১৩৩৭-এর বৈশাখে নতুন ধানের সংবাদ দিয়েছে ‘কৃষক’। ঢাকার সরকারি পরীক্ষাগার (তখনো এর অবস্থান আজকের খামারবাড়ি এলাকায়, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার জন্য মণিপুর ফার্ম) সাতটি নতুন ধান আবিষ্কারের খবর দিয়েছে। প্রতিটির ফলন বেশি, কৃষকের জন্য লাভজনক, ভাতও সুস্বাদু।
এ সাতটির মধ্যে চারটি হচ্ছে শালী ধান্য এবং তিনটি আশু ধান্য। নিবন্ধটি পুরনো বাংলার ধান-চাল, পাট, চা ইত্যাদি নিয়ে।
শালী ধান্য
আবিষ্কার নং ঢাকা ১ ইন্দ্রশাইল
ভাওয়ালের নিচু জমি পূর্ব ও উত্তরবঙ্গের উর্বর জমি, যা নভেম্বর পর্যন্ত সিক্ত থাকে, এই নতুন ধানের জন্য উপযোগী।
ইন্দ্রশাইল মাঝারি আকারের রোয়াধান। ধান কাটার মৌসুম ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়। উঁচু জমি ইন্দ্রশাইলের উপযুক্ত নয়। প্রতি বিঘায় ফলন এক মণের বেশি হয়।
ঢাকা নং ৫ দুধসর
অনেকটা ইন্দ্রশাইলের মতো, তবে ফলনের জন্য অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি উত্তম। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পেকে যায়। ফলনও বেশি।
ঢাকা নং ১৫ ঝিঙ্গাশাইল
ঝিঙ্গাশাইল ইন্দ্রশাইল ও দুধসরের চেয়ে উত্তম এবং মিহি ধান। ধান পাকে দুধসরের সঙ্গেই। ফলন ইন্দ্রশাইলের সমান, স্থানীয় ধানের চেয়ে বিঘাপ্রতি এক মণ বেশি। ঝিঙ্গাশাইলের খড় নরম, ঝড়ো বাতাসে শুয়ে পড়ে।
ঢাকা নং ৭ তিলক কাচারি
তিলক কাচারি মোটা ধান। ধান পাকতে ইন্দ্রশাইলের চেয়ে বেশি সময় নেয়, তবে ফলে এর চেয়েও বেশি। নিচু জমি বেশি উপযোগী। যারা ধানের বেশি ফলন চান, তাদের জন্যই তিলক কাচারি।
আশু ধান্য
ঢাকা নং ২ কটকতারা
কটকতারা মাঝারি আকারের মিহি ধান। চার মাসে ধান পেকে যায়। উঁচু জমিতে ছিটিয়ে বোনা হয়। মধুপুর জঙ্গলের উঁচু জমিতে ভালো ফলন হয়েছে। রবিশস্যের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি চাষের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পাকতে দেরি হয় বলে দোফসলি ধানী জমির উপযোগী নয়।
ঢাকা নং ৪ সূর্যমুখী
শুধু চালের প্রকৃতি ভিন্ন, আর সব কটকতারার মতোই। পাকতে সময় বেশি লাগে।
ঢাকা নং ৬ চারনক
চারনক উচ্চ ও হালকা জমির উপযোগী আউশ ধান। চালটি সরু। ফলন বেশি। কটকতারা ও সূর্যমুখীর চেয়ে আগে পাকে।
কৃষক তার জমির প্রকৃতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী ধান বেছে নেবেন।
পাটের বাজার মন্দা
আর্থিক উন্নতির ভাদ্র ১৩৩৭ সংখ্যা মনে করিয়ে দেয়, পাট যেন শেষ পর্যন্ত কৃষকের গলার কাঁটা না হয়ে পড়ে।
১৩৩৬ বঙ্গাব্দে আসাম, বঙ্গদেশ ও বিহার-উড়িষ্যায় পাট চাষ বেড়েছে কিন্তু পাটের দাম কমে গেছে। বঙ্গদেশে আরো ১ লাখ ২৬ হাজার একর জমি পাটের আওতায় চলে এসেছে। রাজশাহী অঞ্চল ছাড়া বাংলার অন্যত্র ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু কাঁচা পয়সার লোভে ফাঁদে পড়ে এখন চাষীরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
‘এমনকি যুদ্ধের পূর্বে যে দর ছিল, এবার তাহা অপেক্ষাও কমিয়াছে। ঢাকায় মান বুঝিয়া প্রতি মণ সোয়া ৫ টাকা হতে পৌনে ৭ টাকা দরে বিক্রয় হইতেছে। বিক্রমপুরে ৫ টাকা হইতে সাড়ে ৬ টাকা, নারায়ণগঞ্জে সাড়ে ৫ টাকা হইতে সাড়ে ৬ টাকা দরে পাট বিক্রি হইতেছে। বাজার ক্রমশ মন্দা, প্রায়ই ৩/৪ আনা করিয়া দর নামিয়া যাইতেছে। দর আরও কমিয়া যাইবে বলিয়া বিশেষজ্ঞগণ অনুমান করিতেছেন।... যে রূপ দেখা যাইতেছে পাটের দর অন্তত ১০/১২ টাকা না হইলে মহা অর্থ সংকট উপস্থিত হইবে।’
পাটের দর নেমে যাওয়ায় স্থানীয় সব ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব বিরাজ করছে। পাটকলে উত্পাদিত চট, শাল ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে অবিক্রীত রয়ে গেছে। গত বছরের পাটের মজুদ শেষ হয়নি। পাটকলের মালিকরা সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা ৬০ থেকে ৫৪-তে নামিয়ে এনেছেন। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তিন সপ্তাহের ছুটি ঘোষণা করেছেন। ফলে শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
চা পান না বিষপান?
সঞ্জীবনী পত্রিকার ২৬ অগ্রহায়ণ ১৩৩৬ সংখ্যা চায়ের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করতে লিখেছে:
‘৩৩ কোটি ভারতবাসীর মধ্যে যদি সাড়ে ১৬ কোটি ভারতবাসী অর্থাৎ অর্ধেক লোক প্রত্যহ ১ পয়সার চা পান করে বলিয়া ধরা যায়, তবে প্রতিদিন ২৫ লক্ষ টাকা অর্থাৎ মাসে সাড়ে ৭ কোটি টাকা অর্থাৎ বত্সরে ৯০ কোটি টাকা আমরা চা পানে নষ্ট করি।
এদিকে ভারতবাসীর গড়ে দৈনিক আয় ৬ পয়সা মাত্র। চা বিষ প্রাতঃকালে খালিপেটে সেবন করিয়া আমরা অজীর্ণ প্রভৃতি রোগে ভুগি। চা পানের ফলে ভাত প্রভৃতি খাদ্য বেশি খাওয়া যায় না। ১ পয়সার চায়ের লোভে আমরা আয়ু হ্রাস করি।’
সর্ব্বনেশে অভ্যাস
অগ্রহায়ণ ১৩৩৬ বঙ্গলক্ষ্মী ডাক্তার সুন্দরী মোহন দাসের নিবন্ধ ‘চা পানের কুফল’-এর অংশবিশেষ:
‘চা পানের সর্ব্বনেশে অভ্যাস হলে উহা ক্রমশ বেড়ে যায়— দশ বারো বার চা না হলে চলে না। অন্তঃত্ত্বা অবস্থায় স্ত্রীলোকের পক্ষে ইহা ভয়ানক অনিষ্টকর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন দেখলেন বিলাতে চায়ের জন্য স্বাধীন চীনের উপর নির্ভর করতে হয়, তারা অধীন ভারতে চা উত্পন্ন করবার মতলব আঁটলেন। ১৮৩৪ খৃষ্টাব্দে লর্ড বেন্টিঙ্ক ভারতে চায়ের চাষ করবার জন্য চীন থেকে চা এবং চীনা শ্রমজীবী আনালেন। তিনি সতীদাহ নিবারণ করেছিলেন বটে কিন্তু চায়ের অপব্যবহারের দরুন কত পরিবারের যে কত মর্মদাহ ভবিষ্যতে হতে পারে, তা তিনি অনুভব করেন নাই। ...১৮৫২ খৃষ্টাব্দে আসামোত্পন্ন চা চীনের চায়ের সমকক্ষ হয়েছিল। প্রথমে দেশীয় লোকেরা চা খেতেন না। এখন চা একটা নেশায় পরিণত হয়েছে।’
১৮৬৪ সালে এ দেশ থেকে ৮০ লাখ পাউন্ড চা রফতানি হয়। এখন প্রতি বছর ৩৫ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড চা রফতানি হয়। দেশে চা ধরানোর জন্য এন্ড্রুুয়াল কোম্পানি কেরানিদের টিফিনের ছুটির সময় ৫ সিকে খরচ করে চা খাওয়াত; তারপর খরচ করত ১০ আনা, তারপর চার আনা। তারপর যখন নেশা ধরেছে তখন আর কিছুই খরচ করতে হলো না। এখন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সবাই চা খায়। মুটে মজুর সবারই এখন চা না হলে চলে না।
‘হিন্দু চা’— ত্রিবিধ স্বর্গমুখ!
ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘তত্ত্ববোধিনী’র চৈত্র ১৩৩৬ সংখ্যায় আাারো লিখেছেন:
“চায়ের দোকানে চা তো দিনরাত চড়ানোই থাকে— মধ্যবিত্ত লোকেরা দোকানে বসিলেন, পাঁচজনের সঙ্গে খোশগল্প, অশ্লীল তামাশা জুড়িয়া দিলেন; ইতিমধ্যে দোকানদার সেই সিদ্ধ চায়ের জল ঢালিয়া তাহাতে টিনের অসার দুধ ও চিনি মিশাইয়া চা প্রস্তুত করিয়া হাজির করিল। চা-পায়ী ভাবিয়া দেখিলেন না যে, তিনি চা খাইতেছেন না তীব্র বিষ গলাধঃকরণ করিতেছেন। আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি, অনেক চা বিক্রেতা একজনের খাওয়া চায়ের অবশিষ্ট অংশ সেই চা কুণ্ডে ফেলিয়া ‘হিন্দু চা’ প্রস্তুত করিতে কিছুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। ইহার ফলে চা-সেবী ত্রিবিধ সুখ লাভ করেন—
(১) ঘরের কড়ি স্বেচ্ছায় উড়াইয়া দেওয়া (২) বিষপান করা এবং (৩) মৃত্যুর মুখে অগ্রসর হওয়া।’
চায়ের জয়যাত্রা তবু রোধ করা যায়নি।
ঢাকায় খাদ্যদ্রব্যের দাম
সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা মির্জা আবু তালেব মোগল সেনাবাহিনীর জেনারেল। ১৬৬৪ থেকে ১৬৮৮ তিনি বাংলার সুবাদার ছিলেন, তার পরিচিতি শায়েস্তা খান নামেই। তার আমলে টাকায় আট মণ চালপ্রাপ্তির যে কাহিনীটি প্রচলিত আছে, তা মিথ নয়; তখনকার মানুষের কেনার সঙ্গতি নিয়ে বিশেষ কোনো গবেষণা হয়নি। চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়ে যায়।
১৭৪৩ সালের মে মাসে দ্রব্যমূল্য কেমন ছিল, তার একটা ধারণা পাওয়া যায় তখন ঢাকা রিভিও পত্রিকায়। অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর ঢাকা— অ্যা রেকর্ড অব চেঞ্জিং ফরচুনস-এ ১৭৪৩ সালের এই মূল্য উদ্ধৃত হয়েছে—
নোয়াখালী হিতৈষী
ভেজালে দেশ ছেয়ে গেছে।
১৩৩৭-এর বৈশাখে নোয়াখালী হিতৈষী জানিয়েছে:
‘কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর, নোয়াখালীর চৌমোহানী এবং নোয়াখালী সদরের বড় বড় মুদীদোকান ও আড়ত ভেজাল দ্রব্য আমদানি ও বিক্রয় করার প্রধান আড্ডা। এই সকল আড্ডার বিলোপ ও আড্ডাকারীগণের কঠোর শাস্তির বিশেষ প্রয়োজন। এদিকে আমরা স্বাস্থ্য বিভাগ ও মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষের তীব্র দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি।’
বিশুদ্ধ খাবার আইন রয়েছে, শহরে সেনেটারি ইন্সপেক্টরও রয়েছে কিন্তু আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। আসাম মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট অনুযায়ী ধুবড়ী পৌরসভা ভেজালের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে বেশ ক’জন ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বিক্রেতাকে গ্রেফতার করেছে।
দুধ, চাল, তৈল, ময়দা, ঘৃত, চিনি— খাবারের দোকান ও রুটিওয়ালার দোকানের সব উপাদানেই ভেজাল। এতে জনস্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, উদরাময় জাতীয় রোগ সংক্রামক আকার ধারণ করছে।
নোয়াখালী হিতৈষী লিখেছে:
‘ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বিক্রেতা এবং ভেজাল মিশ্রণকারী দুর্বৃত্তদিগকে অর্থদণ্ডের সহিত কঠোর কারাদণ্ড প্রদান না করিলে কখনো এই পাপ দূরীভূত হইবে না। কোন কোন উেকাচগ্রাহী ভেজাল পরীক্ষককেও অনুরূপ দণ্ড প্রদান করা বিধেয় বলে মনে করি।’
টাঙ্গাইল হিতৈষী
একই সময় টাঙ্গাইল হিতৈষী একটি সুসংবাদ দিয়েছে:
‘করটীয়ার জমিদার মেহেদি আলী খানাপনি সাহেব কৃষি স্বাস্থ্য ও জনগণের চলাচলের সুবিধার জন্য করালিয়াপাড়া গ্রামে একটি খাল পুনঃখনন করিয়া দিয়াছেন। যুবক জমিদার খানাপনি সাহেব স্বহস্তে খননকার্য করেন। তাহার দৃষ্টান্তে উত্সাহিত হইয়া তিনশত প্রজা এই কার্যটি শেষ করিতে যথাশক্তি পরিশ্রম করে। প্রায় ৫০ খানা পতিত জমি এই খাল খনন করায় আবার কৃষিযোগ্য হইয়া উঠিয়াছে। এই খাল বন্ধ হইয়া যাওয়াতে কয়েক হাজার চাষী চাষাবাদের জন্য গৃহ ছাড়িয়া আসাম চলিয়া গিয়াছিল।’





