে সবচেয়ে কলহপরায়ণ ভূতটি কলকল করিয়া উঠিল, ‘ভাল থাকিও না। মরিবে। আমরা চলিলাম, জগতে সেই বেনের-পো হইতে শুরু করিয়া বহু ঠগ-জোচ্চরকে কিলাইয়া শায়েস্তা করিয়াছি। যেমন কাল পড়িয়াছে, তাহাতে ঠগ কিলাইতে গেলে জগত নির্লোম কম্বলের ন্যায় হইয়া পড়িবে।’